চার মাস আগে বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পরও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক বাংলার সব বিজেপি বিধায়ককে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিল। ভোটের ফল বেরনোর পর বাংলার ৬১ জন বিজেপি বিধায়ক কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে চিঠি লিখে নিরাপত্তা চেয়েছিলেন। ভোটের আগে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছিল কেবলমাত্র বিজেপির তারকা প্রার্থীদেরই। ঠিক ছিল, দরকার না-হলে ৩০ মে-র পর তাঁদের নিরাপত্তা তুলে নেওয়া হবে। তবে যদি কেউ কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা রেখে দেওয়ার জন্য আবেদন জানান, সে ক্ষেত্রে বিষয়টা আলাদা ভাবে বিবেচনা করা হবে।
বিধানসভা ভোটের ফল বেরতেই তৃণমূল থেকে বিজেপিতে গিয়ে বিধায়ক হওয়া অনেক নেতাই তৃণমূলে ফিরতে শুরু করলেন। যে স্রোত এখনও অব্যাহত। সেই দলবদলের আবহেই কেন্দ্র একসঙ্গে বাংলার ৬১ জন বিজেপি বিধায়কের নিরাপত্তা প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বলে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক সূত্রে খবর। দলবদলের আবহে বাংলা বিজেপি বিধায়ক সংখ্যা এই মুহূর্তে ৭১। তাঁদের মধ্যে শুভেন্দু অধিকারীর মতো শীর্ষস্তরের জনা দশেক বিধায়ক বাদ দিয়ে বাকি ৬১ জন আর কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা পাবেন না। জানা গিয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক ইতিমধ্যে রাজ্য সরকারের কাছে একটি চিঠিও পাঠিয়ে দিয়েছে। কেন্দ্রের তরফে রাজ্যকে জানানো হয়েছে, এবার রাজ্য সরকারই এই বিধায়কদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবে।
প্রসঙ্গত, বিধানসভা ভোটের ফল বেরতেই বাংলা বিজেপির নিচুতলার কর্মীরাও যেমন নিরাপত্তা চেয়েছিলেন। অন্যদিকে, পার্টির হেভিওয়েট নেতানেত্রীদের কেউ কেউ কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা ছেড়ে দিয়েছিলেন। তখন শাসক দলের বিরুদ্ধে সুর চড়ানোর বদলে বিজেপি নেতারা পার্টির নেতা-কর্মীদের নিরাপত্তা ইস্যু সামাল দিতেই ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন। উল্লেখ্য, বিধানসভা ভোটের ফল বেরনোর কিছুদিন পর থেকেই বিজেপির নিচুতলার কর্মীরা অভিযোগ তুলেছিলেন, তাঁরা মার খাচ্ছেন, আর নেতারা কেন্দ্রীয় নিরাপত্তায় ঘরে বসে আছেন। এই কারণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে চিঠি পাঠিয়ে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা ছেড়ে দেন হুগলির সাংসদ লকেট চট্টোপাধ্যায়। পরবর্তীতে নাটাবাড়ির বিজেপি বিধায়ক মিহির গোস্বামীও কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা ছেড়ে দেন।
একুশের নির্বাচনের ফলপ্রকাশের পর বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগদানই নয়, দলের অন্দরেও ভাঙন লেগেছে। শুরু হয়েছে প্রবল বিদ্রোহ। বারবার তার আঁচ আছড়ে পড়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। যা নিয়ে মহা অস্বস্তিতে পড়েছে বিজেপি। ভোটের পড়ে মুড়িমুড়কির মতো বিজেপি নেতারা তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন। নিরাপত্তারকথা তুলে ধরে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক থেকে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তাও আদায় করেছিলেন বিভিন্ন স্তরের নেতারা। যদিও বিধানসভা নির্বাচনের পর বিধায়কদেরই নিরাপত্তা বজায় রাখা হয়। কিন্তু এবার সেই বিধায়কদের অধিকাংশের নিরাপত্তাও বাতিল হচ্ছে।
শুভেন্দু অধিকারী, দিলীপ ঘোষের মত মাত্র ১০ জন বিজেপির শীর্ষ নেতা পাবেন কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা। বাকি যে সব বিজেপি নেতাদের এতদিন নিরাপত্তা দিয়েছিল কেন্দ্র সেই সুরক্ষাই প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। কিন্তু কেন? বিশেষঙ্গরা বলছেন, যে হারে বিজেপি বিধায়করা দল ছেড়ে তৃণমূলে যাচ্ছেন তাতে কেন্দ্র বাংলা বিজেপির ওপর আর আস্থা রাখতে পারছে না। কেন্দ্র ভালভাবেই বুঝে গিয়েছে কেবল একুশ নয় আগামী দিনও বাংলায় ঘাঁটি গাঁরা তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। প্রথমত বাংলায় তাদের সংগঠন দুর্বল, তার ওপর সেই সংগঠনকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো সাংগঠনিক ক্ষমতা সম্পন্ন নেতাও বাংলায় নেই। এছাড়া দলের অন্দরে ও বাইরেও প্রতিদিন কোন্দল বাড়ছে। ফলে বাংলার বিজেপির ওপর ভরসা হারাচ্ছে কেন্দ্র।
কেন্দ্র নিরাপত্তা তুলে নিলেও বিজেপি বিধায়করা যদিও নিরাপত্তাহীন হবেন না। কারণ, কেন্দ্র নিরাপত্তা না দিলে বিধায়কদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব বর্তায় রাজ্য সরকারের উপর। নিয়ম অনুযায়ী, কোনও বিধায়ককে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা দেওয়া বা প্রত্যাহার করার সময় কেন্দ্রীয় সরকারকে সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারকে জানাতে হয়। এক্ষেত্রেও সেই নিয়ম অনুসরণ করেই ৬১ জন বিধায়কের নিরাপত্তা প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নবান্নকে জানিয়ে দিয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। এবার রাজ্য সরকার ঠিক করবে এই বিধায়কদের কীভাবে নিরাপত্তা দেওয়া হবে।
যদিও নিরপত্তা প্রত্যাহার নিয়ে কেন্দ্র সাফাই দিয়েছে সামনে একাধিক রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন। তাই সেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থ জোরদার করার জন্য আরও অনেক নিরাপত্তাকর্মী প্রয়োজন। এই কারনেই বাংলা বিজেপি বিধায়কদের কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা প্রত্যাহার করা হচ্ছে। কিন্তু ঘটনা সেটা নয়। মূল কারণ হল একুশে নির্বাচনে ফলাফল এবং তার পরবর্তীতে বাংলার বিজেপি নিয়ে কেন্দ্র ক্রমশই হতাশ হয়ে পড়ছে। তাছাড়া রাজ্য বিজেপি-র পদাধিকারীদের কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা পাওয়ার নজির একেবারেই সাম্প্রতিক। বিজেপি নেতা হিসেবে প্রথম কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা পান রাহুল সিংহ। তিনি তখন রাজ্য সভাপতি ছিলেন। তার পরে মুকুল রায়। দিলীপ ঘোষ রাজ্য সভাপতি হওয়ার পরে অবশ্য কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা নেননি। ২০১৬ সালে খড়্গুপর বিধানসভা আসনে লড়ার সময়েও তাঁর সঙ্গে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা ছিল না। ২০১৮-র পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে তাঁর গাড়িতে পর পর কয়েকটি হামলার ঘটনার পর দিলীপকে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা দেওয়া হয়। এ সবই হয়েছিল রাজনাথ সিংহ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকার সময়ে। অমিত শাহের জমানায় ভারতী ঘোষ থেকে রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়, জিতেন্দ্র তিওয়ারি, শুভ্রাংশু রায়-সহ অনেকেই বিভিন্ন ক্যাটিগরির কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা পেয়েছেন। কিন্তু রাজ্য বিজেপি-র সাধারণ সম্পাদকরাও সে ভাবে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা পান না। জ্যোতির্ময় সিংহ ওই নিরাপত্তা পান সাংসদ হিসেবে। লকেট পেয়েছিলেন বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য। এখন বিষয় কেন্দ্রের নিরাপত্তা তুলে নেওয়ার পর বিজেপি বিধায়কদের দলবদলের হিড়িক আরও বেড়ে যায় কিনা।