দক্ষিণ পশ্চিম সীমান্ত বাংলা, বিহারের পূর্ব-দক্ষিণ ও ওড়িশার উত্তর-পূর্ব সীমান্ত অঞ্চলের মাটিতে আদি অষ্ট্রেলিয় এবং দ্রাবিড় গোষ্ঠীর পাশাপাশি সহাবস্থান বহুদিন যাবৎ চলে আসছে। সাঁওতাল, কোল, হো, কোড়া প্রভৃতি জাতি নিজস্ব অস্ট্রিক ভাষাকে পরিত্যাগ করেনি। কুর্মি, ভূমিজ, কামার, কুমোর, বাগাল প্রভৃতি সম্প্রদায় ঝাড়খণ্ডী বাংলা উপভাষাভাষী। অবশ্যই এতদঞ্চলে কুর্মদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কোন প্রশ্নই উঠতে পারে না। ধানবাদ, রাঁচির পাঁচ পরগণা, সেরাইকেলা, ধলভূম, পুরুলিয়া ও ঝাড়গ্রাম জুড়ে কর্মিরা অত্যন্ত ঘনসংবদ্ধ বসবাস করে। কুর্মিদের আদি বাসভূমি শিখরভূমি। সেখান থেকেই তারা বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে। ভাষা প্রধানত কুর্মালি। কিন্তু বেশীর ভাগ অঞ্চলে কুর্মিরা ঝাড়খণ্ডী বাংলা উপভাষায় কথা বলে। গান গায়। মৌখিক সাহিত্য রচনা করে। ডঃ সুধীর করণ তাঁর সীমান্ত বাংলার লোকযান গ্রন্থে বলেছেন — এদের বাদ দিলে সীমান্ত বাংলাও থাকে না, সীমান্ত সংস্কৃতি থাকে না।
এই মানুষগুলি সারাদিন প্রচণ্ড পরিশ্রম করেন। তাই হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর সন্ধ্যাবেলা উন্মুক্ত উঠোনে বসে তাদের সাহিত্যচর্চা আরম্ভ হয়। বিভিন্ন ঋতু আসে যায়। কখনো কচি ধানক্ষেতের মাথায় রূপালি শিশির বিন্দু শিশু সূর্যের সোনা রঙ গায়ে মেখে ঝলমলিয়ে হাসে। আবার কখনো বা সবুজ ধানক্ষেত সোনালি টোপর মাথায় পরে লক্ষ্মীর আগমনবার্তা সোচ্চারে ঘোষণা করে। মহুয়া ফুলের মধু ঝরে। শাল গাছের কচি শালফুলের গন্ধে ম-ম করে বনভূমি। কোকিলের পাগল করা কুহুধ্বনি শোনা যায়। মাদল বেজে ওঠে। ধামসার গুরুগম্ভীর আওয়াজ পাহাড়, ডুংরি প্রকম্পিত করে। সীমান্ত অঞ্চলের আঙ্গিনায় চলে শিল্পের সাধনা। পল্লি জীবনে রচিত হতে থাকে সুর ও বাণী। গল্প, রূপকথা, ছড়া, গান ও প্রবাদে টাইড়-টিকর, পাহাড়, পর্বত, মালভূমি বনভূমির মানুষেরা আনন্দে উদ্বেল হয়। এই সময় জীবনমন্থন করা দু’ কলি করে ছড়া বা গান রচিত হয়। তাতে অত্যন্ত নিখুঁত ভাবে চিত্রিত হয় তৎকালীন সামাজিক ও অর্থনৈতিক চিত্র। মানুষগুলোর বৈশিষ্ট্যও ধরা পড়ে সহজে। বিভিন্ন সম্পর্কযুক্ত মানুষের বিবাদ-বিসম্বাদ ছড়ায় গানে চমৎকার বিধৃত হয়ে আছে।

সীমান্ত অঞ্চলের শাশুড়ী ও বধূর সম্পর্ক অনেক সময় মধুর হয় না। শাশুড়ীর একটা জাতক্রোধ থাকে বধূর ওপর। অবশ্য ননদের সঙ্গেও বধূর ছুরি কাটারি সম্পর্ক। কৃষ্ণলীলার রাধা, জটিলা ও কুটিলার সম্পর্কের কথা তো সবারই জানা। শাশুড়ী ও ননদিনী রাধিকার জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছিল। তেমনি শাশুড়ীও বধূর জীবনকে মরুভূমি করে তোলে। কেন বধূর প্রতি এই আক্রোশ? তার অবশ্যই কারণ আছে। শাশুড়ী একদিন বধূ ছিল। তার শাশুড়ীর কাছ থেকে অমানুষিক নির্যাতন তাকে সহ্য করতে হয়েছিল। সেই কষ্টের কোন সীমা ছিল না। তাই স্বাভাবিক ভাবেই বধূ নির্যাতনের মানসিকতা তার মধ্যে জন্ম নেয়। নিজে লাঞ্ছিতা। তাই বধূকে লাঞ্ছনা করার মধ্যে তার যেন কোনো অপরাধবোধ থাকে না। নির্যাতিতা বধূ চোখে জল ফেলে। কিন্তু তাতে পোড়খাওয়া শাশুড়ী বিন্দুমাত্র দয়া প্রদর্শন করে না। প্রচলিত কয়েকটি ছড়ার মধ্যে তীব্র রোষ ও ক্ষোভ ঝরে পড়ে বালিকা বধূর ওপর। বধূ সারাদিন প্রচণ্ড পরিশ্রম করে। শাশুড়ী গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায়। পাড়ার ঘরে ঘরে গল্পের আসর জমায়। তার কোন দায়িত্ব নেই। তবে বউ-এর সামান্যতম ক্রটিও কিন্তু সে সহ্য করে না। হয়তো রান্নায় সামান্য ভূল হয়েছে। ডালে একটু নুন বেশী হয়েছে অথবা ভাত গলে গিয়েছে আর যায় কোথায়? তীক্ষ্নকণ্ঠে চেঁচিয়ে ওঠে শাশুড়ী। কারণ বধূর ছিদ্র অনুসন্ধান করাই তো এখন তার প্রধান কাজ। বধূর উদ্দেশ্যে নিক্ষিপ্ত হয় ছড়ার অগ্নিবাণ —
লাগপুরকা ছাঁটল চাল বুচা ডড়ের পানী / বৈসল বৈসল ভাত রাঁধে কেঁওঝরকা রাণী।
নাগপুরের ছাঁটা চাল, বুচা ডঁড় নামক সরোবরের কাকচক্ষু জল এনে কোন পরিশ্রম না করে কেঁওনঝরের রাণীর মত ভাত রাঁধছ। অর্থাৎ তোমাকে চাল ছাঁটতে হচ্ছে না ঢেঁকিতে, জল তুলতে হচ্ছে না তিরিশ হাত গভীর কুঁয়ো থেকে।

কী নির্মম অথচ মিথ্যা উক্তি। বধূ ঢেঁকিতে ধান ভেনেছে। আর তিরিশ হাত গভীর কুয়ো থেকে জলও এনেছে। বিনা পরিশ্রমে রানীর মত বসে বসে কি রান্না করা সম্ভব? তবুও শাশুড়ীর মুখের ওপর মুখ দিতে পারে না। শ্বশুর ও স্বামী সব শুনেও নীরব। তারা যেন ধরে নিয়েছে শাশুড়ীর একথা বলার এক্তিয়ার আছে। তাই সবাই নীরব। যদিও-বা প্রতিবাদের ক্ষীণ স্বর বেরিয়ে পড়ে তবে আর রক্ষে নেই। শাশুড়ী পাড়া মাথায় করে নেচেনেচে গালাগালি দেবে। তাই বধূ নীরবে এই মিথ্যা অভিযোগ মেনে নিতে বাধ্য হয়। আবার খাবার সময় কোনক্রমে যদি দেরী হয় তবে শাশুড়ীর ক্ষুরধার ব্যঙ্গ তাকে বিদ্ধ করে —
হেলায় গেল বেলা, জোসনায় ঘাঁটে ধান, / চলরে কলসি জলকে যাব ভানরে ঢেঁকী ধান
আসল সময় কাজ না করে হেলায় বেলা কাটায় বউ। এত ব্যস্ত যে সেদ্ধ ধান রোদে না মেলে জ্যোৎস্নার আলোয় ধান শুকোচ্ছে। কলসিকে জল, আনতে বললেই তো জল আসবে। আর ঢেঁকীকে ধান ভানতে বললেই বুঝি ভানবে। বউ সময়মত গতর না নাড়লে কি আর মন্ত্রে কাজ হবে? দেরী তো হবেই। বউ-এর দোষে অসময়ে সবাইকে কষ্ট পেতে হয়।
শাশুড়ী সর্বদা বধূকে চোখে চোখে রাখে। উনুনে বেশী কাঠ খরচ করা চলবে না। কথা না শুনলে শাশুড়ীর রসনা চলকে উঠবে।
একটা কাঠে ঠাকার ঠুকুর দুটো কাঠে ধোঁয়া / তিনটা কাঠ লাগাঁয় দিয়েঁ ঠ্যাং পাঁসরায় ঘুমা।

একটা কাঠ বা দুটো কাঠ লাগিয়েই যেন রান্না হয়। সব সময় তিনটা কাঠ বা বেশী যেন উনুনে লাগানো না হয়। বউ যেন একটু ধোঁয়া সহ্য করেই রান্না করে। তিনটে কাঠ উনুনে দিয়ে আরামে পা ছড়িয়ে রান্না করতে দেওয়া হবে না। স্বামী আর পুত্রের কাছেও শুনিয়ে শুনিয়ে বধূকে খোঁটা দেয় শাশুড়ী —
বাদলে বাদলে বেলা যায় / শিয়ান বহু তিনবার খায়।
শিয়ান অর্থাৎ চালাক বউ দিনে তিনবার খায়। বউকে জব্দ করে রাখা শাশুড়ীর পক্ষে যে কত কঠিন তা সরবে স্বামী-পুত্রের নিকট ঘোষণা করে। আর বউ মরমে মরে। লজ্জায় অধোবদন হয়। সবই মিথ্যা কথা। বরং উল্টোটাই ঘটে। কোনও কোনও দিন বউকে খেতেই দেয় না। উপবাসে দিন যায়। সন্ধ্যাবেলায় তাই ম্রিয়মাণ বধূ দাঁতন কাঠি নিয়ে দাঁত মাজে। হঠাৎ সেই সময় হয়তো ছেলে বাড়ি এসে বউকে এই অবস্থায় দেখে ফেলে। এই সময় কিছু জুতসই কথা না বললে বধূ নির্যাতন দেখে ছেলে হয়তো বিগড়ে যাবে। তাই শাশুড়ী বলে —
তিন বেলা খায় তিনবাটি / আর সৈঁয়াকে দেঁখে দাঁতন কাঠি।
হায়! বালিকা বধূর অহসনীয় অবস্থা। এতবড় মিথ্যা অপবাদ তাকে নীরবে সহ্য করতে হয়। স্বামীকে দেখে সে কখনোই দাঁতে কাঠি দেয়নি। সারাদিন কাজের মধ্যে ছিল। খেতে দেওয়া হয়নি তাকে। তাই মুখ ধুয়েই বা কি হবে? এই জন্য সন্ধ্যার প্রাক্কালে অবসর মুহূর্তে সে দাঁতে কাঠি দিয়েছিল। তবুও অপরাধ। প্রতিবাদ করা জন্য তার শরীরটা কাঠের মত দৃঢ় হয়। কিন্তু ভরসা হয় না। ঝগড়া করতে গেলে শ্বশুর বা স্বামী কাউকে সাথে পাবে না। সবাই যেন বধূর প্রতি শাশুড়ীর এই নির্যাতন প্রথাসিদ্ধ বলে মেনে নিয়েছে। অসহ্য ব্যাথায় গুমরে মরে তার নির্যাতিত হৃদয়। অন্তরে কান্নার ঢেউ। কিন্তু বুকের বেলাভূমিতেই আছাড় খেয়ে ঢেউ মিলিয়ে যায়। স্বামীর বুকে এই ঢেউ আঘাত হানবে না।

পূজা পার্বণে প্রতি বাড়িতে পিঠা হয়। আনন্দমুখর পরিবেশ। গুঁড়ি কোটা থেকে সব কাজই বধূকে করতে হয়। স্বাভাবিক ভাবেই এই কাজের জন্য পিঠা তৈরী হতে একটু দেরী হবে। সেই দেরী অনুমান করে কর্মরত বধূর ওপর শাশুড়ী জিভের টাঙ্গি শানায়। স্বামী ও পুত্রের নিকট বধূর গাফিলতি তুলে ধরে।
গুঁড়ি কুইটতে হলা সাঁঝ / থাকুক পিঠা ভাতই রাঁধ।
শাশুড়ীর রসনায় ক্ষুরের ধার। বধূর গলায় নেমে আসে সেই ক্ষুর। তীব্র যাতনায় কুঁকড়ে যায় পল্লির বালিকাবধূ।
‘কাজে নাই পাইটে বহড়ী, (বধূ) / লাউ কাইটতে দৌড়াদৌড়ি।’
অথবা
‘কলির বউ ঘর ভাঙ্গানী।’
এই ভাবে ছড়ার মধ্যে শাশুড়ীর বধূ নির্যাতনের অসংখ্য নমুনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আর মুখে মুখে এই ছড়া দীর্ঘদিন যাবৎ প্রচলিত হয়ে আসায় এটি সহজেই অনুমান করা যায় যে তৎকালীন সমাজ কিরূপ ছিল। ছড়ায় গানে সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক এমনভাবে বিধৃত হয়ে আছে যে তা বিশ্লেষণ করলে সহজেই প্রকৃত চিত্র ধরা পড়বে। ছড়া থেকে যে বৈশিষ্ট্য আমরা আবিষ্কার করলাম তা নিষ্ঠুর হলেও নির্মম সত্য। (চলবে)