বইমেলায় কোনও বিনোদনের জন্য আমি যাই না। তাই এ বারেও গিয়ে বেশ কয়েকটি বিস্ময়ের মুখোমুখি হলাম, যা বিনোদনের এলাকার বাইরে। বইমেলায় যখনই যাই আজও কেন যেন একটা সাম্যবাদের চেতনা মনে ঘুরে বেড়ায় অজান্তে। এত মানুষ বইকে ঘিরে বেঁচে আছে..এই বোধটা আমাকে নাড়ায় আজও। এরমধ্যেই কেউ এসে জানায় সে আমার লেখা ভালোবাসে, কেউ এসে ছবি তোলে, কোনও পরিচিত মাস্টারমশাইয়ের সাথে পুরোনো বইয়ের দোকানে দেখা হয়, কোনও স্টল বলে একশো টাকা পরে দিতে কিন্তু বইটা নিয়ে যেতে, কোনও সম্পাদক ফেরার পথে বাসেই দীর্ঘ আড্ডায় আহ্বান জানান ও বাস ভাড়া দিয়ে দেন ও বলেন-তিনি বয়সে বড় তাই তিনিই দেবেন ভাড়া, কোনও স্টল ততটা জমে ওঠে না কারণ প্রিয় সাহিত্যিক এবার প্রয়াত…
এইসব মুখ ও মুখের কোলাজ মিলেই হয়তো বইমেলা, যেখানে গেলে, বিনোদনের ল্যাংটো নাচগুলো পেরিয়েও হদিস পাই অনেকখন চুপ করে থাকা বিস্ময়ের… আজও… কোনও স্টলে কলেজে ফেলে আসা হারিয়ে যাওয়া মুখের অল্পবয়সী মেয়েটি জানান, দেবর্ষিদা, তুমি এখনও কলেজের উশকো চুলের খ্যাপা ছেলেটাই রয়ে গেলে..আমাদের স্টলে এসো কিন্তু প্লিজ…মুহূর্তে খুলে যায় আমার কলেজদিন, আমার শৈশব, বড়হওয়ার কলকাতার সমস্ত মুখ… স্মৃতির ভিড় ঠেলে আমি হাঁটতে থাকি…হাঁটতে হাঁটতে টের পাই, ভিড় দেখলেই আমি এড়িয়ে যেতে শিখেছি কেমন… টের পাই, আমার মাস্টারমশাই-সম্পাদক-পাঠক- বাকি রাখা বইয়ের দাম একশো টাকা আর জমে থাকা বাস ভাড়া নিয়ে আজও কি ভীষণ জেগে আছে আমার ব্যক্তিগত সাম্যবাদ, আমার গোপন বইমেলায়, একমাত্র…

দুই
বইমেলায় নতুন প্রজন্মের নতুন কোনও ভাষা খুঁজে পেলাম না। (যেমন গতকালই খবর পেলাম আবার একজন বড় পরিচালক মৃণাল সেনকে নিয়ে নস্টালজিয়ার ব্যবসায় মাতছেন ‘পালান’ নামের ছবি বানিয়ে। এরা সব কিছু শেষ করে দেবে। সব।) বইমেলায় নতুন প্রজন্ম গিটার বাজিয়ে গান করছে৷ তারা লিটল ম্যাগাজিন করছে ঠোঙা দিয়ে বানানো টুপি পরে। কিন্তু এ সবকিছুই বাঙালি আশির দশকে করত। তাকেই অনুসরণ করছে এরা। কন্টেন্টেও নতুন কিছুই নেই৷ এক ধরণের প্রতিবাদ আছে। কিন্তু সেটার সাথে ধারাবাহিক পড়াশোনার কোনও যোগাযোগ নেই। ২৪/২৫ বছরে বাবার বিরুদ্ধে বাঙালি এ ধরণের খিস্তিখাস্তা করে। তারপর চাকরি জুটিয়ে বিয়ে করে বাবার মতই আরেকটা লোক হয়ে ঝগড়াগুলো ভুলে যায়।
বলতে চাইছি, বইমেলাও নতুন কোনও কালচারাল আইডেনটিটিকে সাধারণভাবে এড্রেস করতে পারছে না। এটা খুবই চিন্তার। এরমধ্যে একদিন লিটল ম্যাগ কিনতে গিয়ে ভিড়ে আটকে পড়লাম। কারণ, সামনের রাস্তা পেরিয়ে বড় একটা মিছিল আসছে। বিজেপির রাজ্যসভাপতিকে ঘিরে কনভয়। কেন লিটল ম্যাগাজিনের পাশ দিয়েই এরা যাচ্ছে বুঝলাম না? কেনই বা, দুজন গরিব লোক আমাকে এসে বারবার বিজেপির অত্যন্ত ফালতু একটা পত্রিকা কিনতে বলছিলেন, তাও বোঝা গেল না। যেটা বুঝলাম, বাঙালি সস্তা পাপারাতজি হওয়াকে সম্মানের মনে করছে এখন। এককালে এর বিরুদ্ধেই বাঙালি লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন করত। বই লেখা হত ‘কৌরব ও পাপারাতজি’…সে সব বই আর ছাপা হয় না। লেখকও মারা গেছে। আউট অফ প্রিন্ট বই দু-একটা স্টলে খুঁজে পেলে, বুড়ো প্রকাশক (যিনি এককালে লিটল ম্যাগ আন্দোলনের কাউন্টার কালচার বিপ্লবী ছিলেন) ফোকলা হাসে। বলে, ‘কুড়ি টাকা তো খুচরো দিতে পারব না…!’
খুচরো জোগাড় করতে আবার ইউরিনালের পাশে এটিএম খুঁজতে যাই। একটা বাসের ভেতর এবারে এটিএম। খোঁজার পথে দেখা হয় পুরোনো কলেজের বন্ধু, পুরোনো সম্পাদকদের সাথে। দেখি বইমেলাজুড়ে সেলিব্রিটিরা নিজেদের সুনীল গাঙ্গুলি, বুদ্ধদেব গুহ ভেবে লেখক সেজে পাঠকদের সই দিচ্ছে। দেরি হয়ে যায়৷ রাত আটটা বেজে যায়। গিয়ে দেখি এটিএম গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে। আমার টাকা তোলা হয় না।
একটা মরচে পড়া, সেকেলে কালচারের সাথে একটা ফ্রেশ প্রজন্মের এভাবেই বারবার ধাক্কা লাগে। তারপর হয় প্রজন্মটা পুড়ে যায় বা ওই কালচারটা উড়ে যায়…কিছু একটা হয়..তারপর, হয়তো, আপডেটেড লেখালেখি বা সিনেমার ভাষা খুঁজে পায় সভ্যতা। এটাই নিয়ম।
তিন
দু-বছর প্যান্ডেমিকের পরের বইমেলা কতগুলো ধারণা স্পষ্ট করে দিল। এক, নতুন প্রজন্ম (পোস্ট-মিলেনিয়াল) ভাষার অস্তিত্ব আর এই মেলায় পাওয়া যাবে না। তা খুঁজতে ডিজিটাল দুনিয়াই একমাত্র ভরসা৷ এখানে নব্বই পর্যন্ত ভাষার অস্তিত্ব সবচেয়ে বেশি। দুই, দু বছর কোথাও যেতে পারেনি বলেই অধিকাংশ মানুষ এখানে এসে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দু সপ্তাহের পুজো বা সরস্বতী পুজো হলেও এরা এভাবেই ঘুরে বেড়াত। জাস্ট কোনও উদ্দেশ্য নেই তাই মেলায় ঘুরতে আসছে বেশিরভাগ মানুষ। তিন, আরেকদল বই কিনছে কিন্তু এরা মূলত কিনছে নস্টালজিয়া। যে সংস্কৃতি চর্চা সমকালের সাথে কানেক্ট করায়, সমকালকে ডিস্টার্ব করে ও নিজেও ডিস্টার্ব হয় তার সাথে এই চর্চার কোনও যোগ নেই। ‘জানো তো ময়দানের মেলা কি সুন্দর ছিল’ লাইনের নস্টালজিয়া চর্চার বদলে এরা বইমেলায় এসে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মাঝে মাঝে মেয়ে দেখছে, খাচ্ছেদাচ্ছে, তারপর বাড়ি ফিরে বইমেলা ঘিরে পোস্ট দিচ্ছে।

বইমেলা বলতেই এখন সেন্ট্রাল পার্কের ওই লেকটা মনে পড়ে, যা সন্ধ্যা হলেই রহস্যময়ী হয়ে ওঠে। যেন একটা কালো বিপুলাকায় সাপ শুয়ে জিভ লকলক করছে। আর, তার সারা শরীর দিয়ে পিলপিল করে হেঁটে যাচ্ছে কালো কালো মাথার মানুষ। জ্যান্ত মায়াবাস্তবতা।
সাপটা শুধু দু সপ্তাহ শুয়ে থেকেই কোটি টাকার ব্যবসা করে। তারপর শীতঘুমে চলে যায়…
চার
বাবা-মা’র সাথে বইমেলা গেলাম একদিন। সবার মতই আমারও ছোটবেলা থেকেই বাবা-মা’র সাথে একবার মেলা আসা হবেই। মা-বাবা’দের বয়স বেড়ে যায়। তাই বেশি হাঁটতে পারেন না তাঁরা। আর, আমরা মেলা পেরোতে পেরোতে ক্রমেই বড় হয়ে উঠি। তারপর বসন্তের হাওয়া দেয়। ধুলো ওড়ে কিছু। সে সব ধুলো পেরিয়ে দেখতে পাই, আমার বেশ কিছু প্রকাশনা থেকে বেরনো বইয়ের স্টলগুলোয় মা-বাবা’কে আমি নিয়ে যাচ্ছি। যেমন তাঁরা আমাকে নিয়ে যেতেন ছোটবেলায় স্টল চিনে চিনে। সাহিত্য সংসদ থেকে কেনা হত তারপর যোগীন্দ্রনাথ সরকার, অনুষ্টুপ থেকে কেনা হত নাজিম হিকমত…তেমনই, প্রবীণ মা-বাবাকে রাস্তা দেখিয়ে বড়বেলায় আমি নিয়ে চলেছি দে’জ থেকে লিটল ম্যাগাজিন। একে একে তাঁদের হাতে তুলে দিচ্ছি আমার লেখা বইগুলো। ওদের বিস্ময় লক্ষ্য করছি চোখেমুখে। এ বিস্ময় অজান্তে মানুষের মুখে ফুটে ওঠে, বুদবুদের মত, ছুঁলেই ফেটে যায়! জীবনের হাজার কাঠিবাজি আর রাজনীতি আর মারামারি পেরিয়েও সন্তানকে বাস চাপা দিতে পারল না তা হলে! সে বইমেলা পেরোতে পেরোতে আজ দশজনের চেনা, সে বড় হয়ে গেছে… এবারে তাঁকে আর কেউ হারাতে পারবে না তাহলে…
মা-বাবা এসব কথা বলেননি। ওঁরা তো বলেন না। সন্তানরা টের পায়। পায়ে ব্যথা নিয়ে মা হাঁটতে থাকেন মেলায়। বাবা হাঁটতে হাঁটতেই ওষুধ খেয়ে নেন। ছোটবেলার মতই আমরা পেরিয়ে যাই অনুষ্টুপ, আজকাল, রুপা… স্কুল, কলেজের বন্ধুদের সাথে পথেপথে দেখা হতে থাকে…কাউকে মা শেষ স্কুলে দেখেছিল আজ সে রীতিমত প্রকাশনা সামলাচ্ছে, কাউকে দেখেছিল কলেজে..সে তাঁর লেখা বই বাড়িয়ে দেয়,… কেউ আমাকে দূর থেকে ডাকে, ‘দেবর্ষিদা, তোমার বইটা দেখলাম..দারুণ…’ আমি বাবা-মা’কে তারপর নিয়ে যাই সেই স্টলে, বইখুলে দেখাই আমার লেখা… ওরা দেখে… হাত দেয় আমার নামের ছাপা শব্দে… মুখে কিছু বলে না…আমি আবারও লক্ষ্য করি দুটো বয়স্ক ক্লান্ত চোখের বিস্ময়… আনন্দ… মনে হয়, এরচেয়ে জীবনে বড় উপহার আর কি!
আজকের পচে যাওয়া বইমেলাটা আসলে একটা ডিজেল ভেসে থাকা সমুদ্র…যার পেটে এখনও একটা স্মৃতির টাইটানিক এভাবেই ডুবে আছে… মাঝে মাঝে তার নাগাল পাওয়া যায়, বোঝা যায়, স্কুল-কলেজের বন্ধুরা-আমাদের বড় হওয়ার মুখগুলো-আমার লেখা সমস্ত শব্দরা কেউ কোথাও হারায়নি… সবাই এই টাইটানিকে ঘুমিয়ে আছে আজও… সন্তান বড় হয়ে মা-বাবাকে রূপোকাঠির ছোঁয়াও সব্বাইকে আরেকবার ফিরিয়ে এনে উপহার দিতে পারে আচমকা বইমেলায়…স্মৃতির বইমেলায়…

মা-বাবাকে অনেকেই বড় বড় উপহার দেন। কিন্তু আমি এভাবেই একটা ব্যক্তিগত সাম্যবাদ উপহার দিলাম তাঁদের। আমার স্মৃতির টাইটানিক। বসন্তের হাওয়ায়, মা-বাবার মনকেমন করে উঠল। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করেছিল ওরা। মা’র পায়ে ব্যথা করেনি আর। বাবা-ও আড়ালে নাজিম হিকমতের কবিতা বলছিল… জেলখানায় লেখা…
বইমেলায় এখন টাকা থাকলেই ইনফ্লুয়েশিয়াল লোকেরা বই প্রকাশ করে। সবাই ‘লেখক’। সব্বাই। তারমাঝে এই সামান্য পারিবারিক রূপকথার গল্প টুপ করে ঝরে পড়ল তবু! মনে পড়ল, আমার প্রথম লেখা বই। সেও তো বন্ধুদেরই বই ছিল এক রকম। হাতে হাতে ছড়িয়ে ছিল সে বই… এভাবেই আমার থেকে সবার হয়ে গেছিল শব্দেরা… আমি বুঝেছিলাম, আমি বড় হয়ে যাচ্ছি… আমার স্বপ্নেরা বড় হয়ে যাচ্ছে… বাবাকে আর মাধ্যমিক পরীক্ষার দিন আমাকে নিয়ে যেতে হবে না, বলতে হবে না-এডমিট কার্ড এনেছো?… আমি এখন নিজেই জীবনের বাকি লড়াইটা লড়ে নিতে পারব… নতুন বইয়ের গন্ধের মতই এই বিস্ময়!
এরইমাঝে খবর পেলাম, আমাদের শহরের নবতিপর মেধাবী প্রবীণ শ্যামলকুমার গঙ্গোপাধ্যায়কে দান্তে-র অনুবাদ আবারও স্বীকৃতি পেয়েছে ইতালিতে। এর আগেও বারবার তিনি আন্তর্জাতিক নানা পুরস্কার পেয়েছেন তাঁর এসব অনুবাদের জন্য। তিনি রবিঠাকুরকে দেখেছেন, নবারুণকেও। কিন্তু তাঁকে নিয়ে কেউই বিশেষ লেখেননি কাগজে বাংলায়… কেনই বা লিখবেন… তবু, শ্যামলবাবুর এই খবরটা পেতেই আমার স্মৃতির টাইটানিকটা আবারও কেন জানি, দুলে উঠল… কোথাও যেন মা-বাবা’র সাথে বইমেলা-আমার প্রথম বই প্রকাশ আর শ্যামলবাবু কানেক্টেড… কোন সূত্রে? ঠিক জানি না… সব জানতে নেই… এখেকটা দিন এভাবেই ধীরে ধীরে এসে শুধু বলে যায়, আমরা কেউ আলাদা নই…রোজ দেখা না গেলেও আমরা সবাই কোথাও না কোথাও যুক্ত… আমরা এভাবেই বেঁচে নিতে পারব..বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয় আবারো, রাশিয়া যতই বোমা মারুক, সেখান থেকেই তো বিশ্বমানবতা শুনেছি আমরা… বাঙালিরা… প্রজন্মের পর প্রজন্মে…
পাঁচ
বইমেলার বিরল ৩টে ঘটনা। বাউন্সারদের নিয়ে বইমেলা এসেছেন একজন লেখিকা, টাকা চুরি করতে গিয়ে বইমেলায় গ্রেপ্তার অভিনেত্রী আর প্রখ্যাত যুগল শোভন-বৈশাখীকে ঘিরে মেলায় চাঞ্চল্য। বইমেলা শেষের পর এই তিনটে ঘটনা নিয়ে মেতে আছে নেটপাড়া। ২০২২ এর বইমেলায় আনুমানিক বই বিক্রি হয়েছে ২৩ কোটি টাকার আর আনুমানিক ভিড় ৪৬ হাজার মানুষের৷ বেশিরভাগ বিক্রি হয়েছে থ্রিলার আর তন্ত্রের বই। নিন্দুকেরা বলেছেন, পরেরবার থেকে মেলার নাম রাখা হোক, আন্তর্জাতিক সেল্ফি মেলা…
বইমেলা শেষ হয়ে গেলে এখনও একটা ঘোর থেকে যায় ক’দিন…জ্বর ছাড়তে সময় লাগে…আগেও এমন হত… নতুন কেনা বই আর নতুন জমানো স্মৃতিগুলোর পাশে ঘুমোতাম আর ওম নিতাম… এখনও নি…উল্টে পাল্টে দেখি মাঝে মাঝে নতুন বইগুলোর কিছু কিছু পাতা, পড়ি, মগজে শব্দ তৈরি হয়…

বইমেলার যে ভিড় তার দশ শতাংশ বই-পড়ুয়াদের ভিড়। আর বাকিরা? বাকিরা, স্রেফ লোকসংখ্যা। তাঁদের মগজ বা মন নেই। পেট বুক মাথা আছে। এই ভিড়ই আজ ভোটের আগে টালিগঞ্জের অভিনেতাদের ছদ্মবেশে নির্লজ্জের মত বিজেপি হয়ে যেতে পারে, ভোটে হেরে এরাই আবার ‘অভিনয়ে’ ফিরেও আসতে পারে। জনপ্রিয় নেতা টাকা চুরি করেও হ্যাহ্যাহ্যাহ্যা করে ফেসবুক লাইভ করতে পারে। কোরাপশান আমাদের জন্মগত অধিকার, তুমি সেটা করতে পারছ না, সেটা তোমার সমস্য… একটা সময়ের যৌনাঙ্গে ‘বিনোদন’ শব্দটা লেপ্টে আছে, তুমি সেখানে টাকা না চুরি করে বইচোরকে খুঁজে নস্টালজিক হচ্ছ, সেটা তোমার সমস্যা…স্বয়ং রবি ঠাকুর যা পারেননি, এ মেলা তা পেরে গেছে, লেখিকার সাথে ৬জন বাউন্সার!!!… অথচ, বইমেলায় চিরকাল পাঠক আর লেখক মাখামাখি করবে সেটাই ছিল জায়েজ আর এখন-‘আমরা আপনার লেখা পড়ি, ভালোলাগে’ বললেই বাউন্সারের মাসেল তাড়া করছে, বলছে, ‘ফাক ইউ ভালোলাগা-ফাগা-হাগা… সর… হ্যাটহ্যাট… সরে যা… সর সর…’
বম্বের সেলেব কালচার আর কলকাতার বুদ্ধিজীবী সংস্কৃতির ভেদাভেদ একটা দক্ষিণপন্থী সময় খোঁজাটা মুর্খামি। আমি তা খুঁজছিও না। আমাদের শহর থেকে বাংলা মাধ্যম স্কুল উঠে গেছে বহুকাল। এ শহরে ঋত্বিক ঘটকের থেকে ঝুম্পা লাহিড়ি বেশি বিখ্যাত। ২০০ টাকা বেশি পেলে আজকের যৌবন বোম্বে ব্যাঙ্গালোর কেটে গিয়ে কলকাতাকে কলা দেখায়। তাই এ মেলায় ভিড়ের মাঝে প্রতুলদা গান গাইবেন বা সুবিমল মিশ্র লিটল ম্যাগে চুরুট খেয়ে দ্রোহপুরুষ হবেন-সে আশা করার মত গবেট আমি না। শঙখ ঘোষের স্মরণের মঞ্চে বসে আইস্ক্রিম খাবে ছোট কবি, মেনে নাও। মেনে নাও, যে নবারুণের রাগে এ মেলায় আর আগুন লাগবে না বরং এ মেলায় আগুন লাগাতে পারে তন্ত্র তন্ত্র তন্ত্র আর থ্রিলার থ্রিলার থ্রিলার… সময়টাই যখন কিলার! বেওসা হয়েছে কত? ২৩ কোটি। নবারুণ বা মিলান কুন্দেরা বেচে এক কোটিও উঠবে??
বুদ্ধিজীবিতা পরাজিত হলে মূর্খামিই পতাকা তোলে এভাবে। তাই হচ্ছে। যারা লেখক না, তারাই পয়সা আর পাওয়ার দিয়ে বইছাপিয়ে লেখক সেজে এ মেলার নকল বাঘ। তারাই মেয়েবাজি করছে আর ঘুরে বেড়াচ্ছে মেলায়। এরজন্যে দায়ী আমাদের বাবা-কাকারা। গত দুটো দশক বিপ্লবের নামে আর শিল্পের নামে খোলাবাজারকে তোল্লাই না দিলে, কতগুলো মিডিওকার জোকারের হাতে চলে যেত না এ শহর… এখন আর কিছু করার নেই… কিচ্ছু না… তবু, বইমেলা শেষ হলে মনখারাপ করে, কষ্ট হয়… পাশে নতুন কেনা বইগুলো এলোমেলো ফেলে ঘুমিয়ে থাকি মাঝরাতে… রবি ঠাকুর চুপি চুপি এসে বলে যান, রঙ যেন সন্ধ্যাদীপের আগায় লাগে আর মধ্যরাতের জাগায় লাগে…
একজন রবি ঠাকুরের ক্লোন এবারেও দেখলাম মেলায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ওঁকে সবাই চেনেন। ভদ্রলোক বিএসএনএলে চাকরি করতেন। এটিএমের লাইনে তাঁর সাথে কথা হচ্ছিল। বলছিলাম, এত বড় চুল-দাড়ি নিয়ে ঘোরেন?কষ্ট হয় না? বললেন, ‘আমাকে তো দেখতেই রবি ঠাকুরের মত… সেটা দিয়ে সামান্য আয় হয়..বাচ্চারা খুশি হয় আমাকে দেখে…বাঙালি ভাবে আসল নোবেলটা চুরি গেলেও, নকল রবি ঠাকুর অন্তত আমাদের মধ্যে চলেফিরে বেড়াচ্ছে… হাহাহা…’ বইমেলার এটিএম লাইন এগোতে থাকে। এগোন রবি ঠাকুর। আমিও তার পেছন পেছন এগোই। কিছুপরে গার্ড জানান, ‘সরি, সার্ভার ডাউন, লিংক নেই, টাকা তোলা যাবে না…’ নকল রবি ঠাকুরের সাথে ফেরার পথে হতাশ হয়ে বলেই ফেলি, ‘আসলে কি জানেন, আমাদের সময়ের সার্ভারটাই ডাউন… তাই কোনওকিছুরই আর লিংক পাওয়া যাচ্ছে না…’৷ ভদ্রলোক হেসে ওঠেন, ‘হাহাহাহা’… আর, তারপরেই তিন কলেজ তরুণী এসে ওঁকে বলে, ‘স্যার, আমরা আপনার সাথে একটা সেল্ফি…’ নকল রবি ঠাকুর সঙ্গে সঙ্গে মুখটাকে সিরিয়াস করে নেন… চোখদুটোকেও… মেয়েগুলো তারপর ফেসবুকে ছবিটা আপলোড করে লেখে, ‘বইমেলা ম্যান্ডেটারি সেল্ফি @ রবি ঠাকুর…’ ইয়াই!
কার্টেসিঃ এবিপি, দ্য ওয়াল