নির্বাচন কমিশন এখনও বিহারের বিধানসভা নির্বাচনের দিনিক্ষণ ঘোষণা না করলেও আচমকা ২৪ জুন কমিশনের তরফে বিহারের ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের নির্দেশ জারি করে। নির্দেশিকা অনুসারে, বিহারের ৭.৮ কোটি ভোটারকে বিশেষ ফর্ম পূরণ করতে হবে কিন্তু ২০০৩ সালের তালিকায় যাদের নাম ছিল অর্থাৎ ৪.৯৬ কোটি ভোটারকে কোনো অতিরিক্ত নথিপত্র জমা দিতে হবে না। তবে ২০০৩-এর পর যাদের নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তাদের নিজের এবং তাদের পিতামাতার জন্ম তারিখ এবং জন্মস্থানের প্রমাণপত্র দিতে হবে। আসলে কমিশনের নিয়ম বলছে, যদি কারও নাম ২০০৩ সালের ভোটার তালিকায় না থাকে, তাহলে তাকে প্রমাণ করতে হবে সে ভারতীয় নাগরিক। প্রমাণ করতে হলে জন্মসনদ, বাবা-মায়ের নাগরিকত্বের প্রমাণ, বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্কের প্রমাণ বা এক কথায় নাগরিকত্ব প্রমাণের পুরো হিসেব দিতে হবে। কিন্তু সময় মাত্র এক থেকে দেড় মাস। লক্ষ্যনীয় বিষয় হচ্ছে, যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে, সেই সময় বিহার বার্থ রেজিস্ট্রেশন বা জন্মনিবন্ধনে দেশের মধ্যে অন্যতম পিছিয়ে থাকা রাজ্য ছিল। বিহার সরকারের হিসাবই দেখাচ্ছে, ২০০০ সালে বিহারে জন্মের রেজিস্ট্রেশন হয়েছিল মাত্র ৩.৭ শতাংশ, আর ২০০৭-এ সেটা বেড়ে হয় ২৫ শতাংশ। এই হিসাব থেকেই বোঝা যাচ্ছে, লক্ষ লক্ষ মানুষ জন্মসনদ দিতে পারবে না। ফলে বিহারের ভোটার তালিকার পুনর্মূল্যায়ন নিয়ে সে রাজ্যের সাধারণ মানুষের মধ্যে যেমন আতঙ্ক ছড়িয়েছে তেমনি রাজনৈতিক পরিসরে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই অপ্রত্যাশিত এই নির্দেশে বিরোধীরা কেবল ক্ষুব্ধই নয়, তারা মনে করছে এর পেছনে শাসক বিজেপি’র গভীর ষড়যন্ত্র আছে। তারা ছক কষেই কয়েক কোটি আদিবাসী ও সংখ্যালঘু ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দেবার জন্য নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করছে। কারণ বিজেপি বুঝতে পেরেছে বিধানসভা ভোটে বিহারে ক্ষমতায় ফিরে আসা কঠিন। তাই বিজেপি বিরোধী সম্ভাব্য ভোটারদের যতদূর সম্ভব তালিকা থেকে ছেঁটে ফেলতে পারলে দুশ্চিন্তা কিছুটা লাঘব হয়।
নির্বাচন কমিশন বিহারে যদি ভোটার তালিকার মূল্যায়ন করে নির্ভুল তালিকা তৈরি করতে পারে সেটা গণতন্ত্রের পক্ষে স্বাভাবিক। কিন্তু কেন হটাৎ মূল্যায়ন? তা কি শাসক দলের ভোটে জেতার স্বার্থে? বুঝতে হবে বিহারে কোন প্রক্রিয়ায় তালিকা সংশোধন হচ্ছে? নাগরিকত্ব প্রমাণ করার জন্য যে সব নথি চাওয়া হয়েছে তা কি বিহার বা আমাদের দেশের গরিব, অশিক্ষিত, অসচেতন, নিরীহ সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব? কার্যত অসম্ভব। তাছাড়া কেন একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক সার্বভৌম দেশের নাগরিককে বার বার তার পরিচিতির প্রমাণ দিতে হবে? মনে রাখতে হবে দেশ বা রাষ্ট্রের উৎপত্তি মানুষের জন্য। রাষ্ট্রের জন্য মানুষ নয়। সাধারণ মানুষের উপর রাষ্ট্রের বারবার কঠিন নির্দেশ তা কি তাদের পদে পদে বিপদে ফেলার জন্য, নাকি তাদের ভীত সন্ত্রস্ত করা, নাকি তাদের রাষ্ট্রের চোখ রাঙানির মুখে দাঁড় করিয়ে রাখা? এটা কি কোনো জনকল্যাণকামী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চরিত্র হতে পারে? একমাত্র এই ধরনের আচরণ স্বৈর শাসনেরই প্রবণতা হতে পারে। তাছাড়া একজন মানুষ বছরের পর বছর ভোট দিয়ে আসার পর তাকে কেন নতুন করে নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হবে। কোনও সরকার সেটা করতে পারে না। নাগরিক হিসাবে বা ভোটার হিসাবে তার অস্তিত্ব না থাকলে তাকে অবশ্যই নথি দিয়ে নতুন ভোটার হতে হবে। কিন্তু একবার ভোটার হবার পর তাকে কেন প্রমাণ দাখিলের করর জন্য তাড়িয়ে বেড়ানো হবে। বোঝা যাচ্ছে শাসক আত্মবিশ্বাস হারাচ্ছে। ক্ষমতা ক্ষয়ের আশঙ্কা করছে। তাই চাপিয়ে দেওয়ার, জোর জবরদস্তি খাটানো স্বৈরাচারী মানসিকতা প্রবল হয়ে উঠছে। বিহারে আচমকা নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে আনুমানিক তিন কোটি নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ চলে যেতে পারে।
এটা বিজেপির একটি খেলা। কংগ্রেস সাংসদ অভিষেক মনু সিংভি সংগত প্রশ্ন তুলেছেন, ২০০৩ সালের পর থেকে যতগুলি নির্বাচন হয়েছে সেগুলি কি সবই ভুল বা ত্রুটিপূর্ণ ছিল? ২০০৩ সালে শেষবার ভোটার তালিকা সংশোধন হয়েছিল। তারপর বিহারে চার-পাঁচটা নির্বাচন হয়েছে। তাহলে কি সবকটি নির্বাচনই ভুল ছিল? মাত্র দু’মাসের মধ্যে ফের নতুন করে এত বড় রাজ্যের প্রায় ৮ কোটি ভোটার তালিকা সংশোধন কি সম্ভব? এতে অন্তত ২-৩ কোটি মানুষ ভোটাধিকার হারাতে পারেন। কারণ এত কম সময়ে এই কাজ সম্ভব নয়। সাধারণ গরিব মানুষের পক্ষে এত নথি জোগাড় করাও কার্যত অসম্ভব। বিহারের ২০ শতাংশ মানুষ ভিনরাজ্যে কাজ করতে যায়, তারা কীভাবে প্রমাণ করবেন তারা কোথায় থাকে? আদিবাসী বা দলিত পরিবারে পক্ষে বাবা-মায়ের জন্মসনদ দাখিল করাও সম্ভব নয়। সরকারের লজ্জা পাওয়ার কথা, স্বাধীনতার অমৃতকাল পার হওয়ার পরও একজন সাংসদ বলছেন, বহু মানুষ আছে যাদের একটা স্যুটকেসও নেই, যেখানে তাঁরা তাঁদের প্রয়োজনীয় নথিপত্র রাখতে পারবেন। স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে বিহারে বিজেপি সাধারণ মানুষের উপর আস্থা রাখতে পারছে না, তারা ধরেই নিয়েছে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তারা আর জিতে ফিরতে পারবে না, তাই তারা নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করে হারের ফাঁড়া কাটাতে চাইছে। বিহারে ২২ বছর ধরে পাঁচটি নির্বাচন হয়েছে। ২০০৩ সালে বিশেষ নিবিড় সংশোধনীটি লোকসভা নির্বাচনের এক বছর আগে, বিধানসভা নির্বাচনের দুই বছর আগে হয়েছিল। সেগুলি সবই ভুলে ভরা? এটা তো দেশের প্রতিষ্ঠানগুলির পক্ষে চরম অপমানজনক। তার থেকেও বড় কথা এতদিনের সব ভুল মাত্র দুই মাসের মধ্যে সংশোধন? আসলে এটা সাধারণ মানুষকে সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা।