আরামবাগের বনমালীপুরে বিদ্যাসাগরের পূর্বপুরুষদের ভিটেটা এখনো টিকে আছে। পরিবারের উত্তর পুরুষরাও আছেন। কিন্তু স্মৃতিবিজড়িত সেই ঘর আর নেই। সেখানে বসানো হয়েছে আবক্ষ মূর্তি। এ পযর্ন্তই। কালের করাল গ্রাসে আজ সবই শেষ। সংরক্ষণ বা সংস্কার না করায় সবই ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছে। লোহার বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে মূর্তিটিকে।মাথায় ঝোলানো আছে একটি ইলেকট্রিক ল্যাম্প। এখানেই শেষ। শ্রদ্ধা অর্পণ কেবল ২৬ সেপ্টেম্বর। এভাবেই বিদ্যাসাগরকে মনে রেখেছে বনমালীপুরের গ্রামের বাসিন্দারা।
প্রসঙ্গত, এখানকার বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারকে সকলেই এক ডাকে চেনেন। কারণ একটাই। এই বংশেই জন্মেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। যদিও তিনি জন্মগ্রহণ করেন মেদনীপুরের বীরসিংহ গ্রামে। কিন্তু বিদ্যাসাগরের পূর্বপুরুষরা কাটিয়েছেন এই বনমালীপুর গ্রামেই। পিতা, পিতামহ ও প্রপিতামহ সকলেই এই গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। এখনো সেই বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার আছে। আছে চার ঘর। শান্তিতে বসবাসও করছে।
উল্লেখ্য, বিদ্যাসাগরের পিতা ঠাকুরদাস এখানকার বাড়িতে খুব অল্প দিনই ছিলেন। তবে পরে ছেলে ঈশ্বরচন্দ্রকে নিয়ে এখানে এসেছেন। বিদ্যাসগরও দেখেছেন এখানকার গ্রামের মানুষদের। দুঃস্থ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কম্বল বিতরণ করেছেন শিবু, শঙ্কর, তারাপদ দোলুইদের। জায়গাটিকে এখনও কম্বলতলা বলে অনেকেই ডাকেন। শিক্ষার আলো দেখাতে এখানে একটি বিদ্যালয়ও গড়েছিলেন তিনি। আজ সবই ইতিহাস। মানুষ বিদ্যাসাগরকে মনে রাখলেও তাঁর পিতার ভিটায় আজও পযর্ন্ত কোনও সরকারি বা বেসরকারিভাবে সংস্কার বা সংরক্ষণ করা হয়নি। ফলে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করে গড়ে তোলা আজও সম্ভব হয়নি।
ইতিহাসের পাতা ওলটালে দেখা যাবে বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের অনেক তথ্য ও স্মৃতি এখানে লুকিয়ে আছে। মানুষের মনে প্রশ্ন আসতেই পারে বিদ্যাসাগরের পূর্বপুরুষরা কেন বনমালীপুর ছেড়ে বীরসিংহ গ্রামে চলে গেলেন? কথিত, অনেক বদনাম নিয়েই তাঁরা চলে গিয়েছিলেন। বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার বংশপরম্পরায় বনমালীপুরের বাসিন্দা। এই বংশেরই একজন ধর্মনিষ্ঠ ও সৎ ব্রাহ্মণ ছিলেন ভুবনেশ্বর বিদ্যালঙ্কার। তাঁর পাঁচ ছেলে। নৃসিংহরাম, গঙ্গাধর, রামজয়, পঞ্চানন ও রামচরণ। সকলে একসঙ্গে বাস করতেন। কিন্তু নৃসিংহরাম ও গঙ্গাধর সংসারের সমস্ত কার্যভার গ্রহণ করেন। কিন্তু অতি সামান্য সামান্য বিষয় নিয়ে অশান্তি করতেন। এটা একেবারেই মেনে নিতে পারেননি বিদ্যাসাগরের পিতামহ রামজয়। তিনি নিতান্ত নিরুপায় হয়ে শেষে দুই ছেলে ঠাকুরদাস ও কালীদাস ও চার মেয়ে মঙ্গলা, কমলা, গোবিন্দমণি ও অন্নপূর্ণা এবং স্ত্রী দুর্গাদেবীকে রেখে সকলের অজ্ঞাতসারে দেশত্যাগ করলেন। দুর্গাদেবী সংসারের অশান্তি ভোগ না করতে পেরে শেষে তিতিবিরক্ত হয়ে দুই ছেলে ও চার মেয়েকে নিয়ে বীরসিংহ গ্রামে বাপের বাড়িতে চলে যান। বাবা ছিলেন এই গ্রামের একজন বিখ্যাত পণ্ডিত। নাম উমাপতি তর্কসিদ্ধান্ত। বাবার কাছেই রয়ে গেলেন দুর্গাদেবী। রামজয় তর্কভূষণ অবশ্য পরে বনমালীপুরে ফিরে আসেন। স্ত্রী দুর্গাদেবীকে দেখতে না পেয়ে খোঁজ করতে যান বীরসিংহে। দুর্গাদেবীকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইলে তিনি নারাজ হন।এরপর থেকে রামজয়ও সেখানে স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের সঙ্গে থেকে যান।
ঠাকুরদাস অবশ্য বনমালীপুরে ব্যাকরণ পাঠ শুরু করেন।এখানকারই এক পাঠশালায় পড়তে যেতেন। আবার তার পরিশ্রম। পরে বীরসিংহ গ্রামে আবার তাঁর পড়াশোনা। এখনো পারিবারিক ঐতিহ্যকে বজায় রেখে চলেছেন অশোক, অলোক, সমীর, প্রবীর বন্দ্যোপাধ্যায়েরা ঠাকুরদাস ও ভগবতীদেবীর উদার ও দৃঢ় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ছোঁয়ায় অণুপ্রাণিত হয়েই ছেলে বিদ্যাসাগর হতে পেরেছিলেন। আর তাই ভুলে যাননি বনমালীপুরের মাটির কথা। যখন উনিশ শতকের বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতি জীর্ণ সংস্কার লোকাচারের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়েছিল, তখনই এই তেজস্বী সংগামী মানুষটি সকল রকম কুসংস্কারকে মুক্ত করে সমাজকে নবজীবনের স্রোতধারায় চালনা করার কঠিন দায়িত্ব মাথায় তুলে নিয়েছিলেন। তাই ভুলতে পারেননি আরামবাগের কথা। এখানেও ছুটে এসেছিলেন। ভুলতে পারেননি বনমালীপুরের মাটির কথা। শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে ছিলেন। দুঃস্থদের পাশে থেকেছেন। অথচ সেইসব কথা আরামবাগের মানুষ ভুলতে বসেছেন। তাই বনমালীপুর আজ অবহেলিত।