কিছুদিন ধরেই বারবার উত্তপ্ত হয়ে উঠছে প্রতিবেশি রাজ্য ত্রিপুরার রাজনীতির মাটি। কারণ বাংলা জয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেসের লক্ষ্য ওই রাজ্য থেকে বিজেপি সরকারকে উৎখাত করা। সেই লক্ষে একাধিকবার ত্রিপুরায় ছুটে যাচ্ছেন তৃণমূল কংগ্রেস নেতারা। যে কোনও অবস্থাতেই ত্রিপুরায় সংগঠন আরও জোরাল করাই এখন বড় লক্ষ্য। অন্যদিকে জমি ছাড়তে নারাজ বিজেপি। সেখানে পৌঁছে প্রায় প্রতিবারই আক্রান্ত হয়েছেন তৃণমূলের নেতা কর্মীরা। এমনকি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেও বাধার মুখে পড়তে হয়েছে।
এই অবস্থায় ফের ত্রিপুরা সফরে যাবেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এই সফরে রয়েছে একাধিক কর্মসূচি। বিপ্লব গড়ে এক বড়সড় পদযাত্রার আয়োজন করেছেন তিনি। আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর আগরতলায় অভিষেকের নেতৃত্বে ওই পদযাত্রা হওয়ার কথা। ত্রিপুরাতে এবার বিপ্লব দেবকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়বেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। আর পদযাত্রা করেই সেটা বুঝিয়ে দিতে চাইছেন অভিষেক। কেবল তাই নয়, অভিষেকের নেতৃত্বে ওই শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চেই বিজেপির বিরাট ভাঙন নামতে পারে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একটা বড় অংশ।
খবর; ১৫ সেপ্টেম্বর আগরতলায় অভিষেকের নেতৃত্বে যে পদযাত্রা হওয়ার কথা, সেদিন অভিষেকের হাত ধরে বিজেপির বেশ কয়েকজন বিধায়ক তৃণমূলে যোগ দিতে পারেন। তাঁরা তৃণমূলের ঝান্ডা হাতে অভিষেকের নেতৃত্বে মিছিলে হাঁটতে পারেন বলেও জানা গিয়েছে। স্বভাবতই এই ঘটনায় যে ত্রিপুরার রাজনীতিতে বিরাট পরিবর্তন ঘটবে তা বলাই বাহুল্য। প্রসঙ্গত; এতদিন ত্রিপুরায় তৃণমূল কংগ্রেসের সামনের সারিতে ছিলেন রাজ্য সভাপতি আশিসলাল সিংহ। সম্প্রতি সুবল ভৌমিক কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পর থেকে তাঁকেই তৃণমূলের রাজ্য সভাপতির ভূমিকা নিতে দেখা যাচ্ছে। সুবল ভৌমিক জানান, ওই দিন বিজেপি বিধায়কদের তৃণমূলে যোগদানের সম্ভাবনা প্রবল। কারন প্রতিদিন ত্রিপুরার মানুষ বিজেপি থেকে মুখ ঘুরিয়ে তৃণমূলের দিকে ঝুঁকছেন। বিজেপিও বুঝতে শুরু করেছে যে তাদের পায়ের তলার মাটি আলগা হচ্ছে।
ত্রিপুরায় যে তৃণমূলের শক্তি বাড়াছে তা বোঝা যায়— ইতিমধ্যে কংগ্রেস ভেঙে সামনের সারির বেশ কয়েকজন তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। কেবল তাই নয়, বিজেপি ছেড়ে অনেকে যোগ দিয়েছেন তৃণমূলে। এমনকি সিপিএম ছেড়েও একাধিক নেতা-কর্মীরা তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। বিজেপির বড় নেতারা এখনও কেউ দল ছেড়ে তৃণমূলে না এলেও অনেক বিধায়ক তৃণমূলে যোগ দেওয়ার জন্য মুখিয়ে রয়েছেন। কিছুদিন আগে সুদীপ রায় বর্মনের নেতৃত্বে বিজেপির একাংশ কলকাতায় এসেছিলেন। তারা তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন বলেও খবর। ওই ঘটনার পর থেকে বিশেষ করে ১৫ সেপ্টেম্বর অভিষেকের মিছিল ঘোষণার পর থেকেই জোর জল্পনা তবে কি এবার সুদীপ অনুগামী বিধায়করা অভিষেকের সভায় তৃণমূলের পতাকা হাতে তুলে নিচ্ছেন? সুদীপ রায় বর্মনের পাশাপাশি তাঁর অনুগামী বিজেপি বিধায়কদের মধ্যে অনেকের নামই এখন ত্রিপুরার বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। এদের মধ্যে রয়েছেন সুরমার বিধায়ক আশিস দাস, বরদোয়ালির বিধায়ক আশিস সাহা, ওম্পির বিধায়ক বুর্বুমোহন ত্রিপুরা ও ঊনোকোটি জেলার বিধায়ক দিবাচন্দ্র রাঙ্খেল।
ত্রিপুরা বিজেপি অবশ্য এই সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়ে জানাচ্ছে, তৃণমূল হাওয়া গরম করার জন্য এসব কথা বলে বেরাচ্ছে। এমন কোনও সম্ভাবনাই এখন পর্যন্ত ত্রিপুরা বিজেপি দলে নেই। ত্রিপুরা বিজেপি যাই বলুক না কেন, সুদীপ রায় বর্মন বেশ কিছুকাল ধরেই দলে বিদ্রোহী। স্বভাবতই তিনি বিজেপিতে কোণঠাসাও বটে। এতদিন যে তিনি দল থেকে বেরিয়ে ত্রিণমূলে যোগ দেন নি সে বিষয়ে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মত, সুদীপ রায় বর্মন এখন জল মাপছেন। তবে তিনি বিপ্লবের দলে কোণঠাসা হয়ে পড়লেও বিপ্লব শিবিরে ভাঙন ধরিয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে বিপ্লবও কিন্তু সুদীপ-অনুগামী দুই বিধায়ককে ভাঙিয়ে নিজের মন্ত্রিসভায় জায়গা দিয়েছেন। কিন্তু তাতেই কি বিপ্লব দলের ভাঙন আটকাতে পারবেন?
ত্রিপুরা ৬০ আসনের বিধানসভা। এত কম সংখ্যক আসনের বিধানসভায় চার-পাঁচ জন বিধায়কই বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে। তাই লড়াইটা দু-পক্ষের এবং জোরদার। সবাই অঙ্ক কষেই এগনোর চেষ্টা করছে। দর কষাকষির রাজনীতিতে রাস্তা খোলা সবসময়ে যেমন থাকে, আবার কখনও রাস্তা বদলেও যায়। ইতিমধ্যে সুদীপপন্থী সুশান্ত চৌধুরী ও রামপ্রসাদ পালকে মন্ত্রী করে বিপ্লব দেব একটা ঝটকা দিয়েছেন ঠিকই, অন্যদিকে নতুন করে অঙ্ক কষতে শুরু করেছেন সুদীপ রায় বর্মন। তিনি ত্রিপুরায় জাতি, জনজাতি, বাঙালি, হিন্দু-মুসলমান সমীকরণের অঙ্কটা খুব ভালোই জানেন। তারপর রয়েছে বিজেপি, সিপিএম, কংগ্রেস, তৃণমূল, আইপিএফটি ও প্রদ্যোৎ কিশোর বর্মনের তিপ্রামথার ভোট ভাগের হিসেব। এই মুহুর্তে ত্রিপুরার রাজনীতি একভাবে ঘেঁটে রয়েছে। এই অবস্থায় ভোট ভাগাভাগি, আসন সমঝোতা অনেক ধরণের অঙ্ক এবং তার নানা সমীকরণ রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ত্রিপুরার দলবদল অভিষেকের নেতৃত্বে কতটা ফলপ্রসূ হয় তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
দলবদল নিয়ে জোর চর্চা চলছে রাজনৈতিক মহলে। তৃণমূল ত্রিপুরায় একটা সময় দলবদলের জেরে বিধানসভার বিরোধী দল হয়েছিল। কিন্তু এখন তাদের আবার নতুন করে শুরু করতে হয়েছে। তৃণমূল নেতাদের বক্তব্য, ত্রিপুরায় বিজেপি সরকার ফ্যাসিস্ট শাসন চালাচ্ছে। সেই অবস্থা থেকে রাজ্য ও রাজ্যবাসীকে মুক্তি দিতে হবে। সেই লক্ষ্য নিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আসছে। তিনি রাজ্যে পরিবর্তনের ডাক দেবেন। ত্রিপুরাকে সন্ত্রাসের হাত থেকে রক্ষা করার বার্তা দেবেন। বার্তা দেবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেখানো পথে ত্রিপুরাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। লক্ষ্য দেড় বছরের মধ্যে ত্রিপুরা দখল।