রাজা কারিগর বিশ্বকর্মা/ স্বর্গে-মর্তে মিস্তিরি/ তোমার প্রসাদে শ্রমে অকাতর/ ধমনীতে ছোটে পিচকারি/ তোমার হুকুমে হাতিয়ার ধরি, আমরা বিশ্ব বাংলা তে/ থলথলে মাটি, ঠনঠনে লোহা অনায়াসে পারি সামলাতে …
নীলাভ আকাশে পাখিদের মতো ডানা মেলে উড়ে বেড়াচ্ছে নানান রঙের ঘুড়ি সকাল থেকে, ঢাকের শব্দ জানান দিচ্ছে দেবশিল্পীর আগমনী, একমুঠো দুর্গাপুজোর গন্ধ আর একরাশ ভালোলাগা….আজ বিশ্বকর্মা পূজা।
ঋগবেদ অনুসারে ব্রহ্মাপুত্র বিশ্বকর্মা সর্বদর্শী ও সর্বজ্ঞ। দেবতাদের স্থাপত্য ও প্রকৌশলের কারিগর। শিবের ত্রিশূল, বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র, যমরাজের কালদন্ড, ইন্দ্রের বজ্র থেকে শুরু করে রাবনের লঙ্কানগরী, জগন্নাথ দেবের মন্দির ও তাঁদের মূর্তি, হস্তিনাপুর, কৃষ্ণের দ্বারকানগরী, ইন্দ্রপ্রস্থ নগরী দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা দ্বারাই নির্মিত।
হিন্দু ধর্মে সকল দেব-দেবীর পুজোর তিথি নির্ধারিত হয় চন্দ্রের গতি প্রকৃতির উপর। কিন্তু বিশ্বকর্মা পুজোর তিথি স্থির করা হয় সূর্যের গতি প্রকৃতির উপর। সূর্য্য সিংহ রাশি থেকে কন্যা রাশিতে প্রবেশ করলে অর্থ্যৎ উত্তরায়ণের সময় এই পুজোর আয়োজন করা হয়। হিন্দু পঞ্জিকার দুই প্রধান শাখা সূর্যসিদ্ধান্ত এবং বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত— উভয়েই এ বিষয়ে একমত। আসলে বিশ্বকর্মার পুজো দিন ভাদ্র মাসের শেষ তারিখে নির্ধারিত। এই ভাদ্র সংক্রান্তির আগে বাংলা পঞ্জিকায় পাঁচটি মাসের উল্লেখ মেলে। এই পাঁচটি মাসের দিন সংখ্যাও প্রায় বাঁধাধরাই— সাকুল্যে ১৫৬টি দিন! এই নিয়ম ধরে বিশ্বকর্মা পুজোর যে বাংলা পঞ্জিকা মতে তারিখটি বেরোয়, তা ইংরেজি ক্যালেন্ডারের ১৭ সেপ্টেম্বরেই পড়ে। কোনও কোনও বছরে এই পাঁচ মাসের মধ্যে কোনওটা যদি ২৯ বা ৩২ দিনের হয়, একমাত্র তখনই বিশ্বকর্মা পুজোর দিন পিছিয়ে বা এগিয়ে যায়। তবে তা খুবই ব্যতিক্রমী ঘটনা।
কলিযুগে বিশ্বকর্মা কৌরব-পাণ্ডবদের রাজধানী হস্তিনাপুর এবং পাণ্ডবদের রাজধানী ইন্দ্রপ্রস্থের নির্মাণ করেন।
‘ময় ত্রিলোক বিখ্যাত দিব্যি মনিময় সভা নির্মাণ করলেন যার দীপ্তিতে যেন সূর্যের প্রভাও পরাস্ত হলো। এই বিশাল সভা নবোদিত মেঘের ন্যায় আকাশ ব্যাপ্ত করে রইল। তার প্রাচীর ও তোরণ রত্নময়, অভ্যন্তর বহুবিধ উত্তম দ্রব্যে ও চিত্রে সজ্জিত। কিংকর নামক আট হাজার আকাশচারী মহাকায় মহাবল রাক্ষস সেই সভা রক্ষা করতো। ময় দানব সেখানে একটি অতুলনীয় সরোবর রচনা করলেন, তার সোপান স্ফটিকনির্মিত, জল অতি নির্মল, বিবিধ মনিরত্নে সমাকীর্ণ এবং স্বর্ণময় পদ্ম, মৎস্য ও কূর্মে শোভিত। …সভাস্থানের সকল দিকেই পুষ্পিত বৃক্ষশোভিত উদ্যান ও হংসকারন্ডবাদি-সমন্বিত পুস্করিণী ছিল। চোদ্দ মাসে সকল কার্য সম্পন্ন করে ময় যুধিষ্ঠিরকে সংবাদ দিলেন যে সভা প্রস্তুত হয়েছে।’
কথিত আছে, মায়ানগরী নির্মাণের পর পাণ্ডবদের নিমন্ত্রণ রক্ষার্থে কৌরবরা যান সেখানে। মায়াজালে ভ্রমিত হয়ে কোনটি জল, কোনটি আয়না, কোনটি মাটি পার্থক্য করতে না পেড়ে, জলে পরে যায় দুর্যোধন। তাকে পরে যেতে দেখে দ্রৌপদীর ব্যাঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে বলে ওঠে, ‘অন্ধ পিতার অন্ধ পুত্ৰ’ সেই অপমান থেকেই সূত্রপাত হয় কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের।
দিল্লীর প্রাচীন নাম ইন্দ্রপ্রস্থ। বর্তমান শহরে এর ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়।
বিশ্বকর্মা একধারে যেমন যন্ত্রবিদ, শ্রমনেতা, মেকানিক, আর্কিটেক্ট অপরদিকে তিনি গ্রন্থবিদও। তাঁর রচিত স্থাপত্যশিল্প বিষয়ক গ্রন্থটির নাম ‘বস্তুশাস্ত্রম’। চারটি বেদের মতো চারটি উপবেদ আছে। উপবেদগুলো হলো আয়ুর্বেদ, ধনুর্বেদ, গান্ধর্ববেদ এবং স্থাপত্যবেদ। এই স্থাপত্যবেদের রচয়িতা বিশ্বকর্মা। সুপরিকল্পিতভাবে গৃহনির্মাণ, গ্রাম-নগরের পত্তনের নিয়মাবলী ও বিধিনিষেধ গ্রন্থটির মধ্যে উল্লিখিত আছে। মন্দিরের নির্মাণ হেতু আট প্রকার কাঠ এবং গৃহ নির্মাণের জন্য তেইশ প্রকার কাঠের ব্যবহারের কথা উল্লিখিত আছে। ভারতীয় স্থাপত্য শিল্পের ইতিহাসে গ্রন্থটি অমূল্য সম্পদ।
নেতিবাচকতা, অপশক্তির বিনাশ, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা থেকে মুক্তি পেতে কলকারখানায়, ওয়ার্কিংপ্লেসে, দোকানে সাড়ম্বরে প্রতিবছর বিশ্বকর্মা পুজো করা হয়। সাফল্য প্রার্থনা করে মালিক-কর্মচারী একসাথে মেতে ওঠেন উৎসবে। এই আনন্দের রেশটুকু সারাবছর উদ্যমের যোগান দেয়।
ভারতীয় পুরানকে যদি ইতিহাসের অতিবাদ হিসাবে মান্যতা দেওয়া হয়, তবে আজ চারিদিকে বহুতল ফ্ল্যাট, মাল্টিপ্লেক্স, সিনেমা হল, পার্ক ইত্যাদি আধুনিক জীবনের জয়গানের স্বরলিপি বিশ্বকর্মার গ্রন্থেই গ্রন্থিত আছে। শিল্পের বিকাশের মধ্যে নিহিত আছে দেশের উন্নতি। আশীর্বাদপুষ্ট সংসারে কর্ম রূপের দেবতাকে নত মস্তকে প্রনাম জানাই।
‘তব সিংহাসনের আসন হতে/ এলে তুমি নেমে,/ মোরবিজন ঘরের দ্বারের কাছে/ দাঁড়ালে নাথ থেমে।’
তথ্যসূত্র : ১. কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত মহাভারত সারানুবাদ—রাজশেখর বসু, ২. উইকিপিডিয়া।