| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

দেবল দেব এবং ‘বসুধা’ : দীপাঞ্জন দে

Reporter
দীপাঞ্জন দে / ২১০২ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২২

প্রকৃতি পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য দেবল দেবের দীর্ঘ সংগ্রামের কথা আপনাদের অনেকেরই জানা আছে নিশ্চয়। অনেকেই তাঁকে বলে থাকেন ‘প্রকৃতিরক্ষক দেবল দেব’। তাঁর সেই নিরলস সংগ্রামেরই স্থায়ী রূপ হল বাঁকুড়া জেলার বিনোদবাটি গ্রামের ‘বসুধা’। দেশি প্রজাতির ধান উৎপাদনে আগ্রহী কৃষকদের কাছে ‘বসুধা’ একটি পরিচিত নাম। গ্রামের মানুষদের কাছে জায়গাটি এক কথায় ‘কৃষিবিজ্ঞান কেন্দ্র’ হিসেবে পরিচিত। পুরো নামটি হল ‘বসুধা — আরণ্য কৃষি কেন্দ্র’। বাঁকুড়া জেলার বিনোদবাটি গ্রাম— জনঘনত্ব খুবই কম, জঙ্গল এলাকা বলা চলে। পনেরো ক্রোশ দূরেই শুশুনিয়া পাহাড়। সেখানেই দেশীয় প্রজাতির গাছগাছালিতে ভরপুর একখণ্ড জায়গায় গড়ে উঠেছে ‘বসুধা’, যার অর্থ পৃথিবী। বসুধার মাটির বাড়ি, বাগান, লিজের জমি সহ প্রায় ১০ বিঘার কাছাকাছি এলাকা। পরিবেশবিদ দেবল দেব জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের প্রচেষ্টায় সেখানে ‘বসুধা — আরণ্য কৃষি কেন্দ্র’ গড়ে তুলেছেন। বিংশ শতকের সত্তরের দশকেই দেশীয় প্রজাতির ধান সংরক্ষণের ক্ষেত্রে পথ প্রদর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন আর এইচ রিছারিয়া। পরিবেশবিদ দেবল দেব নব্বইয়ের দশক থেকে দেশীয় প্রজাতির ধান সংরক্ষণে মনোনিবেশ করেন এবং এই আন্দোলনকে এক অন্য মাত্রা দেন। ১২ বছর আগে দেবল দেব বাংলা ছেড়ে ওড়িশাতে চলে গেছেন এবং সেখানে নিয়ামগিরি পাহাড়ের কোলে বসুধা কৃষি খামার প্রতিষ্ঠা করেছেন। সেই থেকে সেখানেই পুরোদমে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের কাজ চলছে। আর বাংলার বসুধা প্রাঙ্গণ ১২ বছর পরে আবার পুনর্নির্মিত হয়েছে মাত্র তিন মাস আগে (জুন, ২০২২)।

কৃষিবিজ্ঞানী দেবল দেব চাষীবন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে হাতে কলমে তাদের দেশীয় ধানের বীজ সংরক্ষণের পন্থা ও এর প্রয়োজনীয়তার কথা শিখিয়ে চলেছেন। সবুজ বিপ্লবের আগে সমগ্র ভারতবর্ষে প্রায় এক লক্ষ দশ হাজার দেশীয় প্রজাতির ধানের অস্তিত্ব ছিল বলে জানা যায়। আর পশ্চিমবঙ্গে ছিল প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার দেশীয় প্রজাতির ধান। সবুজ বিপ্লবের হাত ধরে এল উচ্চ ফলনশীল ধান। কৃষকেরা ঘরের বীজের কথা ভুলে গিয়ে প্রত্যেকবার চাষের সময় নতুন বীজ কিনতে অভ্যস্ত হলেন। এই প্রথম চাষীকে বীজ কিনতে হল। তৈরি হল বীজের বাজার। এভাবেই চাষীদেরকে তৈরি করা হল। আর তাদের ঘরে পড়ে রইল দেশীয় ধানের বীজ। বছরভর চাষ না হওয়ায় সেগুলি পড়ে পড়ে নষ্ট হল। ক্রমান্বয়ে সেই সব দেশীয় প্রজাতি হারিয়ে যেতে থাকলো। যদিও গবেষণায় প্রমাণিত যে, দেশীয় প্রজাতির অনেক ধানই উচ্চ ফলনশীল ছিল। ড. দেবল দেব যেমন আজ থেকে প্রায় ১২ বছর আগেই উচ্চ ফলনশীল দেশীয় ধানের ১১টি জাত খুঁজে পেয়েছিলেন। সবুজ বিপ্লবের ফলে স্বতন্ত্র স্বাদ, গন্ধ, ঔষধিগুণসম্পন্ন দেশীয় প্রজাতির ধানগুলি হারিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে জীববৈচিত্র্যের ক্ষতিসাধন করা হয়। যে সকল দেশীয় ধান বিশেষ পরিস্থিতির জন্য ছিল, যেমন— অতিবৃষ্টি বা বন্যা, অনাবৃষ্টি বা খরা, অথবা নোনাজল সহিষ্ণু ধান প্রভৃতি হারিয়ে গেল। এরফলে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে চাষ যেন অসম্ভব হয়ে পড়ল।

প্রকৃতিরক্ষক দেবল দেব এক প্রকার দুরূহ লড়াই চালিয়ে দেশীয় প্রজাতির ধান সংরক্ষণের প্রচেষ্টায় নিয়োজিত হন। প্রথমে দেবল দেব এবং তার সহযোগী কৃষক বন্ধুরা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গা থেকে দেশী ধানের বীজ সংগ্রহ শুরু করেন। ব্রীহি বীজ বিনিময়কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়। ধীরে ধীরে সমগ্র ভারত থেকে চাষীবন্ধুরা তাদের সংগ্রহে থাকা দেশীয় ধানের বীজ বসুধায় জমা করেন। বিনিময়ে তারা নিজেদের পছন্দমত অন্য কোনো দেশীয় ধানের বীজ সংগ্রহের সুযোগ পান। এভাবে কোনো প্রকার আর্থিক বিনিময় ব্যতিরেকেই ড. দেবল দেব বসুধার এই বিশাল কর্মযজ্ঞ আজও চালিয়ে যাচ্ছেন। বায়োপাইরেসি বা বীজডাকাতির হাত থেকে দেশীয় ধানের বৈচিত্র্যকে রক্ষা করার যে লড়াই ড. দেবল দেব শুরু করেছিলেন, তাতে ‘টিম বসুধা’ এখনো অবিচল। তাদের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার ফলেই হারিয়ে যাওয়া দেশীয় ধান সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, লুপ্তপ্রায় বিভিন্ন উদ্ভিদকে বাঁচানো— প্রভৃতি সকল কাজ সম্ভব হচ্ছে। দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার ফলে বর্তমানে তাঁর সংগ্রহে ১,৪৮০ প্রকার দেশীয় প্রজাতির ধান রয়েছে। সবকটির চাষ বর্তমানে ওড়িশাতে হচ্ছে। বসুধায় কালো চালেরই প্রায় ৯টি জাত চাষ করা হয়, যেমন হুগ্গি ভুটা, চখাও পৈরেইথন, কারুপ্পু কাউনি প্রভৃতি। এছাড়াও দেশীয় প্রজাতির অন্যান্য ধানের মধ্যে রয়েছে তুলসিমুকুল থেকে শুরু করে বহুরূপী, সরু নাগরা, মুখি বালাম, ত্রিকোণ নাদি, পরমায়ু শাল, রূপশাল, ঝিঙ্গাশাল, টেংরা পাটনাই, বাদশা ভোগ, কয়া, কেলাস, অসিতকর্মা, গোবিন্দভোগ, কালা ভাত, কাটারিভোগ, ভুতমুড়ি, রেড রাইস, কবিরাজশাল, ভালুদুবরাজ আরো কত কী! রয়েছে যুগল ধান, সতীন ধানের প্রজাতিও— যা একেবারেই বিরল।

ড. দেবল দেব ১৯৯৩ সালে কোনো প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ছাড়াই জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় আলোচনার জন্য ‘সেন্টার ফর ইন্টারডিসিপ্লিনারি স্টাডিজ’ (CIS) নামে একটি ফোরাম প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথম চার বছর তারা বিভিন্ন বিষয়ে একাধিক সেমিনার আয়োজন করেছিলেন। ফিল্ম তত্ত্ব থেকে শুরু করে পেন্টাটোনিক সংগীত, সমাজবিজ্ঞান, জনসংখ্যার রাজনীতি, তৃতীয় বিশ্বের ওষুধ, প্রকৃতি সংরক্ষণ প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়ে কলকাতায় বিশিষ্ট গবেষক এবং ছাত্রদের নিয়ে সেমিনারগুলি হয়েছিল। ১৯৯৫ সাল থেকে CIS-এর কর্মকাণ্ডের মধ্যে ক্ষেত্র গবেষণা অন্তর্ভুক্ত হয়। সুন্দরবনের একটি ব-দ্বীপে একটি ছোট অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সমীক্ষা দিয়ে সেই কাজের শুরু হয়। লক্ষ্য ছিল শস্যের জিনগত বৈচিত্র্য এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য উপযোগী ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের উপর গুরুত্ব দেওয়া। এছাড়াও সিআইএস কৃষকদের অধিকার, দেশীয় জ্ঞানের উপর কর্পোরেট দুনিয়ার আধিপত্য প্রভৃতি বিষয়গুলি নিয়ে চর্চা শুরু করে। এভাবে গবেষণা এবং ডকুমেন্টেশনের কাজ চলতে থাকে। তবে ১৯৯৬ সালের শেষের দিকে ড. দেবল দেব নিজের চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর সিআইএস-এর কাজের গতি আরো বৃদ্ধি পায়। ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে সিআইএস একটি ট্রাস্ট হিসাবে নিবন্ধিত হয়। ১৯৯৭ সাল থেকে সিআইএস পূর্ব ভারতে দেশীয় শস্যের বৈচিত্র্য সংরক্ষণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। ১৯৯৭ সালে তারা ‘রিসার্চ ফাউন্ডেশন ফর সায়েন্স, টেকনোলজি অ্যান্ড ইকোলজি’ বা RFSTE (নিউ দিল্লি) -এর সঙ্গে যৌথভাবে ’ব্রীহি’ নামে একটি দেশীয় ধানের জিন ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠা করে। এটি পূর্ব ভারতের প্রথম এবং সর্ববৃহৎ দেশীয় ধানের জিন ব্যাঙ্ক। সংস্কৃতে ‘ব্রীহি’ শব্দের অর্থ ‘ধান’। এখান থেকে বিরল দেশীয় শস্যের বীজ কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়, উদ্দেশ্য সেগুলিকে সংরক্ষণ করা।

বসুধায় পরিবেশগত চাষের কৌশল, পরিবেশগত স্থাপত্য, বৃষ্টির জল সংগ্রহ, মাটি সংরক্ষণ, স্থানীয় জৈব-সম্পদ সংরক্ষণ প্রভৃতির ব্যবহারিক প্রয়োগ দেখতে পাওয়া যায়। বসুধা হল স্থানীয় সম্পদ-ভিত্তিক সম্প্রদায় উন্নয়নের একটি ক্ষুদ্র মডেল, যেখানে গ্রামবাসীরা স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণ করে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য সহায়ক স্থানীয় সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টায় বসুধা গ্রামবাসীদের উৎসাহ দিয়ে থাকে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় যে, দেবল দেবের নেতৃত্বে সিআইএস স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী স্যাক্রেড গ্রোভস (পবিত্র থান) এবং পবিত্র পুকুর, যেগুলি বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল, সেগুলি চিহ্নিতকরণে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। সিআইএস দেশের বিভিন্ন স্থানে কৃষকদের কর্মশালারও আয়োজন করে। শস্যের জিনগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক কৃষি কৌশল, জীববৈচিত্র্যের নথি প্রস্তুত প্রভৃতি বিষয়ে কৃষক ও বিভিন্ন এনজিওকে তারা প্রশিক্ষণও দিয়ে থাকে।

প্রকৃতিরক্ষক দেবল দেবের মস্তিষ্কপ্রসূত বসুধায় কৃষি বিজ্ঞানে আগ্রহী মানুষদের আনাগোনা লেগেই থাকে। সেই তালিকায় সাধারণ চাষী থেকে গবেষক, বিজ্ঞানী, প্রকৃতিপ্রেমী— কে নেই! বসুধায় দেবল দেব এমন এক পরিকাঠামো তৈরি করেছেন, যেখানে জৈবকৃষি পদ্ধতিতে চাষবাস, দেশীয় প্রজাতির গাছপালা সংরক্ষণ, ইকোলজিকাল আর্কিটেকচার, সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন, জল সংরক্ষণ, মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি, ইকোলজিক্যাল স্যানিটেশন প্রভৃতি ব্যবহারিকভাবে প্রদর্শিত হয়। এছাড়াও দেবল দেব বসুধায় শিশির, কুয়াশা থেকে পানীয় জল সংগ্রহ করে দেখিয়েছেন। সেখানে রয়েছে বাঁশ ও মাটি দিয়ে তৈরি খাট, বাঁশের তৈরি স্নানাগার। বসুধা — আরণ্য কৃষি কেন্দ্রে গাব, করঞ্জ, মহুয়া, অনন্তমূল, সৎমূল, দুধেলতা, লেদা, কদম, আমলকী, শেওড়া, বহেড়া, নিম, মহানিম, শাল, সজিনা, গামার, পাকুড়, শিমুল, কৃষ্ণচূড়া, বাগান শিরীষ, শিমুল, গুড়মার, বকুল, চালতা, পাকুড়, পিপুল, ছাতিম, পান, লাল শিরীষ, শ্বেত শিরীষ, ধঞ্চে, ময়না মন্তা, আঁচ, মহানিম, বেঁচকুল, খুদিজাম, ডুমুর, শেওড়া, চুর্চুমনের মতো অসংখ্য দেশীয় প্রজাতির গাছপালা দেখতে পাওয়া যায়।

বসুধার যে দোতলা মাটির বাড়ি, সেটির কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। বিজ্ঞানী থেকে গবেষক, শিক্ষক বা ছাত্র-ছাত্রী যারাই বসুধায় গিয়েছেন, তারাই এই মাটির বাড়িতে থেকেছেন নিশ্চয়। সম্পূর্ণ স্থানীয় পরিবেশ-বান্ধব পদ্ধতিতে মাটির বাড়িটি তৈরি হয়েছে। বাড়িটি তৈরি করতে কোনো পোড়ানো ইট, সিমেন্ট, প্লাস্টিক, কাঠ ব্যবহার করা হয়নি। চিরাচরিত দেশীয় পদ্ধতি ব্যবহার করে মাটির বাড়িটি তৈরি করা হয়েছে। তালের কড়ি বর্গা, বাঁশ, সূর্যের আলোয় শোকানো ইট, বিচুলি খড়, কাঁচা মাটি প্রভৃতি দিয়ে বাড়িটি তৈরি করা হয়েছে। এটি তৈরির জন্য কোনো গ্রীন হাউজ গ্যাস উৎপন্ন হয়নি। সম্পূর্ণ বিজ্ঞানসম্মত ভাবে পরিকল্পনা মাফিক মাটির বাড়িটি তৈরি করা হয়েছে। সূর্যের অবস্থানকে মাথায় রেখে এমনভাবে বাড়িটির পরিকল্পনা করা হয়েছে যাতে গ্রীষ্মকালে বাড়ির জানালা দরজা দিয়ে সূর্যালোক কম ঢোকে এবং ঘরের তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে কম থাকে। আর অন্যদিকে শীতকালে যাতে সূর্যালোক বেশি ঢুকে ঘরগুলিকে গরম রাখতে পারে। বাড়িটিতে প্রচলিত শক্তিতে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয় না, সৌর বিদ্যুতের সাহায্যে আলো জ্বালানো হয়, পাখা চালানো হয়। জমির উর্বরতার বিষয়টি মাথায় রেখে ইকোলজিক্যাল স্যানিটেশনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। ড. দেবল দেব প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণের প্রতি একাগ্র নিষ্ঠা থেকেই এই মাটির বাড়ির পরিকল্পনা করেন এবং স্থানীয় কৃষক বন্ধুদের সহযোগিতায় এই বিরাট কর্মপরিকল্পনা বাস্তবে রূপান্তরিতও হয়।

দেবল দেব প্রকৃতি সংরক্ষণের যে কাজ দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে যাচ্ছেন তারই প্রত্যক্ষ ফল হল ভাদু গাছ, সীতাপত্র প্রভৃতি লুপ্তপ্রায় উদ্ভিদের আজও টিকে থাকা। এইসব বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ নিয়ে দেবল দেবের গবেষণাপত্র যেমন প্রকাশিত হয়েছে, তেমনি বসুধায় এদের টিস্যু কালচারের মাধ্যমে যত্ন নিয়ে সংরক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। দেবল দেব বলেন, “দেশীয় ধানের বীজ সংরক্ষণ বা লুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ সংরক্ষণ— কোনো ক্ষেত্রেই সরকারি উদ্যোগ দেখতে পাওয়া যায়নি। কোনো সরকারি বিজ্ঞানী বা আমলা একাজে এগিয়ে আসেননি।” সে কারণেই হয়তো দেবল দেবের মতো কৃষি বিজ্ঞানীকে এগিয়ে আসতে হয়েছিল। আর্থিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি এই কাজ করতে ব্যর্থ— বলা যায় তারা পুরোপুরি প্রয়াসহীন। তবে সীতাপত্রের পরিচিতি এবং বিলুপ্তির আশঙ্কা বিষয়ে দেবল দেবের গবেষণাপত্রটি প্রকাশের পর ইংল্যান্ডের রয়্যাল বোটানিক গার্ডেন তাঁর সাথে যোগাযোগ করেছিল বলে জানা যায়।

এই আন্দোলনের পুরোভাগে যেমন দেবল দেব রয়েছেন, তেমনি দেবদুলাল ভট্টাচার্য, শান্তি রায়, হারু রায়, শিবু হেমব্রম, দেবু হেমব্রম, সঞ্জয় সিংহ, অরুণ রাম, সঞ্জয় পাল, রবি মাহাতো, সুব্রত দাস, পাতামণি হেমব্রম প্রমুখের মতো মানুষেরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে দেবল দেবের সঙ্গে থেকে তাঁকে সহযোগিতা করে গিয়েছেন। বসুধার এই কর্মযজ্ঞের অন্যতম সহযোগী শান্তি রায় বলেন, “আধুনিক সভ্যতার হাতছানিতে নিজেদের পরিবেশের মধ্যে বেঁচে থাকা, নিজেদের জিনিসগুলোকে টিকিয়ে রাখার শিক্ষা আমরা প্রায় ভুলতে বসেছিলাম। দেবলদার হাত ধরেই সেই শিক্ষা আমরা আবার ফিরে পাই। যেটা আমাদের খুব ভালো লাগে। আর সেই ভালোলাগা থেকেই আমাদের বসুধার সাথে যুক্ত হওয়া।” দেবল দেবের এই কর্মোদ্যোগের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাঁর আন্দোলনে শরিক হওয়া কৃষকদের মধ্যে অন্যতম হলেন বাঁকুড়ার পাঁচাল গ্রামের ভৈরব সাইনি। মাত্র দেড় বিঘা জমিতে ২৪০ প্রজাতির দেশীয় ধান চাষ করে তিনি সকলকে অবাক করে দেন। এর পশ্চাতেও সেই দেবল দেব। কয়েক বছর আগে দেবর দেবের কাছ থেকে ভৈরব সাইনি একশ কুড়ি প্রজাতির ধানের বীজ সংগ্রহ করেছিলেন। তারপর থেকে তিনি বিভিন্ন ধরনের ধানের বীজ সংগ্রহ শুরু করেন। সেই সংখ্যা বাড়তে বাড়তে বর্তমানে তার সংগ্রহে ২৪০ প্রজাতির ধান রয়েছে।

পরিবেশ পত্রিকা ‘জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা বার্তা’য় বহুবার প্রকৃতিরক্ষক দেবল দেব এবং তাঁর আন্দোলনের কথা প্রকাশিত হয়েছে। গোবরডাঙা জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনা সমিতির মুখপত্র হিসেবে ২০২০ সাল থেকে পরিবেশ পত্রিকা ‘জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা বার্তা’ (Bio-diversity Conservation News Letter) প্রকাশ পাচ্ছে। এটি বাংলা ভাষায় প্রকাশিত একটি ত্রৈমাসিক পরিবেশ পত্রিকা। এর প্রকাশক বরিষ্ঠ বিজ্ঞান প্রচারক দীপককুমার দাঁ, গোবরডাঙা গবেষণা পরিষৎ। এই পত্রিকার অন্যতম উদ্দেশ্য হল জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ। আর পরিবেশবিদ ড. দেবল দেব দীর্ঘদিন ধরে সেই কাজেই ন্যস্ত। ২০২২ সালের অক্টোবরে নদিয়া জেলার পরিবেশকর্মীদের একটি দল বসুধায় গিয়েছিলেন। সেই দলে ‘জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা বার্তা’-র প্রতিনিধিরাও ছিলেন। তাদের পক্ষ থেকে ‘জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা বার্তা’ (Bio-diversity Conservation News Letter)’-র বিগত সংখ্যাটি সেখানে দেবল দেবের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ‘জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা বার্তা’-র প্রথম সংখ্যা থেকেই দেবল দেব এক প্রকার এর সঙ্গে যুক্ত আছেন। পত্রিকার প্রথম সংখ্যাটি দেবল দেবের হাতেই উন্মোচিত হয়েছিল, অনুষ্ঠানটি হয়েছিল গোবরডাঙা গবেষণা পরিষদে। প্রথম সংখ্যাটির প্রচ্ছদে ছিল উড়িষ্যার বসুধা কৃষি খামারের ছবি। আর সেই সংখ্যার দ্বিতীয় প্রচ্ছদে ছিল দেবল দেবের আন্দোলনের কথা। সঙ্গে তাঁর ছবিও মুদ্রিত ছিল।  ‘জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা বার্তা’-র তৃতীয় বর্ষের তৃতীয় সংখ্যাতেও (জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২২) বসুধার কথা রয়েছে, প্রচ্ছদেও রয়েছেন প্রকৃতিরক্ষক দেবল দেব। সেই সংখ্যাটিই এদিন দেবল দেবকে প্রদান করা হয়। প্রকৃতি সংরক্ষণের জন্য তাঁর দীর্ঘ আন্দোলন থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার রয়েছে। দেবল দেবের মতো পরিবেশ সংরক্ষক এবং বসুধার মতো আরণ্য কৃষি কেন্দ্র ‘জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা বার্তা’-র মতো পরিবেশ পত্রিকাগুলির অন্যতম প্রেরণা।

লেখক: সম্পাদক, ‘জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা বার্তা’।

আপনার মতামত লিখুন :

4 responses to “দেবল দেব এবং ‘বসুধা’ : দীপাঞ্জন দে”

  1. প্রদীপ্ত দত্ত says:

    খুব ভালো হয়েছে। পড়ে খুব ভালো লাগলো।

  2. অরুন্ধতী ব্যানার্জি (চক্রবর্তী) says:

    খুব সুন্দর প্রতিবেদন। ড. দেবল দেবকে তার জীবন ও দর্শনকে আমরা যত বুঝতে পারব, আমাদের জীবনবোধ পালটে যেতে বাধ্য। আশা রাখি বাঙালি একদিন তার মাটির এই রত্নটিকে চিনতে পারবে আর তাঁর দেখানো পথ যথাসাধ্য অনুসরণ করবে। সেইজন্যও এই বাংলা প্রতিবেদনটি গুরুত্বপূর্ণ।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev