‘বর্ষা’ প্রবন্ধে প্রমথ চৌধুরী লিখছেন — “মেঘৈর্মেদুরম্বরং বনভূবশ্যামাস্তমালদ্রুমৈঃ’ —
গীতগোবিন্দের এই প্রথম চরণ যে বাঙালি একবার শুনেছে চিরজীবন সে আর তা ভুলতে পারবে না। আকাশে ঘনঘটা হলেই তার কানে ও-চরণ আপনা হতেই বাজতে থাকবে। সেই সঙ্গে মনে পড়ে যাবে মনের কত পুরোনো কথা, কত লুকানো ব্যথা। আমি ভাবছি মানুষ ভাষায় তার মনের কথা কত অল্প ব্যক্ত করে,আর কত বেশি অব্যক্ত রয়ে যায়।ভাষায় মনোভাব ব্যক্ত করবার জন্যই যাঁরা এই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছেন তাঁরাও, অর্থাৎ কবির দলও, আমার বিশ্বাস, তাঁদের মনকে অর্ধেক প্রকাশ করেছেন, অর্ধেক গোপন রেখেছেন।”
সম্প্রতি নতুন একটা কাব্যগ্রন্থ পড়ে আমার অন্তত এমনটাই মনে হল। কবি অমৃতাভ দে’র ‘বৃষ্টি লিখছে কবির জীবন’ কাব্যগ্রন্থের কথা বলছিলাম আমি। পড়তে পড়তে আমি হারিয়ে যাচ্ছিলাম জীবনানন্দের নিসর্গ চেতনার অন্তরালে,কখনও বা রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিমগ্নতায়, আবারও কখনও বা বৈষ্ণব পদাবলির আবেগঘন পদগুলোতে আটকে যাচ্ছিল চোখ।এমন একটা কাব্যগ্রন্থ পড়ে লেখার লোভ সামলাতে পারলাম না। তাইতো কাগজ কলম নিয়ে বসে গেলাম লিখতে। যা মনে এল তাইই তুলে আনলাম খাতার পাতায়। এটাকে সমালোচনা বলে ভাববেন না পাঠক, এ এক একনিষ্ঠ পাঠকের অন্তরের অন্তস্থল থেকে উঠে আসা কিছু কথার সমষ্টি মাত্র।
“তোমার চুলে যে রোদ-মেঘের মতন চুলে-/ তোমার চোখে যে রোদ- সেও যে মেঘের মতো চোখ/ কেমন বৃষ্টি ঝরে- মধুর বৃষ্টি ঝরে-/ ঘাসে যে বৃষ্টি ঝরে- রোদে যে বৃষ্টি ঝরে আজ।” জীবনানন্দের কবিতায় এভাবেই ধরা দিয়েছিল বৃষ্টির সৌন্দর্য । বৈশাখের তপ্ত প্রকৃতির বুকে ঝরে পড়া বৃষ্টি আসলে মৃত প্রাণের সঞ্জীবনী সুধা। গ্রীষ্মের পরেই বর্ষা আসে রাণীর বেশে। প্রকৃতি মাতাও সেজে ওঠে সবুজ আভরণে। আর এই বর্ষা নিয়েই তো কবিদের যত মাতামাতি। কবিবর কালিদাসও তাঁর ‘মেঘদূত’ লিখেছেন “কোন পুণ্য আষাঢ়ের প্রথম দিবসে”। রবীন্দ্রনাথের কবিতাতেও বর্ষা একাধিক বার ঘুরে ফিরে এসেছে। বৈষ্ণব পদাবলীর কবিরাও বর্ষাকে নিয়ে আবেগঘন পদ রচনা করেছেন। কারণ বর্ষা মূলত বিরহের ঋতু। বৃষ্টিও তাই অনেকটা বিরহেরই। কিন্তু বৃষ্টি যখন কবির জীবন লেখে, তা সব সময় বিরহের নয় বরং তা আনন্দের এবং সুখের।আনন্দে-বিষাদে মেশানো এক অনুভূতির সূক্ষ্ম জমির উপর দাঁড়িয়ে কবি রচনা করেছেন এই কাব্যগ্রন্থটি।
‘বাদলের ধারাপাত’ — এরকম অসাধারণ একটা কবিতা দিয়েই কাব্যগ্রন্থটির সূচনা। শ্রাবণের গান, কবির সাজানো বাগানে কদম, বকুল, জুঁই আর বেলির গন্ধে মাতোয়ারা মন, নদীর কূল ঘেঁষে বৃষ্টি নামা, জলাঙ্গির জল ছুঁয়ে বাদলের ধারা রচনা করা মেঘবালিকার রূপকথা; সবুজ মাঠ, তুলসীতলা, শিব মন্দির, বুড়ো বটগাছ, বাঁশের সাঁকো বৃষ্টিতে ভিজে যায়। ফুটো ছাদ দিয়ে চুঁইয়ে পড়া বৃষ্টির জল-এ যেন গ্রাম বাংলার বর্ষার এক চেনা ছবি। কিংবা ব্যাঙের ডাক, বিদ্যুতের চমক, পিচ্ছিল পথ, ঘুটঘুটে অন্ধকার যেন আমাদের শ্রীরাধার অভিসারের কথা মনে করিয়ে দেয়। অসাধারণ এক চিত্রকল্প ও রোমান্টিকতার জগত তৈরি হয় কবিতাটির পরতে পরতে।
তাইতো কবিকে বলতে শুনি —
“বৃষ্টি, তুমি তো জীবনের ধারাপাত/ মেঘের সঙ্গে মিতালী করে ভরিয়ে তুলেছ গীতবিতানের পাতা।!”
কবির চোখে বৃষ্টি আসলে প্রাণের আরাম, প্রেম, জীবনে চলার ছন্দ। তাইতো তিনি বলছেন —
“কবির প্রেম তুমি, শিল্পীর রং, গায়কের সুর, নর্তকীর ছন্দ তুমি/
তোমাকে ছুঁয়ে দেখব বলে বাড়িয়ে দিলাম হাত/ তুমি ঝরে পড় টাপুর-টুপুর… টাপুর-টুপুর…/
পরাণসখা বন্ধু হে আমার। ”
যে বৃষ্টি কবির জীবনকে লেখে, গড়ে দেয় অনেক যাপনচিত্র, সে তো তাঁর ‘পরাণসখা’ হবেই। তাইতো বৃষ্টির সঙ্গে মাখামাখি করেই কবি খুঁজে পান জীবনের মানে।
শুধু বৃষ্টি নয়।কবি আসলে প্রকৃতি প্রেমিক। তাইতো পাহাড়ি নির্জনতা, সমুদ্র, গোধূলি বেলার সূর্যাস্তের সময় লালচে আভা, অরণ্যের শান্ত সমাহিত নির্জনতা, তেপান্তরের মাঠের উদারতা কবিতাগুলিতে ধরা দিয়েছে অন্য এক মাত্রায়। ‘একা একা’ কবিতায় দেখতে পাই —
“পাহাড়ি নির্জনতায় একা একা কাটিয়ে দেব আগামী জীবন।/ প্রকৃতি আমার প্রেম,অরণ্য আমার বর্ণমালা,/
নদী আমার কথাকলি, মেঘ আমার রূপকথা। /বৃষ্টি আমার স্বরলিপি।”
কিংবা
“একা একা বহু পথ হেঁটে যাব।/ পাইনের বন,ঝাউয়ের বনের ভিতর থেকে শব্দ কুড়িয়ে নেব আমি।/
নির্জনতাকে পাশে নিয়ে এভাবেই কেটে যাবে কবির জীবন…”
আবার ‘সমুদ্র’ কবিতায় উঠে এসেছে — “সমুদ্রের কাছে রেখে দিলাম আমার ছেলেবেলা/ রেখে দিলাম আমার চিলেকোঠার গল্প/ বালুতটে বিছিয়ে দিলাম আমার প্রেম/জলের শরীরে ডুবে যেতে যেতে ভুলে গেলাম শ্যাওলা- জীবন।”
জীবনানন্দ যেমন নিসর্গ চেতনার কবি, প্রকৃতি প্রেমিক কবি। অপূর্ব এক চিত্রকল্প আমরা খুঁজে পাই তাঁর কবিতায়। তেমনি এই কবিতাগুলোতেও যেন অদ্ভুত এক চিত্রকল্প ধরা পড়েছে। যেমন পাই ‘গোধূলি’ কবিতায়–
“মাউন্ট আবুতে তোমাকে পাশে নিয়ে সূর্যাস্ত দেখলাম… /মরুভূমির বুকে গোধূলি এলো মন কেমনের অ্যালবাম হয়ে…/ সমুদ্র সৈকতে ‘কামরাঙা লাল মেঘ মৃত মনিয়ার মতো’ ই ডুবে গেল।”
কিংবা
“গোধূলি পেরিয়ে শান্ত অনুগত বাংলার নীল সন্ধে নামে শিলং পাহাড়ে…/ জীবনানন্দ হেঁটে চলেন আমাদের সঙ্গে সঙ্গে…/
বাংলার নদী-মাঠ গোধূলির রঙে হল রূপবতী…”
শুধুমাত্র বৃষ্টি, অরণ্য, প্রকৃতি, সমুদ্র বা গোধূলি নয়; প্রিয়তমার সঙ্গে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সীমাহীন পথে পাশাপাশি হেঁটে চলা, একান্তে কালহরণ, “সুরতরঙ্গে, কথাহীন প্রেমে-গানে/ জীবনের পথে তুমি আর আমি আজও/ বাড়াবো দুহাত পরস্পরের পানে।”
এরকমই আত্মপ্রত্যয় উঠে এসেছে ‘তুমি আছো আমি আছি’ কবিতায়। রবীন্দ্রনাথের কবিতার মত এ এক সুদৃঢ় আত্মপ্রত্যয়, পাশাপাশি সারা জীবন হেঁটে চলার বার্তা। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় আমরা পাই-
“আমরা দুজন স্বর্গ খেলনা গড়িব না ধরণীতে/ মুগ্ধ ললিত অশ্রুগলিত গীতে।।/ পঞ্চশরের বেদনা মাধুরী দিয়ে/ বাসররাত্রি রচিব না মোর প্রিয়ে-/ভাগ্যের পায়ে দুর্বল প্রাণে ভিক্ষা না যেন যাচি।/ কিছু নাই ভয়, জানি নিশ্চয় তুমি আছ আমি আছি।”
কবি অমৃতাভ দের কবিতাতেও আমরা খুঁজে পাই সেই আত্মপ্রত্যয় —
“তুমি আর আমি হেঁটে যাবো পাশাপাশি আমরা কাটাবো একান্তে কাছাকাছি যুদ্ধ থামুক, ‘পৃথিবী বাড়ুক রোজ’,
পথের প্রান্তে তুমি আছো, আমি আছি।”
আবার ঘুরে ফিরে ‘বৃষ্টি’এল কবিতার পাতায়। ‘বৃষ্টি’ কবিতায় বৃষ্টিকে আপন করে পাবার আকুতি যেন ঝরে পড়ে- “মেঘমুলুকে তোমরা কেন থাকো?/ ওই ঠিকানায় বন্ধু বুঝি আছে/ আমার শহর তোমায় খোঁজে রোজ একটু এসো এই শহরের কাছে।”
আবার ‘নির্জনতা’ কবিতায়ও অনিবার্যভাবেই আসে বৃষ্টির প্রসঙ্গ — “কোলাহল থেকে নির্জনতায় হারিয়ে যাই চলো… /কিছুক্ষণ মুখোমুখি বসি তুমি আর আমি।/বৃষ্টি নামুক খুব, ভিজে যাক সবুজ পাহাড়/ অরণ্য ছুঁয়ে বয়ে যাক ছলাৎ ছলাৎ নদী/ মেঘেরা এসে অন্য এক পৃথিবীর গল্প শোনাক…”
নির্জনতা, একান্তে বসে প্রেয়সীর সাথে কথা বলা, বৃষ্টির সন্ধ্যা,লক্ষ লক্ষ অভিমানকে নির্জনতার কাছে সমর্পণ করে দেওয়া-সবই আসলে কবির জীবনের ধারাপাত — যা রচনা করে বৃষ্টি। তাই বৃষ্টি শব্দটি বারবারই উঠে এসেছে বিভিন্ন কবিতায়। বৃষ্টি যেন একদিকে কবির জীবনে বিরহের কথাকলি রচনা করেছে, তেমনি জীবনের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখকেও লিখে চলেছে অবিরাম ভাবে। তাইতো কাব্যগ্রন্থের নাম ”বৃষ্টি লিখছে কবির জীবন”।
এছাড়াও যেদুটি কবিতার কথা না বললেই নয়,সেদুটি হল-‘আমার ঈশ্বর’ ও ‘পুরুলিয়াগ্রহের কবি’। প্রথমটি কবি বিভাস রায়চৌধুরীর প্রতি এবং দ্বিতীয়টি কবি নির্মল হালদারের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রচিত। ছোট্ট এই এক ফর্মার কাব্যগ্রন্থ অথচ প্রত্যেকটি কবিতাতেই একটি শান্ত সমাহিত প্রচ্ছন্ন শান্তি লুকিয়ে আছে, যা মনের আরাম, প্রাণের শান্তি, অনেক কিছু না বলা কথা কে বলে দেয়। মেঘ, বৃষ্টি, পাহাড়, অরণ্য, প্রকৃতি, সমুদ্র, গোধূলি নিয়ে খেলতে খেলতে কবি যেন হারিয়ে গেছেন কোনো এক নির্জন প্রকৃতির আঙিনায়। তিনি যেন খুঁজে পেতে চেয়েছেন তার সেই প্রিয় ‘পরাণসখা’ বৃষ্টিকে। তাইতো বলতে শুনি —
“এই শহরের ধূসর গলিপথে / আকাশ এসে গল্প খুঁজে চলে। / আমার শহর বৃষ্টি ভেজে নাকো / পদ্যে শুধু তোমার কথা বলে।”
বেশ কয়েক বছর আগে কবি জয়নাল আবেদিনের ‘মেঘ দিলাম বৃষ্টি নামিয়ে নিয়ো” কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতা পড়ে অবাক হয়েছিলাম, কবিতাটির নাম ‘মেঘ’। ওই কবিতায় কবি লিখছেন —
“তোমাকে এক টুকরো মেঘ দিলাম জল নামিয়ে নিও
না হলে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিও আকাশে ওকে যেন জমিয়ে রেখো না।
কখনোই আগুনে পুড়িয়ে ফেলো না তাকে
ও শুধু ঝরতে পারে, জ্বলতে পারে না।
মেঘ দিলাম -বৃষ্টি নামিয়ে চাষ
আবাদ করো।
খেলতে খেলতে ভুল করেও বন্যায় ভেসে/ যেও না।”
আবার বাংলাদেশের কবি রফিকুল রাফির কলমে পাই —
“তবুও বৃষ্টি দেখে
বৃষ্টি জল হাতে মেখে
অভাব পুষি বুকে।
আশা রাখি ভিজবো একদিন
খুনসুটি আর সুখে।”
বৃষ্টির সঙ্গে এভাবেই মিতালি করে কেটে যায় কবির জীবন। আর বন্ধু মানেই তো, রাগারাগি, কখনওবা একটু খুনসুটি, কখনও একটু সুখ, কখনওবা দুঃখ। বৃষ্টির সন্ধে, মনখারাপ, হাতে হাত রেখে অনির্দিষ্ট গন্তব্যে হেঁটে যাওয়া-এ সবই জীবন। আর সেই জীবনের পাতা যখন ভরিয়ে তোলে বৃষ্টি, যাপন করে চলে কবির প্রতিটা মুহূর্ত, জীবনের প্রতিটা ক্ষণ; তখন তার কাছে আর বিশেষ কিছু চাওয়ার থাকে না। সে কবির সত্ত্বার সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়।
কাব্যগ্রন্থ : “বৃষ্টি লিখছে কবির জীবন”, কবি : অমৃতাভ দে, প্রকাশক : আলো পৃথিবী, প্রকাশন প্রকাশকাল : জুলাই,২০২২, প্রচ্ছদ ও নামাঙ্কন : শুভদীপ সেনশর্মা, উৎসর্গ : ফেলে আসা গ্রামের পথের জন্য।
প্রসেনজিৎ দাস, বেতাই, নদিয়া।
দারুণ। আমার প্রিয় কবি।
ধন্যবাদ দাদা।।।।
আর একবার মুগ্ধ হলাম
ধন্যবাদ।।।।