বঙ্গসংস্কৃতিতে রবীন্দ্রানাথ ঠাকুরের গানের ভূমিকা অতুলনীয়। বাঙালিজীবনেও তার আবেদন উৎকর্ষমুখর। অথচ রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে সেভাবে চর্চার পরিসর শ্রীবৃদ্ধি লাভ করেনি। সেই গানে বাঙালির ভক্তি আছে, আছে তীব্র অনুরাগ, নেই শুধু চর্চার অবকাশ। সে যেন স্বতন্ত্র আভিজাত্যে আপন স্বধর্মে সংখ্যালঘু, বিস্তারে তার জনবিমুখ প্রকৃতি সলাজ সবুজ। শিক্ষাশোভন পরিসরেই তার বিচরণ, রবীন্দ্রানুগত্যে তার মহিমা প্রকাশমান। এভাবে কুক্ষিগত পরিসরে রবীন্দ্রগানের চর্চা আপনাতেই অসাধারণ্যের বৃত্তে আবর্তিত হওয়ায় তার পরিসর সম্প্রসারিত হয়নি। সেখানে শিলিগুড়ি থেকে ‘উত্তরধবনি’র সম্পাদক বীরেন চন্দ যেভাবে একান্ত আপন করে রবীন্দ্রগানের চর্চাকে তাঁর পত্রিকা থেকে বইয়ের মাধ্যমে মননশীলতায় নিবিড় করায় প্রয়াস চালিয়েছেন, তা শুধু আপামর রবীন্দ্রানুরাগীরই উপকার করে না, রবীন্দ্রবৃত্তের বাইরে সেই গানের আবেদনে ভাগীরথী ভূমিকা উঠে আসে। পত্রপত্রিকায় বিক্ষিপ্ত-বিচ্ছিন্ন ভাবে রবীন্দ্রনাথের গানের আলোচনা নানাভাবে লক্ষ করা যায়। কিন্তু সুসংবদ্ধভাবে তা নিয়ে চর্চার অবকাশ থেকেই গেছে। সেখানে শুধুমাত্র রবীন্দ্রগান নিয়ে ধারাবাহিক পত্রিকার সংখ্যা থেকে তার বইপ্রকাশের বিষয়টি যে সম্পাদকের লক্ষ্যাভিমুখী চিন্তনের ফসল, তা সহজেই অনুমেয়। এজন্য তার মূল্যায়নের চেয়ে মূল্যবোধের পরিচয় আপনাতেই সংবেদনশীলতায় আবেদনমুখর মনে হয়। রবীন্দ্রনাথের গান শুধু তার অপরূপ সৃষ্টিই নয়, তাঁর অন্যান্য শিল্পরূপের চেয়ে তার মহিমা বেশি বই কম নয়। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানের জন্য নানাভাবে দুর্বলতা ব্যক্ত করেছেন। তাঁর গানকে যে উপেক্ষা করা যাবে না, এ ছিল তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস। সেখানে রবীন্দ্রনাথের গান শুধু শিল্পরূপেই আবদ্ধ থাকেনি। তা তাঁর ভাষারূপ লাভ করেছে। সেই গানের ভাষা কত গভীর, কত বিস্তৃত, কত তীব্র আবেদনমুখর, তা নিয়ে ভাবনার অবকাশ থেকেই যায়। তার শৈল্পিক রূপ নিয়ে বা তার স্বতন্ত্র আভিজাত্য বিষয়ে বিদ্যায়তনিক পরিসর সক্রিয় হয়েছে।
অথচ গানের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের বহুধাবিস্তৃত পরিসর, বহুমুখী বিস্তার সেখানে অধরামাধুরী। বিদ্যায়তনিক পরিসরের বাইরে বৃহত্তর পরিমণ্ডলে তাঁর গানের সাঙ্গীতিক আবেদনপ্রকৃতি কীভাবে জনমানসে সবুজ হয় ওঠে, তার পরিচয় নিয়ে চর্চার অবকাশ থেকেই যায়। রবীন্দ্রানুরাগী সম্পাদক সেদিকে তাকিয়ে অগ্রসর হয়েছিলেন। প্রথমে ‘রবীন্দ্রগানে এপার বাংলা ওপার বাংলা’ নিয়ে সংখ্যা করে বই করেছেন। তার অব্যবহিত পরের সংখ্যায় ‘রবীন্দ্রগানের ঝরনাতলায়’ প্রকাশিত হয় যা বর্তমানে বইয়ের পাঠকের দরবারে হাজির হয়েছে। এতে সম্পাদক তাঁর ‘সম্পাদকের কথায়’ প্রসঙ্গক্রমে জানিয়েছেন : ‘তিনি আমাদের আঁধার রাতের পথপ্রদর্শক। দুঃখ দিনের দিশা ; তাঁর নিজের যা কিছু সম্বল, তিনি তা উজাড় করে অন্য এক আনন্দময় জগতের সন্ধান দেন আমাদের। তাই বাঙালির বড়ো প্রিয়, আদরের ধন রবীন্দ্রসঙ্গীত বিষয়ের দুটি সংখ্যা প্রকাশ করতে পেরে আমরা আনন্দিত।’ বিজ্ঞাপনী ভাষায় সে আনন্দের ভাগ হবে না। সে আনন্দ প্রকাশে, সে আনন্দ পরশে। তারই আয়োজনে বর্তমান বইটি প্রথমটির বনেদিয়ানায় অবিচ্ছেদ্য।
সম্পাদক বইটিকে মহার্ঘ করে তোলার জন্য রবীন্দ্রনাথের গানের সাঙ্গীতিক পরিসর থেকে বৈচিত্র্যমুখর জীবনের পরতে পরতে তার প্রভাবের প্রতিও দৃষ্টি প্রদান করেছেন। সেখানে শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদের লেখনীর পরশ তাঁর লক্ষ্যে সচল হয়ে উঠেছে। স্বাভাবিকভাবেই তাতে নবীন-প্রবীণের মেলবন্ধন ঘটেছে। অন্যদিকে পুনর্মুদ্রণও অনিবার্য হয়ে উঠেছে। সেখানে যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিভিন্ন পত্র ও অভিভাষণ স্থান পেয়েছে, তেমন তাঁর সমকালের ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, শান্তিদেব ঘোষ, সাহানা দেবী প্রমুখের মূল্যায়নও উঠে এসেছে। আবার সুভাষ চৌধুরী, শোভন সোম, সুধীর চন্দ, মায়া সেন, বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের মতো সঙ্গীতজ্ঞ ও সঙ্গীতশিল্পীও আলো হয়ে উঠেছেন। অন্যদিকে বেশকিছু লেখায় রাজেশ্বরী দত্ত, কনক দাস অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবিনয় রায়, সুচিত্রা মিত্রের মতো রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পীর কথাও আবেদনক্ষম হয়ে উঠেছে। সেখানে অবশ্য তাঁদের কথায় রবীন্দ্রগানের পরিচয় পেলে আরও ভালো হত। তবে দেবেশ রায়, পবিত্র সরকার, রুশতী সেন প্রমুখের লেখার আয়োজনে বইটির প্রয়োজনকে বাড়িয়ে তুলেছে। তারপরে রয়েছে একরাশ টাটকা লেখার আমেজ। স্বপনকুমার মণ্ডল, জগদীন্দ্র মণ্ডল, সঞ্জীবন দত্তরায়, দেবাশিস চক্রবর্তীর মূল্যায়নে রবীন্দ্রগানের আবেদন নানাভাবে বিকশিত হয়েছে। রয়েছে একালের স্বনামধন্য ইমন চক্রবর্তীর অনতিদীর্ঘ সাক্ষাৎকার। তাঁর কথায় নতুন প্রজন্মের কাছে রবীন্দ্রগানের আকর্ষণ নিয়ে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। বরং তিনি এব্যাপারে আশাবাদী। সেদিক থেকে রবীন্দ্রগানের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি নিয়ে বিতর্ক বর্তমান। সেখানে রবীন্দ্রনাথের গানের তীব্র আবেদন জনমানসে কতটা প্রভাবশীল, তা নিয়েও চর্চার অবকাশ বর্তমান বইটিতে বর্তমান।
এছাড়া বইটির শেষে বাংলাদেশের স্বনামধন্য রবীন্দ্রসঙ্গীতজ্ঞ ওয়াকিল হকের ‘রবীন্দ্রগীতির নীলকণ্ঠ ধারক’ প্রবন্ধ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাদানুবাদ সংকলিত হওয়ায় তার মানবৃদ্ধির সহায়ক হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের গানকে নিয়ে বিচিত্র ভাবনার সমাবেশে বইটির আবেদন নানাভাবে বিকশিত হয়েছে। এমনকি, রবীন্দ্রগানহীন পৃথিবীর কথাও সেখানে প্রশ্নাতুর হয়ে উঠেছে। পবিত্র সরকার তাঁর ‘রবীন্দ্রসংগীতহীন পৃথিবী’ নিবন্ধে তাই উপসংহার টানতে গিয়ে সংবেদনশীল পাঠককেই সামনে টেনে এনে বসান : ‘তাই এই গান আমাদের জীবনে নেই, ভাবতে কেমন শিউরে উঠি। কিন্তু তখনই আবার ভাবি, পৃথিবীতে কত অভাব আছে, কত ক্ষুধাতৃষ্ণা আছে, আছে গরীব দেশের মানুষের অনন্ত যাপনদুঃখ, সে সব নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে, রবীন্দ্রসংগীত নামক ক্ষুধাতৃষ্ণা নিয়ে আদিখ্যেতা করছি।’ তাতে অবশ্য অস্বীকারের আধারে স্বীকৃতির আলো আপনাতেই প্রকাশমুখর। সেখানে রবীন্দ্রগানের বহুমাত্রিক আবেদনকে নিবিড় করে তুলে ধরে সম্পাদক বীরেন চন্দ যেভাবে তার চর্চার পরিসরকে তাঁর ‘রবীন্দ্রগানের ঝরনাতলা’য় মাধ্যমে সক্রিয় হয়েছেন, তা শুধু ভেজার আনন্দ দেয় না, সংবেদী মনকে সতেজ করে তোলে, প্রাণে আনে নবপ্রাণের হিল্লোল। খারাপ লাগে পত্রিকার শুধুমাত্র মলাট পাল্টে বই করায় তার আবেদনে সেই পত্রিকার আকাঁড়া উপস্থিতিতে। অবশ্য সুরসিক পাঠকের সেটুকু সয়ে যাবে। কেননা রস তাঁর লক্ষ্য, রসই তাঁর আরাধ্য।
রবীন্দ্রগানের ঝরনাতলায়, সম্পাদনা : বীরেন চন্দ, উত্তরধবনি, শিলিগুড়ি।
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।