| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

টানাপোড়েন আর দাম্পত্যের প্রতিলিপি — রিঙ্কি বোস সেনের গল্পগ্রন্থ ‘পছন্দের পঁচিশ’ : প্রসেনজিৎ দাস

Reporter
প্রসেনজিৎ দাস / ৬২৮ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ৩০ মার্চ, ২০২৪

কথাসাহিত্যিক তথা শিক্ষিকা রিঙ্কি বোস সেনের গদ্যের বই ‘পছন্দের পঁচিশ’ পড়ে শেষ করলাম। এটি লেখিকার চতুর্থ গল্প সংকলন গ্রন্থ। এতে ২৫টি ছোটো বড়ো নানা আয়তনের গল্প থাকবে, এ নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই কারণ গল্পগ্রন্থের নামটা যখন ‘পছন্দের পঁচিশ’। বইটি উপহার পেয়েছিলাম দিদির কাছ থেকে। প্রথমেই বলে রাখি এটাকে সমালোচনা বললে ভুল হবে, পড়ার পর একজন অনুরক্ত পাঠক হিসাবে আমার যা অনুভূতি তা লিপিবদ্ধ করলাম ক্ষুদ্র এই আলোচনাটিতে। তাই আমি এটার নাম দিয়েছি গ্রন্থ আলোচনা, সমালোচনা নয়।

এতে আছে লেখিকার নিজস্ব পছন্দের পঁচিশটি গল্প, যেগুলি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।গল্পগুলি ভিন্নস্বাদের এবং ভিন্ন আঙ্গিকের তা সচেতন পাঠক মাত্রেরই চোখ এড়াবে না।গল্পগুলি পড়তে গিয়ে বারবার আমার মনে পড়ছিল আশাপূর্ণা দেবীর কথা।অসামান্য সূক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গী, সংবেদনশীলতা ও পরিচিত সমাজের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে, বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবনকে আশ্চর্য দক্ষতায় তিনি তাঁর গল্প, উপন্যাসে তুলে ধরেছিলেন, তেমনি লেখিকা রিঙ্কি বোস সেনের ‘পছন্দের পঁচিশ’-এর গল্পগুলির মধ্যেও রয়েছে আশ্চর্য এক জীবনবোধ।গল্পের কাহিনী উঠে আসে জীবন থেকে, যেখানে গোটা জীবনটাই আসলে গল্প, তেমনি গল্পই জীবন।

লেখিকা নিজেই বলেছেন — “পছন্দের পঁচিশ আমার নিজের বাছাই করা পঁচিশটি পঁচিশ রকমের গল্পের একত্রীকরণ। এখানে যেমন আছে পারিবারিক উষ্ণতা এবং টানাপোড়েন, তেমনি আছে সমাজ ও তার অবক্ষয়। একই সাথে আছে নিছক হাস্যকৌতুকের কিছু আয়োজন, আবার আছে প্রেমের অমোঘ হাতছানি, দাম্পত্যের আখ্যান।”

প্রথম গল্পের নাম ‘অনুঘটক’। বিজ্ঞানে পড়েছিলাম, যে পদার্থ কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে বিক্রিয়ার বেগকে বাড়ায় বা কমায় কিন্তু বিক্রিয়া শেষে যার কোনো পরিবর্তন হয় না, সেইই অনুঘটক বা ক্যাটালিস্ট। এই গল্পেও নিলয়ের সুপ্ত প্রেমকে উস্কে দিতে তাকে দিয়ে পত্রিকার পাতায়

প্রেমের গল্প লিখিয়ে নেওয়া মনীশ, যেন সত্যিই অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। আসলে প্রেম জিনিসটা লোক দেখানো বা বহিরঙ্গ বিষয় নয়,যার অন্তরে প্রেমের অনিবার্ণ দীপ জ্বলছে অবিরাম, বাহ্যিক আড়ম্বর তার কাছে তুচ্ছ। নিলয় বাহ্যিক আড়ম্বর, লোক দেখানো প্রেমে বিশ্বাসী নয়। সে বলেছে — “প্রেম কি শুধুই…এই যে অবাধ স্বাধীনতা, যা নিলয় শ্রুতিকে দিয়েছে, সেটাও তো প্রেম, নয় কি? শ্রুতির প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য? প্রেম নয়?আর একনিষ্ঠ থাকাটা? এটা প্রেম নয়? এ তো প্রেমের মস্ত বড়ো প্রমাণ। শুধু কি সিনেমা দেখালেই আর সারপ্রাইজ গিফট দিলেই প্রেম হয়? শোওয়ার আগে বডি স্প্রে লাগালেই প্রেম হয়?”

না, বরং দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা, উদারতা, একনিষ্ঠতা, দায়িত্বপালন এবং ইগো বা অহংবোধকে সরিয়ে দুটি মনের মিলনের মধ্য দিয়েই মধুর দাম্পত্য সম্পর্ক তৈরি হয়, তাকে যদি কেউ প্রেম না বলে তাহলে সে আনরোমান্টিক।

এরকমই দাম্পত্যের খুঁটিনাটি আখ্যানে মোড়া বেশ কিছু গল্প আছে এই গ্রন্থে।

”সংসার বড় জটিল জায়গা, তার চেয়েও বেশি জটিল সংসারের চৌহদ্দির মধ্যেকার সম্পর্কের সমীকরণ গুলো” —

মানুষের মনস্তত্ব, চাওয়া-পাওয়া, অপূর্ণতার বেদনা ফুটে উঠেছে “চোরাগলি” গল্পে। স্মৃতির নস্টালজিয়া, অর্ধেক রাতে ঘুম-ঘোরে জেগে ওঠা ইত্যাদি। অন্যদিকে “অগোচরে” গল্পে দেখা যায় সংসারের যাঁতাকলে পিষ্ট নারীর প্রতি অবহেলা, ‘অবলা’ নাম দেগে দিয়ে তাকে দূরে সরিয়ে দেওয়া।

কিছুটা প্রতিবাদের সুরও ধ্বনিত হয়েছে গল্পগুলির মধ্যে। মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বীরাঙ্গনা’ কাব্যে বীরাঙ্গনারা তাদের প্রিয়তমের কাছে পত্র লিখে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। প্রেমের অনুযোগ, অভিমান, রাগ ইত্যাদি পত্রগুলি জুড়ে। ঊনবিংশ শতকের নারীজাগৃতির প্রতীক হিসাবে পত্রগুলি দাগ কেটেছিল পাঠকদের অন্তরে।তেমনি ‘অগোচরে’ গল্পের দিয়ার ঠাকুমা অনুরাধা প্রতিবাদ জনিয়েছেন পুরুষশাসিত সমাজর প্রতীক তপনকে। নারীরা কেন নিজস্ব চাওয়া-পাওয়া, পছন্দ-অপছন্দের ভাগীদার হতে পারবে না? শেষে তপন তাদের দুজনের যুক্তি-তর্কের কাছে পিছু হঠতে বাধ্য হয়। ক্ষতবিক্ষত হয় তার পুরুষসত্ত্বা।

এরপর আছে “মিষ্টিমুখ” গল্প। বর্তমান সময়ে কন্যাভ্রূণ হত্যা একটা সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুত্রসন্তান নাকি বংশের প্রদীপ। কন্যা সন্তান দিয়ে বংশ রক্ষা চলে না।অতএব কন্যা সন্তান চাই না। এরকম সংকীর্ণ মানসিকতার মানুষ আমাদের সমাজে প্রচুর। ছেলেদের আমরা ব্যাট, বল কিনে দিই, কিন্তু কন্যা সন্তানের হাতে তুলে দিই পুতুল। এই ভেদ বৈষম্যে আজকের সমাজ জর্জরিত। পুত্র-কন্যার মধ্যে এঁকে দিই লক্ষ্মণের গণ্ডী। কিন্তু মনে রাখতে হবে-আমাদের সমাজ একটা পাখির মতো। তার একটা ডানা নারী, আরেকটি পুরুষ। পাখির একটি ডানা না থাকলে সে যেমন উড়তে পারে না, ঠিক তেমনি নারী-পুরুষ উভয়েরই উভয়কে প্রয়োজন।

এই সত্যটা উচ্চারিত হয়েছে এই ‘মিষ্টিমুখ’ গল্পে।

ঠাকুমা ইন্দিরার ইচ্ছে নাতি হবে — “নাতি অর্থাৎ বংশ প্রদীপ। ইন্দিরার গোপাল ঠাকুর।” কিন্তু নীলিমা — কন্যাসন্তান প্রসব করে, স্বভাবতই সংসারে খুশির মাঝেও ইন্দিরার মন সায় দেয় না। সে তাই বৌমাকে নার্সিং হোমে দেখতে পর্যন্ত যায় না। মুখ থেকে বেরিয়ে আসে সংকীর্ণ সত্যটা — “কত করে বলেছিলাম নীলিমাকে ‘তোর হাতেই সব, এইবার একটা নাতির মুখ যেন দেখতে পাই!’ পারলো না, পারলো না বংশের মান রাখতে।”

ইন্দিরার ভুল ধরিয়ে দেয় গায়ত্রী। একটা সামান্য কাজের মেয়ে হয়ে তার ঘরে যখন কন্যাসন্তান আসে, তখন তার আনন্দের সীমা থাকে না। মিষ্টিমুখ করায় সকলকে। একজন অশিক্ষিত, কাজের মেয়ে হয়ে যার মধ্যে ভেদাভেদ নেই, নেই সংকীর্ণতা, আর ইন্দিরা বড়ো ঘরের মেয়ে হয়েও তার মধ্যে এ সংকীর্ণতা কেন? শেষে অবশ্য সে বুঝতে পারে সন্তান সে যাইহোক সন্তানই, সে ছেলেই হোক আর মেয়েই হোক। তাহলে তাকেও তো মিষ্টিমুখ করাতে হবে। কারণ তিনি এখন ঠাকুমা হয়েছেন। এই যে সংকীর্ণতা থেকে মুক্তি; এই ইতিবাচক চিন্তাভাবনা গল্পের শেষে পাঠকদের অভিভূত করে।

‘কানামাছি ভোঁ ভোঁ’ গল্পে উঠে এসেছে বিপন্ন শৈশবের কথা। জোর করে চাপিয়ে দেওয়া — এ যেন অভিভাবকদের চিরন্তন প্রবৃত্তি। স্কুলের পাশাপাশি প্রাইভেট টিউশন, নাচ, ড্রয়িং, ক্যারাটে, গান, আবৃত্তি, ফুটবল কোচিং-এ হেন নানারকম প্রাতিষ্ঠানিক শিখন শিশুদের উপর চপিয়ে দেন অভিভারকরা। ফলে অধিকাংশ শিশুই ভালোবেসে নয় বরং ভয়ে এগুলো শিখতে বাধ্য হয়। শিশুদের প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে ঠেলে দিয়ে অভিভাবকরা খুশি হন কিন্তু শিশুরা আদৌ কি খুশি — এ খবরটা তারা নেন না। “আমাকে আমার মতো থাকতে দাও” সব শিশুরাই চায়-কিন্তু তা হয় কি?

দুরন্ত স্বপ্নের পেছনে ছুটতে ছুটতে আমরা যেন আগের তুলনায় একটু বেশিই যান্ত্রিক হয়ে পড়েছি। শৈশবের সংজ্ঞাটাই যেন বদলে গিয়েছে। দুধের শিশুর পিঠে যখন দেখি ব্যাগভর্তি ভারি  বইয়ের বোঝা,তখন মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে।ছেলে মেয়েদের কচি মাথায় না আছে প্রতিযোগিতার মনোভাব,না  আছে হিংসা, ঈর্ষা। বাবা-মা তাদের নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে এরকম ইঁদুর দৌড়ে ছেলেমেয়েদের ঠেলে দিচ্ছে।

তার ফলে তাদের শৈশব চলে যাচ্ছে বিপন্নতার দিকে। শিশুকাল থেকে যে যে সুঅভ্যাসসমূহ গড়ে তোলার দরকার তারা অধিকাংশই গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে। অনেকেই গল্পের বই পড়া, গল্প বলা এগুলি কোথাও যেন হারিয়ে ফেলছে। তার বদলে বৃহত্তর জায়গা করে নিয়েছে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টুইটার, মেসেঞ্জার, ইনস্টাগ্রাম ইত্যাদি সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটগুলি। ফলে এই সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটগুলোতে শিশুদের মস্তিষ্ককে বিপথে চালিত করার প্রচেষ্টা বেশ চোখে পড়ছে। সুঅভ্যাসসমূহ অনুশীলন করার মত সময় তাদের হাতে নেই। যেটুকু সময় তারা অবসর পাচ্ছে হাতে স্মার্টফোনে ব্যস্ত —

“জানালার ফ্রেমে বন্দী এ মন

বোকা বাক্সের মাঝে,

মুখ গুঁজে স্মার্টফোনে

ব্যস্ত সকাল সাজে।

#

বিপন্ন শৈশব আজ

বিপন্ন মানবতা

কলুষিত হলো শিশু মনখানি

হারায় উর্বরতা।

#

ফেসবুক-টুইটারে বন্দি এ মন

চায়না কিছুই আর,

চাঁদের বুড়ি গিয়েছে হারিয়ে

সপ্তসাগর পার।”

শিশুর মন চায় মুক্তি,বন্ধন থেকে মুক্তি। রোজকার বাঁধাধরা নিয়ম তারা চায় না। কিন্তু আমরা ছাড়বো না তাদের। একটা নিয়মের অদৃশ্য বন্ধনে তাদের বেঁধে ফেলেছি ‘দশটা-চারটের আন্দামানে’। এতটুকু অবসর আমরা তাদের দিচ্ছি না। একটু একান্তে বসে যে সে ভাববে, সে সুযোগটাও আমরা তাদের দিচ্ছি না। ভাবার সময় নেই।পড়ো,পড়ো,শুধু পড়ো। ক্লাসে তোমাকে ফার্স্ট হতেই হবে। দ্বিতীয় হওয়ার কোন কথাই নেই।মা বলে আমার খোকা ডাক্তার হবে,বাবা বলে ইঞ্জিনিয়ার, দাদু-ঠাম্মা হয়তো বলেই ফেলে আমার নাতি হবে কলেজের প্রফেসর। কিন্তু খোকা ভাবে ‘কেউ তো আমাকে বলে না যে, খোকা মানুষ হ।’ হয়তো জয় গোস্বামী ‘টিউটোরিয়াল’ কবিতার সেই গর্বিত পিতার মত আমরা অনেকেই বলে উঠি —

“তোমাকে পেতেই হবে শতকরা অন্তত নব্বই (বা নব্বইয়ের বেশি)

তোমাকে হতেই হবে একদম প্রথম….

তার বদলে মাত্তর পঁচাশি!”

আমাদের মনে রাখা উচিত শিশুকে চাপিয়ে দেওয়া নয়, তার মন ও মান বুঝে তাকে প্রয়োগ করাই বোধহয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে তাদের নিজের মতো করে কাটানোর সুযোগ দিতে হবে। ‘কানামাছি ভোঁ ভোঁ’ গল্পে এই ছবিই ধরা পড়েছে।

‘প্রতারণা’ গল্পটি প্রতারিত পুরুষদের নিয়ে এবং একটি বিশেষ আইনের অপব্যবহার নিয়ে লেখা। নীলেশের মত হাজারও নীলেশকে হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে আমাদের সমাজে, যাদের বিবাহিত জীবন সুখের হয় না। বরং প্রতিনিয়ত তারা প্রতারণার স্বীকার হয়।

অবাধ স্বাধীনতাকে স্বেচ্ছাচারিতা ভেবে তাদের স্ত্রীরা তাদের উপর একপ্রকার মানসিক নির্যাতন চালায়। রাতের পর রাত অজুহাত দিয়ে স্ত্রী যদি স্বামীর কাছ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখে, এটাকে প্রতারণা না বললে অন্যায় হয়। এই ক্ষতটা কেউ চোখে দেখতে পায় না; এর জন্য কোনো আইন নেই।অথচ গালের কালশিটে দাগটা দেখিয়ে মেয়েরা কত সহজেই থানায় গিয়ে স্বামীর বিরুদ্ধে নালিশ জানাতে পারে। তাই হতাশা দানা বেঁধে ওঠে নীলেশের চোখে মুখে —”…..দিনের পর দিন আমার মনটাকে যেভাবে পেষা হয়েছে সেটা ফিজিক্যাল এ্যাসল্টের চেয়ে কিছু কম নয় স্যার। মেন্টাল হ্যারাসমেন্ট যে কী যন্ত্রণাদায়ক তা যদি…! আপনি ওনার গালের কালশিটেটা দেখলেন, আমার ক্ষতবিক্ষত মনটা যদি দেখাতে পারতাম! আর ডিভোর্সের কথা বলছেন, খোরপোষের কথা বললেন না তো? ভাবুন একবার, প্রতারণা আমার সাথে হল আবার খেসারতও আমিই দেবো! আইনের সহযোগিতা আমাদের জন্য কোথায় স্যার?”

ধরা গলায় বলে উঠল —” দিনের পর দিন তাচ্ছিল্য, ভয় দেখানো, থানা পুলিশের হুমকি…অফিসে গিয়ে সিন ক্রিয়েট করার হুমকি, চাপ দিয়ে বাজে খরচ করানো, আমাকে না জানিয়ে আমার ক্রেডিট কার্ড থেকে বড় বড় পার্চেস করা… আরও কত কী, বলে শেষ করতে পারবো না, আমার দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল স্যার! আইন সব মেয়েদের জন্য, এই একটা জায়গাতেই আটকে যেতাম স্যার! অনেকবার নিজেকে শেষ করার কথাও ভেবেছি। বুড়ো মা’য়ের কথা ভেবে পারিনি। আজ সেই মা’কেই থানায় আসতে হল, আমার জন্য! স্যার আর কিছু খোয়ানোর নেই আমার। যা কেস দেবেন দিন।”

আবার ‘সবুজ’ গল্পটি মনস্তত্ত্ব নিয়ে, আমাদের জটিল মনস্তাত্ত্বিক কার্যকলাপ নিয়ে রচিত। মানুষের যে ইচ্ছে পূর্ণ হয়নি, যার জন্য সে অতৃপ্ত, সেই অবদমিত অতৃপ্তি ও ইচ্ছাগুলোই অচেতন স্তর থেকে স্বপ্ন হয়ে বেরিয়ে আসে। ফ্রয়েডের তত্ত্ব অনুযায়ী মনের চেতনও অবচেতন স্তরের সমন্বয়ে তৈরি হয় একজন ব্যক্তিমানুষের অহং।তৃপ্তি আর সোহিনী বাল্যবন্ধু। তৃপ্তির সঙ্গে শতরূপের দাম্পত্য জীবনের ইতি ঘটে একটা মিউচুয়াল বোঝাপড়াতে কারণ ”আর পারছিল না তৃপ্তি, একটা নিষ্প্রাণ সম্পর্কের লাশ টেনে নিয়ে যেতে।”

আর অন্যদিকে তথাগতকে নিয়ে সোহিনীর সোনার সংসার।ফোনে সোহিনীকে কাঁদতে শুনে তৃপ্তি ভেবেছিল শেষ পর্যন্ত সেও কি হেরে গেল! কিন্তু অদ্ভুত একটা অনুভূতি হল তৃপ্তির —”

“কিছুক্ষণ আগেই কী বিশ্রীভাবে ও সোহিনীর প্রতি রাগ আর বিরক্তি অনুভব করছিল। এখন সে সব জল হয়ে গেছে। উল্টে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছে, হারিয়ে যাওয়া এক বন্ধুকে খুঁজে পাওয়ার অনুভূতি। মনে হচ্ছে আবার সেই আগের মত ওরা একে অপরের হয়ে উঠবে। অদ্ভুত ব্যাপার! একটা কেমন জানি স্বস্তি বোধ হল তৃপ্তির।”

কিন্তু সোহিনীর বাড়ি এসে সে যখন শুনতে পেল তথাগতর সঙ্গে সোহিনীর কিছু হয়নি। তার ছেলে ড্রাগের নেশা ধরেছে বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে। একথা শুনে তৃপ্তির মেজাজটা যেন তেতো হয়ে গেল। তাই গাড়িতে করে বাড়ি ফেরার সময় গাড়ির লুকিং গ্লাসে নিজের ঈর্ষান্বিত সবুজ চোখ দেখে সে যেন পাথরের মত নিশ্চল হয়ে গেল।

এরকমই ‘অফার’, ‘খোলা আকাশ’, ‘ঘুড়ি’, ‘পারিশ্রমিক’, ‘ক্লাস’, ‘আড়াল’, ‘ঘুড়ি’, ‘নামকরণ’, ‘ঋণমুক্ত’ ইত্যাদি গল্পগুলির মধ্যেও রয়েছে ভিন্ন ধরণের স্বাদ। সমাজের সূক্ষ্ম দৃষ্টিকোণ ও তার অবক্ষয়, সাংসারিক জীবনের নানাবিধ চড়াই-উতরাই, বাস্তব জীবনবোধ ফুটে উঠেছে গল্পগুলোতে, যা এককথায় অসাধারণ। গল্পের প্লট নির্বাচন, চরিত্র রূপায়ণ, ভাষা ব্যবহার, শব্দচয়ন কৌশল, সর্বোপরি ছোটোগল্পের হঠাৎ শুরু ও ‘শেষ হয়ে হইল না শেষ’-অর্থাৎ আশ্চর্য সমাপতন এই গল্পগুলিকে অনন্য মাত্রা দিয়েছে।গল্পের চরিত্রগুলি যেন বাস্তব জীবন থেকে তুলে আনা।তাই সেগুলি আরো জীবন্ত হয়ে উঠেছে লেখিকার কলমে।

গ্রন্থনাম : ‘পছন্দের পঁচিশ’, লেখিকা : রিঙ্কি বোস সেন, ধরণ : গদ্যগ্রন্থ, প্রকাশকাল : কলকাতা বইমেলা-২০২৪, প্রকাশক : বার্তা প্রকাশন, নিবেদক : ‘শব্দসাঁকো’, প্রচ্ছদ : সন্তু কর্মকার, উৎসর্গ : মা-বাবাকে, লিখিত মূল্য : তিনশত তিরিশ টাকা।

আপনার মতামত লিখুন :

One response to “টানাপোড়েন আর দাম্পত্যের প্রতিলিপি — রিঙ্কি বোস সেনের গল্পগ্রন্থ ‘পছন্দের পঁচিশ’ : প্রসেনজিৎ দাস”

  1. Prosenjit Das says:

    বইটা পড়ুন।আশা করি ভালো লাগবে।।।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev