“সব বাড়িতেই একটি দৃশ্যে থমকে যাচ্ছে প্রাণ
দেখেছি হিন্দু ললনাদের
প্রতিরাত্রে বিয়ে দিচ্ছেন বিসমিল্লাহ খান”
নহবত …..কুন্তল মুখোপাধ্যায়।
যাঁর সুরের তানাবানা এক সুতোয় বেঁধেছে গোটা ভারতবর্ষকে, যাঁর সানাই প্রজাতন্ত্র দিবসের প্রথম আলোয় মনে করিয়ে দেয় ভারতের গঙ্গা-যমুনা সভ্যতার ঐতিহ্য, যাঁর সানাইয়ের সুরে বাতাস মুখরিত হলে বিয়ের মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে বেজে ওঠে শঙ্খ তিনিই সারা বিশ্বের সংস্কৃতির উজ্জ্বল নক্ষত্র ভারতরত্ন ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খান।
পিতা পয়গম্বর খান ও মাতা মিঠানের দ্বিতীয় পুত্র বিসমিল্লাহ। বিসমিল্লাহের ডাকনাম ছিলো কামরুদ্দিন।
শোনা যায় ঠাকুরদা নবজাতককে দেখে বলেন ‘বিসমিল্লাহ’ আর সেই থেকেই নাম তাঁর বিসমিল্লাহ খান’। পরিবারের সকলেই সঙ্গীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পয়গম্বর খান সাহেব ও তাঁর পুর্বপুরুষেরা রাজ দরবারে সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন। বিসমিল্লাহ খানের সঙ্গীতগুরু ছিলেন আলি বক্স বিলায়াতু।
বিসমিল্লাহের চোখ হীরার মতো ঝলমল করতো, তাতে মিশে থাকতো খেলাধুলা এবং শিশুসুলভ নিষ্পাপতা। তার কথায় ঝড়তো জ্ঞানের মুক্তা। হৃদয় ছিলো খাঁটি সোনার।
সানাইয়ের উৎপত্তিস্থল সম্ভবত পারস্য উপমহাদেশ। বৈদিক সাহিত্যে এর উপস্থিতি দেখা যায়। এর সুরের লহমায় নব আনন্দের বন্যা বয়ে দিলেও মূলত আবেশ থাকে কারুণ্যে। মোঘল আমলে সানাইয়ের নামকরণ হলেও যন্ত্রটির নবজন্ম হয় বিসমিল্লাহ খানের সুরের মূর্ছনায়। ১৯৩৭ সালে কলকাতায় অল ইন্ডিয়া মিউজিক কনফারেন্স এ সানাই বাজিয়ে সানাইকে ভারতীয় সংগীতের মূল মঞ্চে নিয়ে আসেন বলে মনে করা হয়।
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর সিদ্ধান্ত ছিলো প্রতিবছর ভারতের স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে রেডিওতে তাঁর সানাই প্রচারিত হবে। ১৯৫০ সালে ২৬শে জানুয়ারি লালকেল্লায় অনুষ্ঠিত ভারতের প্রথম প্রজাতন্ত্র দিবসে বিসমিল্লাহ রাগ কাফি বাজিয়ে মুগ্ধ করে দেন ভারতবাসীদের।
পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ এবং ভারতরত্ন ভারতের চারটি সর্বোচ্চ সম্মানে সম্মানিত হয়েছিলেন।

এক হৃদয়ের কুঠুরিতে মসজিদ অন্য কুঠুরিতে মন্দির নিয়ে অতিসাধারণ জীবন যাপন করতেন। আমেরিকার নাগরিকত্বের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।
একবার লন্ডনে অনুষ্ঠান শেষে প্রবাসীরা বললেন, “খান সাহেব ইঁহা বস জাইয়ে, কেয়া রাখ্খা হ্যায় কাশি মে”? দেশপ্রেমী বিসমিল্লা খাঁন উত্তর দিলেন, “গঙ্গা জল কা এক লোটা, সুঁখী রোটি বাসি, ধেত্তেরি কি লন্ডন, কাশি মেরি পেয়ারী”। এই হলেন আমাদের ওস্তাদ যাঁর সানাইয়ে বারাণসীর শিবের মন্দিরের দুয়ার খোলে। এটাই আমার ভারতবর্ষ ।
বিখ্যাত সিনেমা পরিচালক গৌতম ঘোষ বিসমিল্লাহ খানের জীবন এবং কর্মের উপর “সঙ্গ মিল সে মুলাকাত”— ‘মিটিং আ মাইলস্টোন’ তৈরি করেন।
তথ্যচিত্রে এক সাক্ষাৎকারে বিসমিল্লাহ সাহেব বেনিয়াবাগের মাটিতে চাদর পেতে নিজের জীবন ও শিল্প নিয়ে চিত্রনাট্যকার আইন রশিদ খানকে আড্ডার মাধ্যমে বলেছিলেন,— এই বাড়িতে আমরা গুলি খেলতাম। গুলি খেলাকালীনও সঙ্গীত ছিলো। এরপর উস্তাদজি গুলি মারার আঙুলে আঙ্গুল টেনে সঙ্গীতের টান কী সেটা মুখ দিয়ে সুরের ভঙ্গিতে বোঝালেন। বলতেন— যখন কোনও জিনিস দিনের পর দিন, বছরের পর বছর একটা জায়গায়, একটা স্থানে করা হয়, একটা আশ্চর্য জিনিস তৈরি হয় ওখানে। তেমনি এখানে দেওয়ালেও সঙ্গীত গেঁথে আছে।
‘মিটিং আ মাইলস্টোন’-এর শুরুতে দেখানো হয় সনাতন বেনারসের গঙ্গার ঘাট। নৌকা ভেসে আছে গঙ্গার ঘাটে। মন্দগতিতে ফুটে উঠেছে ভোরের প্রথম আলো। আলতো আলোর স্পর্শে জেগে উঠেছে পাখিরা। পুণ্যার্থীরা গঙ্গায় ডুব দিয়ে সূর্য্য দেবতাকে অর্ঘ্য প্রদান করেছেন গঙ্গা জল দিয়ে। চলছে গঙ্গায় প্রদীপ ভাসিয়ে দেওয়ার আয়োজন। সকল আয়োজনের স্তব্ধতা ভেদ করে বেজে উঠেছেন বিসমিল্লাহের মর্মভেদী সানাইয়ের সুর।

প্রাচীন লোকগাথার শহর বেনারস— যেখানে শিক্ষা, সঙ্গীত আর নৃত্যর সকল রসের ধারা মিলিত হয়েছে। বেনারসের গঙ্গার ঘাটে জ্বলতে থাকা ধিকধিকি আগুন পরমাত্মার সন্ধান দেয়। বেনারসের গঙ্গার জলে নিজেকে শুদ্ধ করে চলে যান মসজিদে। নিষ্ঠা ভরে নামাজ পাঠ করেন। বৃদ্ধের সারা শরীর জুড়ে মাখানো সঙ্গীতের রস। মন্দিরের প্রাঙ্গণে বাজিয়ে চলেছেন সানাই। আকাশ, বাতাস সুরের মূর্ছনায় বলে উঠছে “বিসমিল্লাহ”!
ওস্তাদ বলতেন, সঙ্গীতের কোন ধর্ম হয় না। নিজেকে আল্লাহ এবং সংগীতের উপাসক বলে অভিহিত করতেন। কাশীর মন্দিরে বিভোর হয়ে যখন সানাইয়ের সুরের মধ্যে ডুবে থাকতেন, সেখানে থাকতো পয়গম্বর আল্লাহর স্পর্শ। তাঁর সানাইয়ের ফুৎকারের মধ্যে লালন আর বিসমিল্লাহ এক সাথে বেজে ওঠে। ২১ শে আগস্ট ২০০৬ সালে ৯০ বছর বয়সে বারাণসীর হেরিটেজ হসপিটালে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
ওস্তাদের বেনারসের বাড়ী, যেখানে তিনি সঙ্গীতের গঙ্গায় ডুবে থাকতেন, যেটি ছিলো তাঁর উপাসনালয়, সেটি তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর শিষ্যরা এবং গুনগ্রাহীরা ২০০৬ সালে বাড়ীটিতে সংগ্রহশালা বা হেরিটেজ তকমা দেবার দাবী করেন। তাতে সরকার কর্ণপাত করেনি। গতবছর তাঁর উপাসনালয়ের একটি অংশ ভেঙে ফেলা হয় ও কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স হবে বলে দেওয়া হয়।
তাঁর ব্যবহৃত সানাই, ছবি, পুরস্কার সহ নানান জিনিস আত্মীয়রা নষ্ট করেছে বলে জানা যায়।
শিল্পীর নাতি নাজরে হাসান তাঁর প্রিয় সানাই একটি গয়নার দোকানে ১৭ হাজার টাকার বিনিময়ে বিক্রি করতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে ।
পার্থিব শরীর ত্যাগ করলেও, ভারতের আত্মার অটুট বন্ধনে সমস্ত বিভেদের মধ্যে সানাইয়ের সুরমূর্ছনায় শাশ্বত হয়ে বাজবেন বিসমিল্লাহ খান।
খুব ভালো লেখা। তথ্য নয় মন টেনে রাখার লেখা এটি। ধন্যবাদ।