আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছনোর জন্য শিক্ষাবিদরা যখন পঠনপাঠনকে আরও সহজ করতে চাইছেন, নিয়ে যেতে চাইছেন একেবারে প্রান্তিক মানুষের কাছে তখন ঠিক উল্টো রাস্তায় হাঁটছে বিজেপি। সংস্কৃতকে স্কুলে একটা অবশ্য পাঠ্য বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে চাইছে তারা। রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের পরিকল্পনা অনুযায়ী গুজরাট থেকেই শুরু হয়েছে একাজ। সেখানে প্রথম শ্রেণি থেকেই সংস্কৃতকে একটা অবশ্য পাঠ্য বিষয় হিসেবে ঢোকানোর চেষ্টা করছে আরএসএস (RSS)। জাতীয় শিক্ষানীতির মধ্যেই সংস্কৃতকে ঢোকানোর কথা বলছেন এই নীতির প্রবক্তারা। এমনিতে সংস্কৃত ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে স্কুলে কোন ছাত্র পড়তে পারে। কিন্তু তা বাধ্যতামূলক করার পিছনে কোন বাস্তববোধ বা মানুষের প্রয়োজনের কোনও সম্পর্ক নেই বলেই শিক্ষাবিদদের ধারণা।
সত্যি বলতে কি ২০২০-র জাতীয় শিক্ষানীতির সঙ্গেও বিষয়টি যায়না। সেখানে পুরনো ১০+২ কাঠামোর পরিবর্তে ৫+৩+৩+৪ কাঠামো আনা হয়েছে। পাঠ্য বইয়ের বোঝা কমিয়ে জোর দেওয়া হয়েছে বহুমুখী পরীক্ষামূলক শিক্ষার ওপর। তার সঙ্গে বাধ্যতামূলক সংস্কৃত মোটেই খাপ খায়না। দুর্জনেরা বলছেন, ধর্মীয় মেরুকরণের কাজে জোর দেওয়ার জন্যই রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের এই উদ্যোগ। অথচ জাতীয় শিক্ষা নীতিতে এখন পঞ্চম শ্রেণী অবধি মাতৃভাষা বা স্থানীয় ভাষায় শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। সেখানে কোন যুক্তিতে সংস্কৃতকে অবশ্য পাঠ্য করার ক্তহা বলা হচ্ছে তা বোঝা কঠিন। নিজেদের প্রস্তাবিত কাঠামোর সঙ্গেই তো তার কোন মিল নেই।

জাতীয় শিক্ষানীতিতে ‘ত্রিভাষা সূত্র’র কথা বলা হয়েছে। স্কুলে পড়াশোনার জন্য তিনটির মধ্যে দুটি স্থানীয় ভাষা থাকবে। আবার খসড়া প্রস্তাবে বলা হচ্ছে স্কুল এবং ছাত্ররাই বিষয়টা ঠিক করবে। অথচ গুজরাটে আর এস এস এবং সহযোগী সংগঠনগুলি সপ্তাহে ৬ দিন সংস্কৃত পড়ানোর দাবি তুলেছে।
হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি স্কুলে রামায়ণ, মহাভারত এবং গীতা পড়ানোর দাবি তুলেছে। বলছে ‘বৈদিক গণিত’ আবশ্যক করতে হবে। উপনিষদ এবং বেদের মূল্যবোধগুলিকে ঢোকাতে হবে ছাত্রদের মধ্যে। এই মূল্যবোধের মূল্য চোকাতে গিয়ে ছাত্রদের একটা বড় অংশকে পাঠক্রমের বাইরে চলে যেতে হবে। আর এস এস বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে হিন্দুত্ব নির্ভর পাঠক্রম চাপিয়ে দিতে চাইছে। ইতিমধ্যেই তা উত্তরাখণ্ড সহ বহু রাজ্যের স্কুল সিলেবাসে ঢুকে পড়েছে ভাগবত গীতা। সঙ্ঘের ত্রিভাষা সূত্রের ব্যাখ্যায় রাজ্যের মাতৃভাষা সংস্কৃত এবং রাজ্য সরকারের ঠিক করে দেওয়া যেকোন একটি ভাষা পড়তেই হবে। অথচ ত্রিভাষা সূত্রে পরিস্কার বলা হয়েছিল কোন ভাষাকেই আবশ্যিক করা চলবে না, ইংরেজি শিখতে হবে সব ছাত্রদেরই। এটা ঘটনা জাতীয় শিক্ষানীতিতে একটা উঁচুমানের দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও তা এখনও শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াতে পারেনি। কিন্তু শিক্ষার এই গৈরিকীকরণ সামগ্রিকভাবে শিক্ষা ব্যবস্থাকেই বানচাল করে দেবে।