বাউল কথাটা থেকে থেকেই অনেক কিছুর আগে উড়ে এসে জুড়ে বসে। বাউল তত্ত্ব ও ভাবনায় উদাস হওয়ার মত কোন জায়গাই নেই। তবুও জ্ঞান হওয়ার প্রায় পর থেকেই শুনে আসছি ‘উদাস বাউল’। তারপর আছে ‘বিবাগী বাউল’। একদা সিনেমা, থিয়েটার, যাত্রায় যার কাজই হয়ে দাঁড়িয়েছিল হঠাৎ করে ‘ভোলা মন’ ডাক ছেড়ে কিছু না কিছু গেয়ে ওঠা। এরপর বাংলা ব্যান্ডের কল্যাণে আমরা পেয়েছি বড় চুল, কানে দুল, হাতে বালা, গলে মালা পরা ডিজাইনার বাউল। ঝুলিতে থাকা ‘হৃদ মাঝারে রাখবো’ থেকে ‘মিলন হবে কত দিনে’ জাতীয় ডজন খানেক তালের গান দিয়ে যারা তছনছ করে দিচ্ছেন আপনার, আমার প্রাণ ও কানের আরাম।

এসব জিনিস চলে, জনপ্রিয়তা পায় তার কারণ মানুষ বাউল গান শুনতে ভালোবাসে। তাদের ভাবনা ও জীবনযাপন সম্পর্কেও মানুষের বেশ আগ্রহ রয়েছে। সমস্যা হল, ভালো বাউল গান শোনার জায়গা কম, আরও কম নিজের মাঝে ঈশ্বরকে খোঁজার মত গভীর কথা যারা বলেন তাদের সঙ্গে মেশার সুযোগ। একটা লম্বা টান দিয়ে যে মানুষটি আপনার চোখ কপালে তুলে দিল, সে কিন্তু গানটির ভাবনার বিন্দু বিসর্গও জানেনা। কেউ বলতেই পারেন যে গভীর নির্জন পথ ধরে বাউলরা হাঁটেন, তাদের কি আপনাকে নিজেদের ভাবনার কথা বলার কোন দায় আছে? এর একটিই উত্তর, না নেই। কিন্তু আপনার জানার প্রয়োজন রয়েছে কারণ, সে কথা জানলে আপনার বাঁচাটা হয়ে উঠতে পারে আরও আনন্দময়, আরও অর্থবহ।

কেউ হয়তো অনেক সময় ভেবেছেন, যদি এমন একটা পরিসর থাকতো যেখানে দু’দণ্ড কাটিয়ে বাউলসঙ্গ করা যেত; নিজে মত করে শোনা যেত তাদের গান; জেনে নেওয়া যেত গানটির মূল ভাবনা, পরিচিত হওয়া যেত তাদের জীবনধারার সঙ্গে – তাহলে কী ভালোই না হতো! বননবগ্রাম বাউল আশ্রম হল, আপনার সেই ইচ্ছাপূরণের জায়গা। অতিমারির দম আটকানো গন্ডি পেরিয়ে একটু হাঁফ ছাড়তে হলে আপনাকে এখানে আসতেই হবে। বর্ধমানের আউশগ্রাম বনাঞ্চলের পাশেই এই আশ্রম যেন আতঙ্ক আর লাগাতার মৃত্যুর খবরে বিধ্বস্ত মানুষের জীবনে একটা টাটকা বাতাস।

এখানে একসঙ্গে মিলেছে বেড়ানো, বাউল গান এবং নিরিবিলিতে নিজের মত করে একটু জিরিয়ে নেওয়া। কোন হাঁকডাক না করেই তা আপনার মনের দখল নেবে। এই অবস্থায় কোথায় যাবো বলে যারা প্রবল চিন্তায় পড়েছেন তাদের বলি, বননবগ্রাম চলুন। কোভিড সময়ে বেড়ানোর এ এক আদর্শ জায়গা। ভ্রমণে আমরা প্রকৃতি দেখি, দেখি ইতিহাস, পরিচিত হই সংস্কৃতির সঙ্গে। কিন্তু কোন জায়গাতেই কি আপনার সঙ্গে নিজের দেখা হয়? বননবগ্রাম হল সেই নিজের সঙ্গে দেখা করার জায়গা। বাউল সঙ্গ, বাউল গান, উদার প্রকৃতি, শান্ত জীবন আপনাকে সেই সুযোগ করে দেবে।

বননবগ্রাম যেন ১.১৩ একর জমি জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এক আলাদা জীবনধারা। উন্মুক্ত প্রকৃতি, জলাশয়, আখড়ায় বাউল গান, বাউল সঙ্গ, জৈব চাষ, বাহুল্য বর্জিত জীবন সব মিলিয়ে এ যেন নিজের মত করে ক’দিন কাটানোর এক চমৎকার জায়গা। এই ভাবনার রূপকার, বাংলা নাটক ডট কম। সংস্থার কর্ণধার অমিতাভ ভট্টাচার্য জানালেন, “বাউল দর্শন হল, সহজ, সরল জীবনযাপন ও একসঙ্গে মিলেমিশে থাকার একটা পথ। এখানে এলে মানুষ তার খোঁজ পাবেন। শুধু গান নয়, এখানে নানা ধারার বাউল গানের মূল ভাবনা ও দর্শন নিয়ে চর্চা করেন বাউলরা। আগ্রহী অতিথিরা তাদের সঙ্গে যোগ দিতে পারেন। আগে বাউল গান ও চর্চা ছিল আখড়া ভিত্তিক। বননবগ্রাম সেটাকেই আবার ফিরিয়ে আনবে।”

বননবগ্রামে থাকার জন্য রয়েছে আধুনিক ব্যবস্থাসম্পন্ন কুটির। থাকা, খাওয়ার ব্যবস্থাও আয়ত্তের মধ্যে। আশ্রমে জৈব চাষ হয়, অতিথিরা ক্ষেতের ফসলই খাবেন। পানাগড় এবং শান্তিনিকেতন থেকে বন নবগ্রামের দূরত্ব ২৫ কিলোমিটার। বর্ধমানের গুশকরা থেকে দূরত্ব ১২ কিলোমিটার। কলকাতা এয়ারপোর্ট থেকে গাড়িতে আসতে সময় লাগে সাড়ে তিন ঘন্টা। কেউ ইচ্ছে করলে ভলভো বাসে বুদবুদ/পানাগড়ে আসতে পারেন। সেখান থেকে বননবগ্রামে যাওয়ার ব্যবস্থা আছে। যদি কেউ দিল্লি থেকে আসতে চান, তাহলে অন্ডাল এয়ারপোর্টে নামতে পারেন। ২৫ ডিসেম্বর থেকে খুলে গেছে এই আশ্রমের দরজা। বাংলায় নতুন পর্যটনের বার্তা নিয়ে বননবগ্রাম বাউল আশ্রম অপেক্ষা করছে আপনার জন্য। এখানে এলে নিজের সঙ্গে দেখা হবে আপনার।
কেউ যেতে চাইলে যোগাযোগঃ toureast@banglanatak.com কিংবা 8420106396 এই নাম্বারেও ফোন করতে পারেন।
ছবি : কিশোর মন্ডল
তোমার অতি সুখপাঠ্য লেখাটি পড়ে মন ছুটে যেতে চাইছে বননবগ্রামে। ইচ্ছে রইলো যাবার।