২৮শে জানুয়ারি, ২০২২, শুক্রবার, পুরুলিয়ার রাজগড়িয়া ধর্মশালায় সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য প্রফেসর একালের বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক স্বপনকুমার মণ্ডলের সাতশত বাণীর সংকলন ‘জীবনের বাণী : মননের আলো’ গ্রন্থটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হলো জীবনের পরম পরশ কমিটির উদ্যোগে। ২৪ মার্চ ২০২০ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রাবন্ধিক-প্রফেসর স্বপনকুমার মণ্ডল মহাশয় তাঁর ফেসবুক টাইমলাইনে যে অমূল্য বাণীবিতান প্রকাশ করে চলেছেন, যা স্বল্পকথায় বৃহৎ পরিসরের সৃষ্টি করে, যা ফেসবুকে বিপুল জনপ্রিয়তায় আমজনতার মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে, তারই সংকলিত রূপ এই গ্রন্থ। অনুষ্ঠানের শুভসূচনা হয় গ্রন্থের লেখক স্বপনকুমার মণ্ডলের প্রদীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমে। একে একে মঞ্চে উপস্থিত অতিথিদের বরণ করে নেন সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক শুক্লা গাঙ্গুলি, রাখী গরাই, মধুমিতা কর্মকার। উদ্বোধনী সঙ্গীত পরিবেশন করেন রিবা দত্ত। নিউ আলিপুর কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক বৈদনাথ বাস্কের স্বাগত ভাষণের মাধ্যমে মূল অনুষ্ঠান এগিয়ে চলে। এরপর অনুষ্ঠানের মূল পর্ব অর্থাৎ মঞ্চে ‘জীবনের বাণী : মননের আলো’ গ্রন্থটির মলাট উন্মোচন করেন প্রাবন্ধিক স্বপনকুমার মণ্ডল। উদ্বোধনী মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গৌরীশঙ্কর নাগ। ছিলেন মনিপুর স্বামী বিবেকানন্দ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক তথা জীবনের পরম পরশ কমিটির সভাপতি ড. কার্তিক কুমার মণ্ডল। এরপর এই সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে আরও অলংকৃত করে শিশুশিল্পী আদৃতা মণ্ডলের নৃত্য। বইটি প্রকাশ করা জীবনের পরম পরশ কমিটির কাছে এক অমূল্য প্রাপ্তি তা ধরা পড়ে কমিটির সদস্য-সম্পাদকদের বক্তব্যে।
অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষন ছিল প্রাবন্ধিক প্রফেসর স্বপনকুমার মণ্ডলের অমূল্য বক্তব্য। তিনি ‘জীবনের পাথেয়, জীবনের সঞ্চয়’ বিষয়ে আলোকপাত করেন। তিনি বলেন “জীবনের পাথেয় দিয়ে জীবনের সঞ্চয় করা দুরূহ। আমার জীবনের পাথেয় বলতে অর্জিত শিক্ষা। প্রথাগত শিক্ষা আবার আয় করতে শেখানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। শুধু তাই নয়,তার মধ্যে জীবনে কীসের জন্য কতটুকু ব্যয় করা জরুরি, তার ধারণা সেই শিক্ষা থেকে আসে না। পর্যাপ্ত আয় করেও জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য মেলে না,আবার অত্যধিক ব্যয় বাহুল্যে সঞ্জিত ভাণ্ডারও নিঃশেষ হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, যে ধনের জন্য মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রমে করতে হয়, সেই ধনের প্রাচুর্যই আবার তার পক্ষে প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ভাষায় ‘অর্থই যত অনর্থের মূল।’ সর্বত্র সেই পাথেয় দিয়ে সঞ্চয়ের ব্যর্থ প্রয়াস আমাদের জীবনকে অস্থির করে তোলে। চাহিদা জোগানের ভারসাম্যে জীবন তখন ঘড়ির পেণ্ডুলামের মতো দোলায়মান।” তিনি আরও বলেন “শৈশবের তৃপ্তিবোধ বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ হারিয়ে যেতে থাকে। শিক্ষা যত এগিয়ে চলে,ততই অতৃপ্তিবোধ বহুমাত্রিক আগ্রাসী হয়ে ওঠে । তার ফলে শৈশবের বসন্ত অচিরেই নিঃস্ব হয়ে পড়ে, জেগে ওঠে গ্রীষ্মের প্রখর দাবদাহ,শীতের হিমশীতলতা। জীবন এগিয়ে যায়,শৈশবের মধুবন দূরত্ব বাড়িয়ে চলে। রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ ও শব্দময় বহুরূপী ও বহু বিস্তারী পৃথিবীর চেনা-জানার ও আস্বাদনে অতৃপ্ত মনই জীবনের গতিকে তীব্র করে তোলে। সেখানে অতৃপ্ত মনের ক্ষুধা-তৃষ্ণাও জীবনের পাথেয় হয়ে ওঠে। অথচ তা দিয়ে জীবনের সঞ্চয় শুধুমাত্র ভোগ ও উপভোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ মনে হয়। তখন সীমিত জীবনে অসীম সঞ্চয়ের কথাও মনে আসে না। বিপুল সম্ভাবনাময় জীবন সেখানে অধরা মাধুরী হয়েই থেকে যায়।” এরপর গৌরীশঙ্কর বাবু তাঁর বক্তব্যে ফুটিয়ে তোলেন স্বপনকুমার মণ্ডলের বাণীবিতানে তাঁর ব্যক্তিগত পরম পরশে আবৃত হওয়ার কথা। অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে জীবনের পরম পরশ কমিটির তরফ থেকে কার্তিক কুমার মণ্ডলের ধন্যবাদ জ্ঞাপনের সাথে উঠে আসে অমূল্য এই গ্রন্থটি কীভাবে সমাজ ও সমাজমানসে এক বদলের সূচনা করে দিতে পারে তার কথা। শেষে প্রকৃতি বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমাপ্তি সঙ্গীতের মধ্যে দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়।
অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মনিপুর স্বামী বিবেকানন্দ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সমরকিশোর মাহাতো, প্রেসিডেন্ট দেবেন্দ্রনাথ পরমানিক, কেশরগড় শ্রীকৃষ্ণানন্দ বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক প্রবোধচন্দ্র পাল, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রী মধুমিতা কর্মকার, গবেষক শুক্লা গাঙ্গুলী, রাখী গরাই, বিকাশ কালিন্দী, সুপ্রিয় গঙ্গোপাধ্যায়, রিবা দত্ত এবং লাল্টু মিত্র প্রমুখ। সমগ্র অনুষ্ঠানটি মনোমুগ্ধকর সঞ্চালনা করেন রামানন্দ কলেজের অধ্যাপক সিদ্ধার্থ দত্ত।