বড় বিস্ময় জাগে সাধারণের, বড় বিস্ময় লাগে ঐতিহাসিকদেরও। অগ্নিযুগের ফায়ারব্র্যান্ড বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষ কিভাবে যোগী শ্রী অরবিন্দে পরিণত হলেন। অনেকে এটাকে পরিহাসে লঘু করে বলেছেন ‘বোম থেকে ওম’। অরবিন্দর বিখ্যাত উত্তরপাড়া অভিভাষণ (১৯০৯), সেখানে তিনি বলছেন — সনাতন ধর্মই জাতীয়তাবাদ। সমস্যার জন্ম এখানেই। কেউ কেউ বলেছিলেন, অরবিন্দর জাতীয়তাবাদ রাজনীতিচিন্তা রবীন্দ্রনাথ, গান্ধীর মতো উদার হতে পারেনি। নিরপেক্ষ ইতিহাসবিদ বলবেন, অরবিন্দর সনাতন ধর্ম হল আবহমান মানুষের ধর্ম। এর কোনও সীমানা সীমান্ত নেই, ভেদ অভেদ নেই। এ ধর্ম হল এক ‘ইউনিভার্সাল রিলিজিয়ন হুইচ এমব্রেসেস অল আদার্স’। অরবিন্দর সনাতন ধর্মে রয়েছে এক সার্বভৌমত্বের সন্ধান। অরবিন্দ বলেছিলেন — যে ধর্ম সংকীর্ণ, সাম্প্রদায়িক, অনুদার তা কখনও বিশ্বজনীন হতে পারে না, সনাতনও হতে পারে না।
পুদুচেরী কথাটির অর্থ হল ‘New Settlement’। ভারতের দক্ষিণ পূর্ব উপকূলে অবস্থিত এই শহরের প্রাচীন কাল থেকে কোনও নথিভুক্ত ইতিহাস নেই। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে ডাচ, পর্তুগীজ, ইংরেজ ও ফরাসিদের মত ঔপনিবেশিক শক্তির আবির্ভাবের পরেই পুদুচেরীর ইতিহাস লিপিবদ্ধ হয়েছে। শ্রী অরবিন্দের ভিতরে ভাঙাগড়া শুরু হয়েছিল আলিপুর বোমা মামলায় (১৯০৯) জেলে থাকাকালীন। অন্তর থেকে কিছু ডাক অনুভব করছিলেন তিনি। নতুন কিছু পথের সন্ধান। এছাড়া ইংরেজদের হাত থেকে পুরোপুরি মুক্তি পেতে বেছে নিলেন এই ‘New Settlement’ পুদুচেরী বা পন্ডিচেরী।
যে অরবিন্দ আলিপুর বোমা মামলার রায় প্রকাশের পরও লর্ড মিন্টোর মতে ছিলেন ‘দ্য মোস্ট ডেঞ্জারাস ম্যান উই হ্যাভ টু ডিল উইথ’, সেই অগ্নিপুরুষ যখন ‘যোগী’ বা ‘ঋষি’ তে পরিণত হন তখন তাঁর এই যাত্রাকে অনেকেই ‘পরিকল্পিত পলায়ন’ ভেবে নিয়েছেন। অনেকের কাছে উনি ব্রিটিশ সরকারের ‘কোলাবোরেটর’। আবার অনেকের কাছে ওঁর এই যাত্রা বা উত্তরণ বোধগম্য হয় নি, এ যেন এক আত্মকেন্দ্রিক একলা উত্তরণ। এইটা অনেকেই বুঝতে চাননি বা বোঝেন নি যে অরবিন্দ ঘোষ এবং শ্রী অরবিন্দ একই ব্যক্তি, কোনো খন্ডিত বা বিভাজিত ব্যক্তি নন। বাইরে পরিবর্তন এলেও তাঁর অন্তর্জীবনে ছেদ ছিল না, এক অখন্ড চেতনাতরঙ্গ বয়ে যেত। তিনি যখন দেশের স্বাধীনতার চিন্তা করেছেন তখন যে আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন সেটা ছিল বৈপ্লবিক। আবার তাঁর রচিত, তাঁর ভাবিত পূর্ণযোগ বা দিব্যচেতনা রহস্যাবৃত, জটিল আধ্যাত্মবাদ নয়। মানবজীবনকে এক বৃহত্তর মননের সঙ্গে যুক্ত করার এক বৈপ্লবিক প্রয়াস। সুতরাং আগেও তিনি ছিলেন বিপ্লবী, আবার ভারতীয় দর্শনমার্গে তাঁর যোগ-দর্শন, সেখানেও তিনি বৈপ্লবিক।
জাতীয়তাবাদের লগ্নে যখন সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় রাণী ভিক্টোরিয়াকে বলছেন ‘আমাদের মাতা’, সেই সময়ে দাঁড়িয়ে অরবিন্দ ঘোষ বলেছেন, ‘ইংরেজদের কাছ থেকে আমরা কী করে প্রত্যাশা করছি যে, ওরা আমাদের হিতকারী হবে! ওরা তো এসেছে শাসন করতে, শোষণ করতে, বণিকসুলভ মনোভাব তাড়িত হয়েই।’ অরবিন্দর কথা ছিল — ঔপনিবেশিক আবহ যে আত্মকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে তাকে পুনর্গঠন করা। অরবিন্দ লিখেছেন — আমাদের শত্রু আমাদের শরীরের বাইরে নেই, আছে ভিতরেই। আমাদের কাপুরুষতা, স্বার্থপরতা, দ্বিচারিতা, আমাদের প্রায়ান্ধ আবেগবিহ্বলতা। এই কারণেই অরোভিলের প্রতিষ্ঠাও খুব নিরুপদ্রবে ঘটেনি। পঞ্চাশের দশকে এই আশ্রমের বিরুদ্ধে ভারতের সনাতন ধর্মের কিছু প্রতিনিধি মামলা দায়ের করেছিলেন। লোয়ার কোর্ট, হাইকোর্ট হয়ে সেই মামলা শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টে যায়। সুপ্রিম কোর্ট তখন আদেশ দেন — “This is not a religion, this is a symbol of humanity.”।
অরবিন্দ ছিলেন অনেকের আগে। তিনিই সম্ভবত প্রথম ভারতীয় যিনি ১৮৯৩ সালে মাত্র একুশ বছর বয়সে ‘প্রোলেতারিয়েত’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। যখন এ দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক সংস্কৃতিতে এই শব্দের কোনো পরিচিতিই ছিল না। ‘প্রোলেতারিয়েত’ অরবিন্দ ঘোষের মতে ‘দ্য গ্রেট মাস অফ দ্য পিপল’, যাদের কথা সকলে বললেও কেউ তাদের নিয়ে ভাবেন না। এই সাধারণ মানুষের মধ্যেই অরবিন্দ দেখেছেন ভবিষ্যতের আশা। তারাই ‘দ্য রিয়েল কী অব দ্য সিচুয়েশন’। মাত্র বাইশ বছরে অরবিন্দ প্রোলেতারিয়েতদের মধ্যে নিহিত ক্ষমতা ও সম্ভাবনা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। যিনি এই শক্তিকে বের করে আনতে সক্ষম তিনিই তো হয়ে উঠবেন ‘দ্য মাস্টার অব দ্য ফিউচার’।
আইসিএস ত্যাগ করে আসা রাজনারায়ণ বসুর দৌহিত্র অরবিন্দ ঘোষ ছিলেন একাধারে উজ্জ্বল ছাত্র ও কবি। পেশায় ছিলেন সয়াজিরাও গায়কোয়াড় শাসিত বরোদা রাজ্যের রাজস্ব দফতরের কর্মী। চিরকালই তিনি ধীর স্থির। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতা তাঁকে বিচলিত করে তোলে। ভারতের জাতীয় কংগ্রেস ততদিনে আট বছরের। চোদ্দ বছর ইংল্যান্ডে থেকেও অরবিন্দ বুঝেছিলেন কংগ্রেস মূলত গুটিকয়েক অভিজাত ভারতীয় ও তাঁদের ব্রিটিশ সহযোগীদের দল। যাঁরা প্রার্থনা আর প্রস্তাব ছাড়া আর কিছু করবেন না। অরবিন্দ উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন গান্ধীর অহিংস নীতি নিয়ে। বলেছিলেন, “গান্ধী কি করছেন? অহিংসা পরম ধর্ম, Jainism, হরতাল, passive resistance ইত্যাদির খিচুড়ি করে সত্যাগ্রহ বলে একরকম Indianised Tolstoyism দেশে আনছেন।” গান্ধীর অহিংসা কখনই হিংসাত্মক হয় না, কিন্তু অরবিন্দ একটি জানলা খোলা রেখেছিলেন সহিংস প্রতিবাদের। এখানেই তাঁর স্বাতন্ত্র্য।
রবীন্দ্রনাথের কাছে তাই তিনি একাধারে ‘রুদ্রদূত’ আবার অন্যদিকে ‘স্বদেশ আত্মার বাণীমূর্তি’। ব্রিটিশ অধীন স্বায়ত্তশাসন নয়, অরবিন্দ ঘোষ চেয়েছিলেন পূর্ণ স্বাধীনতা। ধর্ম্ম পত্রিকায় ১৯০৯ সালে তিনি লিখেছিলেন, “আমরা সম্পূর্ণ স্বাধীনতা চাই। বিদেশীর আদেশ ও বন্ধন হইতে সম্পূর্ণ মুক্তি, স্বগৃহে প্রজার সম্পূর্ণ আধিপত্য, ইহাই আমাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য।” তিনি বলেছিলেন, “আমাদের সভ্যতা হয়ে গেছে অচলায়তন, ধর্ম্ম বাহ্যের গোঁড়ামি। অধ্যাত্মবাদ একটি ক্ষীণ আলোক। এই অবস্থা যতদিন থাকিবে, ভারতের স্থায়ী পুনরুত্থান অসম্ভব।”
১৯০৯ এর বক্তব্য আজ ২০২৫ এর ১৫ই আগষ্টে তাঁর ১৫৪-তম জন্মদিনে এসেও সমান প্রাসঙ্গিক। তাঁর ভাবনা তাঁর চিন্তা সবই ছিল যুগের থেকে অনেক এগিয়ে। তাই হয়ত অন্তরে অন্যরকম আহ্বান শুনতে পাচ্ছিলেন। অগ্নিযুগের অগ্নিময় পুরুষ অন্যপথে মানবের উন্নতিকল্পে নিজেকে নিয়োগ করেন। ১৯১০ এর ৪ঠা এপ্রিল তাই পুদুচেরী গমন। New Settlement এ এসে অরবিন্দ পরিণত হলেন ঋষি অরবিন্দতে। বোম থেকে ওম যাত্রা সুসম্পন্ন হল অবশেষে।
Commendable. সমৃদ্ধ হলাম