“গান, বাজনা, মতিচুর/এই তিনে বিষ্ণুপুর” — প্রাচীন মল্ল রাজধানী বিষ্ণুপুরকে ঘিরে এই প্রবাদ। গানের সঙ্গে বাজনার যে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক তেমনি বিষ্ণুপুরের সঙ্গে মতিচুরের এক নিবিড় সম্পর্ক। গানের সুরে বাদ্যযন্ত্রের ঝংকার মিশে গিয়ে বিষ্ণুপুর খ্যাত ‘সংগীতের দ্বিতীয় দিল্লি’ হিসাবে। সঙ্গীত ছাড়াও বিষ্ণুপুরের রসনা তৃপ্তিকারক রসালো মতিচুরে মন মজেছে বহু মিষ্টি প্রেমীর।
রাঢ়বঙ্গের ঘরে ঘরে খই, বাজরা, মুড়ি, চিঁড়ের সঙ্গে গুড় বা দোলা চিনি মিশিয়ে যে মিষ্টান্নশিল্পের সূচনা হয়েছিল সুদূর অতীতে, উত্তরণের পথে মধ্যযুগে তা উত্তীর্ণ হয়েছে বৈষ্ণব কবিদের নামাঙ্কিত কাঞ্চন-লতিকা, লবঙ্গ-লতিকা, মৌক্তিকাক্ষ বা মতিচুর জাতীয় রসালো মিষ্টান্নতে।
হিন্দিতে মতি কথার অর্থ হলো মুক্তা, চুর কথার অর্থ হল ভাঙ্গা। অতএব মতিচুর কথার অর্থ হলো মুক্তার ভাঙ্গা গুড়া। ছোট ছোট মুক্ত দানার মত বোদে বানিয়ে একসঙ্গে হাতে গোল পাকিয়ে তৈরি করা হয় মতিচুরের লাড্ডু।
আভিধানিক অর্থ মতিচুরের –মিহিদানা কিন্তু মিহিদানা মানেই মতিচুর নয়। কারণ মতিচুরের একটা নিজস্ব মৌলিক উপাদান আছে, যার সঙ্গে মিহিদানার উপাদানের কোন মিল নেই। মিহিদানা তৈরি হয় মূলত গোবিন্দভোগ, কামিনীভোগ অথবা বাসমতি চালের সাথে সামান্য বেসন এবং জাফরান বা ঈষৎ পীতাভ রঙ মিশিয়ে। এটি মিহি অর্থ্যৎ ক্ষুদ্র দানা বিশিষ্ট মিষ্টান্ন।

আর মতিচুর তৈরি হয় পিয়াল বীজের বেসন থেকে। পিয়ালের বেসনের সাথে আনুপাতিক হারে চালগুড়ি মিশিয়ে পরিমাণমতো জল দিয়ে বেশ ভালোভাবে বেসন ফেটিয়ে থাক অর্থাৎ পাট করে হালকা আঁচে দেশি ঘিয়ে মতিচুর ভাজা হতো। তারপর চিনির রসে ডুবিয়ে রেখে নির্দিষ্ট সময়ে ঠান্ডা করে নেওয়া হতো।
মতিচুরে রংয়ের ব্যবহার নিষিদ্ধ কিন্তু ক্ষেত্র বিশেষে অল্পমাত্রায় বাসন্তী রং ব্যবহার করা হয়। মিহিদানা জলে ভাসে না। মতিচুর কিন্তু জলে ভাসতো। ঐতিহাসিক যুগের সেই মতিচুর মিহিদানার তুলনায় ঘি টানতো বেশি, খেতে হতো খাস্তা—মুখে দিয়ে অল্প একটু চাপ দিলেই নিমেষেই মিলিয়ে যেত মুখে।
কৃষ্ণদাস কবিরাজ তার ‘গোবিন্দ লীলামৃত’ গ্রন্থে মৌক্তিকাক্ষ নাড়ুর উল্লেখ করেছেন —
“মনরমা করো তুমি নাড়ু মনোহরা। / মৌক্তিকাক্ষ নাড়ু কর তুমি রত্নমালা।।”
বৃন্দাবনে রচিত গোবিন্দ লীলামৃত গ্রন্থটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন যদুনন্দন দাস। উপরিউক্ত মৌক্তিকাক্ষ নাড়ুই বিষ্ণুপুরের মতিচুর। বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজারা বিশেষত বীর হাম্বির কৃষ্ণ প্রেমে পাগল ছিলেন। বৈষ্ণব ধর্মের দীক্ষিত হয়ে গোবিন্দের আরাধনার জন্য একের পর এক টেরাকোটার মন্দির বিষ্ণুপুরে গড়ে তুললেন। এইসব মন্দিরে পূজার নৈবিদ্যে বৈচিত্র আনার লক্ষ্যে বিভিন্ন মিষ্টির আমদানি করা হতো। রাজা হাম্বীর এর জন্য মুর্শিদাবাদ থেকে হালুইকর নিয়ে এসেছিলেন। আর তার ইচ্ছেতেই তৈরি হয় নতুন মিষ্টি মতিচুর। যদিও মল্ল রাজাদের আমলে এই মিষ্টিটি রাজভোগ হিসেবে ব্যবহার হত।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ লক্ষ লক্ষ নরহত্যার পাশাপাশি হত্যা করেছিল বিষ্ণুপুরের মতিচুরকে। যুদ্ধের সময় বিষ্ণুপুরের দক্ষিণ পূর্বে অবস্থিত বাসুদেবপুর মৌজায় একটি এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত গামারবনী অঞ্চলে একটি ল্যান্ডিংগ্রাউন্ড নামান্তরে এরোড্রাম অর্থাৎ ‘যুদ্ধবিমান ঘাঁটি’ তৈরি করা হয়। যুদ্ধের গুরুত্ব উপলব্ধি করে তৎকালীন ব্রিটিশ শাসিত ভারত সরকার স্থানীয় জমিদারগণের বন জঙ্গল এবং পতিত জমি অধিগ্রহণ করেন। পিয়াল গাছের প্রাচুর্যের জন্য পিয়ালডোবা অঞ্চল সহ বিষ্ণুপুর শহরের পার্শ্ববর্তী মড়ার, ধবনী, বেনাচাপড়া, গামারবনী প্রভৃতি জঙ্গল মৌজাগুলিও সরকার অধিগ্রহণ করেন যুদ্ধকালীন তৎপরতায়। এই এলাকাগুলিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে পিয়াল গাছ ছিল। অধিগ্রহণের ফলে স্বভাবতই পিয়াল গাছগুলি কাটা হয়। ফলে পিয়াল ফল তথা পিয়াল বীজের অভাব ঘটতে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দাপটে মতিচুরের আকাল মৃত্যু হয়।
বর্তমানে বিষ্ণুপুরের মতিচুর নামে মিষ্টান্ন পাওয়া যায় তা পিয়াল বীজের বেসনের পরিবর্তে তৈরি হয় মটর ডালের বেসনের সঙ্গে গাওয়া ঘি মিশিয়ে। ফলে পিয়াল বীজের বেসনের তৈরির মধুচুরে সুস্বাদ এবং সুঘ্রাণ এখন আর নেই।

কিন্তু বিষ্ণুপুরের মোদকেরা দাবি করেন, মতিচুরের লাড্ডুর স্বাদ আজো অটুট রয়েছে। বিষ্ণুপুরেই যে এই মিষ্টির জন্ম এবং এই মিষ্টির মধ্যে অনন্যতা এবং প্রাচীনত্ব আছে তারই প্রমাণ দেয়ার জন্য কোমর বেঁধে প্রস্তুত বিষ্ণুপুরের মিষ্টান্ন ব্যবসায়ীরা। বিষ্ণুপুরের মোদকদের একাংশের দাবি, যেভাবে শক্তিগড়ের ল্যাংচা ও বর্ধমানের মিহিদানা ভারত সরকারের জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে, সেইভাবেই জিআই স্বীকৃতি পাক বিষ্ণুপুরের মতিচুরের লাড্ডু।
পৌরাণিক আখ্যানে একটি গল্প প্রচলিত আছে। শিশু গণেশ একবার জেদ ধরেছেন বেজায়। মা পার্বতী কিছুতেই শান্ত করতে পারেন না। অবশেষে তিনি শরণাপন্ন হন মহাদেবের। মহাদেবও গণেশকে শান্ত করার চেষ্টায় ব্যর্থ হন। এমতাবস্থায় মহাদেব তার জটাজালের অগ্রভাগের একটুখানি ছিড়ে নিয়ে নিক্ষেপ করেন ভূমিতে। মুহূর্তে সেই ছিন্নজটা থেকে এক সৌম্যকান্তি পুরুষ আবির্ভূত হয়ে বিনম্রচিত্তে মহাদেব কে বলেন, ‘প্রভু আদেশ করুন।’

রোরুদ্যমান গণেশ-কে দেখিয়ে মহাদেব বলেন যে কোন উপায়ে শান্ত করো ওকে। সুদর্শন পুরুষটি তৎক্ষণাৎ একটি লাড্ডু তৈরি করে ধরিয়ে দেন গণেশের হাতে। সুস্বাদু লাড্ডুটির স্বল্প অংশ মুখে দিতেই গণপতি ভুলে যান কান্নাকাটি। নাচতে থাকেন পরমানন্দে। এরপর থেকে প্রতিদিনই ওই পুরুষ গণেশকে লাড্ডু খাওয়াতেন। এই ঘটনার পর থেকেই নাকি লাড্ডু হস্তে গণেশ মূর্তি পূজার প্রচলন হয়। দেবাদিদের শঙ্করের অংশসম্ভূত উক্ত পুরুষটি হলেন মোদক বা ময়রা জাতির আদি পুরুষ এবং গণেশ হলেন মোদক জাতীর উপাস্য দেবতা। সেই পৌরাণিক যুগ থেকে ক্রন্দনরত এক দেব শিশুকে শান্ত করার জন্য সৃষ্টি হয়েছিল মিষ্টির। কালে তা আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার মন জয় করে। আর অবিভক্ত বঙ্গে এতাদৃশ মিষ্টান্ন মতিচুরের জন্মস্থান দেবনগরী বিষ্ণুপুর। মতিচুরের জয় জয়কার ও জনপ্রিয়তা আজ সর্বত্র।
Beautiful
Thank you