মাতৃদুগ্ধ সদ্যজাতের অমিয় সুধা। মাতৃদুগ্ধর গুরুত্ব তুলে ধরা এবং এর সচেতনতা সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিশ্বজুড়ে ১-৭ই আগস্ট পালিত হলো ‘বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ’।
একটা উপন্যাসে পড়া এক সদ্য মা হাওয়া তরুনীর অভিজ্ঞতার কথা বলি।
‘ডাক্তার সিস্টারদের বললো, ওদের একটু দুধ খাওয়াও। বেচারারা পৃথিবীর আলো দেখার পর কিছু খায়নি।
সিস্টার দুটো আমার মুখের দিকে তাকায়। দুধ খাওয়ানর জন্য আমাকে তৈরি করলো। আমি তো আনপড়। যাই হোক সিস্টার দুটো আমার ম্যাক্সি টেনে বুক থেকে নামিয়ে দিল। নিজের দিকে তাকিয়ে নিজেই কেমন যেন অবাক হয়ে গেলাম। নিজের বুক নিজেই চিনতে পারছি না। প্রথম মাতৃত্ব কাকে বলে অনুভব করলাম।
একজন সিস্টার বললো, কাকে প্রথম খাওয়াবেন?
হেসে ফেললাম।
সিস্টার দুজনও হাসছে। ওদেরই একজন ছেলেকে এগিয়ে দিল।
প্রথমে ছেলেকে বুকে আঁকড়ে ধরলাম। তারপর মেয়েকে। মনে মনে বিশ্বাস করলাম আমি মা হয়েছি। যেই কোলে নিয়েছি, টিঁ টিঁ করে সে কি কান্না। কিছুতেই থামাতে পারি না। সিস্টাররা হেল্প করলো।
দুজনে ঘুমচ্ছিল, ঘুম ভেঙে গেছে। তারপর কান্না থামিয়ে পিট পিট করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। কোন দিকে তাকাচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছি না।
সিস্টারদের সাহায্যে দুজনকে দুধ খাওয়ালাম। আমার শরীর নিসৃত অমৃত। সারাটা শরীরে একটা বিদ্যুতের শিহরণ। এক অভূতপূর্ব অনুভূতি। আমার স্বপ্ন স্বার্থক। কচি কচি ঠোঁটে নিপিল দুটো নিয়ে কি খামচা খামচি। যেন সাত রাজার ধন এক মানিক খুঁজে পেয়েছে। কি শুরশুরি লাগছিল। হঁ হঁ করছে।
কচি কচি হাত দুটো চোখ বন্ধ করে কিছু ছুঁতে চাইছে। কিছুতেই সামলাতে পারি না। সিস্টার দুটো সাহায্য করলো। ওদের মুখের দিকে ঠায় চেয়ে আছি। কুত কুত চোখে মাঝে মাঝে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আবার চোখ বন্ধ করে নেয়। মিনিট তিনেক নিপিল দুটো চোষাচুষির পর ঘুমিয়ে পরলো। মনটা খারাপ হয়ে গেল।
সিস্টারকে বললাম, ওরা আর খাবে না? পেট ভরে গেছে, আবার এক ঘণ্টা পর।’

১৯৯২ সালে প্রথম সারা বিশ্বজুড়ে ওয়ার্ল্ড অ্যালায়েন্স ফর ব্রেস্ট ফিডিং অ্যাকসানের উদ্যোগে মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ পালন করা হয়।
২০২১-এর প্রতিপাদ্য হচ্ছে, “Protect breastfeeding : A shared responsibility”
‘আগার তুমনে মা কা দুধ পিয়া হ্যায় তো সামনে আও’, হিন্দী সিনেমার এক বিখ্যাত কমন ডায়ালগ। শুধু সিনেমার কেন, সেই ত্রেতা যুগ থেকে বিভিন্ন কাহিনীর মধ্যে দিয়ে মাতৃদুগ্ধের প্রয়োজনীয়তা সকলের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতি বছর বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে মায়েদের উৎসাহ ও সচেতনতা বাড়ানো হয়।
জন্মের পর থেকে প্রথম ছয় মাস অবধি শিশুদের শুধু মাত্র মাতৃদুগ্ধ দেওয়া উচিত। মাতৃদুগ্ধ নিঃসরণ না হলেও স্কিন-টু-স্কিন কন্টাক্ট ও খুব জরুরী। মায়ের দুধকে বলা হয় শিশুর প্রথম ভ্যাকসিন। এই দুধেই রয়েছে অ্যান্টিবডি, immune system components, এবং growth factors। স্তনদান মা এবং শিশুর উভয়ের পক্ষেই প্রয়োজনীয়।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, জন্মের ১ ঘণ্টার মধ্যেই শিশুকে স্তন্যপান করালে ভবিষ্যতে নানা অসুখ থেকে তাকে দূরে রাখা যায়। স্ত্রীরোগ চিকিৎসক বাসুদেব মুখোপাধ্যায় বলেন, সন্তানের জন্মের পরে প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই মায়ের স্তনবৃন্ত থেকে ঈষৎ হলদেটে ঘন দুধ নিঃসৃত হয়। এই দুধকেই বলা হয় কোলস্ট্রাম। কোলোস্ট্রামে আছে IgA নামক এক বিশেষ ধরনের অ্যান্টিবডি যা সদ্যোজাতর মুখ, গলা, থেকে শুরু করে ফুসফুস ও অন্ত্র প্রতিটি অঙ্গের রক্ষাকারী আবরণ মিউকাস মেমব্রেনের সুরক্ষা কবচ। মিউকাস স্তর সুরক্ষিত থাকলে বাইরের সংক্রমণ চট করে শিশুকে কাবু করতে পারে না। মনে রাখবেন, মাতৃদুগ্ধ সব সময়েই ফর্মুলার চেয়ে বেশি উপকারি যে কোনও শিশুর ক্ষেত্রে। মাতৃদুগ্ধের মাধ্যমে মায়ের শরীর থেকে অ্যান্টিবডি শিশুর শরীরে যায়। ফর্মুলাতে সেটা থাকবে না। এমনকি শিশুর ডায়রিয়া হলেও মাতৃদুগ্ধ বন্ধ করা উচিৎ নয়।
ছয় মাসের পর থেকে দুবছর বা তারও বেশি বয়স পর্যন্ত পরিপূরক খাদ্যের সঙ্গে বুকের দুধ নিয়মিত খাওয়ানোর পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। অনেক ক্ষেত্রে সদ্যজাতকে মা স্তনদান দিতে পারেন না। ব্যাকুল হৃদয় খিদেয় ছটফট করতে দেখেও সহ্য করতে হয়। বিশেষজ্ঞের সঠিক পরামর্শ মেলে না অনেক সময়ে। আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে শুরু হয়েছে বিশ্ব স্তনদান সপ্তাহ। এই উদ্দেশ্যে ১ আগস্ট শুরু করা হলো একটি ওয়েবসাইট (http://www.breastfeeding.org.in/)। নিয়ন্যাটোলজি সোসাইটি ওয়েস্টবেঙ্গলের (এনএসডব্লিউ) উদ্যোগে রবিবার এই ওয়েবসাইটের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।
আশা করা যায় এইধরনের সমস্যায় পড়া মায়েদের আলোর দিশা দেখাবে এই ওয়েবসাইট। এই প্রকল্পটি যাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত, এনএসডব্লিউ-এর সম্পাদক শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সুমিতা সাহা। মাত্র দু-সপ্তাহের মধ্যে তাঁর ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব হয়েছে এনএসডব্লিউ এবং ন্যাশনাল নিওন্যাটোলজি ফোরামের যৌথ সহায়তায়।
ডা. সুমিতা জানান, দেড় দশক আগে নিজে যখন প্রথম মা হয়েছিলেন, তখন স্তন্যদান সংক্রান্ত সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন তিনিও। তাঁর কথায়, ‘বিলেতে থাকাকালীন এই ধরনের সমস্যায় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন অনেকে। কিন্তু সে দেশের মতো মিডওয়াইফ থেকে শুরু করে ল্যাকটেশন কনসালট্যান্টের সুবিধা এ দেশে মেলে না। তাই এখানকার সদ্য মা হওয়া তরুণীদের অসহায়তা কাটাতে এই উদ্যোগ নেওয়া হলো।’
ডা. সুমিতা জানান, ওয়েবসাইটে চোখ দিলে নতুন মায়েরা জয় করতে পারেন স্তনদান সংক্রান্ত নানা সমস্যা। দক্ষিণ ভারতে অনুরূপ একটি ওয়েবসাইট আছে তামিল ভাষায়। কিন্তু নতুন এই ওয়েবসাইটে বাংলা ও ইংরেজি, দুটোই রাখা হয়েছে।
উদ্যোক্তারা জানান, স্তনদান সংক্রান্ত যে সব সমস্যায় মায়েরা জর্জরিত হন, বিশেষ করে শহুরে মায়েরা, পোর্টালে সেগুলোর সমাধান বলে দেওয়া হয়েছে। আছে ডায়েটিসিয়ান থেকে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ এবং সদ্যজাতদের রোগ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ।
স্তনদানের মধ্যে দিয়ে মা ও শিশুর মধ্যে এক নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এছাড়া বুকের দুধ খাওয়ালে মায়েদের ডিম্বাশয় ও স্তনের ক্যানসারের ঝুঁকি কমে যায়।
ছবি অন্তর্জাল থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে