‘ঠাকুর্দার ঝুলি’, ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ ‘ঠানদিদির থলে’, ‘গল্প বলে দাদুমণি’ বইগুলোর নাম শুনলেই ভেসে ওঠে একটা ছবি। বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের চারপাশে ঘন হয়ে বসেছে ছোটরা। চোখে অবাক বিস্ময়, অপার কৌতূহল। গল্পের চেয়েও দ্রুত গতিতে ছুটছে তাদের মন। কখনও তা ঢুকে পড়ছে গুপ্তধনের গুহায়, কখনও পাড়ি দিচ্ছে তেপান্তরের মাঠ। বার্ধক্য যেন ছিল তখন একটা পরিবার, পরিজন, নাতিপুতি ঘেরা নিশ্চিত নিরাপত্তা, নিশ্চিন্ত বিশ্রাম। একটু সন্মান, একটু মনোযোগ বদলে দিতে পারে মানুষগুলোর শেষ জীবনকে। এটুকু পড়েই কেউ ভেবে নিতে পারেন সেকালেও বৃদ্ধ–বৃদ্ধাদের জীবনে অনেক সমস্যা ছিল। অবহেলা, অশ্রদ্ধা, বঞ্চনার ঘটনা তখনও কম ছিলনা। অতীতের সবকিছু ভালো, তা এক অলীক কল্পনা।
ঠিকই, কিন্তু গ্রাম বলুন বা শহর এখনকার বয়স্ক মানুষদের মত নিঃসঙ্গতা ও বিষণ্ণতা তখন তুলনামূলকভাবে একটু কম ছিল। বয়স্করা তখন ভিড়ের মধ্যে থেকেও এতটা বাতিল হয়ে যাননি। আদর যত্ন হয়তো সবার সমান ছিলনা। অনেকেরই ছিলনা নাতি নাতনিদের গল্প শোনানোর মত পরিসর কিংবা ততটা মনোযোগ। তবু এরা কেউই সংসারে থেকেও সংসারের বাইরের মানুষ হয়ে যাননি। এতটা বিপন্নতা গ্রাস করেনি তাদের। এতটা নিরাপত্তাহীন জীবন ছিলনা তাদের।
চিকিৎসাবিজ্ঞান মানুষের বেঁচে থাকার ও কর্মজীবনের মেয়াদ বাড়িয়েছে ঠিকই কিন্তু বার্ধক্যের সন্মান ও নিরাপত্তা বাড়ায়নি। বাবা-মা’কে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানোর ব্যাপারে অনেক সমালোচনা হয়। সেখানেও পাঠানোর ব্যাপারটাও তো একটা সামর্থ্যের ব্যাপার। কিন্তু পরিবারে থেকেও যারা পাননা কোন মনোযোগ, জিজ্ঞাসা করা হয়না তারা কেমন আছেন সেকথা, তাতো আরও ভয়াবহ ব্যাপার। এটা ঠিকই, জিজ্ঞেস করলে বা কথা বললেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবেনা। কিন্তু খোঁজখবর নিলে একটু আশ্বস্ত হন এরা। ভাবেন, কেউ তো তাদের কথা ভাবছে। অন্তত কেউ তাদের মনে রেখেছে। এটুকুই জীবনকে অনেক সহনীয় করে তোলে।

বয়স্ক মানুষদের স্বাস্থ্যের সমস্যা সত্যিই একটা বড় ব্যাপার। কেমন আছেন তারা, একথা জানতে ল্যাসি বা লঙ্গিচ্যুডিনাল এজেন্সি স্টাডি ইন ইন্ডিয়া একটা অভিনব সমীক্ষা চালিয়েছে। এই সমীক্ষাতে দেশের ষাটোর্ধ মানুষেরা নিজেরাই তাদের শরীরস্বাস্থ্যের নানা সমস্যার কথা জানিয়েছেন। তা থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে এই বয়সে শরীরস্বাস্থ্যের ব্যাপারে যতটা মনোযোগ পাওয়া তাদের দরকার ছিল তা তারা পাচ্ছেন না। সমীক্ষায় দেখা গেছে ষাটোর্ধ প্রতি চারজন দেশবাসীর একজনের স্বাস্থ্যের অবস্থা বেশ খারাপ। শহরের থেকে আরও খারাপ গ্রামের বয়স্ক মানুষদের অবস্থা। ছেলেদের থেকে আরও খারাপ অবস্থা মেয়েদের।
দেশের মোট জনসংখ্যার ২৪ শতাংশ এই মানুষগুলি রোগব্যাধিকে সঙ্গী করেই বাঁচছেন। বয়স্ক মানুষদের স্বাস্থ্যের সমস্যা সবচাইতে বেশি কেরালা ও তামিলনাডুতে। দুটি রাজ্যেরই আর্থিক অবস্থা খুব একটা খারাপ নয়। তাহলে দেখা যাচ্ছে অর্থ নয়, বার্ধক্যের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিটাই একটা বড় সমস্যা। এই দুটি রাজ্যের ষাটোর্ধ অর্ধেকের বেশি মানুষ অসুস্থ। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, হিমাচল প্রদেশ, গোয়া, জম্মু ও কাশ্মীর, পন্ডিচেরির এক চতুর্থাংশ বয়স্ক মানুষ নানা শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় ভুগছেন।
গোটা দেশেই বয়স্কদের শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতাগুলির মধ্যে রয়েছে চলাফেরার সমস্যা, শ্রবণশক্তির সমস্যা, বাক সমস্যা। সমস্যা জেনেই কিন্তু কাজ শেষ হয়ে যায়না। এক্ষেত্রে আমরা নিজেরাও একটা গা বাঁচানো মনোভাব নিয়ে চলি। গোটা দায়িত্বটাই চাপিয়ে দিই সরকারের ওপর। একটা মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সমস্যাটা সমাধানের চেষ্টা করি না। অসুস্থ বয়স্কদের শারীরিক সমস্যার ব্যাপারে সহায়তায় তারুণ্যের শক্তিতে ভরপুর ভারত এব্যাপারে কি ভাবছে?
নিজেদের এলাকা থেকেই শুরু হতে পারে এই কাজ। পাড়ার অসুস্থ বয়স্ক মানুষদের চিহ্নিত করে তাদের শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসায় ও সহায়তা করতে পারি আমরা। সমীক্ষার ফল জানার পর সব দায় সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার মনোভাব থেকে বেরোতে হবে আমাদের।
রাষ্ট্রসংঘ এই দশকটিকে ‘ডিকেড অফ হেলদি এজিং’ বলে চিহ্নিত করেছেন। কলকাতায় বছরটি শুরুই হল মধ্য কলকাতায় এক নিঃসঙ্গ অসুস্থ বৃদ্ধের হত্যার মধ্যে দিয়ে। কেউ বলবেন, আজকের দিনে ছেলেমেয়েদের গল্প শুনতে ঠাকুমা, দিদিমাদের কাছে পাঠানো যায়না, তাদের কত কাজ! এ নিয়ে তর্কে যাবো না, তবে বৃদ্ধদের পাশে থাকা, খোঁজখবর রাখা, দরকারে চিকিৎসক ডাকা বা ওষুধ, পথ্য ইত্যাদি কিনে দেওয়ার ব্যাপারে সহায়তা করলেও অনেকটা কাজ হয়। কোভিড সময়ে পাড়ায় পাড়ায় এদের বিপন্নতার ছবি আমাদের কাছে আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে। সব কাজ সরকারের হতে পারেনা। আমাদেরও কিছু দায়িত্ব আছে। আসুন, এই সামান্য কাজগুলির মধ্যে দিয়েই বার্ধক্যকে সন্মান জানাই আমরা।
এই সময়ের দাবীতে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক একটি লেখা।