স্বাস্থ্যই সম্পদ —কথাটি বেশী করে বুঝিয়ে দিয়েছে করোনার দাপট। তাই প্রতিদিনের ডায়েটের তালিকায় থাকছে ‘ইমিউনিটি বুস্টার’ উপাদান। সেই তালিকার অন্তর্ভুক্ত স্বাস্থ্যকর, সহজলভ্য উপাদানটির নাম ‘হলুদ’। হাজারো বছর ধরে ‘মসলার রানী’ হলুদের গুণের কথা সর্বজনবিদিত। প্রাচীন ভারতীয় আয়ুর্বেদ ও চৈনিক চিকিৎসাপদ্ধতিতে এটি ‘ঔষধি ভেষজ’ নামে আখ্যায়িত।
প্রতিটি পরিবারের হেঁসেলে হলুদ একটি জরুরি উপাদান। মনমোহিনী একটি ঘ্রাণও আছে। রান্না ফিকে লাগে এর উপস্থিতি ছাড়া।
হলুদের রঙ তো হলদেই হবে কিন্তু তা যদি হয় নীল অথবা কালো! এই বিশেষ প্রজাতির হলুদের নাম ব্ল্যাক টারমারিক বা কার্কুমা সিশিয়া বা কালো জেডোয়ারি। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আয়ুর্বেদিক মহৌষধি গাছকে করচুর বলা হয়। এক ধরনের কন্দ জাতীয় গাছ।
বিরল ও বহুমূল্য এই হলুদের প্রধান রাসায়নিক উপাদান হলো উদ্বায়ী তেল। এছাড়া ৩০ ধরনের উপাদান চিহ্নিত করা গেছে। চিকিৎসকদের মতে, ক্যান্সারের মতো দুরারোগ্য ব্যাধিতে ম্যাজিকের মতো কাজ করে কালো হলুদ।
এর মধ্যে কারকিউমিন ও পলিফেনল থাকায় এটি আন্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কার্যকর। আছে বি-সাবটাইলিস নামক উপাদান যা জীবাণুনাশক। মাংসপেশীর সংকোচন প্রতিরোধে, অনিদ্রা দূর করতে, গ্যাস্ট্রিক আলসার প্রতিরোধে, শ্বাসকষ্ট, ইনফ্ল্যামেশন, জ্বর, গাঁটে ব্যথা, ত্বকের রোগ, পাইলস, দাঁতে ব্যাথা, খিঁচুনি ইত্যাদি প্রতিরোধে সাহায্য করে হলুদ।

উত্তর পূর্ব ভারত, মধ্যপ্রদেশ ও বাংলাদেশের কিছু জায়গায় পাওয়া যায় নীল রঙের হলুদ। এ হলুদ রান্নায় ব্যবহার করার জন্য নয়, নির্যাসে প্রচুর ভেষজ গুন থাকায় ওষুধ তৈরি করতে সহায়ক এই নতুন অতিথি।
সিডনি, সান ফ্রান্সিসকো, ইংল্যান্ডের বিভিন্ন ক্যাফেতে দুধের সঙ্গে আমন্ড, কাজু এবং হলুদ মিশিয়ে ফেমাস হেল্থ ড্রিংকসের নাম ‘টারমারিক লাতে’। এটি ‘হলুদ দেওয়া দুধের’ পোশাকি নাম। প্রাচীনকালে ভারতীয় মুনি ঋষিরা চিকিৎসার কাজে ব্যবহৃত করতো। আজো মায়েরা ব্যথা-বেদনার উপশমে টোটকা হিসাবে ব্যবহার করে এই হলুদ দুধ ।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, হলুদ ও গোলমরিচের যুগলবন্দী স্বাস্থ্যের পক্ষে অত্যন্ত উপকারী।পেইন কিলার হিসাবে এর সুনাম আছে যথেষ্ট। হলুদের কারকুমিন ও গোলমরিচের পাইপারিন শরীরের পক্ষে উপকারী। আয়ুর্বেদ চিকিৎসকরা বলেন, ২ গ্রাম হলুদের সঙ্গে ২০ মিলিগ্রাম গোলমরিচের গুঁড়া মেশালেই তৈরি এই যুগলবন্দী ।
হলুদের অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ক্ষমতার জন্য প্রাচীনকাল থেকে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে বিয়ের ‘গায়ে হলুদ’ অনুষ্ঠানে-এর ব্যবহার চলে আসছে।
পুরান মতে, শিব-সতীর বিবাহে গাত্র হরিদ্রা হয়েছিল তাদের রূপের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধির জন্য।
বামন পুরানে বিনায়ক সৃষ্টি হওয়ার কাহিনীতে বলা হয়, ‘মাতা পার্বতী অঙ্গে হলুদ লেপন করে অবগাহন করছিলেন। কী খেয়াল হতে সেই হলুদ থেকে মনুষ্য মূর্তি গড়ে প্রাণসঞ্চার করলেন দেবী। জন্ম হলো পার্বতীর দেহজাত জৈষ্ঠ্য পুত্রের।
হলুদ রঙ অর্থ্যৎ পবিত্র রঙ। শুধু হিন্দু বিবাহে নয় মুসলিম সম্প্রদায়ের বিবাহের অনুষ্ঠানেও আছে ‘গায়ে হলুদ’ এর পর্ব। দুটি মানুষ নব-জীবনে প্রবেশ করার আগে শুভাশিস প্রদান করা হয় গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে। বিয়ের কার্ডেও হলুদের ফোটা দেওয়া হয়।
এছাড়া তখনকার দিনে ছিলোনা এত কসমেটিক্স বা বিউটি পার্লার। ত্বকের জেল্লা আনতে বা ত্বকের নানান সমস্যায় মা-ঠাকুমাদের ভরসা ছিলো রান্নাঘরের এই উপাদান।
হিন্দুদের ধর্মীয় উপাসনায় হলুদ ব্যবহার করা হয় এই ধারণায়, এটি শুভ ও ঐশ্বরিক গুণাবলীতে পূর্ন ।

বিশ্বাস করা হয়, পুজোর শুরুতে এর ব্যবহার ব্যক্তির বৃহস্পতি গ্রহ শক্তিশালী করে। বাড়ির সীমানায় হলুদের রেখা টানা হয় নেতিবাচক শক্তিগুলো ঘরে প্রবেশ না করতে পারে।
জ্ঞান, বিদ্যা এবং বিবেকের প্রতীক হলুদ রঙ। অশুভত্ত্বকে নাশ করে বলে সর্ববিঘ্নহন্তা গণপতির পোশাক হলুদ রঙের। শ্রীবিষ্ণুর পীতবস্ত্র অসীম জ্ঞানের দোত্যক।
ঐতিহাসিকরা বলেন, ধর্মীয় কারণে নয়, হলুদের উপকারী দিক বিবেচনা করার এর ব্যবহার করা হয়।
হলুদে রয়েছে প্রচুর পরিমানে ফাইবার, প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ লবণ, ফসফরাস, ক্যালসিয়াম, লোহা। ট্রমাটিক ডিসঅর্ডারে অর্থ্যৎ খারাপ বা ভয়ের স্মৃতি কমাতে সাহায্য করে হলুদ। একটি গবেষণায় জানা গেছে, রোজ কাঁচা হলুদ খেলে প্রায় ৫৬ রকমের ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে যায়।
বাজারজাত প্যাকেট বা খোলা হলুদের গুঁড়োয় মিশে থাকতে পারে সীসা (লেড ক্রোমেট যা স্থানভেদে ‘পিউরি’, ‘বাসন্তি রং’, ‘কাঁঠালি’ ইত্যাদি নামে পরিচিত), চক বা রাসায়নিক। ক্রমাগত এর ব্যবহার মহিলাদের বন্ধ্যাত্ব, নার্ভ টক্সিসিটি, শিশুদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, হৃদরোগ ইত্যাদির কারণ হতে পারে।
অতএব উপায়! কিনে আনুন গোটা হলুদ। ভালোভাবে ধুয়ে, বেটে ব্যবহার করুন। অনেক ভালো ফল মিলবে।
Informative