গত বছরের অক্টোবরে ভারতের শেয়ার বাজার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছয়। ২০২১ সালের ১৯ অক্টোবর বাজার চলাকালীন সেনসেক্স সর্বোচ্চ বিন্দু ৬২,২৪৫ ছুঁয়েছিল, যদিও সেদিন বাজার শেষে সেনসেক্স হয়েছিল ৬১,৭১৬ পয়েন্ট। এর আগের দিন, ১৮ অক্টোবর ২০২১ বাজার শেষের সর্বোচ্চ বিন্দু ছোঁয় সেনসেক্স, তা ছিল ৬১,৭৬৬ পয়েন্ট। প্রসঙ্গত, বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ-এর সঙ্গে যুক্ত ৩০টি কোম্পানির শেয়ার মূল্যের ওঠানামা মাপা হয় এই সূচকে। সেনসেক্স-এর ওঠানামা দিয়ে সামগ্রিক বাজারের হাবভাব বোঝা যায়।

একই রকম আরেকটি সূচক নিফটি। ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ বা এনএসই-র সঙ্গে যুক্ত ৫০টি কোম্পানির শেয়ারের দামের ওঠাপড়ার হিসেব রাখে এই সূচক, তাই একে নিফটি-ফিফটিও বলা হয়। নিফটির ক্ষেত্রেও সাম্প্রতিক ইতিহাসটা একই রকম। ২০২১ সালের ১৯ অক্টোবর বাজার চলাকালীন নিফটি সর্বোচ্চ বিন্দু ১৮,৬০৪ ছুঁয়েছিল, যদিও সেদিন বাজার শেষে নিফটি হয়েছিল ১৮,৪১৯ পয়েন্ট। এর আগের দিন, ১৮ অক্টোবর ২০২১ বাজার শেষের সর্বোচ্চ বিন্দু ছোঁয় নিফটি, তা ছিল ১৮,৪৭৭ পয়েন্ট।

এর পরেই ভাটার টান আসে শেয়ার বাজারে। গত তিন মাসে আর কখনও অক্টোবরের জায়গায় ফিরে যেতে পারেনি শেয়ার বাজার। চলতি সপ্তাহে শেয়ার বাজারের ব্যাপক পতন কিন্তু অনেকের কাছেই বেশ অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশ ভাবছেন, ভারতীয় অর্থনীতির দুর্বলতা ফুটে উঠছে শেয়ার বাজারে। চলতি সপ্তাহে পরপর বড় পতনের ফলে লগ্নিকারীরা হারিয়েছেন প্রায় দশ লক্ষ কোটি টাকা। দেশের আর্থিক বৃদ্ধির গল্পটাও বেশ এলোমেলো লাগছে অনেকের কাছেই।

শেয়ার বাজারে ভালুকের দাপাদাপি
শেয়ার বাজারে উত্থানের পরে কিছুটা সংশোধনমূলক পতন স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু চলতি সপ্তাহে ঘটনাক্রম যেন সেই স্বাভাবিকতার গণ্ডি ছাড়াচ্ছে। চলতি সপ্তাহে সোমবার নিফটি বাজার শেষ হয়েছিল ১৮,৩০৮ পয়েন্টে, মঙ্গলবার শেষ হয় ১৮,১১৩ পয়েন্টে। বুধবার ১৭,৯৩৮, বৃহস্পতিবার ১৭,৭৫৭ পয়েন্টে, শুক্রবার বাজার শেষে নিফটি হয়েছে ১৭,৬১৭। সেনসেক্স-এর চলাচলটিও একই ধরনের। সোমবার সেনসেক্স বাজার শেষে হয়েছিল ৬১,৩০৯ পয়েন্ট, মঙ্গলবার ৬০,৭৫৫, বুধবার ৬০,০৯৯। বৃহস্পতিবার ৫৯,৪৬৫ পয়েন্টে, আর সপ্তাহের শেষ দিন শুক্রবার বাজার শেষে সেনসেক্স নেমে হয়েছে ৫৯,০৩৭ পয়েন্ট। চলতি সপ্তাহের চারটি দিনে সূচক পড়েছে পৌনে চার শতাংশ, লগ্নিকারীরা হারিয়েছেন ৯ লক্ষ ৮৩ হাজার কোটি টাকা। স্বাভাবিক সংশোধনের সীমা ছাড়ানো এই পতন কেন? বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি কারণের দিকে ইঙ্গিত করছেন।

দেশে আর্থিক বৃদ্ধির গল্পটা ধোপে টিকছে না
সম্প্রতি গত ত্রৈমাসিকের আর্খিক ফল প্রকাশ করতে শুরু করেছে কোম্পানিগুলি। সিয়াট, এশিয়ান পেইন্টস-এর মতো নামি-দামি কোম্পানির আর্খিক ফলাফলে দুর্বলতার ছাপ স্পষ্ট। দেশের জাতীয় উৎপাদনের বৃদ্ধি, যা জিডিপি দিয়ে মাপা হয়, তা-ও আগের অনুমান থেকে অনেকটাই কমবে বলে নানা মহল থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। ২০২০ সালে করোনা লকডাউনের পরিস্থিতিতে জাতীয় উৎপাদন সঙ্কুচিত হয়ে গেছিল। সেই নীচু ভিত্তির উপর হিসেব করায় এবার একটা বৃদ্ধির অঙ্ক খাতায় কলমে দেখানো সম্ভব হলেও বছর শেষে তার প্রকৃত মূল্য ২০১৯ সালের থেকে কম থাকবে বলেই অনুমান অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের। বর্তমান অবস্থা যে লগ্নির উপযুক্ত নয় মোটেই, সেটা বোঝা গিয়েছে ক্রমবর্ধমান কর্মহীন মানুষের সংখ্যা থেকেই। সিএমআইই সংস্থার সমীক্ষা অনুযায়ী ভারতে গত মাসে কর্মহীনতার হার ছিল প্রায় ৮ শতাংশ। তুলনার জন্য উল্লেখ করা যেতে পারে, কোভডের একই রকম হামলা সত্ত্বেও এই হার বাংলাদেশে ৫.৩ শতাংশ, মেক্সিকো দেশে ৪.৭ এবং ভিয়েতনামে ২.৩ শতাংশ।

এ দেশের আরেকটি বড় সমস্যা হলো ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি। খাদ্যদ্রব্যে পাইকারি দামবৃদ্ধি নভেম্বরে ছিল ৪.৮৮ শতাংশ, ডিসেম্বরে হয়েছে ৯.৫৬ শতাংশ। ওই দু’মাসে আনাজের মূল্যবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ৩.৯১ ও ৩১.৫৬ শতাংশ!
পাল্লা দিয়ে বেড়েছে খুচরো দাম বৃদ্ধি। দাম বাড়ার সমস্যা সামলাতে না পারলে ব্যাঙ্ক সুদ বাড়াতে হবে, যেটা চাইছে না বাণিজ্য মহল। কারণ, সুদ বাড়লে দামি হবে ব্যাঙ্ক ঋণ, ব্যাবসা চালাবার খরচ বাড়বে। এই মনোভাবের প্রতিফলন পড়ছে শেয়ার বাজারে।
তবে সম্প্রতি দাম বাড়ছে বিশ্ব জুড়েই। বাড়ছে অপরিশোধিত পেট্রোলিয়ামের দাম, ব্রেন্ট ক্রুড ছুঁতে পারে ব্যারেল পিছু ১০০ ডলার। মার্কিন দেশে, ইউরোপে মূল্যবৃদ্ধি সামলাতে বাড়ানো হতে পারে সুদের হার। সুদ বাড়ার সম্ভাবনায় ভারত ছাড়ছে বিদেশি ফাটকা পুঁজি, ক’দিনে দেশ ছেড়েছে এমন ১৭ হাজার কোটি টাকা, যা টেনে নামাচ্ছে শেয়ার বাজারকে। দুর্বলতা ধরা পড়ছে ভারতের মুদ্রাতেও, ডলারের তুলনায় কমছে টাকার দাম। সম্প্রতি ১ ডলারের দাম ৭৪ টাকা থেকে কমে ৭৪ টাকা ৫০ পয়সা হয়েছে।

বাজারে তৈরি হয়েছে বাজেট-পিছুটান
বাজারকে আরও ম্রিয়মান করেছে কেন্দ্রীয় বাজেটের সময় চয়নের বিষয়টি। স্বাস্থ্যকর পদ্ধতি হলো, নির্বাচনের সময় বাজেট পেশ না করা। আগে ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে বাজেট পেশ করা হতো। উত্তরপ্রদেশের ভোট সামনে রেখে ১ ফেব্রুয়ারি বাজেট পেশ করা শুরু করেন প্রয়াক অর্থমন্ত্রী অরুণ জেইটলি। সেই ট্র্যাডিশন এখনও চলছে। এ বছরও উত্তর প্রদেশ সহ পাঁচ রাজ্যে ভোট সামনে রেখে বাজেট পেশ করা হবে পয়লা ফেব্রুয়ারি। জাতীয় অর্থনীতির সমস্যা কাটানোর পরিবর্তে পেশ হতে চলেছে তথাকথিত ‘জনপ্রিয়’ বাজেট, শঙ্কা কর্পোরেট কর্তাদের। মূল্যবৃদ্ধি চলতে থাকবে, অথচ সুদ বাড়বে না, এতে সবথেকে বেশি ক্ষতি হয় মধ্যবিত্ত মানুষের। আবার চড়া মূল্যবৃদ্ধি, আকাশ ছোঁয়া কর্মহীনতা মিলিয়ে তৈরি করে তথাকথিত স্ট্যাগফ্লেশন-এর অশুভ চক্র, যা থেকে বেরনো কঠিন। অনেকে মনে করছেন, ভারতে এখন শুরু হয়ে গিয়েছে স্ট্যাগফ্লেশন। পরিস্থিতি সামালাতে হিন্দুত্ববাদী শক্তি সাম্প্রদায়িকতাকে আরও খুঁচিয়ে তোলে কি-না. সেটাই এখন দেখার।