ফুটপাত ধরে হেঁটে যায় তরুণ কবি
ব্যাগভর্তি লিটল ম্যাগাজিন
এখনো তাতে কালির গন্ধ লেগে আছে
***
সেই চেনা রেলিংটাতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে যে, তার হাতে পৌঁছে দেবে হ্যান্ডমেড পেপারে নিজেরই করা প্রচ্ছদলিপিতে নির্মিত ‘একরাশ স্বপ্নিল প্রাণের আকাশছোঁয়ার ছাড়পত্র’।
কফি হাউসের সিঁড়ি, এককাপ ইনফিউশন—
সদ্য সিগারেট খেতে-শেখা তরুণের কাছে কবিতার মতোই…
***
এই পথে হেঁটেছেন জীবনানন্দ, হেঁটেছে বাংলাভাষা
এই পথে কত লড়াই, দাবি-দাওয়া আদায়ের জন্য কত বিক্ষোভ
এই পথেই ছড়িয়ে আছে প্রথম প্রেম, পুরোনো বাংলা ছবি, মাটির ভাঁড়, হাজারো বিনোদন পত্রিকা, অ্যাম্বুলেন্স, অসুখের গন্ধ…
***
বসন্তকেবিনের চা কিংবা ইউনিভার্সিটির ক্যান্টিনের স্যান্ডউইচ, কফিহাউসের নস্টালজিয়া কিংবা প্যারামাউন্টের শরবতের গেলাস সেই ছেলেটিকে মনে করিয়ে দেয় প্রথম কবিতার বই প্রকাশ করতে না পারার যন্ত্রণাকে…
***
আজও স্বপ্নের ভিতরে সে দেখতে পায়
ভেপারের আলোয় মাথা উঁচু করে হেঁটে যাচ্ছে বর্ণমালা…
***

বইপাড়া মানে আমার কাছে স্মৃতির অ্যালবাম। টুকরো ছবির কত না কোলাজ। প্রেসিডেন্সি কলেজ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুবাদে পাঁচটা বছর আমার কেটেছে বইপাড়ার একটু পাশেই। বিধান সরণি ধরে সোজা ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি।থাকতাম মুক্তারামবাবু স্ট্রিট-লাগোয়া রাজেন্দ্রদেব রোডে।পায়ে হাঁটা পথে পৌঁছে যেতাম কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়। পেরিয়ে আসতাম অসংখ্য লোহালক্কড়ের দোকান, আজকাল অফিস, কলেজস্ট্রিট মার্কেট, ট্রামরাস্তা, ফুটপাত, বাটার শোরুম, বইয়ের দোকান, লিটল ম্যাগাজিনের সেরা ঠিকানা পাতিরাম, বেনারসির শ্রেষ্ঠ ঠিকানা মোহিনীমোহন কাঞ্জিলাল। সালটা ২০০১। কৃষ্ণনগর শহর থেকে পা রাখলাম কলকাতায়। শিয়ালদা স্টেশন থেকে ফুটপাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে প্রেসিডেন্সির গেট। ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে এই রাস্তায় বহুবার এসেছি কিন্তু কলেজ- ছাত্র হিসেবে এই পথ আমাকে দিল অনেক কিছু, প্রতিদিন নতুন নতুন অভিজ্ঞতা কত বইয়ের সম্ভার, কত না ধরন বিয়ের কার্ডের, তত্ত্বসূচির হাজারো রকমফের,পাশাপাশি কত না ট্রফি, খেলার সরঞ্জাম, রংবেরঙের ছাতা, ব্যাগ, সিনেমা হল, ট্রাফিক সিগনাল, ফুটপাতের রঙিন জল, সিগারেটের ধোঁয়া, নোংরা আবর্জনার স্তূপ, পুঁটিরামের গরম গরম কচুরি, ঠেলা রিক্সা, টাইপরাইটার মেশিনের খটখট শব্দ, আর্চিস গ্যালারি, বহুদিনের পুরনো সব বাড়ি, কালো-হলুদ ট্যাক্সি, বই কিংবা কাগজের ভ্যান, আর লক্ষ লক্ষ মানুষ।এরা সবাই আমার প্রতিদিনের গল্প হয়ে উঠেছিল। বিধান সরণি, কলেজস্ট্রিট, বেনিয়াটোলা লেন, কলুটোলাস্ট্রিট, সূর্যসেন স্ট্রিট, টেমার লেন কখন হয়ে উঠেছিল আমার ফেলে-আসা গ্রামের পথ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালের পুরোনো পত্র-পত্রিকা আর পুরোনো বইয়ের সম্ভার হয়ে উঠেছিল আমার প্রতিদিনের বন্ধু। কলেজ স্কোয়ারের বিকেলগুলো মন খারাপ করে দিতো। আসলে কলকাতা শহরের বিকেলটা আমার কাছে কেমন ধূসর বলে মনে হতো। শিয়ালদা স্টেশনের দিকে দ্রুতগতিতে ফিরে যাচ্ছে শহরে কাজ করতে আসা মানুষগুলো। তারা চলে যেত তাদের দূরের কোনো গ্রামে, কিংবা মফস্বল শহরে। হরিপদ কেরানির মতো আমার মনে হতো ‘শেয়ালদা ইস্টিশনে যাই/সন্ধ্যেটা কাটিয়ে আসি।’ ট্রামের আওয়াজ, ট্রামের তারে আলোর চকমকি, কলেজস্ট্রিটের বইপাড়ার মৃদু আলো, ফুটপাতের ধোঁয়া-ওঠা চা, ইউনিভার্সিটির সামনের দোকানের ডিমের অমলেট কিংবা বাটার টোস্ট, সিগারেটের মাদকতা ফিরিয়ে নিয়ে যেত হোস্টেলের বারান্দায়।আসলে কোলকাতার এই পাড়াটিকে কখনো মনে হত একটা জীবন্ত কবিতার মতো, আবার কখনো মনে হতো সাদাকালো ক্যানভাস, কখনো এই পাড়া হয়ে উঠত টুকরো টুকরো গল্পের কোলাজ কিংবা মহাকাব্যিক উপন্যাস।এই পাড়ার প্রতিটা গলির গন্ধই আলাদা। বইয়ের পাতায় পাতায় লেগে-থাকা টাটকা সতেজ শব্দগুলো যেমন মুগ্ধ করত মন, তেমনি পুরনো বইয়ের মলাট কোন এক অতীত ইতিহাসের পথে নিয়ে যেত আমাকে।
সম্পাদনা করতাম ‘জীবনকুচি’ নামে একটি পত্রিকা। উচ্চমাধ্যমিক পড়ার সময় জন্ম নিয়েছে পত্রিকাটি। স্বাভাবিকভাবেই কলকাতায় পৌঁছতেই পত্রিকা নিয়ে স্বপ্ন আরো বেড়ে গেল। অনেকের সান্নিধ্য পেলাম। প্রথম কফিহাউস দেখা। পরিচিত হওয়া বেশ কিছু মানুষের সঙ্গে। জেলার পরিচিত কবিরা আলাপ করিয়ে দিলেন শহরের কবিদের সঙ্গে। কলেজবন্ধুরা তো ছিলই, পাশাপাশি কলেজে অধ্যাপক হিসেবে পেলাম বহু গুণী লেখককে। অদ্ভুত ভালো মনের সব মানুষ। কবিতাপ্রেমী আমার এক প্রিয় মাস্টারমশাই কলেজ ছুটির পর আমাকে নিয়ে বসতেন মহাজাতি সদন মেট্রো স্টেশনের পাশে একটি ফুটপাতের চায়ের দোকানে। দোকান নয়, ঝাঁপ। বসতাম একটা ভাঙা ল্যাম্পপোস্টের উপর। অনেক গল্প হত। আসলে বইপাড়ার সঙ্গে সংযুক্ত প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটা গলি, তার চারপাশের মানুষ, দোকান, ফুটপাত, ফুটপাতে গড়ে ওঠা বেঁচে থাকার আশ্রয়-এসব আমাদের যৌবনে ছিল বসন্তের মতো। পত্রিকার প্রচ্ছদ হ্যান্ডমেড পেপারে। আর তাই কাগজের পট্টি অর্থাৎ বৈঠকখানা মার্কেট ছিল আমার খুব প্রিয় জায়গা। ঘাড়ে করে দিস্তা দিস্তা কাগজ নিয়ে যাওয়ার আনন্দই ছিল আলাদা। ছাপাখানার গলি হয়ে উঠত রঙিন ক্যানভাস। তাছাড়া হোস্টেলে সরস্বতী পুজোর কত রংবেরঙের কাগজ-কলম সংগ্রহ করতে হতো আমাকেই। ছোটবেলা থেকেই পেনের প্রতি আমার একটা ঝোঁক ছিল, প্রেম বলা ভালো।তাই কলেজস্ট্রিটের পেনের দোকানগুলি আমার কাছে ছিল স্বপ্নেরজগৎ।

লিটল ম্যাগাজিন করব অথচ লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্রে যাব না, এমনটা হয় নাকি! সন্দীপকাকু ছিলেন আমার প্রাণের প্রিয় মানুষ। পড়াশোনার কারণে তো যেতামই। তাঁর সঙ্গে ছিল নিজের পত্রিকা পৌঁছে দেওয়া। এইতো কিছুদিন আগে নদিয়া জেলা লিটল ম্যাগাজিন মেলায় এসে খোঁজ করেছেন আমার, মনে রেখেছেন পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যার কথা। আসলে আমাদের প্রত্যেকের শরীরেই বইপাড়ার গন্ধ লেগে আছে। বইপাড়া মানেই সেই পরিচিত ডাক-‘কী বই বলুন? এই ভাই কী বই চাই? স্যার বলুন একবার কোন্ বইটা? বেশি করে ডিসকাউন্ট দেব।’কিন্তু উত্তর দিতে পারতাম কি সব সময়? শুধুই হাঁটতে হাঁটতে পুরনো বইয়ের মলাট দেখতে দেখতে, নতুন বইয়ের মাদকতা অনুভব করতে করতে অনেকটা সময় পেরিয়ে যেত। আসলে হাতে খুব বেশি পয়সা ছিল না। মনে হতো কলকাতা শহর, পড়তে পাঠিয়েছেন বাবা, বেশি খরচ যেন না করে ফেলি। প্রেসিডেন্সি কলেজ লাইব্রেরির বইয়ের ভাণ্ডার বইয়ের অভাব কোনদিনই বুঝতে দেয়নি। ঘন্টার পর ঘন্টা লাইব্রেরিতে বসে থেকেছি। লিখে নিয়েছি পাতার পর পাতা। আবার যখন বুঝেছি বই কিনতে হবে যে করেই হোক, তখন টিফিনের খরচ বাঁচিয়ে প্রচুর দাম দর করে পুরনো সাহিত্যের ইতিহাস, উপন্যাস, গল্পসংগ্রহ, কবিতাসংগ্রহ একটু একটু করে কিনে ফেলা।
বইপাড়া প্রচুর কিছু শিখিয়েছে।বইপাড়ায় হাঁটতে থাকা প্রতিটি মানুষের ছন্দ যেন এক এক রকমের। আসলে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের চলাচল এই বইপাড়ায়। বাইন্ডার, প্রকাশক লেখক-শিল্পী, বুদ্ধিজীবী মানুষ, মুটে, প্রেসের মালিক, কম্পোজার, ভ্যানটানা মানুষ, ফুটপাতে স্পেসিমেন কপি বিক্রি করতে থাকা মানুষ আমাকে শিখিয়েছে শহর কলকাতার বইপাড়াকে চিনতে। আমাদের নদিয়া জেলারই বাদকুল্লা থেকে একজন প্রতিদিনই নিয়ে যেতেন রসগোল্লা। মোহিনীমোহন কাঞ্জিলালের পাশের গলিতে হাত-রুটি আর সয়াবিনের তরকারি খেয়ে একটা রসগোল্লা খেতেই হতো, যতই হোক নিজের জেলার তৈরি রসগোল্লা। হয়তো কলকাতার রসগোল্লা ভালো লাগত না বলেই তাতে এক অন্যরকমের স্বাদ অনুভব করতাম। কফি হাউসের সিঁড়ি বেয়ে চ্যাটার্জি এন্ড কোম্পানির বইয়ের ওপেন স্টলে গিয়ে অনেকক্ষণ কাটাতাম। অত বই চোখের সামনে দেখে মনের ভিতর একটা অদ্ভুত শিহরণ জাগত। নানান বইয়ের স্পর্শে হয়ে উঠতাম আবেগপ্রবণ। একবার একটা বইয়ের খুব প্রয়োজন হয়েছিল। কেনার মতো পয়সা নেই। লুকিয়ে লুকিয়ে পকেটে থাকা একটি কাগজে লিখে নেবার চেষ্টা করছিলাম কিছুটা অংশ। সিকিউরিটি গার্ড ধরল। ভাবল অন্য কোন মতলবে আমি আছি। দোকান থেকে ধমক দিয়ে বের করে দিল। দে’জ পাবলিশিং হাউসের বাইরের দিকের দেওয়ালে সাঁটা নতুন বইয়ের পোস্টারগুলো দেখে খুব আনন্দ পেতাম। হিন্দু স্কুল, সংস্কৃত কলেজ, হেয়ার স্কুল, ইডেন হিন্দু হোস্টেল, প্রেসিডেন্সি কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বইপাড়াকে আগলে রাখতো সব সময়। আগলে রাখতো আমাদের স্বপ্নগুলোকে।

ভোররাতের কলেজস্ট্রিট একেবারেই অন্যরকম। বহুবার হোস্টেল থেকে কৃষ্ণনগরের ফার্স্ট ট্রেন ধরতে শিয়ালদা স্টেশন পর্যন্ত হেঁটে গিয়েছি। পুরো বিধানসরণি জুড়ে থাকতো ডাবের স্তূপ, আর আখ। কলকাতা শহরের বিভিন্ন প্রান্তে তা পৌঁছে যেত সকাল সকাল। ব্যস্ত কলেজস্ট্রিটের রূপটা তখন যেন পুরনো দিনের সাদাকালো ছবি। কলকাতার রাস্তা আসলে কখনোই ঘুমোয় না। ভোররাতে স্তব্ধ বইপাড়ার মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে কখন যে আরো বড় হয়ে গেলাম জানতেই পারলাম না। শহর কলকাতা ছেড়ে গ্রামের স্কুলে চাকরি নেওয়া। পত্রিকা আজও প্রকাশ পায়। আজও বইপাড়া থেকে বই এসে পৌঁছায় আমার কাছে। পাতা ওল্টায়,নতুন গন্ধ শুকতে থাকি। চোখের সামনে ভেসে ওঠে কলেজবেলা। পাল্টায়নি কোনকিছুই। চলমান বইপাড়া আজও অক্ষর বুনে চলে, লিখে চলে অতীত-বর্তমান ভবিষ্যতের কত কাহিনি।
কৃতজ্ঞতা : ‘বনামি’ সাহিত্য পত্রিকা, সম্পাদক : দিলীপ মজুমদার
অমৃতাভ দে, সম্পাদক : জীবনকুচি
খুব সুন্দর লেখা।চোখের সামনে যেন জীবন্ত হয়ে উঠল।।।।
বেশ সুন্দর লাগলো, নিজের জীবনের গল্পে নিজের কলেজ জীবনের থেকে বড় বেলা।
অদ্ভুত একটা ভালো লাগা। যেন টুকরো টুকরো স্মৃতি। টুকরো টুকরো ছবি৷। চেনা৷। তবু কেউ চিনিয়ে দিলে মন কেমন করে ওঠে। সেই চিনিয়ে দেবার কাজটা করেছে অমৃতাভ দে। ধন্যবাদ তো দিতেই হয়।
একটা অদ্ভুত ভালো লাগা। চেনা স্মৃতি। চেনা ছবি। তবু নতুন করে চিনিয়ে দিলে অদ্ভুত রোমান্টিক লাগে। মনে হয়,বারবার দেখি, ছবির উপর হাত বোলাই, গন্ধ নিই। তারপর ব্যোম হয়ে বসে থাকি, গাঁজারুর মত। লেখককে অনেক ধন্যবাদ।
খুব সুন্দর লাগলো। তোমার কলেজ জীবনের স্মৃতি যেন আমার দুচোখে বাস্তব হয়ে উঠল।
খুব ভাল লাগল লেখাটা অমৃতাভদা