বারাণস্যাং তু বিশ্বেশম
কাশীর বিশ্বনাথের মন্দির শিবের দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের নবম জ্যোতির্লিঙ্গ–বারাণস্যাং তু বিশ্বেশম। অবিমুক্তক্ষেত্র কাশী বা বারাণসী হলো চিরমোক্ষদায়িকা। স্কন্ধপুরাণের কাশীখন্ডে অগস্ত্য মুনিকে স্কন্দ কাশীর মাহাত্ম্য কথায় বলেছিলেন, “ক্ষেত্রের মধ্যে কুরুক্ষেত্র, অরণ্যের মধ্যে নৈমিষারণ্য, তীর্থের মধ্যে প্রয়াগরাজ এবং পুণ্য ও ধর্মস্থানের মধ্যে কাশীই মহান। তিন লোকের মধ্যে কাশী সর্বোত্তম।”
শিবশক্তির ধারক এইক্ষেত্র। গঙ্গা এখানে বলায়াকারে বিশাল ভূখণ্ডকে ধরে রেখেছে বরুনা ও অসি নদীর মিলন ঘটিয়ে। তাই এই অঞ্চলের নাম বারাণসী। ভক্তদের বিশ্বাস, এই বলায়াকার অংশটি শিবের ত্রিশূল। তাই এখানে কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয় অনুভূত হয় না।
বিশ্বনাথ সৃষ্টির আদি পুরুষ কালস্বরূপ। স্বয়ং বিশ্বনাথ নির্মাণ করেন কাশিক্ষেত্র। পঞ্চক্রোশ পরিধি বিশিষ্ট এই ক্ষেত্র তাই শিবের অত্যন্ত প্রিয়। বার্ধ্যকে বারাণসী কামনা করে বহু মানুষও এখানে সুদীর্ঘকাল অবস্থান করেন। শিবপ্রিয় বারাণসীতে জ্যোতির্লিঙ্গের স্থাপন হয়েছিল ভগবান বিষ্ণুর ইচ্ছায়। অর্ধচন্দ্রাকৃতি এই রম্য স্থান কেন যে শিবের এত প্রিয়, তার অনুসন্ধান করতে এসে ভগবান বিষ্ণু অভিভূত হয়ে এই কাশিতেই থেকে যান।
নারায়ন তার সুদর্শন চক্র দিয়ে একটি কুণ্ড খনন করেন এবং সেই কুণ্ড স্বশরীরের স্বেদ জলে পূর্ণ করে তারই পাশে বসে সহস্রবছর ধরে দেবাদিদেবের তপস্যা করেন।

বিষ্ণুর তপস্যায় তুষ্ট হয়ে ভগবান শিব পার্বতী-সহ উপস্থিত হন সেখানে। বিষ্ণুর সাধনা দেখে পার্বতী অভিভূত হয়ে ও রম্যস্থানে গঙ্গার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে আত্মহারা হয়ে কুন্ডের জল স্পর্শ করতে গেলে তার কর্ণভূষন পড়ে যায় কুণ্ডের জলে। তখন থেকে সেই স্থান মনিকর্ণিকা মহাতীর্থ রুপে গণ্য হলো। স্বয়ং মহাদেবের এবং পার্বতীর আবির্ভাব দেখে বিষ্ণু খুব খুশি হলেন এবং মহাদেবকে জ্যোতির্লিঙ্গরূপে এখানে বিরাজ করার অনুরোধ করেন। শিব তখন শূন্যমার্গ থেকে নিজের প্রতীক জ্যোতির্ময় লিঙ্গ উপযুক্ত স্থানে রেখে পার্বতী ও বিষ্ণু-সহ অদৃশ্য হলেন। জ্যোতির্লিঙ্গের জ্যোতির প্রভাবে পঞ্চক্রোশী কাশীধাম এতটাই উজ্জ্বলতর হল যে ৩৩ কোটি দেবতারা সর্বক্ষণের জন্য এখানে সুক্ষ্ম শরীরে অবস্থান করেন এখানে। শিব হলেন পৃথিবীর নাথ। তাই বিশ্বনাথধাম হলো এখানকার নাম। মা অন্নপূর্ণারও অধিষ্ঠান হল এখানে।
অনাদিকাল থেকেই বিশ্বনাথ যেমন কাশীতে আছেন, তেমনি কাশীও বিদ্যমান এই কাশীতেই। ঐতিহাসিকদের মতে কাশীনগরীর প্রতিষ্ঠা হয়েছে ১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তখন এর নাম ছিল আনন্দ-কানন। মহাভারতেও উল্লেখ আছে বিশ্বনাথ ক্ষেত্র কাশীর কথা। প্রাচীন শৈবতীর্থ এই কাশীর আধুনিক নাম বারানসি।
হিন্দু ধর্মের দিকপাল তৈলঙ্গ স্বামী, বিজয় কৃষ্ণ গোস্বামী, রামানুজ, শঙ্করাচার্য, শ্রীরামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, শ্যামাচরণ লাহিড়ী, বামাক্ষ্যাপা, বুদ্ধদেব… সকলের পদধূলিতে ধন্য এই কাশী। কথিত আছে পুণ্যক্ষেত্র এই কাশীতে বসে একদা মহর্ষি গৌতম রচনা করেছিলেন ন্যায়শাস্ত্র। যুগ যুগ ধরে কাশীপ্রসিদ্ধ পাণিনির ব্যাকরণের জন্য।

কিন্তু উন্মত্ত বিধর্মীয় আক্রমণে বিশ্বনাথের মন্দির বারে বারে ধ্বংস হতে থাকে এবং প্রতিবারই তাকে পুনঃস্থাপন করা হয়। সেকেন্দার আলী ১৪৯৪ খ্রিস্টাব্দে বারাণসী আক্রমণ করার সময় বিশ্বনাথের মন্দিরটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেন। বহু বছর ধরে নানা ঘটনার মধ্যে দিয়ে নারায়ণ ভট্ট পূর্ণানন্দস্বামী ও টোডারমলের প্রচেষ্টায় মন্দির স্থাপন হয়।
১৬৬৯ খ্রিস্টাব্দে আওরঙ্গজেব মন্দিরটি ধ্বংস করেন। সঙ্গে অনেকেই নিহত হলেন। কথিত আছে, শিবকে জ্ঞানবাপী মধ্যে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল এই সময় এবং তিনি নাকি এখানে সত্যনারায়ণের মন্দিরের পিছনে পুরান বিশ্বনাথ নামে স্থাপিত আছেন। ইন্দোরের মহারানী অহল্যাবাই হোলকার ১৭৮৩ খ্রিস্টাব্দে আবার মন্দিরটি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। এখন সেই মন্দিরটিই আছে। বাংলার রানী ভবানীরও কাশিতে পথঘাট, মন্দির, অন্নসত্র, ধর্মশালা, জলাশয় নির্মানের অনেক অবদান আছে। ১৯৮৩ সাল থেকে উত্তর প্রদেশ সরকার এই মন্দিরটি পরিচালনা করছেন।
কাশীর প্রাণস্বরূপ গঙ্গাতীরে দশাশ্বমেধঘাটের দিক থেকে গোধুলিয়া মোড়ের দিকে একটু এগোলেই বিশ্বনাথ গলি। কাশীর গলি ইতিহাস প্রসিদ্ধ। কথায় বলে, এই গলিতে একবার ঢুকিয়ে দিতে পারলেই সারাদিন ঘুরে মরবে। গলির দুপাশেই কাপড় মিষ্টি মনোহারী দ্রব্যের দোকান। দোকানগুলি পেরিয়ে এলেই প্রথমে দর্শন পাবেন ঢুন্ডিরাজ গণেশের। মেটে সিঁদুরে রাঙানো আশীর্বাদের মুদ্রায় দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। প্রবাদে আছে, সর্বাগ্রে এই গণেশের পূজা না দিলে কাশী দর্শনে কোনো ফল হয় না।

এরপর সামনেই পড়বে মা অন্নপূর্ণার মন্দির, বাঁ হাতে বিশ্বনাথ মন্দির। মন্দিরের মূল ফটক নকশা করার রুপোর চাদরে মোড়া। ভিতরে নাট মন্দির সংলগ্ন মন্দির। প্রধান মন্দিরের মধ্যে একটি ৬০ সেন্টিমিটার উঁচু ও ৯০ সেন্টিমিটার পরিধির শিবলিঙ্গ রুপোর বেদীর উপর প্রতিষ্ঠিত। নাট মন্দিরে বিশ্বনাথের বাহন শ্বেত পাথরের একটি বৃষমূর্তি। এখানকার সবচেয়ে বড় ঘন্টাটি নেপালের রাজার দান। মন্দির চত্বরে রয়েছে কালভৈরব, দন্ডপানি, অবিমুক্তেশ্বর, বিষ্ণু, বিনায়ক, শনীশ্বর, বিরূপাক্ষ ও বিরূপাক্ষ গৌরী মন্দির।
বিশ্বনাথ মন্দিরে উচ্চতা প্রায় ১০০ ফুট। মন্দিরের মূল শিখরটির চারপাশে ছোট ছোট অনেকগুলোই চূড়া। চূড়াগুলি সব সোনা দিয়ে মোড়া। ১৮৩৫ সালে পাঞ্জাবে শিখ সম্রাট রঞ্জিত সিং বাহাদুর চূড়াটি ১০০০ কিলোগ্রাম সোনা দিয়ে মুড়িয়ে দেন। কোন এক সময় কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি বাবা বিশ্বনাথের কাছে দীর্ঘজীবন এবং আরোগ্য লাভের আশায় মানত করেছিলেন। বাবার দয়ায় রোগ মুক্তি হলে তিনি তাঁর কথা রাখেন।
বিশ্বনাথ মন্দিরের পিছনে জ্ঞানবাপী কূপ। কুপের পাশে একটি বিশাল পাথরের বৃষমূর্তি নন্দি। পুরান বলে, বিশ্বনাথের আদেশেই গণেশ তাঁরই ত্রিশূল দিয়ে এই কুপটি খনন করেন বিশ্বনাথকে স্নান করানোর জন্য। এই কুপের জলে স্নান করে প্রীত হন বিশ্বনাথ। বর প্রার্থনা করতে বলেন গণেশকে। গনেশ প্রার্থনা করলেন এই কুন্ডই যেন কাশির সমস্ত তীর্থ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হয়। এখানে এসে যে কুপের সেবা পুজো করবে, সে দিব্য জ্ঞান প্রাপ্ত হয়ে স্বর্গে আরোহন করবে। বিশ্বনাথে এই কুপের নাম দেন জ্ঞানবাপী। কথিত আছে কালাপাহাড় কাশিতে মন্দির ধ্বংস করতে এলে এই কূপে আশ্রয় নেন বিশ্বনাথ। ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে জ্ঞানবাপীর মন্দিরটি নির্মাণ করে দেন গোয়ালিয়রের রানী বৈজাবাই।

বিশ্বনাথ মন্দিরের থেকে কুড়ি-পঁচিশ পা এগোলেই দেবী অন্নপূর্ণার মন্দির। বিশাল দরজার সম্পূর্ণটাই রূপোয় বাধানো। গর্ভমন্দিরে রুপোর আসনে উপবিষ্টা দেবী অন্নপূর্ণা। দীপ্ত মুখমণ্ডল, টানা টানা চোখ, অপূর্ব মূর্তি। দক্ষিণী রাজা বিষ্ণুপন্থ গাজাড়েজি নির্মাণ করে দেন বর্তমানের মন্দিরটি। আদি মূর্তিটি অতি জীর্ণ হয়ে যাওয়ায় এখন সর্বদাই মূর্তিটি ঢাকা থাকে সোনার আবরণে।
বিশ্বনাথ মন্দির থেকে মাইল খানেক উত্তরে প্রতিষ্ঠিত কালভৈরব মন্দির। কাশিক্ষেত্রের দ্বারপাল স্বয়ং কালভৈরব। ঘোর নীলবর্ন কালভৈরবের চোখ দুটি রুপোর এবং বাহন কুকুরের মূর্তি। কাশিখন্ডের ৩১ অধ্যায়ে কালভৈরব এর আবির্ভাব সম্পর্কে বলা হয়েছে ব্রহ্মার গর্ব খর্ব করার জন্য ক্রোধানিত রুদ্রদেবের ললাট থেকেই এনার সৃষ্টি।
সময় বদলালেও বাঙালির কাছে আজও কাশী হল তাদের বার্ধ্যকের দ্বিতীয় ঘর। ত্রিভুবনের সপ্তদ্বীপ, সপ্তসমুদ্র ও সপ্তপর্বত পরিক্রমা করলে যে পুণ্য লাভ হয় মহাকাশী পরিক্রমা করলে সে পুণ্যলাভ করেন পুন্যার্থীরা। তাই আজও জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শন করতে দেশ-বিদেশ থেকে বহু পুণ্যার্থীরা ছুটে আসেন বাবা বিশ্বনাথ দর্শনে।
সুন্দর কাশীক্ষেত্রের বর্ননা ও চিত্রণ।
অনেক ধন্যবাদ জানাই আপনাকে শ্রদ্ধেয়।