| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বৌ পাগলের একদিন : ছোট গল্প লিখছেন সৌমেন দেবনাথ

Reporter
সৌমেন দেবনাথ / ১৪৩২ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২১

হেকমত আর করিম দুই বন্ধু গল্প করছে। হেকমতকে মহাখুশি দেখে কারণ জানতে চাইলো করিম। হেকমত অতি আনন্দের সাথে বললো, মিয়া ভাইয়ের বিয়ে শেষ। এবার আমার পালা। কি যে ভালো লাগছে! নিজের বিয়ে আসন্ন! কি যে আনন্দ করবো! সাত গ্রামের মানুষ জানবে আমার বিয়ের কথা। বিয়েতে যে কি আনন্দ যজ্ঞ করতে হয় দেখিয়ে দেবো।

করিম একগাল হেসে বললো, তোরা দুই ভাই যে এমন বিয়ে পাগল না দেখলে বিশ্বাসই করতাম না। তোর মিয়া ভাই এর সাথে ওর সাথে বলে বেড়াতো বিয়ে করবো, বিয়ে করবো, কবে করবো, কাকে করবো, সব তো ভাল লাগে। তোর বাবা মা তোর মিয়া ভাইকে অল্প বয়সে বিয়ে দেবে না বলে তিন বার গলায় দড়ি দিতে গিয়ে একবারও দিলো না। ডুবে মরবে বলে পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতার কেটে আবার উপরে চলে আসে। শেষে কোথা থেকে একটা বৌ নিয়ে ঘরে উঠেছে। ফরিদ কি এখন খুব খুশি?

হেকমত বললো, মিয়া ভাই খুশি মানে, নিজের বৌ নিজস্ব জিনিস। গালে তুলে ভাবীকে খাওয়ায়ে দিচ্ছে। আর মাঝে মাঝে গান গেয়ে শোনাচ্ছে। আমিও বিয়ে করে বৌকে খুব আদর করবো। নিজের বৌকে যেমনে ইচ্ছা তেমনে আদর করা যায়। মাটিতে পা ফেলতে দেবো না। ঠাণ্ডা মাটিতে পা ফেলে হাটলে তো সর্দি লাগবে। বৌ অসুস্থ হলে কি বাঁচতে পারবো? বৌকে মাথায় তুলে রাখবো।

করিম বিজ্ঞজনের মত বললো, জোয়াল টানা অত সহজ না। আর কাঁধে জোয়াল পড়লে তা না টেনে উপায় নেই। এবার দেখ্ তোর মিয়া ভাইয়ের কি দশা হয়!

হেকমত বিরক্ত হয়ে বললো, আরে পাগল, জোয়াল তো গরু টানে। গরুর নেই মাথায় বুদ্ধি। সেই গরু যদি জোয়াল টানতে পারে আর আমার মিয়া ভাই মানুষ। বুদ্ধির জাহাজ। সে জোয়াল টানতে পারবে না এটা কোনো কথা হলো?

করিম হাসি থামিয়ে বললো, কালই যদি তোর বাবা তোর মিয়া ভাইকে আলাদা করে দেন, না খেতে পেয়ে তো মরেই যাবে।

হেকমত বললো, ওরে বোকা, ঘরে সুন্দরী বৌ থাকলে ভাত খাওয়া লাগে নাকি? সকাল বেলা শুনেছি, মিয়া ভাই ভাবীকে বলছে, তোমার চোখে চেয়ে অনন্তকাল থাকতে পারবো। জানিস, আগে বিয়ে করবো বলে স্বপ্ন দেখতাম আর এখন স্বপ্ন না, কিছু দিনের মধ্যেই বিয়ে করবো, আমার কি যে ভালো লাগছে! মিয়া ভাই বলেছে, তোর বিয়ের ভার আমার কাঁধে। আমি থাকতে তোর বিয়ে কেউ আটকাতে পারবে না। মিয়া ভাইয়ের মত ভাল মানুষ আর দেখবো বলে মনে হয় না।

এমন সময় ফরিদ এলো ওদের মাঝে। এসেই হেকমতকে বললো, তোকে না বলেছি করিমের সাথে মিশবি না? বাড়ি যা। আমি তোর ভাবীর জন্য তেল সাবান আনতে বাজারে যাচ্ছি। এই করিম শোন্, তোর আব্বা আমাকে ভয় দেখিয়েছিলেন আমি বিয়ে করতে চাচ্ছিলাম বলে। কি বলেছিলো জানিস? আমি নাকি আমার বৌকে তেল-সাবান কিনে দিতে পারবো না। তোর আব্বা একটা বেকুব। চুল পাকলেই জ্ঞানী হওয়া যায় না। দিনে দিনে বড়ই হয়েছেন শুধু। এই দেখ্, তেল-সাবান আনতে যাচ্ছি।

করিম বললো, যা তেল সাবান কিনতে, দোকানদাররা তো তোর শ্বশুর।

ফরিদ বললো, দোকানদাররা শ্বশুর হতে যাবে কেন্? বাজারের সবচেয়ে বড় মুদি দোকানটা আমার বন্ধু জলিলের। সবচেয়ে বড় কসমেটিকসের দোকানটা আমার বন্ধু আব্বাসের। আমার বন্ধুরা আমার সাথে আছে। আমার বন্ধুরা নামে নামে বন্ধু না, কাজে বন্ধু। আজীবন বাকি কিনলেও কিছু বলবে না। নায়িকা শাবনূরের মত করে আমার বৌকে আমি সাজিয়ে রাখবো।

এই বলে ফরিদ বাজারে চলে গেলো। হেকমত খুশিতে লাফ মেরে উঠে বারবার বলতে লাগলো, এমন লক্ষ্মীভাই ঘরে ঘরে হোক।

হেকমত বাড়ি এলো। পাড়ার মানুষ ফরিদের বৌকে দেখতে আসছে৷ এক প্রতিবেশিনী বললো, বাবা মায়ের ঘরে ছিলি, ডগমগিয়ে বেড়েছিস। বিয়ে বসে ফরিদের ঘরে আসলি। করে না আয়-রোজগার, আবার অলস। খেতে না পেয়ে শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাবি।

একথা হেকমত শুনতে পেয়ে বললো, আমরা না খেয়ে ভাবীকে খাওয়াবো। সে চিন্তা আপনাকে করতে হবে না। অযথা অন্যের চিন্তা করে মাথার বাকি চুলগুলো পাকিয়েন না। আর না খেয়ে কেউ মরে না। এটা অত্যাধুনিক সময়। বই-পুস্তকে আছে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। বই-পুস্তক কি কিছু পড়েন?

আর এক প্রতিবেশিনী বললেন, শরীরে বাতাস লাগিয়ে বেড়িয়েছে তোর ভাই। এবার রোদ বৃষ্টিতে খাটতে হবে, বুঝবে ফরিদ।

একথা শুনে হেকমত বললো, যারা শরীরে বাতাস লাগিয়ে চলে তারা আজীবন শরীরে বাতাস লাগিয়েই চলে। আর যারা রোদে পোড়ে, বৃষ্টিতে ভেজে তারা আজীবন রোদে পোড়ে, বৃষ্টিতে ভেজেই। এ হলো চিরন্তন সত্য। চিরন্তন সত্য কি বোঝেন? আর রোদে পুড়বে কেনো? বৃষ্টিতে ভিজবে কেনো? ছাতা আছে না? মিয়া ভাইয়ের ছাতা এক নম্বর ছাতা, যেমন বড় তেমন শক্ত।

ঘর থেকে হাক পেড়ে হেকমতের মা বললেন, বড়দের সাথে তর্ক করতে নেই। বড়রা গুণীজন। তারা ভুল বলেন না। তারা যা বলছেন সত্যই বলছেন।

ফরিদ এসে মায়ের কথাগুলো শুনলো। যারা বৌ দেখতে এসেছে তাদের উদ্দেশ্যে বললো, এই আপনাদের কেউ বলেছিলেন বিয়ে করতে যোগ্যতা লাগে, বিয়ে করে ফেলেছি, যোগ্যতা লাগলো কই? কেউ বলেছিলেন বিয়ে করতে হিম্মত লাগে। বিয়ে করে হিম্মত দেখিয়েছি। সাবদার চাচা বলেছিলেন, বৌর ভরণ-পোষণ অত সহজ না। বৌর ভরণ-পোষণ করে দেখিয়ে দেবো আমি পারি।

মুনছুর মামার বৌ বললেন, সময় হলে বুঝবে কত ধানে কত চাল।

ফরিদ বললো, যারা ধানের চাষ করে তাদের কাছে চালের হিসাব। ধান চিটা নিয়ে আমার ভাবনা নেই। আমার বন্ধুদের চালের দোকান আছে। আনবো আর খাবো।

একথা শুনে ফরিদের মা বললেন, সব দোকান থেকে ধার-দেনা করে খাবি। দোকানদাররা তো ধরবে তোর বাবাকে।

ফরিদ বললো, এই আব্বার পাল্লায় পড়ে হালখাতার মিষ্টি কখনো খেতে পারিনি। সব নগদে কেনে। এবার দেখো মা, আমাদের বাড়ি অনেক হালখাতার কার্ড আসবে। এক এক দিন এক এক দোকানে হালখাতা করবো আর এক এক দিন এক এক রকমের হালখাতার মিষ্টি খাবো। ঘরে বৌ এনেছি বলেই তো হালখাতার মিষ্টি খাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হলো।

শুনে পিন্টুর মা বললেন, এ কেমন অলক্ষ্মী ছেলে! ছেলেটার দেখি কপালে ভাত জুটবে না।

ফরিদ বললো, কপালে ভাত থাকে না। ভাত থাকে হাড়িতে, প্লেটে। বুদ্ধি না থাকলে খাটতে খাটতে মরতে হয়। আর বুদ্ধি থাকলে পরিশ্রমই করা লাগে না। আজ এর দোকান থেকে বাকি খাবো তো কাল ওর দোকান থেকে। পরদিন অন্য আর এক দোকান থেকে। এতে সব দোকানদারের সাথে আমার সম্পর্ক সৃষ্টি হবে।

শরীফের বৌ বললেন, সদ্য বিয়ে করেছিস, এক মাস না গেলে মজা বুঝবি না। বিয়ে করে কোন ফাঁদে যে পড়েছিস হাড়ে হাড়ে বুঝবি। পৃথিবীটা অত সহজ না।

ফরিদ বললো, পৃথিবী অত কঠিন কিছু না। এখন পৃথিবীটা কতটুকু জানেন? এতটুকু! ঠিক এতটুকু! পাঠ্য-পুস্তকে আছে পৃথিবী এখন মুষ্ঠিতলে। হাড়ভাঙা খাটুনির সেদিন আর নেই। এখন আঙুলের টোকায় ইনকাম। তাও এক আঙুলের টোকা।

মুনছুর মামার বৌ বললেন, কল্পনার ঘোড়া আকাশে উড়ে। বাস্তবের ঘোড়া দৌঁড়ে কূল পায় না। বাস্তবের ঘোড়া অনেকটা খোঁড়া। কুকুরের মত দৌঁড়ে, গরুর মত খেটেও ভাত জুটছে না। জিনিসপত্রের যে দাম! আমার ছেলে আয়-রোজগার শিখলে তবেই বিয়ে দেবো।

ফরিদ বললো, আয়-রোজগার সবাই করে। অন্ধ অজুহাতে ছেলেদের দেরিতে বিয়ে দিয়ে ছেলেদের প্রতি প্রতিটি মা বাবা চরম অন্যায় করে। ছেলেদের প্রতি বাবা মায়ের এতটা নির্দয় আচরণ ঠিক না।

ফরিদের মা বললেন, গুরুজনেদের সাথে সেই থেকে তর্ক করছিস। ধার-দেনা-বাকি করে কতদিন খাবি?

ফরিদ বললো, মা, পাঠ্য-পুস্তকে আছে আধুনিক ব্যবসায় ধার-দেনা-বাকি এসবের উপর নির্ভর। যারা ব্যবসায় করে তারা এসব ভালো জানে। যদি কেউ ধার-দেনা-বাকি না দিতে চায় তবে বই-পুস্তকের পৃষ্ঠা খুলে দেখাবো। সব ভুল হতে পারে বই-পুস্তক ভুল হতে পারে না।

ফরিদ এসব বলে ঘরে গেলো। ঘরে নতুন বৌ। সাজগোজ করে বসে আছে। বৌকে ফরিদ বললো, এই দেখো, মাথার কয়টা চুল এলোমেলো হয়ে আছে।

দুপদাপ পা ফেলে বাইরে এসে মাকে বললো, জীবনে একটা বড় আয়না ক্রয় করোনি। নেই একটা ভালো চিরুনি। আমার বৌ সাজবে কি করে? যার তার বৌ না, ফরিদের বৌ। ফরিদের বৌ থাকবে পরীর বেশে।

ওদিকে হেকমত নতুন বন্ধু জুলমতের সাথে কথা বলছে। জুলমত বললো, ভালো একটা মেয়ে আছে। তবে তোর চেয়ে বছর পাঁচেক বড় হবে। অবশ্য বৌ বড় হলেই ভালো। অভিজ্ঞ হয়। অভিজ্ঞ বৌ কিন্তু সম্পদ।

হেকমত বললো, আমি বাজার-ঘাটে একা চলতে পারি না। বৌ বড় হলে হাত ধরে হাটতে পারবো। মা বাবা যদি আপত্তি করে?

জুলমত বললো, কত নাবালিকা মেয়েকে সাবালিকা দেখিয়ে বিয়ে দেয়া হচ্ছে। মেয়ের বয়স পাঁচ বছর কমিয়ে তোর বয়সের সমান করে দেবো। অথবা তোর বয়স বাড়িয়ে কন্যার বয়সের সমান করে দেবো। আর তুই তো দেখতে বয়স্কদের মত। এখন সব কাগজের খেলা, বুঝলি?

হেকমত বললো, নাবালিকাকে সাবালিকা কাগজ-কলমে বানানো অন্যায়। তাছাড়া নাবালিকাকে কাগজে সাবালিকা বানালে কি সাবালিকা হবে? লোকে যদি বলে বৌ তো না, বটগাছ!

জুলমত বললো, বৌ বটগাছ হলেই তো ভালো। বটগাছের ছায়া শীতল। নিরাপদ আশ্রয়ও। বেশি বয়সের বৌ তরুণ স্বামীকে খুব আদর-যত্ন করে৷ আর বিয়ের পর দেখবি বয়সটা মূখ্য না, ভালোবাসাটায় মূখ্য।

এমন সময় এদিক দিয়ে ফরিদ যাচ্ছিলো। ভাইকে দেখে ফরিদ বললো, জুলমতের সাথে মিশবি, তবুও ঐ করিমের সাথে মিশবি না। আমার বিয়ের সময় জুলমতের বাবা কি বলেছিলো জানিস? একা একা বিয়ে করে ফেল্। তোর বাপ কিন্তু তোকে বিয়ে দেবে না। বিয়ে যখন করতেই হবে একদিন পরে কেন্ একদিন আগেই কর্।

হেকমত বললো, ঠিক আছে মিয়া ভাই। করিমের সাথে মিশবো না। তুই এখন কোথায় যাচ্ছিস?

ফরিদ বললো, বাজারে যাচ্ছি তোর ভাবীর জন্য আয়না-চিরুনি কিনতে। খবরদার, তোর ভাবীর আয়না-চিরুনিতে হাত দিবি না। সাজগোজ করার সময় যদি তোর ভাবী আয়না-চিরুনি খুঁজে না পায়, তবে কিন্তু তোর হাত ভেঙে দেবো।

এই বলে ফরিদ চলে গেলো। জুলমত বললো, এখন কি করবি? ঐ বড় মেয়েটাকে কি বিয়ে করবি? দেখ্, বৌ বড় মানে কিন্তু অনেক সুবিধা। মাথায় তেল মাখিয়ে দেবে, মাথায় চিরুনি করে দেবে। মাথার পাকা চুল বেছে দেবে। মাথার চুল টেনে টেনে আরাম দেবে। বড়রা বুদ্ধিতেও এগিয়ে থাকে। তোর মাথায় বুদ্ধিও দেবে। মোটকথা তোকে মাথায় তুলে রাখবে। জানিস তো, বড়রা কত যত্নশীল হয়!

হেকমত বললো, বিয়ে মানেই শুভ কাজ। আর শুভ কাজ করবো না কেন্? বিয়ে না করা পর্যন্ত আমি হাল ছাড়ছি না।

ওদিকে ফরিদ আয়না-চিরুনি কিনতে দোকানে গেলো, বললো, আয়না-চিরুনি দে তো। তোর ভাবী সাজতে পারছে না।

আব্বাস বললো, আয়না-চিরুনি না কিনেই বিয়ে করেছিস? সাজগোজের যা যা লাগবে নিয়ে যা।

ফরিদ বললো, আচ্ছা, মজিদ আঙ্কেলের দোকান থেকে একটা ড্রেসিং টেবিল নিয়ে যাই? বৌর জন্য খরচ করবো যখন কম করবো কেনো? বৌকে দামি দামি জিনিস দিয়ে তাক লাগিয়ে দেবো। এবং জানাবো যে আমি সক্ষম স্বামী।

আব্বাস বললো, যেভাবে বৌর জন্য বাজারে দেনা করছিস বাপের ভিটা বিক্রি করলেও তো শোধ হবে না।

ফরিদ বললো, কত বড় বড় মানুষ কোটি কোটি টাকা দেনা করছে, ঋণ করছে, কিচ্ছু হচ্ছে না। আর আমি তেল, সাবান, স্যাম্পু, আয়না, চিরুনি বাকিতে কিনলে ফকির হবো? শোন্, যা করছি আমার বৌর জন্য করছি, পাড়া প্রতিবেশীর জন্য করছি না। বৌ হলো প্রাণের মানুষ, তার জন্য কিছু করলে কেউ ঠকে না, পাগল।

ফরিদ ড্রেসিং টেবিল কিনে বাড়ি ফিরছে। পথে আক্কাসের সাথে দেখা। সে বললো, দেখছিস সংসার কি জিনিস! কত কিছু কিনতে হচ্ছে। সাংসারিক যন্ত্রণায় তুই না পাগল হয়ে যাস্!

ফরিদ বললো, দুনিয়ার সব মানুষই বিয়ে করেছে, করছে, করবে। কেউ পাগল হচ্ছে না। আর আমি পাগল হয়ে যাবো, তাই না? সাংসারিক যন্ত্রণায় না, বল সাংসারিক মধুরতায় মানুষ উন্নতি করে। বৌ হলো জীবন বুঝলি, বৌ হলো জীবন। বৌকে মৃত্যুবধি কত না কিছু দেবো আমি হৃদয় উজাড় করে! বৌকে উপহার দিয়ে ঢেকে দেবো যা আমার জীবনের একমাত্র ব্রত।

ড্রেসিং টেবিল নিয়ে বাড়ি ফিরলো ফরিদ। মা দেখে বললো, গিয়েছিলি আয়না-চিরুনি কিনতে। নিয়ে এলি ড্রেসিং টেবিল। এত টাকা পাচ্ছিস কোথায়? টাকা কি রাস্তায় পেয়েছিস?

ফরিদ বললো, টাকা যদি রাস্তায় পাওয়া যেত তবে আমি সারাদিন রাস্তাতেই পড়ে থাকতাম, মা।

মা বললেন, তবে কি আবার দেনা করলি?

ফরিদ বললো, পৃথিবীর সবাই দেনা করে। দেশের সরকার পর্যন্ত দেনা করে। মা, দেনা করলে রাগ করো কেন্? সকল কাজে তুমি শুধু উৎসাহ দেবে, মা।

মা বললেন, ধার-দেনা সময়ে পরিশোধ না করলে দোকানদাররা কিন্তু তোকে, তোর বাবাকে অপমান করবে। যা তা বলবে। মান-সম্মান-ইজ্জতের মূল্য অনেক বেশি, বাবা।

ফরিদ বললো, মা, মান-সম্মানের ভয় করলে জীবনে উন্নতি করা যাবে না। দুই নম্বর লোক হতে হবে। দুই নম্বর লোক সব এক নম্বর কাজ পায়। মানুষের মুখ আটকানো যায় না, ভালো কাজ করলেও যে বলবে সে বলবেই, খারাপ কাজ করলেও বলবে। বলবে পাছে বলুক। মান-সম্মান বিসর্জন না দিলে উন্নতি হবেই না। কেউ আমাকে অপমান করলো, আমি অপমানিত হলাম না, ব্যস্।

ফরিদ এসব বলে ঘরে গেলো। বৌকে এক পলকে কিছুক্ষণ দেখে নিয়ে বললো, শাবনূর আমার প্রিয় নায়িকা। তুমি হলে আমার শাবনূর। তোমার পায়ে পর্যন্ত আমি কাদা-মাটি লাগতে দেবো না।

ফরিদের বৌ দুলনা হেসে বললো, আমার কত সৌভাগ্য তোমার মত স্বামী পেয়েছি। এমন স্বামীভাগ্য কজনের আছে? তুমি হলে আমার সালমান শাহ।

ফরিদ বললো, জুলমতের আব্বা বলেছে, বৌকে খবরদার অনাদর করবি না। বৌ যদি কান্না করে দেখবি তোরও হৃদয় ফেঁটে যাচ্ছে। কখনো বৌর চোখে অশ্রু আনবি না। প্রয়োজনে বৌর জন্য জীবন দিবি।

দুলনা বললো, জুলমতের আব্বা তো খুব ভালো মানুষ।তুমি উনাকে একটা লুঙ্গি কিনে দিও।

জুলমত হেকমতকে নিয়ে পাশের গ্রামে গেলো। জুলমত বললো, তোর স্বপ্নের রানীর বাড়ি ঐটা। এক দেখায় হয়ত তাকে তোর ভালো লাগবে না। তবে মনে রাখিস এক দেখায় শেষ দেখা না। দেখতে দেখতে একটা মানুষকে ভালো লেগে যায়। তাছাড়া বিয়ের পর অপছন্দকেও পছন্দ না করে উপায় থাকে না। তোকে যদি ছোট ভাই ভেবে লজেন্স দেয়, নিবি না কিন্তু।

হেকমত বললো, এখানে দাঁড়িয়ে থেকে কি দেখা যাবে? না, কনের বাড়ি যাবো? আরে বৌ বৌই। বড় হোক আর ছোট হোক। তাছাড়া বড় বৌ শুনতেও ভালো লাগে। বড় বৌ কজনের ভাগ্যে জোটে? বুঝলি, আমার কপাল বড় বৌ পাওয়ার কপাল!

জুলমত হেসে নিয়ে বললো, এখান থেকে দেখেই আমরা চলে যাবো। পরে বাবা মাকে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে পাঠাতে হবে।

হেকমত বললো, বাবা আমার বিয়ের কথা শুনলে কি বলবে জানিস? বলবে, মুখে এখনো দুধের গন্ধ, বিয়ের কথা মুখে নিস? আরো বলবে, রাস্তা চিনে রাতে বাড়ি আসতে পারিস না, বিয়ের নাম মুখে নিস্? এও বলবে, ভালো করে প্যান্ট পরা শিখলি না, বিয়ের কথা বলিস? বিশ্বাস কর্, আমার মুখে দুধের গন্ধ নেই। দাঁত না হয় মাজন করি না, তাই বলে মুখে দুধের গন্ধ থাকবে? রাস্তা চিনতেও ভুল করি না, আর প্যান্টও ঠিকঠাক পরতে পারি।

জুলমত বললো, তোর আব্বা আর কি বলেন?

হেকমত বললো, বলে, লেখাপড়া শেষ না হলে বিয়ে দেবে না। এক বছর গেলে এক ক্লাস পাস হয়। আবার যদি করি ফেল তো গেলো! লেখাপড়া শেষ করতে করতে তো বিয়ের বয়সই থাকবে না। মাথার চুল সব পেকে যাবে। শুনেছি, চুল পাকা ছেলেদের নাকি বিয়ে হয় না। বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গেলেই নাকি অপমানিত হতে হয়। সরকার লেখাপড়ার ক্লাস অত বাড়িয়েছে কেন্? আবার মিজু স্যার বলেছেন, লেখাপড়ার শেষ নেই। বাবা বলেছে, লেখাপড়া শেষ না করে বিয়ে দেবে না। ব্যাপারটা কি দাঁড়ালো বল্ তো? বাবা মনে হয় আমাকে বিয়ে দেবে না!

জুলমত বললো, তুই হচ্ছিস আধুনিক যুগের ছেলে। আধুনিক ছেলেরা মা বাবা বিয়ে দেবে এই আশায় বসে থাকে না। যদি নিজে নিজে বিয়েই না করতে পারলি তো কিসের আধুনিক ছেলে! আর তোর চুল না পেকে তো পড়েও যেতে পারে। একবার ভেবে দেখ্, টাক হয়ে গেলে আদৌ কি তোর বিয়ে হবে?

হেকমত বললো, তুই সত্যই বলেছিস বন্ধু। কনের বাড়ির সামনে এভাবে আলাপ করলে কি কনের দেখা পাবো? কনেকে দেখবো, বাড়ি গিয়ে কনেকে নিয়ে একটা কবিতা লিখবো। কনে দেখে কনেকে নিয়ে কবিতা লেখার প্রচলন আমিই শুরু করবো। সৃষ্টি হবে ইতিহাস।

এমন সময় পিছন থেকে এক বয়স্ক লোক এসে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, অনেকক্ষণ ধরে তোরা এখানে কি আলাপ করছিস? তোদের মতলব কি? দিনে কোথায় কি আছে দেখে রাখছিস, রাতে এসে চুরি করবি নাকি? এই বয়সেই চুরির এত এত কৌশল শিখেছিস?

জুলমত আর হেকমত অপ্রস্তুত হয়ে গেলো। জুলমত বললো, না চাচা, আমরা চোর না, চোরের গোষ্ঠীতেও আমাদের জন্ম না। কিভাবে চুরি করতে হয় তাও আমাদের জানা নেই। আমরা আসলে মেয়ে দেখতে এসেছি।

চাচা একগাল হেসে বললেন, ও তোমরা ছেলেপক্ষের লোক? তা আর মানুষ কই? তোমাদের তো বিকালে আসার কথা! এসো বাবারা, আমার সাথে ভেতরে এসো।৷

জুলমত আর হেকমত চাচার পিছন পিছন যেতে লাগলো। চাচা বললেন, তোমাদেরকে তোরাব ভাই আগে পাঠিয়ে দিয়েছেন, তাই না? আহা, বাইরে রোদে দাঁড়িয়ে থেকে কত কষ্টই না পেয়েছো!

চাচার কথার উত্তর দিয়ে জুলমত হেকমতের কানের কাছে এসে বললো, দেখেছিস সৌভাগ্য কি জিনিস? কনের বাপই আমাদের নিয়ে যাচ্ছেন। দুই চোখ ভরে কনেকে দেখবি কিন্তু! আবার যেন চোখ মারিস না। চোখে চোখে চেয়েই তো তোরা আজীবন পার করবি।

গেট পেরিয়ে ওরা তিনজন ভিতরে ঢুকলো। চাচা হাঁক পাড়লেন, কইগো তোমরা? বরপক্ষের দুই জন আগেই চলে এসেছে। বসতে দাও। নাস্তা দাও।

বসতে না বসতেই খাদ্য-খাবার চলে এলো। যে মেয়েটি খাবার এনেছে সে বললো, আমি জরিনা। তোমাদের হবু ভাবী। দেখতে কেমন লাগছে? আমি এখনো গোসল করিনি। সাবান-স্যাম্পু দিয়ে গোসল করবো। তারপর পার্লারে যাবো। তবেই তো বুঝবে আমি কত রূপসী! খাবার সামনে নিয়ে রূপসীদের দেখতে নেই। রূপসীতে মন ভরলেও পেট ভরে না। চোখের স্বাদ মিটলেও জিহ্বার স্বাদ মেটে না।

জুলমত হেকমতের কানের কাছে গিয়ে বললো, দেখ্, দেখ্, ভালো করে দেখ্। হাটছে তো ঘর কাঁপছে। হাসছে তো ঘর নাচছে। কথা বলছে তো বজ্র পড়ছে।

হেকমত জুলমতের কানের কাছে গিয়ে বললো, আমাদের বাড়ির চৌকি, খাট, চেয়ার, টুল সব ভাঙবে। চৌকি, খাট ভাঙলে বৌ নিয়ে মাটিতে ঘুমাতে তো হবে!

বন্ধু দুঃখিত, মানুষের ওজন ভারী হলে বাজে কথা বলতে নেই। সব স্রষ্টার ইচ্ছায় হয়রে।

জুলমত বললো, তা তো ঠিকই। তবে বন্ধু গ্রামে মোটা বৌ কারো নেই। যদি মোটা বৌ তোর হয় তবে এটা হবে তোর অনন্য এক রেকর্ড। আর মোটা বৌ পছন্দ না হলে ডায়েট করতে বলবি। অবশ্য বাড়িতে মোটা বৌ থাকলে পরপুরুষও আসে না। এমনকি মোটা বৌয়ের ভয়ে বাড়ি চোরও আসে না।

হেকমত খুব খুশি হলো। আর বললো, মোটা মোটা শব্দ বাদ দে। এমন বাজে শব্দ ব্যবহার করিস না। নারীকে সম্মানে কথা বলা পুরুষের কর্তব্য, বন্ধু।

চাচা আর চাচী আবডালে কথা বলছেন। চাচা বললেন, মেয়েকে তো অনেকে দেখে অপছন্দ করে চলে যাচ্ছেন। চলো, এই দুই জন ছেলেকে হাত করি। এদের এমন ভাবে বোঝাতে হবে যেন তারা বায়না ধরে তাদের ভাইয়ের বৌ করার জন্য।

চাচী বললেন, প্রয়োজনে এ দুই জনকে কিছু নগদ অর্থ দিবো। যেন ওদের ভাই বা বাবা, চাচা আমাদের মেয়েকে অপছন্দ করলেও এরা দুই জন রাজী করাতে সম্মত হয়।

ওদিকে হেকমত বললো, চল্, এবার ভেগে পড়ি। কনে দেখেছি, কনের হাতের খাবারও খেয়েছি।

তখন চাচা, চাচী ওদের সামনে এলেন। চাচা বললেন, আগেই যেহেতু চলে এসেছো, খুব ভালো আমাদের এলাকাটা। চলো, একটু হাটাহাটি করি।

চাচী বললেন, না, বাইরে যেতে হবে না। তা বাবা, তোরাব ভাইয়ের ছেলে টিপুর ছোটো ভাই কে? তুমি? না, তুমি? না, তোমরা দুই জনই?

জুলমত কি বলবে না বলবে এমন ইতস্তত করলেও হেকমত বললো, সে জানার কি দরকার?

চাচী কিছু টাকা হেকমতের হাতে দিয়ে বললেন, তোমরা তো আমার মেয়েকে দেখেছো। আজ যখন তোমার ভাই আর বাবা, চাচা আমার মেয়েকে দেখতে আসবে শুধু বলবে, ভাবী হিসেবে আমরা এ মেয়েকেই চাই। বলবে না?

জুলমত টাকা নিয়ে বললো, বলবো। বলবো। এখন আমরা একটু আপনাদের এলাকাটা ঘুরে দেখতে চাই।

এই বলে জুলমত হেকমত ভেঙে গেলো। হেকমত বারবার বলছে, বিকালে বরপক্ষ এসে যদি কনে পছন্দ করে বিয়ের তারিখ ঠিক করে যায়, তবে?

জুলমত বললো, বরপক্ষ জীবনেও জরিনাকে পছন্দ করবে না। জরিনা এমনি এক জাতের মেয়ে যে কেবল হেকমতের জন্যই জন্মেছে। এমন অদ্ভুত সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করার মত পাগল হতে পারে হেকমত ছাড়া দ্বিতীয়টি নেই।

হেকমত বললো, তুই হচ্ছিস এক নম্বর জাত বন্ধু। তোর সাথে আগে থেকে ঘুরলে আমার বিয়েটা এতদিন হয়ে যেত।

দুলনাকে নিয়ে ফরিদের মা রান্না ঘরে ঢুকেছেন। তা দেখতে পেয়ে ফরিদ বললো, মা, তুমি আমার বৌকে, আমার এত আদরের বৌকে নিয়ে রান্না ঘরে ঢুকেছো? যদি আমার বৌ মলিন হয়ে যায় তবে আমি মনকে বুঝ দেবো কি করে? আমার দুধে আলতা বৌটাকে কালো কয়লা করার পায়তারা করছো?

মা বললেন, তাই বলে বৌমা ঘরের দুই-একটা কাজ করবে না?

ফরিদ বললো, মা, তোমার বৌমা তোমার ঘরের লক্ষ্মী। একটা বৌ একটা ঘরের শোভা। দুই পয়সার কাজ করতে গিয়ে আমার বৌয়ের সোনার অঙ্গ মলিন হলে দুশো টাকার কসমেটিকস লাগবে! বৌকে দিয়ে কাজ করাবো এমন স্বামী আমি না, মা!

দুলনাকে রান্নাঘর থেকে বের নিয়ে নিজের ঘরে গেলো ফরিদ আর বললো, আমার চোখের সামনে তুমি কাজ করবে, ঘামবে, আমি তা দেখে স্থির থাকতে পারি?

দুলনা বললো, আমি তো ঘরের বৌ, ঘরের কাজ করা তো আমার দায়িত্ব।

ফরিদ বললো, কাজ করলে শুকিয়ে যাবে, কাজ করলে হাত-পা কাটবে, কাজ করলে…

পিছন পিছন মা এলেন, বললেন, তা এখন রান্না করবে কে?

ফরিদ বললো, তুমি! তুমি তো রান্নাতে খুব অভিজ্ঞ। যা রান্না করো, যেমনে রান্না করো, তাই খেতে ভালো লাগে। তোমার রান্নার হাত নিয়ে আমি কত গর্ব করি!

মা বললেন, ছেলেকে বিয়ে দেয়ার পরও কি মা রান্না-বান্না করে?

ফরিদ বললো, ছেলেকে বিয়ে দাওনি, ছেলে বিয়ে করেছে। আমি যাতে বিয়ে না করি তার জন্য তোমরা কি কম ষড়যন্ত্র করেছিলে? বিয়ের চিন্তা আমাকে পাগল করেছে, বিয়ের কথা বলতাম বলে বলতে, আমাকে ভূতে ধরেছে, এজন্য কবিরাজের ওষুধ পর্যন্ত খাওয়ায়েছিলে। মা বাবা হয়ে তোমরা আমাকে পদে পদে বিয়ের পথে বাঁধা দিয়েছো।

মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ঠিক আছে, আমিই রান্না করবো।

ফরিদ বললো, চারজনের রান্না এতকাল করতে পেরেছো, আর মাত্র বিয়ে করলাম, পরিবারে একজন সদস্য বেড়েছে, আর রান্না করতে কষ্ট হয়ে যাচ্ছে?

মা বললেন, আমার কষ্ট তোর চোখে পড়বে না। কারণ তোকে মানুষ করতে পারিনি। এবার কাজ-কর্ম করা ধর। বৌয়ের মুখের দিকে চেয়ে থাকলে কি হবে?

ফরিদ বললো, মা, মনের শান্তিই আসল শান্তি। দুলনার চোখে চেয়ে থাকলে আমি সেই শান্তি পাই। কাজ-কর্ম আমার সাথে যায় না। বাবা কাজ করবে, বাবা কাজ করতে ভালো পারে। কাজ করার জন্য সাত গ্রামে বাবার নাম আছে।

বাবা দূর থেকে হাঁক পেড়ে বললেন, কাজে না গেলে তোকে আলাদা করে দেবো।

শুনে ফরিদ বললো, সব বাবা মা চায় তাদের ছেলে মেয়ে আরাম-আয়েশে থাকুক। আর আমার বাবা মা আমাকে শুধু কাজ করতে বলে। বিয়ের আগে কাজ শিখাওনি, বিয়ের পর কাজ করতে পারবো না। কাজ করলে যে ত্বক নষ্ট হয়ে যায় বাবা মা হয়েও তোমরা বুঝলে না। বড় ছেলেকে তোমরা বাবু বলে ডাকো, মানিক বলে ডাকো, আমি বাবুর মত, আমি মানিকের মত সব সময় থাকবো।

বাবা বললেন, এতগুলো মানুষের খাদ্য জোগাড় করা আমার জন্য দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে।

ফরিদ কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বললো, বিয়ের আগে কাজ করলে বলতে হাত কেটে যাবে, পা ভেঙে যাবে। আর বিয়ের পর কাজ করার জন্য শুধু তাগাদা দিচ্ছো। বিয়ের পর তোমরা গ্রামবাসীসহ আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছো। ভালো একটা বৌ পেয়েছি তো কারো সহ্য হচ্ছে না।

ফরিদের এই কথাগুলো আবুল চাচা সব শুনেছে। ফরিদের বাবাকে বললেন, ছেলে গোল্লায় গেছে। আলাদা না করে দিলে কিন্তু ভালো হবে না।

ফরিদ ক্ষেপে গিয়ে বললো, এই গ্রামবাসী আমার বাবা মায়ের মাথা খেয়েছে। আলাদা করে দেয়ার মত একটা বাজে বুদ্ধি দিতে এসেছেন। পরমানুষের বুদ্ধি নিয়ে আমার বাবা মা আমাকে পর করে দিচ্ছে। যে বাবা মা আমার কাজ করা দেখলে অস্থির হয়ে যেত সেই বাবা মা আমাকে কাজ করতে বলছে বারবার। বিয়ের আগে তো বলেছো আমি বাচ্চা মানুষ। বিয়ের পরই বাচ্চা মানুষকে কাজ করতে বলছো কেনো?

ফরিদের কথা শুনে আবুল চাচা আশ্চর্য হয়ে বললেন, তোকে তোর বাবা খেতে দিতে পারে। কিন্তু তোর বৌকে তোর বাবা খেটে খাওয়াবে কেন?

ফরিদ বললো, চারটা মানুষকে যে খেটে খাওয়াতে পারে, পাঁচটা মানুষকেও সে খেটে খাওয়াতে পারবে। শুধু সৎ চিন্তা আর সৎ ভাবনা দরকার। একটু ভেবে দেখেন আবুল চাচা, একটি মানুষ আসলেই কি ভার বোঝা? এক তেল, লবণ, মরিচে যে তরকারি খেতাম চারজন, এখন খাবো পাঁচজন। এমন কি বাড়তি জ্বালানি খরচও লাগবে না। চার জনের খরচে পাঁচ জনের চলছে এটুকুও তো বুঝতে চাইছেন না।

আবুল চাচা হতবাক হয়ে বললেন, তোর আব্বার বয়স হয়েছে। এখন কি তুই সংসারের হাল ধরবি না?

ফরিদ বললো, আব্বার বয়স মাত্র পয়ত্রিশ। পেপারে দেখলাম মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। পেপার-পত্রিকা তো কোন দিন খুলেও দেখেন না।

ঠিক এমন সময় এক পাওনাদার এলো, বললো, ফরিদ, পাঁচ হাজার টাকা পাওনা হয়ে গেছে। টাকাগুলো যদি দিতিস…

ফরিদ বললো, পাঁচ হাজার টাকা মাত্র, এক লাখ টাকার কুড়ি ভাগের এক ভাগ। পাঁচ হাজার টাকা আবার টাকা হলো? তাও নিতে বাড়ি চলে এসেছিস?

পাওনাদার বললো, পাঁচ হাজার টাকা আমার কাছে অনেক টাকা। অল্প পুঁজির ব্যবসায় আমার।

ফরিদ বললো, অল্প পুঁজি নিয়ে ব্যবসায়ে নেমেছিস কেন্? টাকা পয়সা নেই তবে ব্যবসায় করতে নেমেছিস কেন্? মাত্র পাঁচ হাজার টাকা পাবি, তাও চাইতে বাড়ি চলে এসেছিস, মান-সম্মান শেষ করে দিলি! বর্তমান কালে পাঁচ হাজার টাকা কোনো টাকা হলো?

বাইরে সবাইকে রেখে ফরিদ ঘরে চলে গেলো। দুলনা ফ্যানের বাতাস খাচ্ছে। দেখে ফরিদ বললো, বিয়ে করলেই রোজগার করতে হবে এমন কোনো কথা কোথাও কি লেখা আছে, বৌ? এত ক্লাস পড়াশোনা করেছি কোথাও লেখা নেই বিয়ে করলে রোজগার করতে হবে! এত ব্যানার, পোস্টার, পেপার-টেপার পড়ি কোথাও লেখা নেই বিয়ে করলে রোজগার করতে হবে! গ্রামে জন্মে কি যে ভুল করেছি, কেউ কিছু জানে না!

দুলনা উত্তরে বললো, রোজগার না করলে খাবো কি?

ফরিদ বললো, বৌ, তুমি খাওয়ার চিন্তা করছো কেনো? তুমি জানো না, না খেয়ে কেউ মরে না।

দুলনা একটু একটু বুঝতে পারছে অনেক অর্থহীন কথা বলে তার স্বামী। তাই শান্তকণ্ঠে বললো, কাল থেকে বাবার সাথে কাজে যাবে।

ফরিদ থমকে গেলো। বললো, বৌ, তুমিও আমাকে কাজ করতে বলছো? মজিদ স্যার আমাকে রাজপুত্র বলে ডাকেন। তুমি রাজপুত্রকে কাজ করতে বলছো?

দুলনা বললো, কাজ না করলে রাজার ভাণ্ডারও শেষ হয়ে যায়। ভণ্ডামি রেখে কাজে লেগে যাও।

ফরিদ বৌকে নিজের দিকে তাকাতে বলে বললো, পায়ে চামড়ার জুতো, চোখে রঙিন চশমা, হাতে ঘড়ি। পরনে দামি শার্ট-প্যান্ট। আর আমি যাবো কাজে? আমাকে দেখে কি কাজের ছেলে মনে হচ্ছে? কাজের ছেলে কি এত সুদর্শন দেখতে হয়?

দুলনা বোঝাতে চেষ্ট করলো, বললো, শোনো, কাজ-কর্ম না করলে মানুষ মন্দ বলে। আর অলস স্বামীকে কোনো স্ত্রী পছন্দ করে না। কাজ চোরাকে সবাই ঘৃণা করে। ভালো ছেলের মত কাজে যোগ দাও।

ফরিদ বললো, নায়কের মত দেখতে তোমার স্বামীকে কাজ করতে বলছো? রোদে পুড়ে কালো হয়ে গেলে আমাকে দেখতে তোমার ভালো লাগবে?

দুলনা বললো, সুদর্শন স্বামীতে স্ত্রী খুশি না, সুকর্মা স্বামীতে যে কোন স্ত্রীই খুশি। কাজে যোগ দাও, করিৎকর্মা হয়ে উঠো দ্রুত। কথা কম কাজ বেশি। সাজ কম কাজ বেশি।

ফরিদ এক হাত পিছিয়ে গিয়ে বললো, শেষ পর্যন্ত কাজ করার জন্য তুমিও এভাবে তাগাদা দিতে পারলে? বৌ হয়ে স্বামীকে রোদ-বৃষ্টির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছো? রোদ-বৃষ্টিতে কাজ করলে আয়ু কমে যায়। তুমি কি চাও আমার আয়ু কমুক? আমার পরিশ্রান্ত দেহ দেখতে তোমার ভালো লাগবে?

দুলনা বললো, যে স্ত্রীর স্বামী কাজ করে না, সে স্ত্রীর সামাজিক মর্যাদা থাকে না। আমাকে কেউ যদি বলে অলসের বৌ, তোমার শুনতে ভালো ঠেকবে?

ফরিদ রাগ করে বাইরে চলে গেলো। মা বললেন, কাজ না করলে না ঘরে শান্তি পাবি, না বাইরে শান্তি পাবি!

ফরিদ রেগে বললো, মা, তুমি কি ভুলে গেছো আমি সদ্য বিবাহিত? সদ্য বিবাহিত হয়ে আমি কাজে যাবো?

মা বললেন, কাজের মানুষরা এসব অযথা অজুহাত খোঁজে না। সময় পেলেই কাজে ছোটে।

ফরিদ বললো, কাজ করা কত কষ্ট! আমি তোমাদের বড় ছেলে, আদরের বড় সন্তান। কত আদরে মানুষ করেছো, তাকে কাজ করতে বলছো কেনো?

দুলনা ঘর থেকে বের হয়ে এলো আর বললো, অনেক অসংলগ্ন কথা বলো তুমি। তুমি এ বাড়ির বড় সন্তান, কিন্তু বড় হওনি৷ দায়িত্ব কি শেখোনি। কাজকে যদি ভয় পাও, জীবনে উন্নতি করবে কি করে?

বৌয়ের দিকে এক নজর ক্রুদ্ধ চোখে তাকালো ফরিদ। চরম অসহ্য লাগলো প্রিয় শাবনূর উপমায় খ্যাত করা দুলনাকে। দুপদাপ পা ফেলে বাইরে চলে গেলো। হেকমতের সাথে দেখা, বললো, মিয়া ভাই, মেয়ে দেখে এসেছি। খুব সুন্দর। বিকালের আগে না গেলে অন্যের হয়ে যাবে।

ফরিদ রেগে বললো, বিয়ে বিয়ে করিস না। বিয়ে করলে সব পর হয়ে যায়। মা পর, বাবা পর, বৌও তো আরো বেশি পর। বিয়ে করলে খাদ্যে স্বয়ংসম্পন্ন ঘরেও খাদ্য সংকট দেখা দেয়। বিয়ের আগে না খেতে চাইলেও মা ডেকে ডেকে খাওয়াত। আর বিয়ের পর বলে কাজ না করলে খেতে পারবো না। যদি জানতাম বিয়ে করলে কাজ করতে হয় তবে কি আমি বিয়ে করতাম? পথে ঘোরা স্বভাব যার এক বিয়ে করেই সে পথে বসে গেলো।

হেকমত বললো, মিয়া ভাই, বিয়ের পর আমি কাজ-কর্ম করবো। আমার বিয়েটা দিয়ে দাও। আমারও একটা বৌ থাকবে এটা আমার অনেক দিনের সুপ্ত আশা। বৌ ছাড়া বড় একা।

ফরিদ বিরক্ত হয়ে বললো, বাড়ি যা, মা বাবাকে বল্। এখন আমাকে একা থাকতে দে।

হেকমত বললো, আমার কথাকে গুরুত্বই দিচ্ছো না কেনো, মিয়া ভাই? তোমার ছোট ভাইয়ের বিয়ের বিষয়ে তোমারই গুরুত্ব বেশি দেয়া উচিত। দুই ভাইয়ের দুইটা বৌ থাকবে, দুই ভাইয়ের জীবনে সুখের ঝর্ণাধারা বইবে।

ফরিদ বললো, বিয়ে সুখের না, ভাই। বিয়ে একটা বোঝা আমাদের মত অকর্মাদের জন্য। সব বোঝা বহন যত না সহজ, এ বোঝা বহন তত কঠিন। পড়াশোনা শেষ কর্ আগে।

হেকমত বললো, তুমি বিয়ে সেরে এখন আমাকে পড়াশোনার লাইনে ধাবিত করতে চাচ্ছো, তাই না? আমাকে বিয়ের লাইনে ধাবিত করাটাই তোমার উচিত, মিয়া ভাই। পড়াশোনা যারা করে তারা বিয়ের কথা ভুলে যায়। পড়াশোনা করতে বলে আমাকে বিয়ের কথা ভোলাতে চেও না।

ফরিদ গরম দিয়ে বললো, বিয়ে যে করবি, কাজ জানিস?

হেকমত বললো, জানি, থালা, বাটি, হাড়ি মাজতে জানি, বৌয়ের সব কাজ করে দেবো। উঠোন ঝাড়ু দিয়ে দেবো। বৌকে তোমার মত আদরে রাখবো, কোনো কাজ করতে দেবো না। প্রয়োজনে বৌয়ের শাড়ি ধুয়েও দেবো। তরকারি কুটে দেবো। অনেক কাজ পারি আমি, মিয়া ভাই।

ফরিদ বিরক্ত হয়ে বললো, রোজগার পারিস? আগে রোজগার শেখ্, তারপর বিয়ের নাম মুখে নিবি।

হেকমত বললো, রোজগার করবো কেনো? বাবা আছে, তুমি বড় ভাই আছো। তোমরা থাকতে আমি রোজগার করবো কেনো? তোমরা থাকতে আমি বৌবিহীন থাকবো কেনো? তুমি আব্বাকে বলে আমার বিয়ের ব্যবস্থাটা করো, মিয়া ভাই। কথা দিলাম বৌকে অনেক যত্নে রাখবো। আয়না-চিরুনি, চুড়ি, নূপুর, চুলের ক্লিপ, লিপিস্টিক সব কিনে দেবো।

ফরিদ আশ্বস্ত করে বললো, এখন যা তো। আমাকে একা থাকতে দে।

হেকমত যেতেই আব্বাস এলো, বললো, দোস্ত, অনেক দিনই তো হলো, এবার আমার টাকাগুলো শোধ দে।

ফরিদ মুহূর্তে রেগে বললো, রাস্তাঘাটে কি টাকা চাওয়ার জায়গা? টাকা-পয়সা পবিত্র জিনিস, যত্রতত্র চাস কেন? অভাবে কি তোর স্বভাব নষ্ট হলো?

আব্বাস বললো, বন্ধু, দিনে দিনে অবিবেচকের মত অনেক দেনা করেছিস। বাজারে গেলে দোকানদাররা তোকে পিলারের সাথে বেঁধে রাখবে।

ফরিদ ভয় পেয়ে গেলো। বললো, মান-সম্মানের ভয় আমি করি না। পিলারের সাথে বেঁধে রাখে রাখুক। মারবে না তো? মার খাওয়ার ভয়ে স্কুলে না যেয়ে জঙ্গলে পালিয়ে থেকে মশার কামড় খেতাম। বল্, কেউ মারবে না তো?

আব্বাস বললো, চালের দোকানদার তোর ঠ্যাং ভেঙে দেবে বলেছেন, ঠ্যাং না ভাঙতে পারলেও কয়েকটা বাড়ি তো দেবেনই।

ফরিদ আরো ভয় পেয়ে গেলো। বললো, আচ্ছা, আমি যদি ক্ষমা চাই সব দোকানদার আমাকে কি ক্ষমা করে দেবেন? ক্ষমা তো স্বর্গীয় ব্যাপার। ক্ষমা মহৎ গুণও।

আব্বাস চলে যেতে যেতে বললো, দোকানদাররা তো ক্ষমার বাক্স নিয়ে বসেছেন! দেনা শোধ করে দে।

আব্বাস চলে গেলো। ফরিদ মনে মনে বললো, বাজারে বেঁধে রাখবে? মেরে ঠ্যাং ভেঙে দেবে? বৌ ঘরে ঢুকতে দেবে না? ভাত দেবে না বাবা? কাজ করতে হবে? বিয়ে করার পর জীবনে একি বিপর্যয় নেমে এলো? জীবনে একি অমানিশার ঘনঘটা? এত কিছু জানার পরও মানুষ বিয়ে করে? এত কিছু ঘটবে না জেনে আমি বিয়ে করেছি? বিয়ে করার জন্য মিছেমিছে পাগল হয়েছিলাম? বিয়ের পর দেখি সত্যি সত্যি পাগল হয়ে যাবো। হে অবিবাহিত জগৎবাসী, তোমরা বিয়ে ভুলে যাও।

ঐ সময়ে ওখানে করিমের আব্বা এলেন। বললেন, মুখে এত হতাশার চিহ্ন কেন্? যেভাবে হাত পা ছেড়ে পথে পড়ে আছিস যেন কতকাল খাসনি! শোন্, কাজ শিখে, রোজগার করে, সঞ্চয় করে বিয়ের উপযুক্ত বয়সেই বিয়ে করতে হয়।

ফরিদ বললো, চাচা, আমরা দুটো ভাই বিয়ে পাগল আর বৌ পাগল। আমরা দুটো ভাই মানুষ হতে পারিনি। আপনার কথা শুনলে আজ আমার এই দশা হতো না। কথা দিলাম চাচা, কাল থেকেই কাজে লেগে যাবো। পরিশেষে বুঝেছি, কাজ পাগলের চেয়ে ভালো পাগল পৃথিবীতে আর নেই। বাকি পাগল সব ভোঁয়া। বাবা মা সব সন্তানের ভালো চায়, কিন্তু বিয়ে পাগল আর বৌ পাগল হওয়াতে কিছুই বুঝতে পারিনি।

ফরিদ বাড়ি এলো। দেখলো হেকমত মায়ের সাথে তর্ক করছে। হেকমত বললো, মা, তোমার কাছে আমার একটাই বায়না, আমার একটা বিয়ে দিয়ে দাও। আমার একটাই শখ, তাও একটা বিয়ে করার শখ। তাছাড়া আর কোনো শখ নেই।

মা বললেন, নিজ পায়ে দাঁড়িয়ে তবেই বিয়ে করবি।

হেকমত বললো, আজ বিকালের আগে গেলেই আমার বিয়েটা হবে, মা। নতুবা মেয়েটাকে অন্য কেউ বিয়ে করে ফেলবে। অত সুন্দর মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেলে আমার বিয়ে করার মনটাই ভেঙে যাবে। অত সুন্দর মেয়ে কালে ভদ্রে মেলে, মা। মা, সন্তানের মনের আশা পূরণ করতে হয়।

মা বললেন, তোর মিয়া ভাই নিজ পায়ে কুড়াল মেরেছে। তুইও নিজ পায়ে কুড়াল মারবি?

হেকমত বললো, মিয়া ভাই দিব্যি সুস্থ পায়ে হেটে বেড়াচ্ছে। পায়ে কুড়াল মারলে কি হাটতে পারতো? মা হয়ে এভাবে দিনে-দুপুরে খাঁটি মিথ্যা কথা বলতে পারলে, মা?

মা বিরক্ত হয়ে বললেন, আয়-রোজগার শিখলি না। খাবি কি? বৌর খাওয়াবি কি?

হেকমত বললো, মা, আমি অন্যের খাওয়া দেখে আনন্দ পাই। আমার খাওয়াটাই বৌকে খেতে দেবো। অন্যকে খাওয়াতে পারলে আমি খুব আনন্দ পাই। বৌকে খাওয়াবো, আমার না খেলেও চলবে।

ফরিদের হাতের কাছে লাঠি ছিলো। তুলে নিয়ে হেকমতের পিঠে দিলো এক বাড়ি। দিয়ে বললো, বিয়ের নাম মুখে নিবি না।

হেকমত বললো, ও তোর বিয়ে হয়ে গেছে আর সব ভুলে গেলি? তুই না বলেছিলি আমার বিয়ের ভার তোর কাঁধে! এতটা বিশ্বাসঘাতকতা ভাই হয়ে ভাইয়ের সাথে করতে পারলি?

হেকমতের কথা শুনে ফরিদ তাকে আরো দুই বাড়ি দিলো। ভাব বেগতিক দেখে হেকমত দৌঁড় মারলো আর বললো, ভাই, বিয়ে করলে যে পর হয়ে যায় তুই তার জলন্ত প্রমাণ। আমাকে বিয়ে দিয়েই না হয় পর করে দিতিস! বৌ কি জিনিস নিজের বেলা ঠিকই বুঝলি কিন্তু আমার বেলা বুঝলি না।

ফরিদ আবারো হেকমতকে তাড়া দিলো। হেকমত দৌঁড়ে ঐ পাড়া চলে গিয়ে গাছতলা বসে কান্না করতে থাকলো। ফরিদ ভাইকে উদ্দেশ্য করে বললো, বিয়ে না করলে মানুষ খুব বিয়ের নাম মুখে নেয়। বিয়ে করলে বিয়ের নাম ভুলে যায় সবাই। ভাই, বিয়ে করে আমি সোজা হয়ে গেছি। একেবারে সোজা।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev