শ্রীমৎ স্বামী সারদানন্দ মহারাজ শ্রী রামকৃষ্ণ লীলা প্রসঙ্গ গ্রন্থের দ্বিতীয় ভাগে লিখেছেন যে ঠাকুর রামকৃষ্ণ সারদা মাকে বলেছিলেন “বিষ্ণুপুর হ’ল গুপ্ত বৃন্দাবন, অতি পবিত্র স্থান! সারদা তুমি একবার দেখে আসবে”। পরবর্তী কালে সারদা দেবী একাধিক বার বিষ্ণুপুর এসেছেন। বিশেষ করে কোলকাতার সঙ্গে রেল যোগাযোগ চালু হওয়ার পর তিনি পালকিতে বা গরুর গাড়িতে জয়রামবাটী-কামারপুকুর থেকে বিষ্ণুপুর এসে ট্রেনপথেই কোলকাতা যেতেন।

স্টেশনেও তিনি বসতেন এক কাঁঠাল গাছের নিচে। শতবর্ষ প্রাচীন সে গাছ আজও আছে বিষ্ণুপুর রেল স্টেশনে।এখন থেকে একশো দু বছর আগে ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯২০ শ্রীশ্রী মা সারদা শেষ বারের মতো বিষ্ণুপুর থেকে দক্ষিণেশ্বরে গিয়েছিলেন গোমো হাওড়া ফাস্ট প্যাসেঞ্জার ট্রেনের যাত্রী হিসেবে।

বিষ্ণুপুর গড়দরজা এলাকার বাসিন্দা সুরেশ্বর সেন মহাশয় ছিলেন মায়ের পরম ভক্ত। তার বাড়ীতেই মা বিশ্রাম নিতেন। দোতলার ঘরে তিনি থাকতেন। সুরেশ্বর সেন ছিলেন বিজ্ঞানী ও কৃষিবিদ তথা ঠাকুর ও স্বামী বিবেকানন্দের পরম ভক্ত বশীশ্বর সেনের বড় ভাই। মা তাঁকে বলতেন দ্বিতীয় গিরিশ। মায়ের প্রতি কতটা ভক্তি ছিল তার উল্লেখ পাই যখন দেখি সুরেশ্বর গরুর গাড়ি থেকে গরু খুলে ছেড়ে দিচ্ছেন আর নিজে মায়ের গাড়ি টেনে ঘরে নিয়ে আসছেন। তার অনুজ বশীশ্বর সেন ছিলেন একাধারে বিজ্ঞানী অন্যদিকে আধ্যাত্মিক চেতনায় সমৃদ্ধ পুরুষ। যিনি স্বামীজির ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত, জগদীশচন্দ্র বসুর এক কালের সুযোগ্য সহকারী আর ভগিনী নিবেদিতার বিশেষ স্নেহধন্যে বিবিধ গবেষণার পুরোধা গবেষক। দেশ-বিদেশের বিজ্ঞানীদের কাছে তিনি বশী সেন নামেই পরিচিত ছিলেন।

উদ্ভিদ বিজ্ঞানী বশীশ্বর সেন (১৮৮৭, ৩১ আগষ্ট, ১৯৭১) ১৯২৪ সালে কলকাতার ৮ নম্বর বোসপাড়া লেনে স্থাপনা করেন ‘বিবেকানন্দ ল্যাবরেটরি’। ১৯৩৬ সালে স্বামীজির অন্যতম প্রিয় পাহাড়ি স্থান আলমোড়ায় তা স্থানান্তরিত করেন। তিনিই ভারতে প্রথম গম, ভুট্টা, জোয়ার, বাজরার সফল সঙ্করায়ণ ঘটান। তাঁর উদ্ভিদ কোষতত্ত্ব, শারীরতত্ত্ব, উদ্ভিদ হর্মোন সংক্রান্ত গবেষণা উচ্চপ্রশংসিত হয়েছিল। পঞ্চাশের মন্বন্তর তাঁকে ফলিত উদ্ভিদ বিদ্যার গবেষণায় প্রেরণা যোগায়। দরিদ্র, বুভুক্ষু মানুষের জন্য কৃষি বিজ্ঞানে কাজ করে ১৯৫৭ সালে তিনি পদ্মভূষণ উপাধি লাভ করেন। ১৯৬২ সালে তিনি ‘ওয়াতুমল ফাউন্ডেশন পুরস্কার’ লাভ করেন। তিনি ভারতে সবুজ বিপ্লবের অন্যতম পুরুষ। তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৭৪ সালে উত্তর প্রদেশ সরকার আলমোড়ার গবেষণা কেন্দ্রটি কেন্দ্রীয় সরকারের আই.সি.এ.আর-কে হস্তান্তর করে। এর নতুন নাম হয় ‘বিবেকানন্দ পার্বত্য কৃষি অনুসন্ধানশালা’।

বশী সেনের সহধর্মিনীর নাম গারট্রুড এমার্সন। আমেরিকান এই মহিলা শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক এবং রয়্যাল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটির ফেলো, ‘এশিয়া’ পত্রিকার সম্পাদিকা এবং আমেরিকান এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্যা। তাঁর লেখা গ্রন্থ ‘ভয়েসলেস ইণ্ডিয়া’-র ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। প্রকৃতপক্ষে স্বামী-স্ত্রীর যৌথ উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল বিবেকানন্দ ল্যাবরেটরি। স্বামীজির শিষ্য-শিষ্যারা তাদের নানাভাবে সহায়তা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিজ্ঞান গ্রন্থ ‘বিশ্বপরিচয়’ শেষ করেন আলমোড়ায় এসে। বশী তখন আলমোড়ায় গবেষণা কেন্দ্রে কর্মরত। তিনি বশীকে গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি দেখিয়ে নেন। বশী অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে পুরো পাণ্ডুলিপিটি পড়েন। রবীন্দ্রনাথ তাতে অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন তা বইটিতে লিপিবদ্ধ আছে।

দুংখের বিষয় বিষ্ণুপুর তার এই মহান সন্তানের আবির্ভাব ও তাঁর কর্মকাণ্ড সম্বন্ধে অনেকটাই উদাসীন থেকে গেছে। মায়ের ইচ্ছা ছিল বিষ্ণুপুরের এই বাড়ীতে একটি স্থায়ী শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠুক। বশী সেন ও পরবর্তী কালে ওনার বিদেশীনী স্ত্রী এই কাজকে অনেকটাই এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন কিন্তু তা সম্পুর্ণ হয় নি।

পাশেই রয়েছে গোঁসাই পুকুর বলে একটি ছোট পুকুর যেখানে শ্রীমা এখানে থাকার সময় স্নানাদি করতেন। শ্রী সারদা মায়ের পদধূলি বিজড়িত এই ঐতিহ্যময় বশী সেনের বাড়িটি আজ অনেকেই দেখতে আসেন। ভবিষ্যত হয়তো একদিন মা সারদার ইচ্ছে অনুযায়ী এখানে রামকৃষ্ণ ভাবধারা কেন্দ্র গড়ে উঠবে। বিষ্ণুপুরের কাছে যা হবে এক বিশাল সম্পদ।
Pore darun laglo. Bidya dadati binay – poriskar phute othe sejuger kahini te
খুব সুন্দর গবেষণাধর্মী লেখা। বশী সেনের মত একজন বিখ্যাত ব্যক্তির নাম আমরা ভুলতে বসেছি। লেখক অত্যন্ত যত্ন সহকারে বশী সেন ও তাঁর কর্ম কাণ্ড সম্পর্কে তার লেখায় গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন। এজন্য অবশ্যই লেখকের ধন্যবাদ প্রাপ্য। লেখকের প্রস্তাব মত বিষ্ণুপুরের বিদগ্ধ ব্যক্তি বর্গ বশী সেনের ও তাঁর স্ত্রীর ছেড়ে যাওয়া কাজ সুসম্পন্ন করেন তাহলে শুধু বলি সেন কেই সম্মান জানানো হবে না বিষ্ণুপুর ও উপকৃত হবে।
তথ্য মূলক এই লেখাটি অন্যত্র আগেও পড়েছি আবার পড়লাম । ভালো লাগলো।
এমন সুলিখিত এবং মহা মূল্যবান তথ্য সমন্বিত রচনাটি শ্রীমা সারদা দেবীর সঙ্গে মন্দির শহর বিষ্ণুপুরের ঘনিষ্ঠ সংযোগের অসামান্য কাহিনী তুলে ধরেছে। বিষ্ণুপুর এক সম্পূর্ণ অন্য মাত্রায় উদ্ভাসিত হল। শ্রী শ্রী মায়ের প্রতি গভীর ভক্তি ছাড়াও ভারতীয় কৃষি ও সবুজ বিপ্লবে বশী সেনের এমন অবদানের কথা জেনে সমৃদ্ধ হলাম।
তথ্যপূর্ণ। খুব ভালো লাগলো।
অসম্ভব সুন্দর তথ্য নির্ভর লেখা। আপনার লেখা টি পড়ে বিষ্ণুপুর সম্পর্কে নতুন করে কৌতূহল ও আগ্রহ বাড়লো।
আগামী দিনেও এরকম নতুন কিছু জানার ইচ্ছে রইলো।
তথ্যপূর্ণ।