কথিত যে আকবরের সময় থেকে মারোয়াড়িদের দ্বিতীয় বাড়ি আর প্রথম কর্মস্থল ঢাকা, মুর্শিদাবাদ হয়ে কলকাতার বড়বাজারে থিতু হয়েছে গত ২৫০ বছর। বড়বাজারের পূর্বাইয়া ক্ষত্রী যাদের আমরা মারোয়াড়ি বলেই জানি, কলকাতায় বিশ্ব হিন্দু পরিষদের জন্ম দিলেও, তারা নাকী চান না, বাংলার মসনদে ভাজপা বসুক। সহস্রাব্দ শেষে আমি যখন হকার ইউনিয়নের হোলটাইমার, সে সময় এরকম একটা মিথের কথা বলেছিলেন একদা উত্তর কলকাতার সিপিএমের দৌর্দণ্ডপ্রতাপ পুর প্রতিনিধি, সাংসদ। কারন জানতে চাইলে মিচকি হেসেছেন। উত্তর পাইনি। গত বিধানসভা ফলের গভীরে ডুবে, এই মিথটির উত্তর খোঁজার দায় পাঠকের ওপরে সঁপে দিয়ে, হপ্তাখানেক বাদে কলকাতা পুরসভায় পঞ্চবার্ষিকী পুরনির্বাচনে কলকাতার লক্ষ্মী এলাকা বড়বাজারে ২টি আসনে ভাজপার ভোটিয় ভবিষ্যৎ বিষয়ে কিঞ্চিত তত্ত্বতালাশ করব।
পুরসভা ভোটনিমিত্ত বড়বাজারে টহল শুরুর আগে একটিবার ২০২১ এর বিধানসভা ভোটের নিরিখে কলকাতায় বিজেপির আর তৃণমূলের ওয়ার্ডভিত্তিক এগিয়ে থাকা পিছিয়ে থাকার একটা সুমারি করা যাক। ২০২১এর নির্বাচনে ওয়ার্ডভিত্তিক ফলে পুরসভা গঠিত হলে কলকাতার ১৪৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৩১ ওয়ার্ডে বিজয়ী হত বর্তমান শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস। ১২টি ওয়ার্ড দখল করে বিজেপি। কংগ্রেস ১টি ওয়ার্ড। কলকাতার অবাঙালি, উত্তর ভারতীয় ভোটের সিংহভাগেরে বাস বড়বাজার, জোড়াসাঁকো, চৌরঙ্গি, ভবানীপুর নিউআলিপুরে। আজ আমরা অন্য সব কটা অবাঙালি অধ্যুষিত এলাকা ছেড়ে নজর রাখব শুধুই বড়বাজার এলাকায়।

৩৪ বছরের শাসনে বড়বাজার এলাকায় দৌর্দণ্ডপ্রতাপ সিপিএম খুব একটা দাগ কাটতে পারে নি; উত্তর কলকাতার বড়বাজার সংলগ্ন ওয়ার্ডগুলো থেকে পুর নির্বাচনে ২৩ বছর পর্যন্ত সিপিএমের একজনও প্রতিনিধি ছোট লালবাবাড়িতে ঠাঁই পায় নি। অজেয় বড় বাজারের বিজেপির মিথ ভেঙে প্রথম ভোটব্যাঙ্ক ভাঙলেন সুধাংশু শীল। সে নির্বাচনে কিছুটা আমিও জড়িয়েছিলাম, সেই ইন্টারেস্টিং গল্প বারান্তরে হবে। তখন বিজেপি-তৃণমূল জোট। সুধাংশু শীলের হাত ধরে এই প্রথম বড় বাজারে ১৮টা আসনে লিড নিল সিপিএম। এরপরে গঙ্গা দিয়ে গুচ্ছের জল গড়িয়েছে, জোটবন্ধু থেকে চরম বিদ্বেষী হয়েছে বিজেপি তৃণমূল সম্পর্ক, কিন্তু বড়বাজারের দুটো আসন ২২ এবং ৪২ থেকে গত পাঁচটা পুরনির্বাচনে জিতে এসেছে বিজেপির দুই জবরদস্ত প্রার্থী ২২ নম্বর ওয়ার্ডে মীনাদেবী পুরোহিত ও ৪২ নম্বর ওয়ার্ডে সুনিতা ঝাওয়ার। পুরসভার নির্বাচনে এই দুটো আসনকে পাখির চোখ করেছে বঙ্গ বিজেপি। জিততে মরিয়া সুনিতা ঝাওয়ার বড়বাজারে ১৬ অগস্ট প্রকল্প শুরুর দিন থেকেই নিজের ওয়ার্ডে লক্ষ্মীর ঝাঁপি নিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন। ২২ নম্বর ওয়ার্ডে বিজেপির প্রার্থী একদা ডেপুটি মেয়র মীনাদেবী পুরোহিতও রাস্তায়। তিনি ১৯৯৫ থেকে জিতে আসছেন; ডেপুটি মেয়রও হয়েছেন। বিজেপির একাংশ বড়বাজারে দুই প্রার্থীর জেতা বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী।
কিন্তু বিজেপির আরেক একাংশের এতটা আত্মবিশ্বাসী হতে পারছে না। সর্বভারতীয় এক নেত্রী জানালেন স্বাধীনতার পরে বিধানসভার নির্বাচনের ইতিহাসে ২০%-এর বেশি আসন জিতেও যে দলের রাজ্য সম্পাদককে পদ খোয়াতে হয়, কেন্দ্রে ক্ষমতায় থেকে রাজ্যের বিধানসভায় চমকপ্রদ ফল করার পরেও যে দলের কর্মকর্তা জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচনের পরেই রাজ্যের শাসক দলে ঢোকার জন্যে আকুলিবিকুলি করে, বিধানসভা নির্বাচনের কয়েক মাসের মধ্যেই জিতে আসা আসনের উপনির্বাচনগুলোয় চরমভাবে পর্যুদস্ত হয় — কেন্দ্রিয় মন্ত্রীর নিজের আসনের জামানত জব্দ হয়, সে দলের খুব বেশি আসন না জেতার খোয়াব দেখাই ভাল। বিজেপি অবাঙালি এলাকায় আসন জেতার আশা করলেও তিনি বললেন দলের বড় মাথা ব্যথা হল বিধানসভা নির্বাচনে অবাঙালি প্রধান এলাকায় হিন্দিভাষীদের ঐক্য চুরমার করে তৃণমূলের বিজয়রথ আদবানির রামরথের থেকেও দ্রুত গতিতে এগিয়েছে। কলকাতার অবাঙালি ভোটারের বড় অংশ এখন তৃণমূলের সঙ্গে। ফলে বড়বাজার বিধানসভা নির্বাচনের অবাঙালি ভোটারদের মন জয় করা ট্রেন্ড পুরভোটে দেখাগেলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। এর সঙ্গে আরেকটা লুকোনো বোমা অর্থনীতি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বজাতি গুজরাটি শিল্পপতিদের অতিরিক্ত সুবিধে পাইয়ে দেওয়ার উদ্যমে শোনা যায় মাড়োয়াড়ি বড়বাজার না খুশ। নোটবাতিলে তাদের প্রচুর ক্ষতি সইতে হয়েছে। বিজেপির অন্দরে অনেকেরই আশংকা দিদির তৃণমূলের সর্বভারতীয় দল হয়ে ওঠার পেছনে সলতে পাকাচ্ছেন বড়বাজারের একাংশ।
এ সব ইঙ্গিতই রাজ্য বিজেপির পক্ষে যথেষ্ট সিঁদুরে মেঘ। বিধানসভার নির্বাচনের লাভকে আত্মধ্বংসে রূপান্তরিত করে দলীয় কোন্দলে পর্যুদস্ত রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বড়বাজার থেকে ছোটলালবাড়িতে ২৫ বছরের দুই প্রতিনিধি আদৌ পাঠাতে পারবে কী না সে বিষয়ে নেতারা সন্দিহান। আশাকরি ১৯ ডিসেম্বরের ফল ভোটারদের মুখে হাসি ফোটাবে।