জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
ইউনিভার্সিটিতে সৌম্য আমার জুনিয়র ব্যাচের ছেলে। আমার সৌজন্যে আমাদের অফিসে প্রায় আসতো। কাগজে টুক-টাক লেখা লিখি করতো। মাস-কম করে কখনই সাংবাদিকতাকে পেশা হিসাবে নিতে চায় নি। বরং সব সময় একটা চাকরি পেলে জীবনটা বত্তে যায়, ব্যাপারটা এরকম ছিল।
হলও তাই। ফ্রিল্যান্সিং করতে করতে আইটিসিতে একটা সুযোগ পেল। আমাকে এসে বললো, দাদা এ্যাপ্লাই করলাম, দুজনের রেফারেন্স চেয়েছিল তোমার নামটা দিয়েছি।
আমার পার্মিশন নিয়েছিস?
তোমার আবার পার্মিশনের দরকার আছে নাকি, তাহলে তোমায় দাদা বলে ডাকছি কেনো। ভাইকে যদি দাদার পার্মিশন নিতে হয় তাহলে ওরকম দাদার দরকার নেই।
সৌম্যর চাকরি হলো। কিন্তু আমাকে বাইফোনে পঁয়তাল্লিশ মিনিটের ইন্টারভিউ দিতে হলো ওর ডিরেক্টরকে। যার বেশির ভাগটাই আমি বানিয়ে বানিয়ে সৌম্যর সম্বন্ধে বলেছি।
যাক তবু ছেলেটা চাকরি পেল। জুনিয়র ইনফর্মেশন অফিসার।
এরপর প্রায়ই সৌম্য ফোন করতো। ভালমন্দের খবর নিত।
একদিন কপি লিখছি। তখন কাগজের পিক টাইম সৌম্যর ফোন। ধরলাম।
কেমন আছো অনিদা?
ভালো আছি।
ফেঁসেছি। আগামীকাল একটু সময় দেবে—
তুইতো বেইমান, প্রয়োজন ছাড়া ফোন করিস না। বল কি প্রয়োজন—
আগে বলো সময় দেবে, তারপর।
ঠিক আছে, কাল প্রেস ক্লাবে আসবি, আমি বিকেলের দিকে থাকবো।
কটা বলো।
তিনটে নাগাদ আয়।
সেদিন প্রেস ক্লাবে একটা প্রেস কনফারেন্স ছিল। ব্যস্ত ছিলাম। ভুলেই গেছিলাম সৌম্যকে আসতে বলেছি।
প্রেস কনফারেন্স হয়ে যাবার পর বেরিয়ে আসবো। দেখি লনে সৌম্য দাঁড়িয়ে। পাশে একটা মিষ্টি মতো মেয়ে।
আমাকে দেখে একগাল হাসি।
কাছে এগিয়ে গেলাম।
এ-কি দাদাকে প্রণাম করো।
সৌম্য মেয়েটাকে ধমকালো, না ভালোবেসে বললো বুঝলাম না।
যাক সে পর্বটাও ভালোয় ভালোয় কাটলো। লনে দাঁড়িয়েই চা খেতে খেতে সৌম্য বললো।
আগামীকাল রেস্ট্রী করবো। বাড়ীর অমতে। তোমাকে সাক্ষী দিতে হবে।
হাসলাম।
এরকম প্রায়ই সৌম্যর ফোন আসে। সব সময়ই ওর বিশেষ প্রয়োজন। উতরে দিই।
একবার ফোন করে বললো, মেয়ের বাবা হয়েছি।
বেশ করেছো। আমার কি—
খেপে যাচ্ছ কেনো।
প্রয়োজনটা বল।
সারকথার এক কথা।
হাসলাম।
এখন থেকে বুকিং করলাম। মেয়েকে একটা ভালো স্কুলে ভর্তি করে দিতে হবে।
যা ভাগ। ফোন রেখে দিলাম।
মাস ছয়েক আগে সৌম্য ফোন করেছিল।
দাদা সব জায়গায় ফর্ম তুলেছি। মেয়েটার একটা গতি করে দাও প্লিজ।
নাছোড় বান্দা সৌম্যকে বলেছিলাম পরে ফোন করিস। এখন ব্যস্ত আছি।
পরে অবশ্য সৌম্যর মেয়েকে বেথুনে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলাম।
গত একুশে ডিসেম্বর, আমার এক নিকট আত্মীয়ের অপারেশন হয়েছে। তার কাছে আছি। মোবইলটা পকেটের মধ্যে ভীষণভাবে নড়াচড়া শুরু করে দিল। ভাইব্রেশন মুড শব্দ হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে পকেট থেকে বার করলাম। স্ক্রিনে সৌম্যর নামটা ব্লিঙ্ক করছে।
ধরেই বললাম।
আমাকে ক্ষমা কর, আমি এখন একটা হাসপাতালে আছি আমার এক নিকট আত্মীয়ের অপারেশন চলছে।
তোমাকে আমার ভীষণ দরকার প্লিজ আমার কথাটা মন দিয়ে শোন।
তখন মনটাও আমার ভাল নয়। হাসপাতালে যাকে দেখতে গিয়েছি। সবে তার সেদিন অপারেশন হয়েছে।
বাধ্য হয়ে বললাম,—বল কি বলছিস।
গত চোদ্দই নভেম্বর বাবার সেরিব্রাল হয়। বাবাকে আমার এলাকার নার্সিংহোমে এ্যাডমিশন করি। বাবার ব্যাপারটা মা মন থেকে ঠিক মতো মেনে নিতে পারে নি। পরের দিন মারও সেরিব্রাল হয়। কিন্তু ওই নার্সিংহোম পেসেন্ট এ্যাডমিট করতে চায় নি। তাই বাধ্য হয়ে মাকে সিএমআর আইতে ভর্তি করি।
বাবাকে কয়েকদিন নার্সিংহোমে রেখে সুস্থ করে বাড়ি নিয়ে এসেছি। মাকে ফেরাতে পারি নি। গত চোদ্দই ডিসেম্বর মা আমাকে ছেড়ে চলে গেছেন।
বাবাকে নার্সিংহোম থেকে ফিরিয়ে আনার পর মার ব্যাপারটা বলতে কেমন যেন আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল। তারপর ধীরে ধীরে কেমন যেন বায়াস হয়ে গেল। বাড়িতে রাখতে পারছি না। সকাল সন্ধ্যে যে আয়াগুলোকে রেখেছি তারাও বাবাকে সামলাতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে।
মায়ের কাজ পঁচিশ তারিখ তুমি একবার এসো।
অনিদা এভাবে চললে আমার বউ অসুস্থ হয়ে পরবে। মেয়ের দিকে তাকাতে পারছি না। বাধ্য হয়ে বাবাকে আবার নার্সিংহোমে সিফ্ট করেছি। প্লিজ তুমি একবার এসো।
ঝড়ের মতো সৌম্য কথা বলে গেল কিন্তু খুব সহজ-সরল গলায়।
আমি কিছুক্ষণ গুম হয়ে থাকলাম।
ঠিক আছে তুই এখন রাখ আমি আগামীকাল যাচ্ছি।
বহুদিন আগে মাসীমা-মেসোমশাইকে দেখেছি। সৌম্য যখন চাকরি পেল, তখন একদিন আমাকে নিমন্ত্রণ করে বাড়িতে ডেকে খাইয়েছিল। দেখা সাক্ষাৎ খুবই কম হতো বেশিরভাগ সময় ফোনেই কথা হতো।
মনটা খারাপ হয়ে গেলো।
পরের দিন আর যেতে পারি নি। শ্রাদ্ধের দিনও অনেক চেষ্টা করে যাওয়া হয়ে উঠলো না। গেলাম সাতাশে ডিসেম্বর। সোজা নার্সিংহোম। তারপর সৌম্যর বাড়ি। সৌম্যর শরীরে মাতৃদায় গ্রস্ত পুত্রের সাজ। মাথা নেড়া।
এসো।
ভেতরে গেলাম।
সৌম্য বাবা-মার একমাত্র সন্তান। স্বচ্ছল পরিবার। বাবা সরকারী চাকুরে ছিলেন। ছেলের জন্য বাড়ি করে রেখেছেন। ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স খারাপ নয়। ছেলেকে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়িয়েছেন।
বসলাম।
সৌম্য বললো, সেদিন রাতে সবাই একসঙ্গে ডিনার করলাম। বাবার সঙ্গে কত কথা হলো। খাওয়ার পর বাবা বললো, বুঝলি রানা (সৌম্যর ডাকনাম)। মাথাটা ভীষণ যন্ত্রণা করছে।
প্রথমে বুঝতে পারি নি। পরে যখন অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হলো। সঙ্গে সঙ্গে নার্সিংহোমে নিয়ে গেলাম।
ডাক্তার দেখে বললো, একটা স্মাইল স্ট্রোক হয়েগেছে। এ যাত্রায় রক্ষা পেয়ে গেলেন।
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। বাবাকে নার্সিংহোমে রেখে বাড়ি ফিরলাম। মাকে এসে সব বললাম।
পরদিন মা বললো বাবাকে দেখতে যাবে।
বললাম চলো।
মা বাথরুমে গেলো। তারপর ঠাকুর ঘর। দেখি পূজো আর শেষ হয় না। ঠাকুর ঘরে গিয়ে দেখি মা শুয়ে আছে। চোখ বন্ধ। ডাক্তার ডাকলাম। দেখে বললো স্ট্রোক। ম্যাসিভ।
দশদিন বাবাকে নার্সিমহোমে রেখে ফিরিয়ে আনলাম। বেশ ছিল। মার খোঁজ খবর করতে সব বললাম। তারপর থেকে কেমন যেন দেখলে চিনতে পারতো না। কাউকে সহ্য করতে পারতো না। আমার মেয়েকে দেখলেও রেগে যেত। আস্তে আস্তে বায়াস হতে শুরু করলো। ধরে রাখা যেত না। তবু বাড়িতে রাখলাম।
মা মারা গেলেন। বাড়িতে নিয়ে এলাম। সবাই বারণ করেছিল বাবাকে দেখাতে হবে না। তবু বাবাকে নিচে নিয়ে এসে দেখালাম। ধরে ধরে ওপরের ঘরে তুলে আনলাম।
কাঁদলো। বললো, মাধু রাগ করে চলে গেলো।
শ্মশান থেকে ফিরলাম। আমাকে দেখে বললো। দু-ভাই-এর যে কোনও একজন কাজ করলেই হবে।
প্রথম খটকা লাগলো।
মাকে বাবা ঠাম্মা ভাবছে, আমাকে ভাই ভাবছে!
ভালো লাগলো না। সাইকিয়াটিসের সঙ্গে এ্যাপয়েন্টমেন্ট করে বাড়িতে নিয়ে এসে দেখালাম। বললো, উনি খুব সক্ পেয়েছেন। ওনার এখন ভীষণ যত্নের দরকার।
কি করে করি বলোতো—মায়ের পেছনে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। তারপর বাবা—
তুমি একটা বৃদ্ধাশ্রমের ব্যবস্থা করে দাও না। আমি মাসে চারহাজার টাকা পর্যন্ত খরচ করতে পারি। বাবাকে বাড়িতে রাখাটা ভীষণ রিক্স হয়ে যাচ্ছে। দাদুর ওইসব দেখে মেয়েটা পর্যন্ত কেমন হয়ে গেছে। বউ বলছে বাপের বাড়ি চলে যাবে।
আমি সৌম্যর মুখের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম।
সৌম্য ভীষণ ক্যাজুয়াল।
প্লিজ অনিদা বাবার জন্য তুমি কিছু একটা করো। আমি মেক্সিমাম মান্থলি পাঁচহাজার পর্যন্ত খরচ করতে পারি। জানোতো আমার এই চাকরিটা সম্বল। তার থেকেই সংসার মেয়ের পড়াশুন। লোক লৌকিকতা, সবইতো বোঝ।
আমি আর থাকতে পারলাম না। বেরিয়ে এলাম।
সৌম্য বার বার বললো, তুমি কিন্তু বাবার জন্য একটা ব্যবস্থা করে দিচ্ছ।
আগরপাড়া স্টেশনে এসে একটা চায়ের দোকানে দাঁড়ালাম। শীতের রাত। এবার শীতটা বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। বয়স্ক ভদ্রলোক চা বানাচ্ছেন। একটু জল খেয়ে এক ভাঁড় চা চাইলাম।
বার বার সৌম্যর বাবার মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে। শিশু সুলভ চোখ কাউকে চিনতে পারছেন না। নিজের মনে নিজে রয়েছেন। এই ভদ্রলোকই একদিন সৌম্যর জন্য কতো রাত জেগেছেন। একমাত্র সন্তানের শরীর খারপে স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে পালা করে রাত জেগেছেন।
সৌম্য যখন ছয়মাসের শিশু, হয়তো এমন কোনও এক শীতের রাতে বিছানায় পেচ্ছাপ করে কেঁদে উঠেছে তখন সৌম্যর বাবা নিজের বুকে তার শিশু সন্তানকে তুলে নিয়ে সারাটা রাত হয়তো জেগেই কাটিয়ে দিয়েছেন। সৌম্য তার পিতার বুকের ওমে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থেকেছে।
ঘন বর্ষায় রাস্তায় জল জমে গেছে। সৌম্যর বাবা ছেলেকে কাঁধে করে স্কুল থেকে নিয়ে ফিরেছেন। ছেলের জন্য বাবা মাকে কতো লাঞ্ছনা-গঞ্জনা শুনতে হয়েছে।
নিজেদের ইচ্ছে না থকলেও একমাত্র ছেলের বৌকে হাসিমুখে মনে নিয়েছেন।
আর আজ তাঁর সবচেয়ে বড়ো দুর্দিনে যার সর্বক্ষণ পাশে থাকার কথা সে কিনা তাঁকে বৃদ্ধাশ্রমের ঠিকানা দেখাচ্ছে!
সৌম্যর প্রতি আমার একটা দুর্বলতা ছিল, সেটা নিমেষে উধাও হয়ে গেলো। মনে মনে ওকে ভীষণ ঘৃণা করতে ইচ্ছে করলো। এ-কি উদ্ভট চিন্তা করছে সৌম্য!
অবিমৃশ্যের মতো অনেকক্ষণ স্টেশনের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ঘোরা ঘুরি করলাম। ট্রেণ আসে চলে যায়। আমার আর ওঠা হয় না।
মনটাকে কিছুতেই বাগে আনতে পারছি না। শেষে মনে মনে বললাম, আমি তোর এই অনুরোধটা রাখতে পারলাম না সৌম্য। এই দায়িত্বটা সম্পূর্ণ তোর ব্যক্তিগত, আমি এতে ভাগ বসাতে চাই না।
প্লিজ ক্ষমা করিস। তোর অনিদা এই ব্যাপরটায় নতি স্বীকার করলো।
দিন পনেরো বাদে আমার মোবাইলে একটা ম্যাসেজ এলো সৌম্যর কাছ থেকে, খুলে দেখলাম—
বাবা চলে গেলেন, শ্মশানে যাচ্ছি….
Kanna Peye jay emon santan er katha sunle!!!era daat thakte daat er mahima bojhe na,jader nei tarai bojhe!!!