মেলাপাগল বাঙালির বইমেলার ঘটা দেখে ভাবার কোনো কারণ নেই যে তার বইবিমুখ প্রকৃতি হঠাৎ করে বইপ্রেমীর সজীবতায় সবুজ হয়ে উঠেছে। এমনিতে বইমেলার বিস্তৃতি সারা রাজ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু তাই নয়, তার বাৎসরিক আয়োজন প্রয়োজনের গণ্ডিকেও অতিক্রম করে চলেছে। বাঙালির বছরভর উৎসবে তার চাহিদাও অগ্রসরগামী। শীতে মেলার মরশুমে অন্য মেলার চেয়ে তার প্রত্যাশা ক্রমশ চরৈবেতি। শুধু তাই নয়, তার ধারাবাহিক ভাবে স্থানভেদে মাস তিন-চারেক ধরে একাধিক দিন ব্যাপী যেভাবে একের পর এক আয়োজনের আড়ম্বর চলে, তা অনায়াসেই অন্যকোনো মেলার সঙ্গে অতুলনীয় হয়ে উঠেছে। শিক্ষাশোভন বাঙালিমানসে কল্যাণকামী পবিত্র চেতনায় বইমেলার পরশ আপনাতেই তীব্র আবেদনক্ষম। এজন্য তার লক্ষ্যের চেয়ে উপলক্ষের দিকে দৃষ্টি, মেলার চেয়ে বইয়ের চেতনা। তার কোনো তিথি বা বার নেই, সময়-অসময়ের বাদবিচার নেই, আছে শুধু বইকে কেন্দ্র করে উৎসবে মেতে ওঠা। তার উষ্ণতায় শীত তার পৌষের পরশ ছড়িয়ে দেয়, তার উত্তেজনা মাঘকেও হার মানায়। এই বইকে নিয়ে মেলার আয়োজনে রয়েছে মানসিক আভিজাত্যবোধ ও উৎকর্ষমুখর সংস্কৃতিচেতনা। এজন্য তার প্রয়োজন আয়োজনের মহার্ঘতায় চরৈবেতির মন্ত্র লাভ করেছে, তার আয়োজন প্রয়োজনকে আরও অমূল্য করে তুলেছে। অবশ্য বইয়ের উদার হাতছানিতে শুধু সর্বজনীন আবেদনই মূর্ত হয়ে ওঠে না, মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের বহুমুখী অস্তিত্বের প্রকাশ থেকে তার উন্নত জীবনের আলোও তাতে বিস্তার লাভ করে। শুধু তাই নয়, সেখানে ব্যর্থতার সোপানে সাফল্যের হাতছানি সবাকমূর্তিতে কথা বলে ওঠে। জীবনকে মননের নন্দনকাননে বিহারের আমন্ত্রণ জানাতে শুষ্ক বইয়ের নীরব ভাষার কোনো জুড়ি নেই। তার বুনিয়াদি চেতনাতেই রয়েছে জীবনবোধের মহার্ঘ আয়োজন। কীভাবে জীবনকে উপভোগ করতে হয়, তার সুলুকসন্ধানও তাতে মেলে। সেখানে অজ্ঞানতা দূর করাই শুধু নয়, নতুন পথের দিশা উন্মোচনের লক্ষ্যেও তার বনেদি ভূমিকা অনস্বীকার্য। মানবসভ্যতার ধারক-বাহক হিসাবে বইয়ের অবদান সত্যমুখর। সেখানে জীবনের আধারে বই যেমন সত্যপ্রকাশ, তেমনই সত্যসুন্দর। বইয়ের সেই সত্যকাম মূর্তিই জনমানসে প্রতিমায় নৈবেদ্য লাভ করে। বইয়ের প্রতি তীব্র শ্রদ্ধাবোধই বইমেলাকে আবেদনমুখর করে তুলেছে। স্বাভাবিকভাবেই এই বইমেলাকে কেন্দ্র করে বই-সংস্কৃতির বিস্তার ছিল সময়ের অপেক্ষামাত্র। সেদিক থেকে শুধু উৎসবপ্রাণ বাঙালিমানসে বইমেলায় শুধুমাত্র বইকেনার জন্য নয়, বইকে কেন্দ্র করে আবর্তিত মননদীপ্ত সাংস্কৃতিক আবহই তার সৌরভ বিস্তার করে চলেছে।
প্রয়োজনের বাইরেই সত্যের শ্রীবৃদ্ধি মনোহর মূর্তি লাভ করে। বইমেলায় বইয়ের ব্যবসা বা সাধারণ্যে বইয়ের বিস্তারের বাইরে তার বইসংস্কৃতির পরশ সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে। সেখানে আঞ্চলিক পরিসরে বইমেলা বইয়ের স্থানিক দূরত্বকে নাশ করার বিষয়টির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তার মানসিক দূরত্বে আলো প্রদানের সক্রিয়তায়। বইমেলা বাংলায় লেখালেখির অভিমুখটিই বদলে দিয়েছে। শ্রীরামচন্দ্রের শারদীয়া দুর্গাপুজোর মতো শীতের মরশুমে বইমেলা শুধু বইপ্রকাশে পূর্বের ১ বৈশাখকেই ম্লান করে দেয়নি, বইকে নিয়ে বাংলার সংস্কৃতিচেতনায় নবদিগন্তের সূচনা করেছে। সেখানে আঞ্চলিক পরিসরে বইমেলার দৌলতে লেখালেখির চর্চার মাধ্যমে আত্মপ্রকাশের গতিলাভ লক্ষণীয়। শুধু তাই নয়, প্রকাশের মুক্ত পরিসরে বহুমুখী বিস্তারে লেখক-পাঠক-প্রকাশকের ত্রিবেণীসঙ্গমে নির্মাণ ও সৃষ্টির পরশ শুধু উন্মাদনা জাগায় না, মননের মৌতাতে উজ্জীবিত করে তোলে। সেক্ষেত্রে আঞ্চলিক স্তরে তার আত্মবিশ্বাসে উৎসাহ ও প্রেরণায় বইমেলার বইসংস্কৃতির অনন্য ভূমিকা অনস্বীকার্য। রত্নাকর সমুদ্র থেকে মণিমুক্তো মেলে ঠিকই, কিন্তু যতক্ষণ তা অলঙ্কারে পরিণত না হয়, ততক্ষণ তার রূপমাধুর্য সম্পদে পরিণত হয় না। আর তা করে অলঙ্কারপ্রণেতারা। মানসসাগর থেকে মণিমুক্ত তুলে তা লেখার মাধ্যমে অলঙ্কারে পরিণত করে লেখকেরা। আর তা বইআকারে প্রকাশ করে প্রকাশক। তার অন্তরালে যুক্ত থাকে অসংখ্য গুণী মানুষ। সেখানে বই আলো হয়ে ওঠে আর তার নীচে অন্ত্যজ অন্ধকারে বইশিল্পীরা আত্মগোপন করে। বইমেলার বইসংস্কৃতিতে পুরস্কার-সম্মান-সংবর্ধনার মাধ্যমে স্থানীয় গুণী লেখক ও শিল্পীদের উপেক্ষিত পরিসরে আলো প্রদান করা একান্ত প্রয়োজন। শুধু তাই নয়, বহুমুখী প্রতিভার প্রকাশে যেমন বইয়ের জুড়ি মেলা ভার, তেমনই স্থানীয় গুনীজনের সমাদরে বইসংস্কৃতির সক্রিয়তা আবশ্যক হয়ে ওঠে। সেদিক থেকে বইমেলার বইসংস্কৃতি উপেক্ষিত গুণী মানুষের সমাদরে আরও সুরভিত হয়ে উঠবে, তা বইয়ের সত্যসুন্দর মানসমূর্তিতেই প্রতীয়মান।
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।