৮ সেপ্টেম্বর ২০২২ বৃহস্পতি বার পশ্চিমবঙ্গ তৃণমূল কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হলো নেতাজি ইন্ডোর স্টেডায়ামে। আরও একবার অদ্যোপান্ত ‘অগ্নিকন্যা’ ইমেজকে অস্ত্র করে বিরোধী শিবিরের মোকাবিলায় নামলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এদিন মঞ্চ থেকে রণভেরী বাজিয়ে তিনি ঘোষণা করলেন, আরো মারাত্মক খেলা হবে চব্বিশে। সিংহ গর্জনে বৃহস্পতিবার প্রত্যুত্তর দিয়েছে স্টেডিয়াম ভর্তি জনতা — ‘এবার আরও বড় খেলা হবে।’ সম্প্রতি বাংলায় শুরু হয়েছে কেন্দ্রীয় এজেন্সি দিয়ে গেরুয়া পার্টিকে ‘অক্সিজন’ দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা। সেই প্রেক্ষিতকে সামনে রেখেই দলের বিশেষ অধিবেশনে মমতা এদিন বলেন, ‘ঝাড়খণ্ডে সরকার বাঁচিয়েছি আমরা, বাংলা পেরেছে। এখন এজেন্সি দিয়ে ভয় দেখাচ্ছে! লাভ হবে না, আগামীতে আবার খেলা হবে। পঞ্চায়েত ভোট শান্তিপূর্ণভাবে করব, তারপরই শুরু হবে চব্বিশের খেলা।’ তৃণমূল সুপ্রিমোর প্রত্যয়ী বার্তা — ‘এমন খেলা খেলব, বিজেপিবাবুরা বুঝবে, ঠ্যালার নাম বাবাজি।’ মহারণ ২৪’ এর ময়দানে সঙ্গী-সাথী আর রসদ যে প্রস্তুত, এদিন সেই বার্তাও দিয়েছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। বলেছেন, ‘বাংলার ময়দান থেকেই শুরু হবে খেলা’। তিনি আরও বলেন, ‘ভয় পাওয়ার কিছু নেই। জেলে গিয়ে ভাত খাবেন। সেই চাল আমরা দিই। আমরা আপনাদের পাশে আছি।… ওরা হারবে। বিজেপি ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। আমরা ৩৪ বছর সিপিএমের ভয় দেখেছি। ঘাস কাটলে ঘাসফুল বাড়ে। সিবিআই, ইডি-কে দিয়ে কাঁচি করে কোনও লাভ নেই। দেখবি আর জ্বলবি, লুচির মতো ফুলবি। বিজেপি-র নেতাগুলো ভাল বাংলা বলতে পারে না। বলে বঙ্গাল। এ তো হিন্দি কথা।’ কর্মীদের উদ্দশ্য দলনেন্ত্রী বলেন, ‘এবার থেকে একটাই স্লোগান হবে, বিজেপি-র এজেন্সি চাই না, চাকরি চাই। মমতা জানতে চান, পি এম কেয়ার্সের টাকা কোথায় গেল? মনে হয়, বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে। বিজেপি এখন সিপিএম-কে টাকা দিচ্ছে সংখ্যালঘুদের কাছে টানার জন্য। আমার বিশ্বাস, ওরা এ সব করবে না। আমি কেন রেড রোডে নমাজ পড়তে যাই, তাই নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আমার কাছে কোনও ভাগাভাগি নেই। যতদিন বাঁচব, ততদিন রেড রোডে যাব — এটাই সম্প্রীতি।’

গরুপাচার মামলায় জেলবন্দি তৃণমূল নেতা অনুব্রত মণ্ডলকে ‘বীর’-এর স্বীকৃতি দেন মমতা। দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা, “বীরের সম্মান দিকে ওকে জেল থেকে বার করে আনবেন। এই মানসিকতায় তৈরি থাকুন।”

এদিনের সভায় তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, ‘ এই দলে একটাই লবি তা হলো মমতা। অন্য কোনও লবি নেই। আমরা সকলেই কর্মী।’ অভিষেকের বক্তৃতা মঞ্চে বসে খুব মন দিয়ে শুনছিলেন দলনেন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরে বলেন, ‘অভিষেক খুব ভাল বলেছে।’ অভিষেক বলেন, ‘পঞ্চায়েত ভোট অবাধ ও শান্তিপূর্ণভাবে হবে। বিজেপি-কে ল্যাজেগোবরে করে জিতব। নন্দীগ্রাম নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিল। জোর ধাক্কা খেয়েছে। এখন হাইকোর্টে হবে। অমিত শাহ একজন বড় পাপ্পু। কেন্দ্রের মন্ত্রিসভায় তিনি অপদার্থ মন্ত্রী। তাঁর ছেলে জাতীয় পতাকা হাতে নিতে চায়নি। ওকে তো ত্যাজ্যপুত্র করা উচিত। নতুন উদ্যম নিয়ে লড়াইয়ে নামছি। পঞ্চায়েত ও লোকসভা বিরোধীশূন্য করতে হবে। শুধু নাম পাল্টাচ্ছে। আমাদের দলে ২-৩ নম্বর বলে কেউ নেই। এই দলে শুধু মমতারই ছবি। ২০২১-এ হেরে সিবিআই, ইডি ইতিমধ্যে ৪ জনকে ধরেছে। পঞ্চায়েত ও লোকসভায় মানুষ এদের যোগ্য জবাব দেবে। বদলা নেব ব্যালটের মাধ্যমে। ভারতে ১৭০০ দল আছে। তার মধ্যে একমাত্র মমতা মাথা উঁচু করে লড়াই করে। জল্লাদদের কাছে মাথা নত করে না। সিপিএমের হার্মাদরা এখন বিজেপি-র সঙ্গে এক হয়েছে। আমরা নাকি দুর্গাপুজো করি না। দুর্গাপুজোকে ইউনেস্কো হেরিটেজ বলে সম্মান দিয়েছে। এটা আমাদের গর্ব।’

‘নতুন তৃণমূলের’র বার্তা ছড়িয়ে পড়ার পরেই চর্চা চলছিল সংগঠন কোন পথে যাবে, তা নিয়ে। জেলাগুলিতে কমিটি রদবদলের মধ্যে দিয়েও নতুনদের ‘প্রাধান্য’ বোধা যাচ্ছিল। বৃহস্পতিবার নেতাজি ইন্ডোরের সভায় বক্তা হিসেবে এক ঝাঁক পুরনো নেতাকে দেখা গেল। নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছিলেন একা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বক্তৃতায় মমতা বলেন, “যাঁরা এখন নতুন করে তৃণমূল করছেন, তাঁদের অতীত জানতে হবে। আমার সব লেখা আচে। বইগুলি পড়তে হবে।” সেই সঙ্গেই তাঁর পরামর্শ, “ছোটদের বলব, বড়দের সম্মান দিয়ে চলবে। বড়রাও ছোটদের ভালবাসুন।” অভিষেককে তিনি ডাকাবুকো (ডেয়ারডেভিল), চনমনে এবং সুবক্তা হিসেবেও প্রশংসা করেন। তাঁর আরও মন্তব্য, “অনেকে আমাদের মধ্যে ভাগাভাগি দেখানোর চেষ্টা করেন। শতাব্দীর সঙ্গে অনুব্রতের, অভিষেকের সঙ্গে আমার। এ ভাগাভাগি হওয়ার নয়।” এদিনের মঞ্চে যাঁরা বক্তৃতা দেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌগত রায়, ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য ও শশী পাঁজা। সভাপতিত্ব করেন দলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সী।