রাত পোহালেই বিশ্বকর্মা পূজা। বিশ্বকর্মা দেবশিল্পী। শিল্পনির্মাণের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন তিনি। বৈদিক দেবতা বিশ্বকর্মা একধারে স্রষ্টা এবং সৃষ্টিও। তিনি কেবল নিজেই শিল্পী নন বরং শিল্পীসমাজের কারিগর বা জন্মদাতা। শাস্ত্রমতে, দেবগুরু বৃহস্পতির ভগিনী যোগসিদ্ধা এবং অষ্টম বসু প্রভাসের পুত্র হলেন বিশ্বকর্মা। পূর্ব ভারতে এই দেবতার আরাধনা করা শ্রমিকদের এক প্রথা। ভাদ্র মাসের সংক্রান্তিতে কলকারখানা শ্রমিক, কামারশালার কর্মী মিস্ত্রি থেকে সোনা রুপার কারিগর এমনকি রিক্সা চালকরা পর্যন্ত সাধ্যমত দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার আরাধনা করে থাকেন। কিন্তু হুগলী জেলার বেগমপুর, ধনেখালি, রাজবলহাট, আঁটপুর, হরিপাল, খরসরাই, ছোটতাজপুর এবং নদিয়া জেলার শান্তিপুর অঞ্চলে ভাদ্র সংক্রান্তির দিন পুজো না হয়ে, পৌষ মাসের শুক্লা নবমীতে এই পূজার আয়োজন করা হয়।
এতদিন আমরা দেবী দুর্গার অকালবোধনের কথা শুনে এসেছি। রামচন্দ্র রাবণকে নিধণ করার জন্য বসন্তকালের পরিবর্তে শরৎকালে দেবীদুর্গার আরাধনা করেছিলেন। ঠিক সেইভাবে দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার ভাদ্র মাসের পরিবর্তে পৌষ মাসে অর্থাৎ দুর্গাপূজার নবমীর তিথির ঠিক তিন মাস পরে, শুক্লা নবমীতে এখানে আয়োজন করা হয় বিশ্বকর্মা পূজা। এখন প্রশ্ন হলো কেন এই নিয়ম?
বেগমপুর ‘বেগমপুরী তাঁতশাড়ী’র জন্য সবার কাছে পরিচিত ও প্রসিদ্ধ। এখানকার তন্তুবায় সম্প্রদায়ের যুক্তি ভাদ্র মাসে আশ্বিনের দুর্গাপুজোর জন্য কাপড় বুনতে ব্যস্ত থাকে তাঁতিরা। সারা বছরের আয়ের সিংহভাগই এই সময়ই হয়। বিশ্বকর্মা পুজোর সময় শাড়ি তৈরি করার প্রচুর চাপ থাকে। এই সময় বিশ্বকর্মা পূজা নিয়ে মাতামাতি করলে তাঁতিদের পক্ষে আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে। এদিকে তাঁদেরও যন্ত্র নিয়েই কারবার। বিশ্বকর্মার আশির্বাদ তাঁদেরও চাই।তাই তারা তিন মাস পরে একটা সময় নিজেরাই বেছে নিয়েছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে।তবে এই কথাটা কতটা যুক্তিসঙ্গত তার কোন সঠিক হদিস মেলে না।
বৃহৎ ধর্মপুরাণ বলে, পিতা-শুদ্র ও মাতা ক্ষত্রিয়ের মিলনে এই তন্ত্তবায় জাতির সৃষ্টি। আবার ব্রহ্মবৈবর্ত পুরানমতে পিতা বিশ্বকর্মা ও মাতা ঘৃতাচির সংকরে এই সম্প্রদায়ের সৃষ্টি। পোশাক তৈরির কারিগর তন্নবায় (দর্জি) ও সূচিশিল্পের কারিগর সুচিকার নামে ‘সংযুক্ত নিকায়’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে।
যতদূর জানা যায় বিংশ শতাব্দীর পাঁচের দশকের প্রথম দিকে বিশ্বকর্মা আরাধনার কথা বয়স্করা বলে থাকেন। কিন্তু তখন মাত্র দুদিন ধরে নিয়ম আচারে আড়ম্বরহীনভাবে বাড়ি বাড়ি পূজার আয়োজন হতো। প্রতিটি তাঁতে শোলা তৈরি ঘোড়া (ঘোড়ার উপর শোলার সেপাইরূপী বিশ্বকর্মা ও ঘোড়ার লেজে ধানের শীষ লাগানো থাকতো) দিয়ে পূজা চলত।লোকবিশ্বাস ঘোড়া দ্রুততার প্রতীক এবং বিশ্বকর্মা আশীর্বাদে তাঁতও দ্রুত চলবে। এছাড়া ধান লক্ষ্মীর প্রতীক।
তাঁতিদের বিশ্বকর্মা পুজোর প্রতিমার বিশেষত্ব হল এখানে ঠাকুরের বাহন হাতীর পরিবর্তে ঘোড়া ও চারটি হাতের পরিবর্তে দুটি হাত। ঘোড়া বাহন হবার কারন তাঁতযন্ত্র যখন চলে তখন ‘মাকুর’ ডানদিক-বামদিক থেকে ঘোড়ার ক্ষুরের মতোই খটা খট্ আওয়াজ হয়, তাই তন্তুবায় বিশ্বকর্মা ঠাকুরের বাহন ঘোড়া।
দু হাতে তাঁত চালানো হয়, তাই দুই হাতের বিশ্বকর্মা। আরো একটি কারণ হলো এখানকার তাঁতিরা নিজেদের বিশ্বকর্মার বর পুত্র বলে মনে করেন বলে দেবমূর্তির চারটি হাতে পরিবর্তে দুটি হাত থাকে। তবে কোন কোন মূর্তি প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী চারটি হাতে থাকে।
যন্ত্রের দেবতা বিশ্বকর্মা পুজোকে কেন্দ্র করে যেহেতু রাজ্যে ঘুড়ি ওড়ানোর প্রথা বহু কাল ধরে চলে আসছে তাই বিশ্বকর্মার একটি হাতে ঘুড়ি, লাটাই ও অন্য হাতে মাকু বা চাঁদ মালা থাকে।
অকাল বিশ্বকর্মার মাটির প্রতিমা জনাই, বড়ার কুমারটুলী, বেগমপুর বারুণী ঘাটা, চাতরা শ্রীরামপুর থেকে নিয়ে আসা হয়। এই পূজোর উপকরণ হিসেবে মোয়া ও তিলের খাজা দেওয়া হয়। এখনো সেভাবেই চলছে।
বিশ্বকর্মা মূর্তিপূজা শুরু হয় ১৫৫২/৫৩ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ। ছোটতাজপুর গ্রামে প্রয়াত মোহন কুণ্ডুর বাড়িতেই প্রথম বিশ্বকর্মা মূর্তি তৈরি করে পূজো হয় বলে জানা যায়। আরও জানা যায়, ওই মূর্তি তৈরি করেন বেগমপুর তিলিপাড়ার পোটো হারাধন অধিকারী। পরে মোহন বাবুর বাড়ির পুজো বন্ধ হয়ে যায়। এর কয়েক বছর পর ১৯৬৩/৬৪ খ্রিস্টাব্দে, ছোটতাজপুর গ্রামের কয়েকজন যুবক সর্বপ্রথম সার্বজনীন বিশ্বকর্মা পূজার সূচনা করেন। ছোটতাজপুর কাঁঠালতলা এবং খড়সরাই হাটতলা এই দুই জায়গায় মূর্তিপূজায় বিশ্বকর্মা আরাধনা হত।
২০০০ সাল থেকে বেগমপুর অঞ্চলে বিশ্বকর্মা পূজা উপলক্ষে এলাকার মানুষের উৎসাহ উদ্দীপনা দেখা যায়। তিনটি গ্রামে ৩৪/৩৫ টি পূজো হয়। এখানকার বিশ্বকর্মা বাহন হাতির বদলে ঘোড়া।
১৯৬৬ সালে (১৩৭৩ বঙ্গাব্দ) খরসরাই অঞ্চলের হাট তলায় দ্বিতীয় পুজো হিসাবে বিশাল জাঁকজমক করে পুজো শুরু হয়। উল্লেখযোগ্য উদ্যোক্তা মন্টু দে শান্তিপুরের জাঁকজমক দেখে এসে শুরু হয় ।
পুজোর কটাদিন সরস্বতী নদীর তীরে বারুণী ঘাটা সংলগ্ন গ্রামের মাঠ ও চাষের ক্ষেতে চলে “পেটকাটি”, “চাঁদিয়াল” “ময়ূরপঙ্খী”, “মুখপোড়া” সহ শতশত ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতিযোগিতা, শয়ে শয়ে মানুষ বিভিন্ন জেলা ও অঞ্চল থেকে সেখানে ঘুড়ি ওড়াতে ও দেখতে ভিড় করেন।
এখন অনেক পুজো কমিটি চন্দননগর থেকে আলোর ব্যবস্থা করে। সমাজ সচেতনতার নানা থিম, বিভিন্ন পূজো কমিটি করে থাকে। মেলার মাঠে বিকালে ঘুড়ি ওড়ানো প্রতিযোগিতা ও মেলা বসে। বিভিন্ন কমিটির মধ্যে চলে অদৃশ্য লড়াই। কেউ আলোকসজ্জায়, কেউ মূর্তিতে, কেউ মন্ডপে আবার কেউ পরিবেশ সচেতনতায় এগিয়ে থাকে।
বর্তমানে হাতে বোনা তাঁত যন্ত্রের (হ্যান্ডলুম) আগের মতো জৌলুস ‘পাওয়ার লুমের’ কাছে হারিয়ে ফেলেছে।তাঁত শিল্পীরা খুবই কষ্টের মধ্যে রয়েছে।হাতে বোনা তাঁত যন্ত্রের (হ্যান্ডলুম) ঘরগুলো যেনো মিউজিয়াম বা ভুতুড়ে বাড়ি! তাঁতের শাড়ির পরিবর্তে এসেছে গেঞ্জির কলার, মোটা রঙিন দড়ি তৈরীর আধুনিক অটোমেটিক মেসিন। এছাড়াও বিগত কয়েক বছরে তাঁতিরা সমস্যায় পড়েছেন। বেগমপুর তাঁত জনপ্রিয় হলেও তাঁতিদের মজুরি বৃদ্ধি পায়নি, ফলে আক্ষেপ থেকে গেছে তন্তুবায়দের।নতুন প্রজন্মের ছেলেরা তাদের কাজ না করে অন্য জীবিকার যুক্ত হচ্ছে।
নানান সমস্যা থাকলেও বিশ্বকর্মা পূজোর আয়োজনে খুব একটা খামতি দেখা যায়নি। বর্তমানে ৪-৫ দিন ধরে মূর্তি প্যান্ডেলে থাকে। মন্ডপে বিভিন্ন থিমের আয়োজন করা হয়। মাসের পর মাস অক্লান্ত পরিশ্রম করেন যুবকেরা। বিকাল থেকে দর্শনার্থীদের ঢাল নামে বিশ্বকর্মা পূজার আয়োজনে উদ্দীপনা ছড়িয়ে পড়ে সারারাত। বাড়ি বাড়ি আত্মীয়-কুটুম, বন্ধুবান্ধবের আনাগোনা স্বাভাবিকভাবেই হয়ে থাকে। পুজো উপলক্ষে প্রায় সমস্ত বাড়িতেই পেটপুজোর আয়োজনে খাসির মাংস এবং মোয়া বানানো হয়। বাঙালির মহাউৎসব যদি হয় দুর্গাপূজা, তবে এই অঞ্চলগুলিতে “অকাল বিশ্বকর্মা পুজো” হল দ্বিতীয় দুর্গাপূজা।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার : লোকাল নিউজ ডেস্ক, ড. সমরেন্দ্র নাথ খাঁড়া এবং অন্যান্য।
pallabdey1975@gmail.com
খুবই সুন্দর লেখনী।