এখন নির্যাতিতা বধূর মনের খবরও একটু নেওয়া দরকার। আহা বেচারা। অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছে। শ্বশুর বাড়িতে এসে এহেন যাঁতাকলের মাঝে পড়ে প্রাণ তার আইঢাই। সব সময় শ্বশুর বাড়িকে পরের ঘর মনে করে। শাশুড়ী যখন তাকে খাবার বেড়ে দেয় তখন সে খায়। নিজে সব তৈরি করলেও নিজের হাতে নিজে খাবার উপায় নেই। দৌড়ঝাঁপ করে, গুঁড়ি কুটে, কাঠ জোগাড় করে সব শাশুড়ীর সামনে এগিয়ে দিতে হয় পিঠে তৈরির সময়। যত লোভনীয় খাবারই হোক না কেন কোনও খাবারের স্বাদই সে নিতে পারে না। কিন্তু বালিকা বধূর মন প্রবোধ মানে না। গরম গরম পিঠে শাশুড়ী ছেঁকে তুলছে। রসনায় জল আসে তার। বাড়ির সমবয়সীরা সবাই এক একটা পিঠে নিয়ে তার প্রাথমিক স্বাদ গ্রহণ করছে। অথচ শাশুড়ী কখনোও তার হাতে একটাও এগিয়ে দিচ্ছে না। তখন সেই বধূ নিজের মনকে প্রবোধ দেয় —
‘ওরে মন লক্ পক / ওরে মন সবুর কর / ওরে মন পরের ঘর।’
মন তুমি আমার সঙ্গে এমন শক্রুতা কোরো না। লক্ পক্ (ছটপট) কোরো না। সবুর করতেই হবে। তুমি যে বধূ। আর এটা পরের ঘর। বাপের বাড়ি এটা নয়। তাই হাতে তুলে না দিলে গ্রহণ করা সম্ভব নয়। অতএব ধৈর্য ধর।

বালিকা বধূর এ হেন অসহনীয় অবস্থা ভাবা যায় না। শ্বশুর-ঘর যদিও তার চিরদিনের আপন ঘর তবুও শাশুড়ীর ব্যবহারে তা হয়ে যায় পরের ঘর। শাশুড়ীর নির্যাতনে তার মনটা হেরে যায়। হারিয়ে যায়। পাখির ডানায় বুঝি ভর করে। বাপের বাড়ির স্নেহপ্রবণ ভাই, বোন, বাবা, মার কাছে গিয়ে পাখিটা নামে। আরোও বেশী ভারাক্রান্ত হয় তার কোমল হৃদয়।
খাবার কথা বাদ দিলে এখন আসে কাপড়ের কথা। শাড়ি কিনে দেবার ব্যাপারেও মতামত প্রাধান্য পায় শাশুড়ীর। স্বামীর সঙ্গে দেখা হয় একেবারে রাত্রে। তবে শাশুড়ীর মুখের উপর কথা বলার ক্ষমতা থাকে না তার স্বামীর। অবোধ শিশুর মতো মায়ের কথা মেনে নেয়। পৌষপরব এই সীমান্ত অঞ্চলের শ্রেষ্ঠ উৎসব। সবাই নূতন কাপড় পরে। মনের মতো কাপড়ও পায়। সেই বছর নীল শাড়ির প্রচলন অত্যন্ত বেশি। তাই বধূর মনে আশা জাগে তার বরাতেও ও বুঝি একটা নীল শাড়ি জুটবে। কিন্তু না। শাশুড়ী তাকে একটা হলুদ শাড়ি কিনে দেয়। তাই আন্তরিক মর্মবেদনায় সে গুমরে মরে। টুসুগানের মধ্যে তার ব্যথিত হৃদয়ের আর্তি ফুটে ওঠে —
‘এ বছর পোষ পরবে সবাই পিঁধে লীল শাড়ি / আমায় শাহড়ী দুইনার পাপী নাই দিল গা নীল শাড়ি।’
শাশুড়ীরা দুনিয়াতে একজন মস্ত বড় পাপী। তা নইলে সবাই যেখানে নীল শাড়ি পরে বেরুচ্ছে তখন কেবল হলুদ শাড়ি পড়তে হয় তাকে? এ জীবনের জ্বালা দুঃসহ। শাশুড়ী, ননদ, ভালো ভালো কাপড় পরে, তাকে দেয় না। জাওয়া গানে বধূর অন্তর্দাহ ফুটে ওঠে —

‘শাসু পিঁধে লীল শাড়ি, দিদি পিঁধে লাল শাড়ি, / হামে গ হামে পিঁধে ছিঁটল কম্বল’।
শাশুড়ী দিদিদের লাল শাড়ি, নীল শাড়ি কপালে জোটে। আর বধূর ভাগ্যে ছেঁড়া কম্বল সার।
‘শাহড়ীর কাপড় আড়পাড় / আর বহুর কাপড় ঠেঙ্গা পাড় / সেই কাপড় টাঙ্গনায় ঝুলিছে গা।’
শাশুড়ীর কাপড়ে বিচিত্র নকশা পাড়। উজ্জ্বল ছাপা। আর বউ-এর কাপড় একেবারে সাদাসিদে ঠেঙ্গার (লাঠি) মতো সোজা। কোন নকশা নেই। দৃষ্টি আকর্ষণীয় রঙ নেই। তাই অভিমানবশত বউ সেই শাড়ি না পরে টাঙ্গানায় (কাপড় মেলার তার) ঝুলিয়ে রেখেছে।
বাপের বাড়ি থেকে বধূ যখন শ্বশুর বাড়িতে যায় তখন তার চোখ দিয়ে জল ঝরে। যেন কোনোও এক অজানা নরকে সে চলেছে। সেখানে প্রেম নেই। আছে যাতনা। ভালবাসা নেই। আছে শাসন। তাই তীব্র কণ্ঠে সে বাপ মায়ের নিকট প্রতিবাদ জানায়। টুসু গানে আছে —
‘মায়ে বলে — হেঁ গ বিটি এতো কেনে শুখালি?
বিটি বলে — শ্বশুর গরের ফঁপরা মুড়ি সে খাঁয়ে শুখালি।
আর যাব না শ্বশুরের বাড়ি
হামকে কিলাঁয় দিল শাশুড়ী।’
শ্বশুর ঘরে অনেক সময় ফোঁপরা মুড়ি খেয়েই তাকে দিন কাটাতে হয়। তাই সে এত রোগা হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, অনেক সময় শাশুড়ী কিল, চড়, ঘুষি মারতেই দ্বিধা করে না।
ননদিনীর ওপর বধূর মনোভাব একটু পর্যালোচনা করা যেতে পারে। একা শাশুড়ীতে রক্ষা নেই তারপর আবার ননদ। একা রামে রক্ষা নেই সুগ্রীব দোসর। ননদিনী রায় বাঘিনী সময়ে অসময়ে বধূর ওপর অচ্যাচার চালায়। সেই অত্যাচারের যাতনা এতই তীব্র যে অনেক সময় সে তার ননদিনীর মৃত্যু কামনাও করে —
‘ভাত রাঁধ্যেছি ডাল রাঁধ্যেছি দুধ ঢালেঁছি,
খাবার বেলা খভর আল্য তর ননদ মর্যেঁ গেল,
ননদ মরল্য ভাল হল্য পেটের ভাল জিরুন গেল,
ছট বেলায় সাঁতায় ছিল তাই হতে যমে লেগল্য।’
ননদিনীর মৃত্যু সংবাদ বধূর নিকট আনন্দ সংবাদ। তার পেটের ভাত জিরুন (হজম) হলো। ছোট বেলার সাঁতানো অর্থাৎ কষ্ট দেওয়ার ফল আজ তার ননদ পেয়েছে।
জাওয়া গানে শাশুড়ী অত্যন্ত সংকীর্ণমনা, স্বার্থপররূপে চিত্রিত। তার অত্যাচার প্রবাদে পরিণত হয়েছে। বধূ তাই শুধু ননদ নয় শাশুড়ীরও মৃত্যু কামনা করে —
‘বনে যে গেলে শাসু বাঘে নাহি খাল্য গ
বাঘ্যে খালে হত আউদান।’
শাশুড়ী বনে যায় পাতা আনতে। তখন যদি বাঘের পেটে পড়তো তাহলে তো একেবারে ল্যাঠা চুকে যেত। তাহলে তার আউদানের (আনন্দের) সীমা থাকত না। কিন্তু তা হয় না।
তাই বধূ ভাবে, নারীর জীবনের মূল্য কী? এ তো ক্রীতদাসীর জীবন। না আছে সুখ, না আছে শান্ত। বালিকা বধূ স্বামীর ভালবাসা পায় না। শ্বশুরের স্নেহ পায় না। উপরন্তু শাশুড়ীর অত্যাচারে প্রাণ অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে। স্বামীর কোনোও ব্যক্তিত্ব নেই। সে মায়ের কথায় চলে। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে বধূকে প্রহার করা এমন কিছু নিষ্ঠুর কাজ নয় বলেই তারা মনে করে। সব কথার মধ্যে একটি সহজলভ্য পুরস্কার তার কপলে জোটে, তা হচ্ছে প্রহার। তাই বিরক্ত হয়ে বউ স্বামীর প্রতি কোনো সম্মান প্রদর্শন করে না —
‘খালভরাকে খাতে দিলে চুলহা শালে বসে লো,
উচিত কথা বলতে গেলে পয়না নিয়ে উঠে লো।’

‘খালভরা’ এই অঞ্চলের প্রচলিত একটি গালাগাল। স্বামীকে খেতে দিলেই চুলহাশালে (উনুন শালে) গিয়ে বসে। ভালো কথা বা উচিত কথা বলতে গেলেও পয়না নিয়ে উঠে। তাই তাকে বিশেষ কিছুই বলা চলে না. শাশুড়ীর উস্কানি সর্বদা আছে। স্বামী হয়ে বউ পেটাবে না এমন কুপুক্র জননী কখনোও গর্ভে ধারণ করে নি বলে সগর্বে পাড়া প্রতিবেশীর কাছে প্রচার করে।
যদি বউ-এর সঙ্গে ছেলের বেশি ভাব-ভালবাসা শাশুড়ীর চোখে পড়ে তাহলে ছেলের প্রতি খড়্গহস্ত হয়। তীক্ষ্নকণ্ঠে তার শ্লেষ দু জনের বুকেই শক্তিসেল হানে —
‘নিধন্যার ধন হলে দিনে দেখে তারা
নি মাউগার মাগ হলে বাসে মায়ের পারা।’
মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা-ভালবাসা রাখা ছেলের কর্তব্য। সেই শ্রদ্ধা ভালবাসা আনুগত্য জবর দখল করে নেবে বউ, তা কি শাশুড়ী সহ্য করতে পারে? তাই ছেলের প্রতি বর্ষিত হয় নির্লজ্জ গালাগাল। যার কোনও দিন ধন ছিল না হঠাৎ ধন পেয়ে আহ্লাদে আটখানা হয়ে সে দিবালোকে তারা দেখে। সেইরূপ যার মাগ (বউ) ছিল না হঠাৎ মাগ পেয়ে সে আহ্লাদে আটখানা হয়ে মায়ের মতো তাকে ভালবাসে। তার আনুগত্য স্বীকার করে। মায়ের এ হেন নির্লজ্জ উক্তি স্বাভাবিক ভাবে পুত্র ও পুত্র বধূর মধ্যে ভালবাসা কিছুটা চিড় ধরায়। বধূকে কষ্ট দিয়ে শাশুড়ীর আনন্দলাভের চরম নিদর্শন।
যে বধূর শাশুড়ী নেই তার স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দের প্রকাশও এখানে উল্লেখযোগ্য। শাশুড়ী না থাকায় শ্বশুর ও স্বামীকে নিয়ে সে সুখে সংসার করে। ইচ্ছামত বিচরণ করতে পারে। প্রতি পদে তাকে বাধা নিষেধের গণ্ডীর মধ্যে আবদ্ধ থাকতে হয় না। সবচেয়ে বড় কথা, তাকে উপবাসে দিন কাটাতে হয় না। তাই একটা গানে বধূর আনন্দের বহিঃপ্রকাশ চমৎকার ভাবে প্রকাশিত হয় —
‘যার ঘরে শাসু নাই তার বড় মজারে
ঘনেক বাসি ঘনেক তাতা ঘনেক চালভাজা রে।’
শাশুড়ী-বিহীন ঘরে বধূই সম্রাজ্ঞী। সে অত্যন্ত আনন্দে দিন কাটায়। ঘন ঘন সে বাসি (পান্তা) বা তাতা (গরম) ভাল খেতে পারে। কেউ তাকে বাধা দেবে না। আর মাঝে মাঝে মুখরোচক খাদ্য না হলে তো জমে না। তাই উপাদেয় চালভাজা তারিয়ে তারিয়ে খাওয়া তার কোনও সমস্যাই নয়। কিন্তু যদি শাশুড়ী থাকত তাহলে ক্রীতদাসীর মতো তার জীবন কাটত। পাশাপাশি নির্যাতিতা বধূদের দেখে সে মর্মাহত হয়।

শাশুড়ীও একদিন বধূ ছিল। তাই বধূ ও শাশুড়ীর এই অহি-নকুল সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু তার মধ্যে বধূজীবনের তীব্র অভিমান ও কান্না হৃদয়কে করুণ রসে আপ্লুত করে। সর্বংসহা নারী। কোনও উপায় না থাকায় এ জীবন সে মেনে নিয়েছে। জীবনকে ধিক্কার দেওয়া ও কপালে করাঘাত করা ছাড়া তাদের গত্যন্তর থাকে না। একটি জাওয়া গানের মধ্যে নারী জীবনের আর্তনাদ ধ্বনিত হয়েছে —
‘কলকা ফুল কলকা পুল ফুটে লালে লাল গ,
বিটি ছানার মিছাই জনম কাঁদিছে অন্তর গ।’
সীমান্ত অঞ্চলের নারীজীবন হতাশা, দীর্ঘশ্বাস, ব্যথা, অভিমান, অত্যাচারের এক মূর্ত প্রতীক রূপে বিদ্যমান ছিল। অপরের প্রতি অত্যাচারের উপায় থাকে না বলেই তারা নিজেরাই দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়। তাই বধূ ও শাশুড়ীর এই তিক্ত সম্পর্ক।
আলোচ্য অংশে ছড়া টুসু ও জাওয়া গানের মাধ্যমে শাশুড়ী ও বধূর সম্পর্ক উদঘাটন করা হলো। কিন্তু ঝুমুর, পাঁতা, বাঁধনা, বিবাহ, করম প্রভৃতি গানে শাশুড়ী বধূ সম্পর্কিত অসংখ্য গানের কলি ইতস্তত ছড়িয়ে আছে। যদি সেই গানগুলি একত্রে সংকলিত করা যায় তাহলে একটি জাতীর সাংস্কৃতিক প্রথা ও মানসিকতার দলিল হয়ে উঠবে তা। তবে একাও অনস্বীকার্য যে আজকে সমাজে পরিবর্তন এসেছে। এখন মেয়েরা আত্মনির্ভর হয়ে উঠছে। নানা সরকারি প্রকল্প মেয়েদের সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে সহায়তা করছে। এই পরিবর্তন উন্নত সমাজের প্রতিফলন।