তবে কি ত্রিপুরা বিজেপিতে ভাঙন নিশ্চিত? বিপ্লব দেবের সরকারের পতন কি সময়ের আগেই ঘটতে চলেছে? এখনও বছর দেড়েক দূরে ত্রিপুরা বিধানসভার ভোট। তৃতীয়বার বাংলা জয়ের পর ত্রিপুরাকে টার্গেট করে অঙ্ক কষা শুরু করে দিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। বাংলায় পর্যুদস্ত হওয়ার পর বিজেপি ত্রিপুরার ক্ষমতা ধরে রাখতে যেমন আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে অন্যদিকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল মরিয়া হয়ে উঠেছে সেখানে শক্ত ঘাঁটি গাড়তে। এই পরিস্থিতিতে শুক্রবার সকালে ত্রিপুরা বিজেপির বিদ্রোহী বিধায়ক সুদীপ রায় বর্মণ-সহ আরও দু-এক জন বিজেপির বিধায়ক কলকাতা পৌঁছলে সেই জল্পনা আরও জোরদার হয়ে উঠেছে।
মুকুল রায় ঘনিষ্ঠ সুদীপ রায় বর্মণকে নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই জল্পনা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে মুকুল রায়ের তৃণমূলে ঘরওয়াপসির পর থেকে সুদীপ রায় বর্মনও তৃণমূলে ফিরতে পারেন বলে জল্পনা তৈরি হয়েছিল। কার্যত সেই জল্পনা সত্যি হতে চলেছে। শুক্রবার সকালেঈ কলকাতায় পৌঁছেছেন ত্রিপুরা বিজেপির বিদ্রোহী বিধায়ক সুদীপ রায় বর্মণ। তাঁর সঙ্গে কলকাতায় এসেছেন আরও এক বিধায়ক। অন্যদিকে সুদীপ ঘনিষ্ঠ আরও এক বিধায়ক গত কয়েকদিন ধরে কলকাতাতে রয়েছেন। এছাড়া তৃণমূলে যোগ দিয়ে চেয়ে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চিঠিও দিয়েছেন বিধায়ক জিতিন সরকার। জানা গিয়েছে, খুব শীঘ্র সুদীপ রায় বর্মণের সঙ্গে বৈঠকে বসেতে পারেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
তবে কি কলকাতাতেই দলবদলের মধ্যে দিয়ে ঘটবে ত্রিপুরা বিজেপির ভাঙন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত অবশ্য, সুদীপের তৃণমূলে যোগদান সময়ের অপেক্ষা। উল্লেখ্য, ত্রিপুরা বিজেপির বিদ্রোহী বিজেপি বিধায়কদের মধ্যে অন্যতম হলেন সুদীপ। তাঁর বিদ্রোহের আঁচ পাওয়ামাত্র তৃণমূল ত্রিপুরাকে পাখির চোখ করেছে। এক সময় সুদীপের হাত ধরেই ত্রিপুরায় ঘাসফুল ফুটেছিল। কিন্তু মুকুল রায় বিজেপিতে যোগ দিতেই তিনিও বিজেপিতে যোগ দেন। পরবর্তীকালে বিধায়ক এবং পরে বিপ্লব দেব সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীও হন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেঈ বিপ্লব দেব সরকারের সঙ্গে তাঁর সংঘাতে বাঁধে এবং মন্ত্রিত্ব যায় তাঁর।
বিদ্রোহী বিধায়ক গত কয়েকদিন আগে পর্যন্ত বিজেপিতে রয়েছে বলে দাবি করলেও মনে প্রাণে তিনি বিজেপিতে যে নেই সেটি পরিষ্কার। তিনি একা নন, ত্রিপুরা বিজেপির অনেকেই তৃণমূলের দিকে পা বাড়িয়ে আছেন। তবে সেই সংখ্যাটা কত এটা এখনও স্পষ্ট নয়। ইতিমধ্যে খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, ‘ত্রিপুরা আমরা দখল করব’। ত্রিপুরারে বারবার আক্রান্ত হচ্ছেন তৃণমূল নেতা-কর্মীরা। তার মধ্যেও দলবদল চলছে সেখানে। দফায় দফায় সেখানে ছুটে যাচ্ছেন তৃণমূল নেতৃত্ব। বোঝা যাচ্ছে ত্রিপুরার মাটিতে ক্রমশ আলগা হচ্ছে বিজেপির পায়ের তলার মাটি। পাশাপাশি তৃণমূলের জমি শক্ত হচ্ছে। এখন পর্যন্ত যতজন বিজেপি বিধায়ক তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ করছে, তাতে বিপ্লব দেব সরকারের পতন অনিবার্য বলে মনে করছে তৃণমূল।
দল ভাঙিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তরে মন নেই তৃণমূলের। তাঁরা এটা চাইছেনও না। কিন্তু বিজেপি বিধায়কদের তৃণমূল-যোগ নিয়ে উৎসাহে যেমন কোনও কার্পন্য নেই অন্যদিকে বিজেপি বিধায়কদের সঙ্গে গোপন বৈঠকেও নিরুৎসাহী নয়। এসব কারণে ত্রিপুরায় প্রবল চাপে বিজেপি! ত্রিপুরা বিজেপিতে বিপ্লব দেব বনাম সুদীপ রায় বর্মনের আড়াআড়ি বিভাজনের যে সুর শোনা যাচ্ছে, তাতে দ্বৈরথ আরও স্পষ্ট। সুদীপ বিজেপিতে থেকেও সমান্তরাল পথে চলছে পরিবর্তনের সরকার প্রতিষ্ঠার পরও। বিজেপিতে সুদীপের অনুগামী অনেক বিধায়ক রয়েছেন। সুদীপের দলবদলের সঙ্গে সঙ্গে তাঁরাও যে ঘাসফুল শিবিরেই নাম লেখাবেন, তা বলাই বাহুল্য। ফলে তৃণমূলে শক্তি এক ধাক্কায় অনেকটা বেড়ে যেতে পারে।
কেবল সুদীপ অনুগামীরাই নন, বিপ্লব দেবের পক্ষে থাকা বিধায়করাও তো এখন আতান্তরে পড়েছেন। বিপ্লব দেবের সরকারের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলছে ত্রিপুরার বহু মানুষ। তাঁরাও নাকি তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন। অতএব জল্পনার পারদ চড়েছে হু-হু করে। এদিকে কংগ্রেসের একটা বড় অংশ তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন ইতিমধ্যে। কংগ্রেস নেতা সুবল ভৌটমিক যোগ দিয়েছেন তৃণমূলে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে বলেন, প্রবীণ নেতা বিগত পাঁচবারের বিধায়ক জিতেন সরকার তৃণমূল যোগ দিতে পারেন। তৃণমূলের সঙ্গে কথা হয়েছে বাম নেতা অজয় বিশ্বাসের সঙ্গে। তারপর প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি প্রদ্যোৎ কিশোর মাণিক্য দেববর্মনের সঙ্গেও। একের পর এক ঘটনায় তৃণমূলের পাল্লা ভারী হতে শুরু করেছে।
তবে কি নির্ধারিত সময়ের আগেই ত্রিপুরায় বিজেপির সরকার পড়ে যাবে? বিজেপি থেকে সুদীপ রায় বর্মন অনুগামীরা বেরিয়ে গেলে বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে কিনা তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। ত্রিপুরায় বিধানসভার আসন ৬০। ২০১৮-র বিধানসভা নির্বাচন অনুযায়ী বিজেপির আসন সংখ্যা ৩৬। আর বিজেপির জোট সঙ্গী আইপিএফটির আসন সংখ্যা ৮। আর বিরোধী দল সিপিএমের পক্ষে ১৬টি। আইপিএফটিকে নিয়ে বিজেপি ৪৪, যা ম্যাজিক ফিগার ৩১-এর থেকে অনেকটাই বেশি। কিন্তু আইপিএফটির সঙ্গে বিজেপির সম্পর্ক বর্তমানে ভালো নয়। তারপর বিজেপিতে দুটি গোষ্ঠীর মধ্যে আড়াআড়ি বিভাজনের সম্ভাবনা রয়েছে। কংগ্রেস-তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়া মুকুল-ঘনিষ্ঠ সুদীপ রায় বর্মন বরাবর দাবি করে এসেছেন তাঁর সঙ্গে রয়েছেন প্রায় ১৫ জন বিধায়ক। এখন এই ১৫ জন যদি বেরিয়ে আসে, তাহলে তো বিজেপি বিপদে পড়ে যাবে। কারণ সুদীপ রায় বর্মনের অনুগামী বিধায়করা দল ছেড়ে বেরিয়ে এলে আইপিএফটিকে নিয়েও সরকার বাঁচাতে পারবে না বিজেপি। সুদীপ রায় বর্মনের সঙ্গে তিন জন বিজেপি বিধায়ক এখন কলকাতায়। অপেক্ষা তৃণমূলের সঙ্গে সুদীপ রায় বর্মনের কোনও বৈঠক হয় কি না।