পশ্চিমবিদ্য ভারতীয় ইতিহাস বলছে পর্তুগিজদের হাত ধরে ভারতে তাস খেলার উদ্ভব। বাংলার তথা বিষ্ণুপুরের ইতিহাস বলছে মল্লরাজাদের সমৃদ্ধিকালে দশাবতার তাস আর তাস খেলার প্রবর্তন হয়। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মশাই ১৮৯৫ সালের এসিয়াটিক সোসাইটির জার্নালের এক ছোট্ট নোটে বলছেন …I fully believe that the game was invented about eleven or twelve hundred years before the present date.
![]()
শাস্ত্রী মশাই-এর হিসেব অনুযায়ী এই খেলার উদ্ভব সপ্তম-অষ্টম শতক। প্রথম কারণ সাধারণত প্রচলিত দশাবতার বিশ্বাসে জগন্নাথ বা বুদ্ধের স্থান নবম— কল্কীর (স্মরণ করুন কবি কোকিল জয়দেবের দশাবতার শ্লোকাবলী— প্রলয় প্রলয়ধি জলে-র বুদ্ধসংক্রান্ত শ্লোকটি) আগে। কিন্তু দশাবতার তাস অনুযায়ী জগন্নাথ বা বুদ্ধদেবের স্থান পঞ্চম। শাস্ত্রীমশাই-এর যুক্তি ধরে বলাযায়, বাংলায় এমন এক সময়ে দশাবতার তাসের খেলার প্রবর্তন হয়েছিল, যখন বুদ্ধদেব পঞ্চম অবতার রূপে গণ্য ছিলেন।
![]()
তাসে বুদ্ধমুর্তি আদতে জগন্নাথ মূর্তি— কেবল মাথা ও হাত-সহ দেহকাণ্ডের মূর্তি। সুতরাং জীবের ক্রমবিকাশেরস্তরে নৃসিংহ (অর্ধ নর অর্ধ পশু) এবং বামনের (পূর্ণ নর) মধ্যবর্তী স্থান পেয়েছেন তিনি— অর্থাৎ নিম্নতম জীব মত্স্য থেকে পূর্ণ মানব পর্যন্ত বিকাশের ইতিহাসের একদম মাঝখানটি অধিকার করে আছেন তিনি— তাই বিনয় ঘোষবাবু এটিকে বলছেন …খুব যুক্তিসংগত স্থান। আর ভারতীয় চিহ্নতত্বের বিকাশের দৃষ্টিভঙ্গী হিসেবে যদি দেখা যায়, দশাবতার তাসে বুদ্ধের প্রতীক পদ্ম। অর্থাৎ এই তাসটি এমন সময় প্রতিভাত হয় যখন বুদ্ধ পদ্মপাণিরূপে পরিচিত ছিলেন। অর্থাৎ পদ্ম ছিল তাঁর পুজোর প্রতীক — যে সময়ের বাংলার কথা আমরা আলোচনা করছি সেটি হল মহাযানী বাংলার কাল। ৮০০ থেকে ১০০০ খ্রীষ্টাব্দের সময়। পাল রাজত্ব বা তার কিছু আগেও হতে পারে। জয়দেব বা ক্ষেমেন্দ্রর কালে (আটশ বছর আগে) প্রচলিত ধারার উত্পত্তি হলেও পাল রাজাদের আগেও এই দশাবতার তাস খেলার প্রচলন ছিল।
![]()
হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মশাই-এর বৌদ্ধিক কাজের প্রায় প্রতিটি অংশে বৌদ্ধবাই-এর ছোঁয়া ছিল, এ মিথ কিন্তু মিথ্যা নয় — বলেছেন অনেক ভাবুকই — বিশেষ করে বিনয় ঘোষ-মশাই। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রকাশন বিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ শাস্ত্রীমশাই-এর যে রচনাবলী প্রকাশ করেছে তার ছত্রে ছত্রে বৌদ্ধবাই-এর তত্বের প্রকাশ পেয়েছে। এবং তাঁর এই অন্তর্দর্শন অসম্ভব সত্য। দশাবতার তাস খেলা, অঙ্কণরীতি, মুদ্রা, রংকরার পদ্ধতি দেখলে পাল যুগেরই কথা সর্বাগ্রে মনে আসে।
![]()
কি এই দশাবতার তাস — কি তার বৈশিষ্ট্য? তাস আকারে গোল এবং ১২০টা তাসের মধ্যে ১০টি তাসে বিষ্ণুর দশ অবতারের ছবি যথা মৎস, কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহ, জগ্ননাথ, বামন, পরশুরাম, রাম, বলরাম এবং কল্কির ছবি হাতে আঁকা থাকে। প্রতি অবতারের অধীনে একজন রাজা ও একজন মন্ত্রী থাকেন। তাঁদের প্রত্যেকের অধীনে থাকে অস্ত্র — শস্ত্র। এইভাবে প্রত্যেক অবতারের নিচে বা অধীনে ১১টা তাস থাকে। প্রতি অবতারের পয়েন্ট আলাদা। সময় ও আবহাওয়া অনুযায়ী অবতারদের পয়েন্ট বদলে যায়। যেমন সকাল বেলা সূর্য ওঠার পর “রাম” অবতার তাসের পয়েন্ট সবচেয়ে বেশি কিন্তু সেই সময় বৃষ্টি হলে “কূর্ম” অবতারের পয়েন্ট বেশী হবে। মল্ল রাজাদের আমলে খেলার আগে স্নান করে শুদ্ধ বস্ত্রে ৫ জন খেলোয়াড়কে আসতে হত। ৬টা আসন পাতা হত ৫ জন নিজ আসনে বসতেন, মাঝের আসন শ্রী বিষ্ণুর নামে রাখা হত।
এই তাসগুলি রাজার তাস। মানে এতে প্রত্যেক অবতার একটা করে কাঠামোর তলায় অবস্থান করছেন। আর অন্যটি মন্ত্রীর তাস — যেখানে কোনো তে-কাঠির কাঠামো থাকে না।
![]()
পটুয়ারা পটের জন্য যে পদ্ধতিতে পট তৈরি করেন, বর্তমানের দশাবতার তাস শিল্পী শীতল ফৌজদার সেই পদ্ধতিতেই তার দশাবতার তাসের কাঠামোটা তৈরি করেন। তারপর শুরু হয় সূক্ষ্মপদ্ধতিতে অঙ্কন। এবং রীতিটি বাংলার নিজস্ব। আজ আর ১২০টা তাস খুব বেশি বিক্রি হয় না। তাই শীতল দশটা তাসেই আবদ্ধ রেখেছেন তাঁর দশাবতার তাস। মহা সৌভাগ্যবান বাংলা, আজও শীতল দশাবতার তাস এঁকে চলেন; আর শীতলের চোখেই আজও আমরা পুরোনো বাংলাকে দেখি।
কি ভাবে তৈরি হয় এ অসাধারণ শিল্প কৃতি।
পটুয়ারা পটের জন্য যে পদ্ধতিতে পট তৈরি করেন, বর্তমানের দশাবতার তাস শিল্পী শীতল ফৌজদার সেই পদ্ধতিতেই তার দশাবতার তাসের কাঠামোটা তৈরি করেন। তারপর শুরু হয় সূক্ষ্মপদ্ধতিতে অঙ্কন। এবং রীতিটি বাংলার নিজস্ব। আজ আর ১২০ টা তাস খুব বেশি বিক্রি হয় না। তাই শীতল দশটা তাসেই আবদ্ধ রেখেছেন তাঁর দশাবতার তাস।
![]()
উপকরণ :
কাপড় : আগে পুরানো ধুতি ব্যবহৃত হত এখন মার্কিনের কাপড়। এই কাপড় সমান মাপে কেটে নিতে হবে।
আঠা : প্রথমে তেঁতুল বীজ বার করে ৩/৪ দিন শুকানোর পর ভাজতে হবে। তারপর ৫/৭ দিন জলে ভিজিয়ে রাখার পর যখন তা ফুলে উঠবে তখন হামানদিস্তায় গুঁড়ো করে ৪/৫ দিন শুকাতে হবে। তারপর সেটিকে আবার ফুটালে তৈরি হবে আঠা। বেলের বীচি বার করে ৮/১০ দিন ভিজিয়ে জল ছেঁকে বেল আঠা বার করা হবে। এরপর তেঁতুল আঠা, শিরীষ আঠা ও বেলের আঠা নির্দিষ্ট ভাবে মিশিয়ে তৈরি হবে সম্পূর্ণ আঠা।
এই আঠা দিয়ে ৬/১০ পিস কাপড় জোড়া হবে। তারপর সেই কাপড় শুকিয়ে ডাইসে ফেলে চার চৌকো আকার দেওয়া হবে।কাপড় শুকানোর সময় সেই এলাকায় কারো যাওয়া বারণ কারণ এত পিচ্ছিল হয়ে থাকে যে অসাবধানে এক বার পা পড়লেই অবধারিত পপাত চ। তবু প্রতি বছরে ছোট খাটো ঘটনা ঘটেই থাকে। কেটে নেওয়ার পর যে সুতো কাপড়ের চারধারে বেড়িয়ে থাকে তা পেয়ারা গাছের কাঠে তৈরি একটি যন্ত্র দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হবে একই সঙ্গে সেটিকে নির্দিষ্ট আকার দেওয়া হবে।
এবার আঁকার পালা। দরকার তুলি ও রং।
তুলি : ছাগলের ল্যাজের লোমে তৈরি তুলি ব্যবহার করা হয় কারণ এর রঙ ধারন ক্ষমতা অনেক বেশী।
রঙ : মুলত প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার;
কালো : কাঠ কয়লা / ভুসো কালি।
হলুদ : কাঁচা হলুদ
সবুজ : শিম পাতা
লাল : পাহাড় থেকে আনা পাথর।
সাদা : পাহাড় থেকে আনা পাথর
অরেঞ্জ : লটকন
নীল : বাজার থেকে কেনা নীল বড়ি
প্রতিটি তাস একান্ত ভাবেই হাতে আঁকা
Oshadharon!
কৃতজ্ঞতা দিদিমনি