| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বীরপথিক বীরেশ্বর

Reporter Default
রিপোর্টার / ৩৯২ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

শুভেন্দু অধিকারী

স্বামী বিবেকানন্দ এক আশ্চর্য জীবনের নাম। একইসঙ্গে তিনি ভারতাত্মার মূর্ত বিগ্রহ, বিশ্বপ্রেমিক, স্বদেশপ্রেমিক, বৈপ্লবিক সন্ন্যাসী, সংগ্রামের পূজারী, যুগনায়ক, চিন্তানায়ক, কল্যাণব্রতী, জাগরণের অগ্রদূত এবং আরও অনেক বিবেকানন্দ। তাঁর সম্পর্কে উচ্চারিত প্রতিটি বিশেষণই জানান দেয়— তিনি কে, তিনি কী, তিনি কত ব্যাপ্ত। আধুনিক ভারতবর্ষের ইতিহাস যাঁরা রচনা করেছেন, স্বামী বিবেকানন্দ তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম। তাঁর সৃষ্ট ইতিহাস ইট-কাঠ-পাথরের ইতিহাস নয়, এই ইতিহাসের প্রারম্ভে মানুষ, অন্তে মানুষ। মানবমহিমাকে তিনি শীর্ষ স্থানে অধিষ্ঠিত করে মানুষকে ঈশ্বরের সঙ্গে একাসনে বসিয়েছেন নির্দ্বিধায়। তীক্ষ্ণ স্পষ্ট ভাষায় উচ্চারণ করেছেন, জগতের সমুদায় ধনরাশির চেয়ে মানুষ বেশি মূল্যবান…মানবপ্রকৃতির মহিমা কখনও ভুলো না, আমরাই সর্বোচ্চ ঈশ্বর। স্বামীজীর বাণী সর্বজনীন উদারতায় পূর্ণ, সর্বজনগ্রাহ্য। এখানে কোনও মহাদেশ, দেশ, ধর্ম, সম্প্রদায় বা জাতির প্রশ্ন নেই। মানুষই শেষ কথা। ১৮৯৩ সালের শিকাগো বিশ্বমহাধর্মসভা পৃথিবীর ইতিহাসের অতীব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। আর্ট ইনস্টিটিউটের কলম্বাস হল-এ স্বামীজীর ভাষণ সমগ্র বিশ্ববাসীর চেতনায় যে চিরস্থায়ী ‘দাগ’ চিহ্নিত করেছে, তা এতটাই গভীর, সত্য ও কালজয়ী যে, ১২৬ বৎসরের কাল-কালোত্তরেও তাকে মুছে ফেলা বা ভুলে থাকা অসম্ভব। অসম্ভব বলেই যে সময়ের মধ্য দিয়ে আমরা এই মুহূর্তে চলেছি, তাঁর বক্তব্যে প্রাসঙ্গিকতা যেন দিনে দিনে আরও অনিবার্য হয়ে উঠেছে। সজ্ঞানে তো নয়ই অজ্ঞানেও তা আমাদের জীবনধারা থেকে কিছুতেই বাদ দেওয়া যাবে না।

বহুমুখী ও বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। তাঁর আধ্যাত্মিকতা, সৃজনক্ষমতা, দেশপ্রেম ও সাহসিকতা সকলের কাছে সুবিদিত। এই সবের পাশাপাশি ছিল তেজস্বী বাগ্মীতা। আমাদের অন্তরের প্রতিচ্ছবি যেমন সবচেয়ে বেশি করে ধরা দেয় চোখের আলোয়, বিবেকানন্দের অন্তরের কথা তেমনই সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে তাঁর ইস্পাত শাণিত উজ্জ্বল শিকাগো বক্তৃতামালায়। বস্তুতপক্ষে, শিকাগো বক্তৃতামালার মধ্য দিয়ে বিশ্ববাসীর মানসলোককে ইতিবাচক ও শক্তিশালী চিন্তা, ভাব ও আদর্শের দ্বারা প্রদীপ্ত করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। বেদান্তের মুক্ত স্বচ্ছ দৃষ্টি, সুগভীর মানবপ্রীতিকে অগাধ আত্মবিশ্বাসে প্রশস্ত দীপাধারে প্রজ্জ্বলিত করেছেন সমগ্র মানবজাতির পথনির্দেশ করার জন্য। বিবেকানন্দ দিয়েছেন বিশ্ববোধ। অপূর্ব তাঁর উচ্চারণ, অসামান্য মানববোধ। অনির্ণেয় প্রসারিত আকারে তিনি মানব ও মানবজাতিকে দর্শন করেছেন, উপস্থিত করেছেন নব মানবধর্ম। ঘোষণা করেছেন, কোনও জাতি অপর জাতি থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে বাঁচতে পারে না। কেবল সংকীর্ণ জাতীয় ভিত্তিতে কোনও বৃহৎ সমস্যার সমাধান হতে পারে না। সমগ্র বিশ্বকে সঙ্গে না নিয়ে একটি পরমাণুও চলতে পারে না। মানুষের কাছে তার অন্তর্নিহিত বাণী প্রচার করা এবং দেবত্ব-বিকাশের পন্থা নির্ধারণ করতে গিয়ে তিনি তাঁর গভীর উপলব্ধি ব্যাখ্যা করেছিলেন, এই সংসার কুসংস্কারের শৃঙ্খলে আবদ্ধ। এক ধর্মের প্রতি আর এক ধর্মের হানাহানি, ধর্মান্ধতা এবং গোঁড়ামির অন্ধকার যুগ যুগ ধরে বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধ এবং মানবিকতাকে তমসাচ্ছন্ন করে রেখেছে। এই সকল দুঃখের মূলে রয়েছে অজ্ঞতা। জগতকে আলো দেখানোর জন্য চাই আত্মবিসর্জন। এটাই  ছিল অতীতকালের কর্মরহস্য; যুগ যুগ তাই-ই চলতে থাকে। জগতে যাঁরা সবচেয়ে সাহসী ও বরেণ্য, তাঁদের চিরদিন ‘বহুজনহিতায় বহুজনসুখায়’ আত্মবিসর্জন করতে হবে। অনন্ত প্রেম ও করুণা নিয়ে এই পৃথিবীতে শত শত বুদ্ধের আবির্ভাব প্রয়োজন। স্বামীজী বিশ্ববাসীকে আত্মদীপ্ত হতে বলেছেন। যে আদর্শের রূপরেখা তিনি আমাদের সামনে রেখেছেন, তার জন্য ভিতরে ভিতরে পুড়ে খাক হয়ে যেতে বলেছেন, যেভাবে সেই আদর্শের জন্য তিনি নিজেও দগ্ধ হয়েছিলেন। তাঁর এই শৌর্যবাণীর অন্তর্হিত অর্থ হলো প্রতি মুহূর্তে নিজের হ্রস্বতা অনুভব করা, যতক্ষণ না ছোটো ছোটো আমিত্বের ঊর্ধ্বে উঠতে পারি আমরা। প্রতি মুহূর্তে নিজের ব্যর্থতা উপলব্ধি করে সমন্বয়ের ঐক্য গড়ে তোলা। সমন্বয়— একত্ব, একাকিত্বের এবং ব্যক্তিত্বের। দৈনন্দিন জীবনে বিবেকানন্দের এই সর্বব্যাপী ঐক্যানুভূতি নিয়ে কাজ করতে গেলে প্রকৃত বীরের শৌর্য দরকার। তাঁর এই ভাবনায় অংশীদার হওয়ার জন্য হৃদয়-মননের দীর্ঘ কঠিন অনুশীলন প্রয়োজন। স্বামীজী আমাদের কাছ থেকে ঠিক এই অনুশীলনই চেয়েছেন। চেয়েছেন সমন্বিত বিশ্বদৃষ্টি এবং একক ব্যক্তিশক্তি। এই লক্ষ্যে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য, দুই বিশ্বকে দুই পাশে নিয়ে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন। উভয়কে মিলিয়ে দেওয়াই ছিল তাঁর অনন্য প্রতিভা। নিজেও বলেছেন, আমি কি শুধু ভারতের? আমি সারা পৃথিবীর। বিশ্বপথিক বিবেকানন্দ এই পর্যায়ে হয়েছিলেন বিশ্ববোধিপ্রাপ্ত।

শিকাগো মহাধর্মসভায় হিন্দু ধর্মের প্রতিনিধি রূপে স্বামীজীর নাম নথিভুক্ত হয়েছিল। নিজের ধর্মের প্রতি অটল আনুগত্য রেখেও তিনি অন্যান্য ধর্ম সম্প্রদায়কে সমমর্যাদা দিয়েছেন। বিশেষ একটা ধর্মে প্রতিষ্ঠিত হওয়া মানুষের মনে প্রসারিত করেছেন বিশ্বজনীন ধর্মের উদার ভাবনা। এই ধর্মের অর্থ বিশাল, কোনও সঙ্কুচিত অর্থে তাঁকে বাঁধা যায় না। গুরুদেব রামকৃষ্ণের অনুসরণে শিষ্য বিবেকানন্দও সর্বধর্মের সত্যকে গ্রহণ করার কথা বলেছেন, তবে ধর্মের সঙ্গে জুড়ে থাকা অপ্রমাণিত, অসার অলৌলিকতাগুলি বর্জন করে। স্বামীজী বারে বারে তাঁর বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট করতে চেয়েছিলেন, ভারতবর্ষ সনাতন হিন্দু ধর্মের দেশ। সেই হিন্দু ধর্ম যা মানুষকে সহনশীলতার শিক্ষা দেয়, যে ধর্ম মানুষকে সমস্ত ধর্মের সত্যতা স্বীকার করতে শেখায়। ধর্ম মানে শাস্ত্রপাঠ, তত্ত্বকথা, মতবাদ, পূজাআর্চা নয়। ধর্ম নিয়ে যুক্তিবিচারের উন্মাদনাও নয়। ধর্ম মানে আদর্শ মানুষ হওয়ার চেষ্টা করা এবং তা হয়ে ওঠা। আমাদের প্রাচীন ভারতবর্ষের বেদান্তের যে বাণী অবহেলার ধুলোয় ঢাকা পড়েছিল, তাকে নতুন আলোয় আনলেন, নতুন ব্যাখ্যা দিলেন। তাঁর মতে বেদান্তের মূল কথা অখণ্ড বোধ— এক বোধ। যাকে অদ্বৈত-ভাব বলা হয়। তিনি রাজযোগ, ভক্তিযোগ, জ্ঞানযোগ এবং কর্মযোগের কথা উত্থাপন করেছেন। সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন কর্মযোগকে, কর্মের সাধনাকে। যে কথাটা শিকাগো ভাষণের প্রথম দিন বলেছিলেন,  পরবর্তী বক্তৃতায় তা নানাভাবে বিভিন্ন উপমা দিয়ে বুঝিয়েছেন। আমাদের গরীয়সী ভারতমাতাই আমাদের আরাধ্য দেবতা। বিরাট ও স্বরাট! বিরাট রূপে এই জগৎ, সমস্ত মানুষ ও পশু আমার ঈশ্বর। তার পূজা করতে হবে। এই দেবতাই একমাত্র জাগ্রত দেবতা, সর্বত্রই তাঁর হস্ত, তিনি সকল স্থান ব্যাপিয়া আছেন। আমাদের স্বদেশবাসীই আমাদের প্রথম উপাস্য। নির্বিকার থেকে উদারভাবে মানুষের সেবা করতে হবে। নর-নারায়ণই সাক্ষাৎ দেবতা। মানব দেহধারী এই দেবতাকেই পূজা করতে হবে। এই পূজা সম্পন্ন করতে হবে অন্নদান, শিক্ষাদান ও ধর্মদানের দ্বারা। আত্মোন্নতিকল্পে পুঁথিগত বিদ্যার চেয়েও স্বামীজী জোর দিয়েছিলেন অন্তর্নিহিত পূর্ণতার প্রকাশের উপর। রামকৃষ্ণদেব ব্যক্তির চিত্তশুদ্ধির উপর জোর দিয়েছিলেন, বিবেকানন্দ চেয়েছিলেন ব্যবহারিক আচরণের ও সেই সঙ্গে মানসিকতার পরিবর্তনের মাধ্যমে সমাজ-সংস্কারের বদল। এটাও তিনি নিষ্পন্ন করতে চেয়েছেন ধর্মের মাধ্যমে। তাই দীপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন, মন্দির, তীর্থ, পূজাপাঠের মধ্যে ধর্মের সার নেই, আছে নিজের অনুভূতি, উপলব্ধিতে। আছে জীবনধারার আকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের মধ্যে। বিবেকানন্দ পাশ্চাত্যে ব্যক্তিরূপে নয়, ভারতবর্ষের প্রতীক রূপে উপস্থিত ছিলেন। শিকাগো মহাধর্মসভায় তাঁর মধ্য দিয়ে পৃথিবী পেয়েছিল চিরন্তন ভারতবর্ষকে। পৃথিবীর এই ভারত-প্রাপ্তি হলো স্বামীজীর সৃষ্টি-প্রয়াসের এক মহৎ কীর্তি। অন্যদিকে পৃথিবী থেকে আহৃত সত্যকে তিনি এনেছেন ভারতবর্ষের কাছে। সেই সত্য— যুবশক্তি, বৈজ্ঞানিক চেতনা এবং মানবিক অধিকারবোধের সমৃদ্ধ। তিনিই প্রথম ভারতীয়, যিনি সামগ্রিক ভারতবর্ষকে পৃথিবীর মানচিত্রে স্থাপন করেছেন। বিনা সঙ্কোচে, কোনও কুণ্ঠিত ভঙ্গি না রেখে, জ্বলন্ত সত্যের উন্নত অহংকার। তাঁর কাছ থেকেই পৃথিবী পেয়েছে ভারতীয় ইতিহাসের বহমান প্রাণধারার সন্ধান। সেই ইতিহাসে কেউ প্রত্যাখ্যাত নয়। সে ইতিহাস আর্য-অনার্য-দ্রাবিড়ের, কোল-ভিল-মুন্ডার, বৌদ্ধ-জৈন-পারসিক-মুসলমানের। সব জাতির মধ্য দিয়েই প্রবাহিত সনাতন সত্যের ধারা। স্বদেশ পরিক্রমাকালীন সঞ্চিত অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার নিঃসৃত করে ভারতবর্ষের শক্তি এবং দুর্বলতা উভয়দিকেই তিনি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। শ্রীবুদ্ধদেবের মতো, শ্রীশঙ্করাচার্যের মতো, শ্রীচৈতন্যদেবের মতো তিনি ভারতবর্ষের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত ঘুরেছেন। ভারতবর্ষের পৃষ্ঠায় লেখা হয়ে গিয়েছে তাঁর পদচিহ্নের পদাবলী। পূর্ব ভারতের পঞ্চবটীর তলায় যাঁর ধর্মসিদ্ধি, উত্তরে হিমালয়ে যিনি সমাহিত, সুদূর দক্ষিণে কন্যাকুমারিকায় যাঁর মানবসিদ্ধি। এই বিবেকানন্দ পুণ্যভূমি ভারতবর্ষের গৌরবের কথা তুলে ধরেছেন শিকাগো ভাষণে। ভারতভূমি শ্রেষ্ঠ পুরুষদের সৃষ্টি করেছে, কিন্তু জনগণের শক্তিকে জাগ্রত করতে পারেনি। তথাপি এ কথাও সত্য, ভারতবর্ষ এখনও বেঁচে আছে এক মহান সত্যকে উপলব্ধি করতে পেরেছে বলেই। নিজের অদ্বৈত সত্তাকে সে বাঁচিয়ে রেখেছে নীরব সহনে, অপূর্ব তপস্যায়। সমগ্রভাবে পাশ্চাত্য জগতে তাঁর বিশ্বজয়ী আবির্ভাবের দ্বারা স্বামীজী পরাধীন ভারতের মানুষদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন, ভারতের মানুষও মানুষ। এই পৃথিবীতে তাঁদেরও জায়গা আছে। অতীতে যে স্থান ছিল মর্যাদার, ভবিষ্যতেও তাই থাকবে। দেশমাতৃকার এই স্বরূপ উদ্ঘাটন করে তিনি আমাদের দিয়েছেন স্বদেশবোধ। নির্ভীক স্বদেশপ্রেমের জয়ধ্বনি যেন তাঁর সিংহস্বভাবের প্রকাশ— লোকে কী বলল, সেদিকে আমি ভ্রুক্ষেপ করি না। আমি ভগবানকে, আমার ধর্মকে, আমার দেশকে, সর্বোপরি দরিদ্র ভিক্ষুককে আমি ভালোবাসি।…মানুষের স্তুতি-নিন্দায় আমি দৃকপাতও করি না। স্বামীজীর এই বীরোদাত্ত আহ্বান মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি আর বৈপরীত্যের মধ্যে পূর্ণ সংগতি সাধনের জন্য। তাঁর কাছে ‘পূর্ণ’ শব্দের অর্থ, আমাদের চারপাশে এবং আমাদের অন্তরে যে পরিব্যাপ্ত ভিন্নতা, তাদের আমূল ঐক্যসাধন, উত্তরোত্তর আরও বেশি সমন্বয়। এই ভাবনার পশ্চাতে যেমন রয়েছে তাঁর ঐশী চেতনা, তেমনই রয়েছে তাঁর স্বপ্ন। যে স্বপ্নগুলি মহান সন্ন্যাসীকে মৃত্যুহীন করেছে। স্বামীজীর অগণিত ভক্তবৃন্দ নানা দৃষ্টিকোণ থেকে এইসব স্বপ্নের ইঙ্গিত পেয়ে আজও তাঁর অদৃশ্য উপস্থিতির অনুভূতি লাভ করে চলেছেন।

কপর্দকশূন্য এক সন্ন্যাসী, যিনি পরিব্রাজকরূপের মধ্যেও বিজয়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। মাত্র ২৩ বছর বয়সে সংসার থেকে বেরিয়ে এলেন, প্রায় অনাহারে, সন্ন্যাসজীবনের কঠিন পরীক্ষা, আসমুদ্র ভারতবর্ষকে বুঝে নেওয়ার অবিশ্বাস্য প্রচেষ্টা, তারপর অনুরাগীদের তোলা সামান্য অর্থ সম্বল করে মহাসমুদ্রের ওপারে পাড়ি দিয়ে শিকাগো ধর্মমহাসভায় বিস্ফোরক আবির্ভাব। এক মহাজীবনের অভাবনীয় প্রকাশ। এই হলেন প্রত্যাদিষ্ট পুরুষ, বিশ্বপথিক বীরেশ্বর বিবেকানন্দ। বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে যিনি একযুগের ইতিহাসের প্রয়োজন পূরণ করেছেন সাহসের, শক্তির, প্রেমের, বেদনার মূর্ত প্রেরণা হয়ে। শিকাগো বক্তৃতা থেকে কী পেয়েছি আমরা? বিপুল সে সম্পদ! প্রথমত, আমরা পেয়েছি আত্মবোধ। দ্বিতীয়ত, ভারতবোধ। তৃতীয়ত, বিশ্ববোধ। এবং চতুর্থত, মানববোধ। কোনও বিবেকবান ঐতিহাসিক না স্বীকার করে পারবেন, এই সম্পদগুলি সর্বাধিক পরিমাণে, সর্বোচ্চরূপে স্বামী বিবেকানন্দের কাছ থেকেই পৃথিবীর দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছে? বিশ্ববাসীর ঐহিক ও পারমার্থিক মঙ্গল করতে এবং জ্ঞানালোক দিয়ে সকলের মধ্যে প্রসুপ্ত ব্রহ্ম-সিংহকে জাগরিত করতেই যে এই জগতে সন্ন্যাসীর আবির্ভাব হয়েছে! তাঁর চল্লিশ বছরের ঝঞ্ঝাময় জীবন যেমন শত বাধা পেরিয়েও স্বপ্নময়, তেমনই ১২৫ বছর অতিক্রান্ত শিকাগো বক্তৃতার উদ্ভাস এতদিন পরেও নতুন যুগের নাগরিকদের প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠার বাসনাকে জাগিয়ে তোলে। স্বামীজীর সেই উপদেশ, সেই বাণী সুধু আমাদের দেশেই নয়, সমগ্র পৃথিবীর মানুষ সাদরে গ্রহণ করেছেন এবং তা জীবনচর্যায় কাজে লাগাচ্ছেন। অন্য ধর্মবিশ্বাসী মানুষ খ্রীস্টান, বৌদ্ধ, মুসলমান, জৈন, জরাথ্রুষ্টিয়, ইহুদি প্রভৃতি ধর্মের মানুষও তাঁদের জীবনে স্বামীজীর বাণী-আদর্শকে গ্রহণ করতে সচেষ্ট হয়েছেন। আজ বিশ্বের যেখানেই জাতীয়তাবোধ ও আন্তর্জাতিকতা নিয়ে সভা, আলোচনা হয় সেখানেই ডাক পড়ে রামকৃষ্ণ মিশনের। রামকৃষ্ণ মিশন বিশ্বজনীন ধর্মের আদর্শ। এইসব আলোচনাচক্রের মূল সুর স্বামীজীর আদর্শ। পৃথিবীর সর্বত্র সর্বক্ষেত্রে সর্ববিষয়ে স্বামীজীর বাণী ছড়িয়ে আছে। যে যেভাবে স্বামীজীকে চায়, সে সেভাবে স্বামীজীর বাণী পায়। অভিঘাত ও সঙ্কট থেকে মুক্তি পেতে আমাদের জীবনেও তাকে কাজে লাগাতে হবে। ভারতবর্ষ তার অতীতকে ছাপিয়ে আরও মহীয়ান হবে, পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ দেশ হওয়ার গৌরব অর্জন করবে— এই ছিল স্বামীজীর স্বপ্ন। আত্মজাগানিয়া বিবেকানন্দের বাণীই সেই স্বপ্নপূরণের, পরিত্রাণের পথ। তিনি নিজেও বলেছেন, ‘ওঠ, ওঠ, মহাতরঙ্গ আসছে, অনওয়ার্ড, অনওয়ার্ড, অনওয়ার্ড’।…এগিয়ে যাও, এগিয়ে যাও, নামের সময় নেই, যশের সময় নেই, মুক্তির সময় নেই, ভক্তির সময় নেই, দেখা যাবে পরে। আমরণ কাজ করে যান। আমি আপনাদের সঙ্গে রয়েছি। আমার শরীর চলে গেলেও আমার শক্তি আপনাদের সঙ্গে কাজ করবে। আমাদের হৃদয়বেত্তায় ও আন্তরিকতায় মিশিয়ে নিতে হবে সেই শক্তি। এজন্য সকল নাগরিককে এগিয়ে আসতে হবে। নিজেদের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে দেশ গঠনে সহায়তা করতে হবে। সকলের মিলিত চেষ্টায় ভারত আবার জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন পাবে।

সংগ্রামী মা মাটি মানুষ পত্রিকার ২০১৯ পূজা সংখ্যায় প্রকাশিত

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev