বৃহস্পতিবার দেশের ৬টি রাজ্যের ৭ বিধানসভা কেন্দ্রে উপ-নির্বাচন হল। সাতটি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে রয়েছে বিহারের মোকামা ও গোপালগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্র, মহারাষ্ট্রের আন্ধেরি (পূর্ব), হরিয়ানার আদমপুর, তেলেঙ্গানার মুনুগোদে, উত্তরপ্রদেশের গোলা গোরক্ষনাথ এবং ওড়িশার ধামনগর। প্রসঙ্গত, একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বে শিবসেনার বিধায়কদের বিদ্রোহের পর জুন মাসে উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বাধীন মহা বিকাশ আঘাডি সরকারের পতনের পর এটাই মহারাষ্ট্রে প্রথম বিধানসভা নির্বাচন। সেদিক থেকে বৃহস্পতিবার দিনটি ছিল জাতীয় রাজনীতিতে একটি বিশেষ দিন কারণ সাতটি বিধানসভা আসনে উপনির্বাচনের পাশাপাশি এদিন গুজরাটে ভোটের তারিখ ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। দুই দফায় ডিসেম্বরের ১ ও ৫ তারিখ ভোট। গণনা ৮ ডিসেম্বর। অনেক আগে হিমাচল প্রদেশে ভোটের দিন ঘোষণা হয়ে গিয়েছিল কিন্তু বিলম্ব হচ্ছিল গুজরাটে ভোটের তারিখ নিয়ে। প্রধানমন্ত্রীর রাজ্যে ভোটের দিন ঘোষণার ক্ষেত্রে দেরি কেন, তা নিয়ে বিরোধীরা বারবার প্রশ্ন তুলছিলেন। যদিও হিসাব অনুযায়ী গুজরাটের বিধানসভার মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২০২৩-এর ১৮ ফেব্রুয়ারি।
উল্লেখ্য, গত মাসে কমিশন হিমাচল প্রদেশের ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণা করেছিল। স্বভাবতই অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন গুজরাটের নির্বাচনের দিনও হয়তো খুব তাড়াতাড়ি ঘোষণা করা হবে। কিন্তু বাস্তবে তা না হওয়ায় গোটা দেশজুড়ে তা নানা চর্চা শুরু হয়েছিল।বিরোধীরা নানা প্রশ্ন তুলেছিল। শেষ পর্যন্ত মোদীর গুজরাট সফর এবং নানা উন্নয়ন প্রকল্পের কথা ঘোষণার পর ভোটের দিন ঘোষণা করা হল। প্রশ্ন সেকারণেই যে মোদির গুজরাট সফরের জন্যই কি ভোটেন দিন ঘোষণা করা হচ্ছিল না? যদিও এই প্রশ্নের উত্তরে মুখ্য নির্বাচনী কমিশনার রাজীব কুমার মৌরবী সেতু বিপর্যয়ের প্রসঙ্গ সামনে নিয়ে এসেছেন। তিনি গুজরাট ভোট ঘোষণার বিলম্বের কারণ হিসাবে মৌরবী সেতু বিপর্যয়কেই অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছেন। এছারাও মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ভোট ঘোষণার আগে আবহাওয়া কেমন থাকবে, কবে বিধানসভার মেয়াদ শেষ হচ্ছে ইত্যাদি দেখে নেওয়ার কথাও জানান। যদিও ভোটের দিন ঘোষণার আগেই কংগ্রেস মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কংগ্রেসের সরাসরি অভিযোগ, গুজরাতের ভোটের দিন ঘোষণা করা নিয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের টালবাহানা আসলে বিজেপিকে সুবিধা করে দেওয়া। বৃহস্পতিবার সাংবাদিকরাও রাজীব কুমারকে এ নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করলে জবাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জানান, গুজরাত বিধানসভার মেয়াদ শেষ হওয়ার ১১০ দিন আগে ভোট হচ্ছে। সুতরাং দেরির অভিযোগ করার কোনও মানে হয়না।
তবে বিজেপির পক্ষে এবারের গুজরাট ভোট খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ, এতদিন ধরে গুজরাটে লড়াইটা ছিল দুটি রাজনৈতিক দল বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে। এবার গুজরাটে লড়ছে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টি। যারা প্রায় প্রতি সপ্তাহে সেখানে পৌঁছে জনসভা করছেন। ১৯৯৫ সালের পর ২০১৭ সালে মোদী-হীন গুজরাটে সবচেয়ে খারাপ ফলাফল হয়েছিল বিজেপির। কংগ্রেস পাঁচ বছর আগে গুজরাটে বিজেপি-কে রীতিমতো বেগ দিয়েছিল। তারা ৭৭টি আসন জিতেছিল। বিজেপি জিতেছিল ৯৯টি আসনে। তবে সেবার কংগ্রেসের সঙ্গে হার্দিক প্যাটেল, অল্পেশ ঠাকোর, জিগনেশ মেওয়ানিরা ছিলেন। এবার তারা কেউই সঙ্গে নেই। তবে ২০১৭-য় বিজেপির আসন কমলেও বেড়েছিল ভোট শতাংশ। বিজেপির দখলে ছিল ৪৯.০৫ শতাংশ ভোট আর কংগ্রেস পেয়েছিল ৪১.৪৪ শতাংশ ভোট। ২০১২ সালে মোদীর নেতৃত্বে বিধানসভা ভোটে গুজরাটে বিজেপি দখল করেছিল ১১৫টি আসন। তবে, শতাংশের নিরিখে ২০১৭-র তুলনায় কম। তারা পেয়েছিল ৪৭.৮৫ শতাংশ ভোট। অবশ্য ২০১৪ বা ২০১৯ সালের লোকসভা ভোট গুরাটের ২৬টি আসনের সবকটিতেই জয় পেয়েছিল পদ্ম শিবির। প্রাপ্ত ভোট দু’বারই ছিল ৬০ শতাংশের উপরে। এদিকে রাহুল গান্ধী ভারত জোড়ো যাত্রা গত ১ নভেম্বর থেকে গুজরাটে পাঁচটি পদযাত্রা শুরু করেছে। রাজ্যের পাঁচ নেতা এই যাত্রার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই পাঁচ যাত্রা রাজ্যের সর্বত্র যাবে। অন্যদিকে ভোটের দিন ঘোষণার আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী পুরোদমে গুজরাটে প্রচারে নানারকম ঘোষণা হয়েছে। টাটা ও এয়ারবাসের কারখানার ভিত্তিপ্রস্তরও তিনি স্থাপন করেছেন।
এবার গুজরাটে লড়াই ত্রিমুখী। কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টি দিল্লি, পাঞ্জাব জয়ের পর ভোটের আসরে প্রবল ভাবে ঝাপিয়ে পড়েছে। বিজেপি ও কংগ্রেসের কাছে এতা যে বিরাট চ্যালেঞ্জের তা বলাই যায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপির তুলানায় আপ কংগ্রেসের ভোট কাটবে। নির্দল বা ছোট দল ১ থেকে ২টি আসন পেতে পারে। গুজরাটের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই একাধিক অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে। রাজ্য জুড়ে সরকার বিরোধী হাওয়া চলছে। তার উপর একদম শেষ পর্যায়ে ব্রিটিশ আমলে তৈরি মোরবীর ঝুলন্ত সেতু ভেঙে ১৪১ জনের মৃত্যু হওয়ায় বিজেপি সরকার চাপে পড়ে গিয়েছে। উল্লেখ্য, গত সাত মাস ধরে এই ঐতিহাসিক সেতুটির মেরামতির কাজ চলছিল। জানা গিয়েছে, সেতুর স্বাস্থ্যপরীক্ষা না করিয়ে, কোনও ‘ফিটনেস সার্টিফিকেট’ না নিয়ে সময়ের আগেই সেতুটি জন সাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। ২৭ বছর ধরে বিজেপি গুজরাটের ক্ষমতায় থাকা বিজেপি ব্রিজ বিপর্যয়কে যেভাবেই ষড়যন্ত্র বলে চালাবার চেষ্টা করুক এবারের ত্রিমুখী লড়াই কিন্তু তার পক্ষে যথেষ্ট চাপের।
গুজরাটে তিন হাজার ৪৮১ সিদ্দি ভোটদাতা আছেন। তারা আদতে পূর্ব আফ্রিকার মানুষ। তারা চতুর্থ ও সপ্তম শতকে এসেছিলেন। তারাও এবার
ভোট দেবে বলে জানিয়েছেন রাজীব কুমার। এবার তৃতীয় লিঙ্গের এক হাজার ৪১৭ জন ভোটদাতার নাম তালিকায় তোলা হয়েছে। অতএব
এবারের গুজরাট ভোট নানা ভাবেই গুরুত্বপূর্ণ।