‘পাখাগ্রাম’। আশপাশের গাঁ থেকে দূর-দুরান্তের দশ-বিশটা গ্রামের মানুষ এই নামেই চেনে ও ডাকে বাঘাদাঁড়ি গ্রামকে। পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথি-৩ ব্লকের এই বাঘাদাঁড়ি গ্রামের ঘরে ঘরে তৈরি হত তালপাতার পাখা। তালপাতার হাতপাখা তৈরিতে একটা সময় কৌলিন্য থাকলে এখন বাঘাদাঁড়ি গ্রাম থেকেও হারিয়ে গেছে সেই তালপাতার হাতপাখা তৈরির ঐতিহ্যের ব্যবসা।
হাল ফ্যাশনের ছোঁয়ায় কমে গিয়েছে সাবেক কালের নিত্য প্রয়োজনীয় তালপাতার হাতপাখার গুরুত্ব। শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামের ঘরে ঘরে এখন বৈদ্যুতিন পাখা, লোডশেডিং-ও কমে গিয়েছে অনেকটাই। প্রত্যন্ত এলাকার বেশিরভাগ গ্রামেই এসেছে বিদ্যুৎ সংযোগ। ফলে হাতপাখার কদর এমনিতেই গিয়েছে কমে। তার উপর যোগ হয়েছে ফাইবারের পাখার সস্তা বাজার। আগে বাজার ছেয়ে থাকত ফ্যাশনের জাপানি হাতপাখায়। তবে তার সঙ্গে তালপাতার পাখার কোন বিরোধ ছিল না।কিন্তু এখন ফাইবারের পাখা তৈরি হচ্ছে তালপাতার পাখার আদলে। বিক্রির হচ্ছে অনেক কম দামে। মানুষজনও সস্তায় ফাইবারের পাখা পেয়ে তালপাতার পাখা ছেড়ে ফাইবারের পাখা কেনার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। ফলে বেশ কয়েক বছর আগেও যে বাঘাদাঁড়ি গ্রামের প্রায় ৭০-৮০ ঘর মানুষ তালপাতার হাতপাখা তৈরির কাজে যুক্ত থাকতেন তা কমতে কমতে একসময় মাত্র একটি ঘরে ঠেকে ছিল। এই একটিমাত্র ঘরের তালপাতার হাতপাখা তৈরির প্রবীণ শিল্পী গোবর্ধন ভূঁইয়া বছর খানেক আগে মারা যান।

গোবর্ধন ভুঁইয়া-র মৃত্যুর পর গোটা বাঘাদাঁড়ি গ্রাম থেকে একবারেই হারিয়ে গিয়েছে তালপাতার হাতপাখা তৈরির ঐতিহ্যের ব্যবসা।বেঁচে থাকার সময় তিন দশক ধরে ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হয়ে হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ ঐতিহ্যের তালপাতার পাখা শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে লড়াই করে গেছেন প্রয়াত গোবর্ধনবাবু।সকাল থেকে গ্রামে গ্রামে ঘুরে কাঁচা তালপাতা জোগার করে বাড়িতে এনে উঠোনে বিছিয়ে রোদে শুকোতে দিতেন। উঠোন জুড়ে রোদে মেলে রাখা তালপাতা একটু একটু করে শুকোনোর সময় বুনো গন্ধ ছড়িয়ে পরতো উঠোন সহ গোটা বাড়িতে। তবে না পাখা তৈরি। পাখার সৌন্দর্য বাড়াতে তালপাতা দিয়েই নকশা তৈরি করে জুড়ে দেওয়া হত পাখার উপর। গরমের সময় নিজের হাতে তৈরি তালপাতার পাখা নিয়ে বিভিন্ন মেলা ও হাটে হাটে ফেরি করতেন পাখাগ্রামের গোবর্ধন ভূঁইয়া।

চাহিদা নেই, বাজার খারাপ তাই প্রয়াত গোবর্ধনবাবুর দুই ছেলে নবীন আর নয়ন বাবার এই পেশার সঙ্গে আর যুক্ত হননি। তাদের কথায়, “অথচ একসময় তালপাতার হাতপাখার এতো চাহিদা ছিল যে পাইকারদের যোগান দিতে হিমসিম খেতে হত বাবা সহ গ্রামের পাখা শিল্পীদের। সে সব সুদিন আর নেই। গরমের সময় দু’তিন মাস পাখার চাহিদা থাকলেও তালপাতার বদলে সস্তার ফাইবারের হাতপাখা কিনতেই আগ্রহী খরিদ্দাররা। আর আছে মেলা। শিল্পরুচির সেসব মেলায় দু’একখানা দামী পাখা কিনে নিয়ে যান শহুরে বাবুরা ঘর সাজানোর উপকরণ হিসেবে। কিন্তু তাতে কি আর পেট ভরে?” তাই বাবার পেশা বেছে না নিয়ে দুই ভাইকে এখন রাজমিস্ত্রির কাজ আর বাজারে সব্জির ব্যবস্যা করতে হয় সারা বছর। গ্রামের দুই হাতপাখা শিল্পী সুধাংশু ভূঁইয়া ও তপন মন্ডল একসময় তালপাতার পাখা তৈরি করতেন। এখন যাবতীয় কাজ ফাইবারে। দুই শিল্পী জানালেন, “তালপাতার তুলনায় ফাইবারের হাতপাখা তৈরি করতে পরিশ্রম ও সময় দুটোই কম লাগে। ফাইবারের রোল কিনে এনে পাখার সাইজে তা কেটে নিতে হয়। তারপর বাঁশ বা প্লাস্টিকের সরু কাঠি তার দিয়ে মুড়ে দিলেই পাখা তৈরি। শুধু যে খরচ কম তাই নয়, বাজারে চাহিদাও বেশি।”
সরকার যদি এইসব গ্রামীন শিল্প টিঁকিয়ে রাখার দিকে একটু নজর আর উদ্যোগ নিতেন তাহলে অন্তত একটা সুরাহা হত হাতপাখা শিল্পীদের। এমনটাই মনে করেন স্থানীয় বহিত্রকুন্ডা প্রাথমিক স্কুলের তরুণ শিক্ষক ঝাড়েশ্বর বেরা। তিনি বলেন, “বিড়ি শ্রমিকদেরও সরকারি স্বীকৃতি আছে। আছে নানা সুযোগ-সুবিধা। হাতপাখা শিল্পীদের সত্যিই কিছুই নেই। ব্যাঙ্ক থেকেও ঋণ মেলে না। রাজ্যের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প দফতরের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নিয়ে ঋণ ও বিক্রির একটা ব্যবস্থা নিয়ে সত্যি যদি কিছু সুবিধা দেওয়া হত, তা হলে অন্তত কিছুটা সুবিধা হত এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত পরিবার গুলির। হারিয়ে যেতে বসত না এই প্রাচীন গ্রামীণ শিল্পটি।”

কাঁথি-৩ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি বিকাশ চন্দ্র বেজ বলেন, “বাঘাদাঁড়ি গ্রামের তালপাতার হাতপাখা শিল্প গোটা কাঁথি-৩ ব্লকের ঐতিহ্য।” বিকাশ বাবুর কথায়, হাল ফ্যাশন আর সস্তায় পাওয়ার আকর্ষণেই সাধারণ মানুষ সাবেক আমলের তালপাতার পাখার প্রতি অনীহা দেখাচ্ছেন বা বিকল্প কিছুর দিকে ঝুঁকছেন। তবে ব্যাঙ্ক ঋণ থেকে বাজার এর একটা ব্যবস্থা করে এই তালপাতার হাতপাখা শিল্পটিকে বাঁচিয়ে পুনরুদ্ধান করা যায় তার জন্য পঞ্চায়েত সমিতির পক্ষ থেকে যা যা করণীয় তা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।” তাতেও কি ভবিষ্যতে কপাল ফিরবে, আবার তালপাতার হাতপাখা তৈরির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন নিজেদের উঠোনময় মেলা কাঁচা তালপাতা শুকোনোর বুনো গন্ধে? শূন্য চোখে গোবর্ধন বাবুর দুই ছেলে বলেন, “জানি না”।
ছবি : সোহম গুহ