এই ব্রিসবেন মনে করায় নব্বই বছরের এক ক্রিকেট খেলিয়ে দেশের বারংবার ঔদ্ধত্য সংহারকে। এই ব্রিসবেন মনে করায় লালকেল্লায় শোভিত একটা তিনরঙা পতাকার শূন্য থেকে শুরু করে দিগ্বিজয়ের প্রহরকে। প্যাট কামিন্সের বাউন্সারটা একশো পঁয়তাল্লিশ কে.পি.এইচে হেলমেট নাড়িয়ে দেবার পর চেতেশ্বর পুজারা একটা মিষ্টি হাসি হেসে মিডল লেগ গার্ডটা নিয়ে নেন আবার, পরের বলটার জন্য; ঠিক যেন হিংস্রতার বিরুদ্ধে সহিষ্ণুতার আশ্বাসবাণী। আনকোরা ওয়াশিংটন-শার্দুল শুরু করে কাউন্টার অ্যাটাক; ঠিক যেন—উত্তিষ্ঠত জাগ্রত। আর বছর তেইশের ঋষভের স্টেপ আউটগুলো ঠিক যেন—প্রাপ্য বরান নিবধতঃ-এর বিবেকবাণী। এটাই তো ভারতবর্ষ। সহিষ্ণুতার ভারতবর্ষ। ‘উত্তিষ্ঠত জাগ্রত’ ভারতবর্ষ। প্রাপ্য বরান নিবধতঃ-এর ভারতবর্ষ। এই ব্রিসবেন যে আদতে মনে করিয়ে দিলো এক ভারতবর্ষকে, যাকে ক্লাইভ লয়েড দেখেছিলেন, স্টিভ ওয়াহ দেখেছিলেন, দেখেছিলেন রিকি পন্টিং-মাইকেল ক্লার্করা; আর আজ দেখলো স্মিথ-গ্রীন-পেইনের ব্রিসবেন।

আফ্রিকায় একটা সুন্দর প্রবাদ আছে—Until the Lions Know how to write, every story will glorify the hunters। কিন্তু রাজসিক ক্রিকেটের ছত্রে ছত্রে ক্লাইভ-স্টিভ-পন্টিং নামের দিগ্বিজয়ী শিকারীদের অপরাজিত ঔদ্ধত্যগুলো বারংবার যে বেন্ড ডাউন হয়ে গিয়েছে অশোকের দেশের বিশালতায়, সে গল্পগুলো কি আদৌ লুকিয়ে রাখা যেত? সেগুলো যে চিকচিক করে আজও, যার চকিত ঔজ্জ্বল্যে চোখ ছোটো করে নিতে হয় এখনও। সাদা জার্সির ঋষভকে আলিঙ্গন করে বিবাগী হয়ে যাওয়া রবি শাস্ত্রী, তেরঙ্গার হাতলটা মুঠোয় নিয়ে আকাশের দিকে তাক করা সিরাজের ছলোছলো চোখ আর চাপদাড়িওয়ালা রাহানের চোখের শান্ত স্নিগ্ধ দৃষ্টি—এই ব্রিসবেন মনে পড়ালো অনেক কিছু। মনে পড়ালো বিশ্বজয়ী শিকারীদের চিরকালীন ঔদ্ধত্যসংহারক এক ভারতবর্ষকে।

এই ব্রিসবেন মনে করিয়ে দেয় পঁয়তাল্লিশ বছর আগেকার পরাজিত এক ক্লাইভ লয়েডের লালায়িত রক্তিমতাকে। ছিয়াত্তরের সাবিনা পার্ক। আগের ম্যাচেই গাভাস্কার-বিশ্বনাথের বিক্রমে ঘটেছে বিশ্বত্রাস ক্লাইভের শোচনীয় পরাজয়। প্রতিশোধের প্লাবনে স্ফুরিত ক্লাইভ পরের সাবিনা পার্ক টেস্টে ভারতীয়দের দিকে তাক করে হোল্ডার-হোল্ডিং-ড্যানিয়েলদের দিয়ে শুরু করালেন বাউন্সার বর্ষণ। ভারতের অর্ধেক খেলোয়াড় আহত ও বিদ্ধস্ত অবস্থায় সাজঘরে। দ্বিতীয় ইনিংসে ৯৭ রানে ৫ উইকেট পড়তেই ক্যাপ্টেন বেদী বাধ্য হলেন ইনিংস ডিক্লেয়ার করতে, কারণ ব্যাট ধরার লোক নেই আর, আহত প্রায় সবাই। আজ, পঁয়তাল্লিশ বছর পর প্যাট কামিন্সের ছোঁড়া রক্তলালায়িত বাউন্সারগুলো শরীর দিয়ে শুষে নিচ্ছেন একজন চেতেশ্বর পুজারা, হাসপাতাল থেকে স্ক্যান করে এসেই প্যাড পরে ক্রিজে গার্ড নিচ্ছেন একজন ঋষভ পন্থ, ভাঙা বুড়ো আঙুলের উপর ডাবল লেয়ারড্ প্রোটেকশন নিয়ে বাইরে অনর্গল শ্যাডো করে চলেছেন একজন রবীন্দ্র জাদেজা, আগের রাত্রে যন্ত্রণায় কাতর হয়ে হামাগুড়ি দিয়ে শুতে যাওয়া একজন রবিচন্দ্র অশ্বিন, গোলাবর্ষণের সামনে বুক পেতে দাঁড়িয়ে থাকেন একশো তেত্রিশটা মিনিট—ব্রিসবেনে আজ ছাপান্ন দিন ধরে বয়ে চলা মৃত্যুর সাথে ক্রিকেটের যুদ্ধের ললাট লিখল বিরাটের সভ্যতা। আজ থেকে ব্রিসবেনের প্রতিটা নিশ্বাসে অনুরণিত হবে মৃত্যুর সামনে শরীর বিছিয়ে দেওয়া চেতেশ্বরের পায়ের খসখস আওয়াজটা।
এই ব্রিসবেন মনে করিয়ে দেয় সাতচল্লিশ বছর আগেকার ইডেনের এক শীতের দুপুরকে। সামার অফ ফরটি টুর শোকস্তব্ধতায় ক্যাপ্টেন্সি ছেড়েছে ওয়াদেকর। দলের অবস্থা টালমাটাল। দায়িত্বভার অর্পিত হয়েছে বয়স্ক পতৌদির ওপর। ক্লাইভের সাথে হওয়া সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচেই পরাজয় স্বীকার পতৌদির ভারতের। আর তারপর? রবার্টস-হোল্ডিংয়ের মিশাইলকে শুষে নিয়ে ইডেনের কোনো এক শীতের দুপুরে বিশ্বনাথের করা ১৩৯ কিংবা ঠিক পরের মাদ্রাস টেস্টে বেদী-প্রসন্নের ঘূর্ণিপাকে বিদ্ধ লয়েড বাহিনীর পরাজয়। ০-২ থেকে ২-২ পতৌদির ভারতের রাজসিক প্রত্যাবর্তন। আজ, সাতচল্লিশ বছর পর, ব্রিসবেনের কি মনে পড়ছে সেটাও? অ্যাডিলেডের সামার অফ থারটি সিক্সের ধ্বংসাবশেষের উপর ঋষভ-রবীন্দ্র-রাহানেদের নির্মিত এই নবরাগের সুরমূর্ছনা কি মনে করায়না সেই বিশ্বাসকে, যে বিশ্বাস লিয়-পেইন-স্মিথদের শ্লেষাত্মক হরতনের ওপর ধৈর্য্যের টেক্কা ফেলে গেছে চিরকাল!

এই ব্রিসবেন আবার কখনও মনে করায় বছর কুড়ি আগেকার কলকাতাকে। স্টিভের ঔদ্ধত্যের অস্তরাগের উপর বেহালার এক যুবকের ছায়া বারবার লম্বা হয়ে গিয়েছিল সেবার। আজ, ২০০১ কলকাতা টেস্টের কুড়ি বছর পরেও ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটের অভিজ্ঞতাহীন একজন ওয়াশিংটন সুন্দরের জেতার উন্মাসিক চাহিদায় মত্ত হয়ে কামিন্সের বাউন্সারে মারা ছয়টা কি বলে দেয় না—এ লড়াই সংক্রামক ভীষণ …কুড়ি বছর পরেও।
সাদা জার্সির এগারোজনের তেরঙ্গা নিয়ে ব্রিসবেনকে চক্রপাক খাওয়া পায়ের খসখস আওয়াজটা এক ভারতবর্ষের গল্প শোনাবে আগামী পঁচাত্তর বছর ধরে; ‘রহে বিশ্বাস যার পরতে পরতে’।