| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

প্রথম পাঠ “অলীক মুদ্রাদোষের নির্বাচিত মুখোশ”- পঙ্কজ চক্রবর্তীর ‘মধ্যম পুরুষের ঠোঁট’ : প্রসেনজিৎ দাস

Reporter
প্রসেনজিৎ দাস / ৫১৬ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ১০ মার্চ, ২০২৪

অধ্যাপক পঙ্কজ চক্রবর্তীর ‘মধ্যম পুরুষের ঠোঁট’ বইটির প্রথম প্রকাশ মার্চ, ২০২১। কিন্তু আজ ২০২৪। সময়ের চোরা স্রোত শুষে নিয়েছে তিন তিনটি বছর। এতদিন পর এবারের আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় এই বইটি আমার হাতে এল ‘তবুও প্রয়াস’ প্রকাশনীর হাত ধরে। বইটা পড়েই এই পাঠ প্রতিক্রিয়া লেখার সাহস দেখালাম। যদিও পঙ্কজ বাবুর লেখা বা ভাবনার ধারে কাছে পৌঁছানোর স্পর্ধা দেখানোর ক্ষমতাও আমার নেই। আমি নিতান্তই একজন পাঠক। পড়তে ভালোবাসি। তাই লেখকের ভালোবাসার স্পর্ধায় এই পাঠ প্রতিক্রিয়া লিখে তাঁর স্নেহ থেকে বঞ্চিত হব না জেনেই লেখাতে হাত পাকালাম।

‘মধ্যম পুরুষের ঠোঁট’ বইটির ট্যাগলাইন — ‘কবির রাজনীতি, কবিতার কিসসা।’ এই ট্যাগলাইন থেকেই বইটির বিষয়বস্তু সম্পর্কে অনেকটাই আন্দাজ করা যায়। বইটি গদ্যের। লেখক কথিত ‘লঘু চালে সিরিয়াস গদ্য’। ২৩টি ছোটো বড়ো গদ্যে সাজানো ৯ ফর্মার এই বইটির ভূমিকা লিখে দিয়েছেন কবিবন্ধু তথা ‘তরুণ কবি ও যশস্বী সম্পাদক সুস্নাত চৌধুরী’।ভূমিকায় তিনি লিখছেন —

“বদলে যাওয়া সময়ে দাঁড়িয়ে এই টুকরো আখ্যানগুলি লিপিবদ্ধ করেছেন পঙ্কজ। তাঁর কলম এই সময়ে দাঁড়িয়ে, কিন্তু কালির টান শুরু হয়েছে গত শতকের কবিতায় ডুবু ডুবু সেই সব মুহূর্ত থেকে।”

কখনও লিখছেন —

“এই বই যে-স্থানাঙ্ক ও সময়াঙ্কের লেখচিত্র তুলে ধরছে তা বড়ো বিরল না হলেও, যে-বিষয় এখানে উঠে এসেছে তার অবস্থান আধুনিক বাংলা সাহিত্যে অনির্ণীত। এর প্রধানতম কারণ, অদ্যাবধি তা বাংলা ভাষায় ঘুণাক্ষরেও আলোচিত নয়। অথচ সত্য, ভীষণ রকম সত্য।….

একান্তে এই পান্ডুলিপি পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে, লেখক যেন স্বগত কথনের মতো নিবিড় ভঙ্গিতে তার বেঁচে-আসা ও দেখে-আসা জীবন অবিরাম লিপিবদ্ধ করে চলেছেন।”

‘লেখকের কথা’ অংশে লেখক বলছেন —

“আমার পূর্ববর্তী গদ্য গ্রন্থ ‘নিজের ছায়ার দিকে’র সহোদর এই বই। এই গ্রন্থে সেই লেখাগুলি অন্তর্ভুক্ত করে নিলাম, ফলত সেই গ্রন্থের পৃথক কোনো অস্তিত্ব আর রইল না। বাকি সব লেখা নতুন।”

বইটির ভূমিকা আর লেখকের কথা অংশটি পড়লেই বোঝা যায় কত যত্ন নিয়ে পাকা হাতের কলমে গড়ে উঠেছে এই শিল্পরূপ।চাঁচাছোলা ভাষায় এই লেখা অনেক কবি, সাহিত্যিক, প্রকাশকের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল সন্দেহ নেই এবং ভবিষ্যতেও নেবে এটুকু বিশাস আমার রয়েছে।

“এই তো সেদিনও ধূষর স্কুলবাড়ি, অথবা কোনো সস্তার লজে মফস‌্সলের কবিসম্মেলনে কলকাতার কোনো বিখ্যাত কবিকে প্রধান অতিথি হিসেবে পাওয়া যেত। আর ছিল অলীক মুদ্রাদোষের নির্বাচিত মুখোশ। সে এক অদ্ভূত একাকিত্ব। সমস্ত সমর্পণের মধ্যে লুকিয়ে আছে জয় গোস্বামীর অবৈধ খ্যাতি। ছোটো ছোটো পত্রিকাগোষ্ঠীর ঈর্ষা আর অশ্লীল অক্ষম খ্যাতির দূরত্ব মেপে পা ফেলা। অন্ধকারের অনেক জটিল অঙ্ক পেরিয়ে অনিশ্চিত সাগরময় ঘোষের চিঠি এসে পৌঁছাত কোনো এক অভিসন্ধিমূলক দুপুরের উদাসীন বুকে। এই বই সেই অলীক নব্বইয়ের স্মৃতিবিস্মৃতি দিয়ে ঘেরা। যেখানে হেমন্ত-সন্ধ্যার পাশেও ফিরে ফিরে আসে বনশ্রী সেনগুপ্তের গান। এই দশক শহর-মফস্‌সলের চাপা দুঃসাহসের মতো শান্ত আর ঈর্ষার উদাসীনতায় নিজেই নিজের চারপাশে জ্বেলে রাখে কাগজের লন্ঠন। বেহিসেবি হতে হতে আড়চোখে দেখে নেয় পুরস্কারের রাজনীতি। বন্ধুর ছায়ার বিরুদ্ধে সমস্ত অস্ত্রই বুমেরাং হয়ে ফিরে আসে নিজের ছায়ার দিকে। নির্জনকে ভালোবেসেও ভিড়ের হৃদয় নিয়ে তার বিলাপের শেষ নেই।” —এ বই যেন একথাকেই ফুটিয়ে তোলে। জেনে শুনে কে আর বিষপান করতে চায়, তবুও লেখক এর কঠোর সমালোচকও জেনে শুনে এ বই পড়বেন আশা রাখি।

বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে কবি সাহিত্যিকদের কাছে নিভৃত সাহিত্যচর্চার বদলে বড়ো হয়ে দেখা দিচ্ছে আত্মপ্রচার। আর এই জন্য চলছে প্রতিযোগিতাও।পুরস্কার, মেমেন্টো, উত্তরীয়, স্মারক,মানপত্র, সস্তার কিছু কবি সম্মেলন,ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে কিছু লাইক কমেন্ট প্রাপ্তি — এসবের মধ্যেই অনেক কবি সাহিত্যিক নিজের জগতকে নির্মাণ করে নিয়েছেন। এরকম বাস্তব টুকরো টুকরো ছবি লেখক তুলে ধরেছেন বইটির পাতায়। লেখা তো নয়, যেন এক একটা পরমাণু বোমা। একটা পরমাণু বোমার মধ্যে যে কি পরিমান শক্তি সঞ্চিত থাকে তা আমরা সকলেই জানি।তেমনি পঙ্কজ চক্রবর্তীর এই লেখাগুলির মধ্যেও নিহিত আছে আশ্চর্য এক শক্তি। চোখে আঙুল দিয়ে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন সব ভন্ডামিকে। তুলে ধরেছেন কবি, সাহিত্যিক, প্রকাশকদের প্রচলিত এক মুদ্রাদোষকে,খুলে দিয়েছেন সকল ভন্ডামির মুখোশ।

প্রথম লেখাটির নাম ”স্মৃতি-বিস্তৃতির চেয়ে কিছু বেশি”। এমন অনেক বিস্তৃত কবি,লেখক, সাহিত্যিক রয়েছেন যারা আলোচনার বাইরে। তাঁদের নিয়ে কোথাও কোন আলোচনা নেই। আজকের দিনে অনেক ছোট পত্রিকা সেইসব বিস্তৃত লেখকদের নিয়ে সংখ্যা করছেন। তাদের নিয়ে আনছেন প্রচারের আলোয়। তবে এই বিস্মৃতিকে সাফল্যের চাবিকাঠি হিসেবে ভাবলে ভুল হবে। ঠিক তেমনি পাঠকও মৌলিক সাহিত্যের বদলে কেবলমাত্র বিস্তৃত লেখককে নিয়ে সংরক্ষণযোগ্য একটি ছোট পত্রিকার সংখ্যা কিনে সমৃদ্ধ হতে চাইলেও সেটা ভুল হবে। তাই লেখক স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন — “আজ অজস্র বিস্তৃত কবির কঙ্কালের উপর দাঁড়িয়ে অনেক ক্ষেত্রে পাঠকের মুগ্ধতা আসলে এক ধরনের আত্ম প্রতারণা। হেজে-মজে গেছেন যে কথাকার তাকে আবিষ্কার করে আমরা পেতে চাইছি আত্মসুখের গৌরব। শুধুমাত্র বিস্মৃত এই অনিবার্য অনুকম্পা দিয়ে চিনে নিতে চাইছি একজন লেখককে কোন রকম গভীর মূল্যায়ন ছাড়াই জনপ্রিয়তাকে দেখছি একটি স্থূল ও পরিচর্যা হিসাবে, খ্যাতিকে ভাবছি ক্ষমতার রোগ। বিস্তৃতির পেছনেও যে একটা অনিবার্য ইতিহাস আছে, আছে জরুরি প্রয়োজন উপেক্ষা করে চলেছি সেই নিভৃত সত্যকে।”

রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, জয় গোস্বামীর ট্রমা থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক বিস্তৃত লেখকদের যদি আমরা আর একটু পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসতে পারি, সমস্ত উপেক্ষা সরিয়ে তাদের দিতে পারি সঠিক স্বীকৃতি তাতে ক্ষতি কি! লেখক উল্লেখ করেছেন মণীন্দ্র গুপ্তের নাম, পাশাপাশি শম্ভুনাথ চট্টোপাধ্যায়,প্রবীর দাশগুপ্ত,দেবদাস আচার্য, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়,ফল্গু বসু, পার্থপ্রতীম কাঞ্জিলালের নাম। প্রকাশকের সহযোগিতা, পুরস্কার, মিডিয়া, ক্ষমতা, রাজনীতি একজন কবির চারপাশে খ্যাতির একটা বলয় তৈরি করতে পারে, কিন্তু বিস্তৃতির হাত থেকে রেহাই নেই।তাই “বিস্তৃতি-স্মৃতি-পুনশ্চ বিস্তৃতির মধ্যেই প্রতিমুহূর্তে জেগে ওঠে অনিশ্চয়তার বালুচর, উদাসীন সংশয়ের মেঘ।”

বিস্মৃতি এক ধরনের বড় অসুখ। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়েই বিস্তৃতি আসে। হারিয়ে যায় অনেক কবি লেখক। তার জায়গায় হাজির হন অন্য আরেকজন। তাই বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে কি এমন ক্ষতি হবে যদি আমরা মনে রাখি শ্যামল কান্তি দাসকে, জহর সেন মজুমদারকে!

আজকের তরুণ কবিরা বড়োই অসহিষ্ণু। তথাকথিত ‘ক্ষমতাবান কবির পদতলে’ অসহায় আত্মসমর্পণ, যদি একটু তাঁর পত্রিকায় লেখার সুযোগ পান কিংবা তাঁর গোষ্ঠীতে প্রবেশ করতে পারেন, তবেই তাঁর কেরিয়ার উজ্জ্বল। তাঁকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয় না। সম্বর্ধনা, পুরস্কার প্রাপ্তি, সম্মান, স্মারক, মানপত্রের ঘেরাটোপে তাঁর লেখক সত্ত্বা যেন একাকার হয়ে যায়। তথাকথিত কবি সম্মেলনের মঞ্চে কবিতা পাঠের আগে চলে অহেতুক নিজের কর্মকাণ্ডের বর্ণনা, তাঁর কটা বই প্রকাশিত হয়েছে, নিজের লড়াই এসবের কথা। কবিতা পাঠ যেন ফিকে হয়ে আসে। কেউ শোনেন, কেউ আদেও শোনেন না। বরং নিজের সতীর্থ কবিকে ফেসবুকে পোস্ট করার জন্য একটা ছবি তুলে দিতে বলেন। চিত্র প্রাপ্তির পর ধীরে ধীরে পা বাড়ান বাড়ির দিকে। একজন প্রাচীন কবির দায়িত্ব একজন তরুণ কবিকে কবিতা লেখায় উৎসাহ দেওয়া এখনকার অনেক প্রবীণ কবির মধ্যেই এই বিষয়টা বিরল। আর আজকালকার তথাকথিত তরুণ কবিও কবিতা লিখে কোন অগ্রজ বা ‘লোকাল কবি’র সন্নিকটে যান না। এটা তাদের স্পর্ধা নাকি মুদ্রাদোষ জানিনা।তবে সাহিত্যচর্চার পরিবেশ এখন অনেকটাই ফিকে হয়ে আসছে।তবে এমন অনেক কবি-লেখক আছেন যাঁরা হয়তো সেভাবেই লাইমলাইটে আসেন না, যাঁরা নিভৃত সাহিত্যচর্চাকে জীবনের নেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন, এমন সংখ্যাটাও নিতান্ত কম নয়।

আর একটা জিনিস আজকাল আকছার ঘটছে সেটার কথা বলব। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে প্রকাশনার ক্ষেত্রে যেন নবজাগরণ ঘটেছে। উঠতি লেখকও চাইছেন তাঁর লেখাগুলি অন্তত একটি বই আকারে প্রকাশ হলেও মন্দ হয় না।যেকোনো লেখা হলেই হল। কেউ পড়ুক আর না পড়ুক, বই করা চায়। আর এই সুযোগেই প্রকাশনী সংস্থাগুলিও ঝোপ বুঝে কোপ মারেন। হাতিয়ে নেন মোটা অঙ্কের টাকা। প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়ে নিজের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে গিয়েও অনেকে সর্বস্বান্ত হন। এর নজিরও ছড়িয়ে রয়েছে যত্রতত্র। এ সকল বই হয়তো সেভাবে বিক্রি হয় না। প্রকাশনা সংস্থাগুলির সঙ্গে লেখকের চুক্তি হয় লেখক প্রকাশক যৌথ খরচে বই প্রকাশ হবে। লেখক পাবেন ১০০ কপি আর প্রকাশকের থাকবে ১০০ কপি। আদেও যে প্রকাশক ২০০ কপি ছেপেছেন এ গ্যারান্টি কে দেবে? লেখক ওই ১০০ কপি বই বাড়িতে নিয়ে আসেন পরম যত্নে। তারপর বিভিন্ন কবি সম্মেলন, অনুষ্ঠানে গিয়ে তথাকথিত মান্যগণ্য ব্যক্তিদের বিলিয়ে দিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এই হচ্ছে উঠতি লেখকদের বইয়ের নিয়তি। সবার ক্ষেত্রে কথাটি প্রযোজ্য নয়, উঠতি লেখকদের এমন বইও হয়েছে, যেগুলি প্রথম প্রকাশেই নিঃশেষিত হয়েছে এমন নজিরও রয়েছে। এও এক ধরনের অসুখ। এই অসুখ থেকে আমরা কবে মুক্তি পাব জানি না। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে প্রকৃত সাহিত্যচর্চা, ক্রমবর্ধমান লেখার উন্নতি জরুরি। তাহলেই অগ্রজ কবির আশীর্বাদ এমনিতেই জুটবে। কবিতা ছাপানোর জন্য তথাকথিত মান্যগণ্য পত্রিকার সম্পাদক বা কোন মহৎ কবির অহেতুক পদলেহনের প্রয়োজন নেই। তবে একটা জিনিস আজকাল লক্ষ্য করা যাচ্ছে-কোনো মহৎ কবি বা লেখকের চার-পাঁচটা বই প্রকাশ হলেই তিনি যেন ধরাকে সরা জ্ঞান করেন।কথায় বলে ‘মা ব্রুয়াৎ সত্যম্ অপ্রিয়ম্’। অপ্রিয় হলেও আসলে তা সত্য। তখন তাকে আর ফোনে পাওয়া যায় না। পত্রিকার জন্য কবিতা চাইতে গেলে দিচ্ছি দেবো করেই এক মাস কাটিয়ে দেন, এমন ভাব দেখান যে তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মহাকবি। এসব অসুখে আজ সাহিত্যজগৎ ভারাক্রান্ত। সাহিত্য জগতে রেষারেষিটা আগেও ছিল, এখনও আছে। এখন বরং বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি কবিতা উৎসবে কবিতা পাঠ নিয়েও শুরু হয়েছিল দ্বন্দ্ব। কে কে কবিতা পড়বে, তার মানদণ্ড কী হবে, তা ঠিক করে দেন দণ্ডমুন্ডের কর্তারা। বাদ পড়ে প্রতিবাদে সরব হয়েছিলেন অনেক প্রতিষ্ঠিত কবি লেখক। এখানেও রাজনীতি। বারো ভূঁইয়ার চোখ রাঙানি, শাসন, তর্জন, গর্জন। এদের অঙ্গুলি হেলনেই চলছে সাহিত্য জগৎ। পুরস্কারপ্রাপ্তি আর পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি। ‘নিজের ছায়ার দিকে’ রচনায় তিনি লিখছেন — “ছদ্ম কবিতার দাপট আর দাদা দিদির পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতির শিকার হল কবিতা। জয় গোস্বামীর থেকে ক্ষমতার কেন্দ্র ঘুরে গেল সুবোধ সরকারের দিকে। অনুজ কবি আরও বেশি পোষ্য হয়ে উঠেছে আজ। কবিতার বইয়ের জাঁকজমকপূর্ণ আনুষ্ঠানিক প্রকাশ এসে পড়ল হইহই করে। খ্যাতি আর পুরস্কার বিনিময়ে যোগ দিল ছোট পত্রিকার কবি ও সম্পাদক।”

অনেকে পুরস্কার প্রাপ্ত কবি লেখকদের বই কেনেন। চোখ ধাঁধানো ফেসবুকীয় বিজ্ঞাপনের বাহারে অনেক পাঠকের মধ্যে সাময়িক একটা কৌতূহল তৈরি হয়। বইয়ের বিক্রি বাড়ে। মুখে মুখে, সভা-সমিতিতে খ্যাতির একটা আশ্চর্য বলয় ঘিরে থাকে কবি লেখককে। অনেকে এইসব বই কিনে প্রতারিত হন আবার অনেকে হন না।সম্প্রতি স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ‘জলের উপর পানি’ উপন্যাসটি সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হওয়ার পরপরই বইটির বিক্রি বহুল পরিমাণে বেড়েছিল সন্দেহ নেই। তবে এই বই কিনে কেউ প্রতারিত হননি আশা করি। কোনো একজন কবি-লেখকের একটা বই পড়েই তাঁকে সমালোচনা করা ঠিক নয়। পূর্ব প্রকাশিত বই থেকে বর্তমানে প্রকাশিত বইগুলি খুব ভালো করে দেখলেই কবির বিবর্তন বোঝা যায়। একটা বইয়ের নিরিখে কবিকে সামগ্রিক মূল্যায়ন এক ধরনের আত্ম প্রতারণা। এ ধরনের মুগ্ধতা আজকে তরুণ পাঠকের মধ্যে এই বেশি করে দেখা যাচ্ছে।

পঙ্কজ বাবুর এই বই যেন এসবের বিরুদ্ধে কথা বলেছে। সাহিত্যজগতের সমস্ত অপসঙ্গতি গুলিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন তিনি। আসলে এই সকল মুদ্রাদোষে বাংলা সাহিত্য জগৎ আজ তথাকথিত অন্ধ। এই স্থান থেকে বাংলা সাহিত্য যতদিন মুক্তি না পাবে ততদিন বাংলা সাহিত্যের উন্নতি হবে না। মজার ছলে সিরিয়াস কথার চাবুক চালিয়ে লেখক পৌঁছে গিয়েছেন সাহিত্যের অনেকটা গভীরে। শব্দ ব্যবহার, বাগ্‌ভঙ্গি যেন ছুরির ফলার মতো।যে বা যাঁরা এই বই নিয়ে ঋনাত্মক সমালোচনা করবেন ছুরির ফলাটা বুমেরাং হয়েই তাঁদের বুকে বিঁধবে। বাস্তব ঠোঁটকাটা কথার জাল বুনে তিনি প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করেছেন।অতীত জীবনের স্মৃতি-বিস্মৃতির আলোছায়ায় এসে মিশেছে বর্তমানের নানা অসুখ। এই অসুখের নিরাময় আবশ্যক। সে নিরাময়ের বার্তাও আমরা পাই এই বইটির নানা লেখায়।

সবশেষে আসব বইটির নামকরণ প্রসঙ্গে, যা সাহিত্যিকের জীবন জিজ্ঞাসার অন্তরালশায়ী নিগূঢ় সত্যের মাপকাঠি। কিন্তু ‘মধ্যম পুরুষের ঠোঁট’ নামকরণটি আমার কাছে প্রথম থেকেই একটু ব্যতিক্রমী মনে হয়েছে। নামকরণে লুকিয়ে আছে ব্যঞ্জনা। প্রথম পুরুষ নয়, উত্তম পুরুষ থেকে তিনি পৌঁছেছেন মধ্যমে। তাইতো বইটির ভূমিকায় সুস্নাত চৌধুরী লিখেছেন — “প্রথম পুরুষের ‘আদারনেস’ তিনি আনেননি, উত্তম থেকে মধ্যমে পৌঁছেছেন। এবার ‘নিজের ছায়ার দিকে’ নয় ঠিকই, কিন্তু এ বই ‘মধ্যম পুরুষের ঠোঁট’।

পরিশেষে একটা কথাই বলব এই গ্রন্থ আলোচনা একেবারেই বই বিক্রির জন্য নয়, নিমগ্ন এক পাঠক তার অন্তরের অনুভূতি সহজ সরল ভাষায় ব্যক্ত করেছে মাত্র। ভুলত্রুটি অবশ্যই মার্জনীয়। শুধু একটা কথাই আমার মনে হচ্ছে — “এ বইয়ের ভাগ্য একটি আলমারির নড়বড়ে পায়া দেখে এখনও কম্পমান।” — এ কথা বলার সময় এখনও আসেনি। একদিন না একদিন এই লেখাগুলি আরও বহু সংখ্যক পাঠকের হাতে যাবে, তারা পড়বেন, মতামত দেবেন কিন্তু লেখক যেটা চেয়েছেন তার সুরাহা হবে কি? যে যে মুদ্রাদোষের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন সেই মুদ্রাদোষগুলি থেকে কি বর্তমান বাংলা সাহিত্য জগত মুক্তি পাবে?

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev