| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ব্রিটিশ উপনিবেশ, সেটলার টাইম আর পুণ্যাহের বিলুপ্তি : অত্রি ভট্টাচার্য, বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
অত্রি ভট্টাচার্য, বিশ্বেন্দু নন্দ / ৫০৩ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬

আধুনিক বিশ্বে সময়কে আমরা সাধারণত একটি নিরপেক্ষ, সর্বজনীন ও অবশ্যম্ভাবী প্রবাহ হিসেবে বিবেচনা করি। গ্রিনিচ মান সময় (জিএমটি) কিংবা ভারতীয় মান সময় (আইএসটি) আমাদের কাছে সময় গণনার স্বাভাবিক, প্রায় ‘প্রাকৃতিক’ একক। কিন্তু মার্ক রিফকিন বিয়ন্ড সেটলার টাইম [Mark Rifkin, Beyond settler time : temporal sovereignty and indigenous self-determination] গ্রন্থে দেখিয়েছেন, সময়ের এই ধারণা মোটেও নিরপেক্ষ নয়; বরং এটি রাষ্ট্র, উপনিবেশবাদ ও পুঁজিবাদের আধিপত্য বিস্তারের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। তিনি একে বলেছেন “উপনিবেশকারী সময়” (সেটলার টাইম) — যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সময়বোধ ও জীবনপ্রবাহকে ধ্বংস করে তাদের একক, যান্ত্রিক ও ‘আধুনিক’ সময়ের কাঠামোয় বন্দি করে (রিফকিন, ২০১৭, পৃ. ৮)। অন্যদিকে, ইতিহাসবিদ ইয়র্ন রুজেন (Jörn Rüsen Time and History: The Variety of Cultures) আর আজিজ আল-আজমেহ [Aziz Al-Azmeh; Hayden White The times of history : universal topics in Islamic historiography] সম্পাদিত টাইম অ্যান্ড হিস্ট্রি গ্রন্থের আলোচনায় দেখা যায়, সংস্কৃতি ও সভ্যতার ইতিহাস রচনার নামে কীভাবে প্রাচ্যের সময়চেতনাকে ‘চক্রাকার’, ‘স্থির’ বা ‘পৌরাণিক’ আখ্যা দিয়ে পাশ্চাত্যের ‘রৈখিক’ ও ‘প্রগতিশীল’ সময়ের বিপরীতে দাঁড় করানো হয়েছে। আল-আজমেহ এই প্রবণতাকে চিহ্নিত করেছেন ‘সাংস্কৃতিকতাবাদী’ (কালচারালিস্ট) ইতিহাস রচনার অংশ হিসেবে, যেখানে কোনো সমাজের জটিল ইতিহাসকে একটি কাল্পনিক ‘সাংস্কৃতিক সারাংশে’ (এসেন্স) আবদ্ধ করে ফেলা হয় (আল-আজমেহ, ২০০৭, পৃ. ৭)। এই তাত্ত্বিক কাঠামোর আলোকে প্রাক-ঔপনিবেশিক বাংলার পুণ্যাহ ও হালখাতা অনুষ্ঠানকে বিশ্লেষণ করলে আমরা উপনিবেশবাদ কর্তৃক বিনষ্ট এক বিকল্প সময়-জীবনের সন্ধান পাই। একইসঙ্গে, সম্প্রতি ভারতের হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদী সরকারের শিক্ষামন্ত্রী কর্তৃক জিএমটির পরিবর্তে ‘মহাকাল’ সময় প্রবর্তনের যে প্রস্তাব তোলা হয়েছে, তাকে একটি প্রতারণামূলক ‘উপনিবেশবাদ-বিরোধিতা’ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় — যা প্রকৃতপক্ষে ব্রাহ্মণ্যবাদী আধিপত্যের নতুন এক ‘কাল-শাসন’ (ক্রোনোক্রেসি) কায়েমের প্রয়াস মাত্র।

ঔপনিবেশিকতা কেবল ভূখণ্ড দখল বা সম্পদ লুণ্ঠনের নাম নয়; এটি মানুষের চেতনা থেকে তার নিজস্ব সময়বোধ কেড়ে নেওয়ার প্রকল্প। ইংরেজরা ভারতবর্ষে রেলগাড়ি, টেলিগ্রাফ ও গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার চালু করার বহু আগেই, এই বদ্বীপের মানুষের সময় মাপার নিজস্ব এক শক্তিশালী ব্যাকরণ ছিল। সেই ব্যাকরণের কেন্দ্রে ছিল ফসল, নদী ও ঋতুচক্র। ব্রিটিশ শাসনের আগে বাংলার অর্থনীতি ও সমাজজীবনের যে দুটি স্তম্ভ ছিল — পুণ্যাহ ও হালখাতা — সেগুলো কেবল হিসাব-নিকাশের অনুষ্ঠান ছিল না; এগুলো ছিল কালচেতনার এক শক্তিশালী আখ্যান, যেখানে বছর শেষ হতো রাজস্বের বন্দোবস্তের আনন্দে এবং বছর শুরু হতো সম্প্রীতির পাণ-সুপারির বিনিময়ে। উপনিবেশিক জ্ঞানতত্ত্ব (কলোনিয়াল এপিস্টেমোলজি) এই সময়চক্রকে ‘অপেশাদার’ ও ‘অবৈজ্ঞানিক’ আখ্যা দিয়ে ধ্বংস করেছিল। অথচ, এই দুই অনুষ্ঠানের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল বাংলার আত্মনির্ভর সময়যাপনের মানচিত্র। আজ আমরা যখন পয়লা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রায় সামিল হই, তখন খুব কম মানুষই মনে রাখি যে এই দিনটির মূল ভিত্তি ছিল পুণ্যাহ। ডিকলোনিয়াল দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে বোঝা যায়, পুণ্যাহ ছিল বাংলার নিজস্ব ‘রাজস্ব বর্ষপঞ্জি’র মহাসম্মিলন। সম্রাট আকবরের সময়ে চান্দ্র হিজরি সনের পরিবর্তে সৌর ভিত্তিক ফসলি সন প্রবর্তনের যে প্রয়াস নেওয়া হয়, মুর্শিদকুলি খাঁর হাত ধরে তা চূড়ান্ত রূপ পায়। পুণ্যাহ যে চৈত্র মাসের শেষে অনুষ্ঠিত হতো, তার গভীর অর্থনৈতিক যুক্তি ছিল। এই সময়টা ছিল শীতের ফসল তোলা ও মজুত করার পরবর্তী মুহূর্ত। এ সময় কৃষকের গোলা ভরা থাকত, খামারে অর্থের প্রবাহ ঘটত। নবাবী আমলের প্রশাসন বুঝেছিল, জোর করে কৃষকের কাছ থেকে বর্ষার মাঝামাঝি খাজনা আদায় করা মানে সময়ের প্রকৃতিকে অস্বীকার করা। তাই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলত। পুণ্যাহের মূল আকর্ষণ ছিল খেলাত প্রদান। জমিদার বা তালুকদার যখন নির্ধারিত সময়ে রাজস্ব পরিশোধ করতেন, তখন নবাব বা দেওয়ান তাকে যে সম্মানসূচক পোশাক পরাতেন, তা ছিল সময়ানুবর্তিতার পুরস্কার। এখানে ক্ষমতার সম্পর্ক ছিল দ্বিমুখী : প্রজা রাজস্ব দিয়ে কেন্দ্রের আনুগত্য করছে এবং কেন্দ্র খেলাত দিয়ে প্রজার মর্যাদাকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। এতে সময়কে কেবল যান্ত্রিক হিসাবে দেখা হতো না; বরং সময়কে দেখা হতো সামাজিক সম্পর্কের বুনন হিসেবে। প্রজা ও শাসক একই ফসলি চক্রের অংশীদার — এই ধারণাই পুণ্যাহকে নিছক কর আদায়ের দিন থেকে একটি জাতীয় উৎসবে উন্নীত করেছিল।

কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ক্ষমতায় আসার পর এই সময়বোধের মৃত্যু ঘটে। ১৭৬৫ সালে কোম্পানি যখন দেওয়ানি লাভ করল, তখন বাংলার সময়চক্রে প্রথম বড় ফাটল ধরে।

ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার ও নরেন্দ্র কৃষ্ণ সিনহার লেখা সূত্রে জানা যায়, রবার্ট ক্লাইভ মুর্শিদাবাদের মতিঝিল প্রাসাদে যে পুণ্যাহে বসেছিলেন, তা বাহ্যিক চাকচিক্যে পূর্বের মতোই ছিল, কিন্তু এর আত্মাটি মরে গিয়েছিল। কারণ, এবার আর ফসলের সময়ের সঙ্গে রাজস্বের সম্পর্ক রইল না। কোম্পানি প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯৩) বাংলার কৃষি-সময়ের ধারণাকে চিরতরে বিপর্যস্ত করে দিল। তারা সূর্যাস্ত আইন জারি করল — যেখানে নির্দিষ্ট ইংরেজি তারিখে (ঋতু বিবেচনা না করেই) রাজস্ব জমা না পড়লে জমিদারি কেড়ে নেওয়া হতো। এখানেই ডিকলোনিয়াল বিশ্লেষণ প্রাসঙ্গিক। বার্নার্ড কোহন যেমন বলেছেন, উপনিবেশিক শাসন স্থানীয় জ্ঞানকে আয়ত্ত করতে গিয়ে তা বিকৃত করে ফেলে (কোহন, ১৯৯৬, পৃ. ৪)। ইংরেজরা পুণ্যাহকে একটি “থিয়েটার অব পাওয়ার” হিসেবে ব্যবহার করলেও, এর মূল প্রাণভোমরা — যা ছিল কৃষির তালে তাল মিলিয়ে চলা — তা বুঝতে ব্যর্থ হয়। ফলে পুণ্যাহ ধীরে ধীরে একটি নিরর্থক আড়ম্বরে পরিণত হলো, যেখানে নবাব অপদস্থ হয়ে ক্লাইভের ডান পাশে বসতেন। রিফকিনের ভাষায়, “উপনিবেশকারী সময়” (সেটলার টাইম) একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকে (অর্থাৎ ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের এখতিয়ার) পটভূমি হিসেবে ধরে নেয়, যেখানে আদিবাসী বা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভিন্নতর সময়ানুভূতি হয় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, নয় তাকে দেখা হয় ‘ব্যতিক্রমী অসঙ্গতি’ (অ্যানোমালি) হিসেবে (রিফকিন, ২০১৭, পৃ. ২)।

তবে পুণ্যাহের চেতনা পুরোপুরি মুছে যায়নি। তা আশ্রয় নেয় লোকায়ত অর্থনীতির শেষ আশ্রয়স্থল হালখাতায়। ‘হাল’ শব্দটি চাষের সঙ্গে জড়িত (হালচাষ)। নববর্ষের প্রথম দিনে ব্যবসায়ীরা পুরনো বছরের বাকি মিটিয়ে নতুন খাতা খোলেন — এটি দেখতে সাধারণ লেনদেন মনে হলেও, এর মধ্যে এক গভীর সময়দর্শন নিহিত। হালখাতায় বাধ্যবাধকতা ছিল না, ছিল আন্তরিকতা। গ্রাহক তার সাধ্যমতো পুরনো দেনা শোধ করতেন, আর দোকানদার তাকে মিষ্টিমুখ করিয়ে নতুন বছরের বিশ্বাসের বীজ বপন করতেন। এখানে ‘বাকি’ রাখাটা অপরাধ ছিল না; বরং বাকি ছিল পারস্পরিক নির্ভরতার একটি সামাজিক চুক্তি। ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েই জানতেন, পরের ফসল না উঠলে এ টাকা আদায় করা অমানবিক। তাই হালখাতা মানেই সময়ের পুনর্জন্ম (সাইক্লিক্যাল টাইম), যেখানে হিসাব শূন্য থেকে শুরু হয় — যেমন শূন্য থেকে শুরু হয় নতুন ফসলের চারা। ঔপনিবেশিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা যখন ঋণখেলাপিকে ‘অপরাধ’ হিসেবে চিহ্নিত করল, তখনই মূলত বাংলার এই মানবিক সময়ের মৃত্যু ঘটল। পুণ্যাহের চেতনা পুরোপুরি মুছে যায়নি; তা আশ্রয় নেয় লোকায়ত অর্থনীতির শেষ আশ্রয়স্থল হালখাতায়। এই হালখাতার মাধ্যমেই প্রাক-ঔপনিবেশিক বাংলার মানবিক সময়বোধ ঔপনিবেশিক আধুনিকতার রৈখিক সময়ের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে।

এই প্রেক্ষাপটে, ভারতের বর্তমান হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদী সরকারের শিক্ষামন্ত্রী কর্তৃক গ্রিনিচ মান সময়ের (জিএমটি) পরিবর্তে ‘মহাকাল’ নামক এক ‘স্বদেশী’ সময় প্রবর্তনের প্রস্তাবটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং একইসঙ্গে ভয়াবহ রকমের প্রতারণামূলক। এটি একটি সুপরিকল্পিত সাংস্কৃতিক রাজ

নীতির অংশ, যার লক্ষ্য ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নামে আরেকটি সর্বগ্রাসী ও একনায়কতান্ত্রিক সময়ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া। প্রথমত, এই প্রস্তাব তথাকথিত ‘উপনিবেশবাদ-বিরোধিতার’ নামে প্রকৃত উপনিবেশবাদ-বিরোধী চেতনাকে খর্ব করে। আজিজ আল-আজমেহ তাঁর “ট্রোপস অ্যান্ড টেম্পোরালিটিস অফ হিস্টোরিওগ্রাফিক রোমান্টিসিজম” প্রবন্ধে যাকে বলেছেন ‘আদি-অবস্থায় প্রত্যাবর্তনের রোমান্টিক আকাঙ্ক্ষা’ (রোমান্টিক কোয়েস্ট ফর অর্গানিজম), এই ‘মহাকাল’-এর ধারণাটি তারই এক জলজ্যান্ত উদাহরণ (আল-আজমেহ, ২০০৭, পৃ. ৬)। এটি মনে করে যে, জিএমটি হলো ‘পাশ্চাত্যের’ প্রতীক, অতএব তার বিপরীতে এক ‘খাঁটি ভারতীয়’ সময়ের প্রয়োজন। এই বাইনারি বিরোধিতা (ওয়েস্ট ভার্সেস রেস্ট) গভীরভাবে ঔপনিবেশিক চিন্তারই উত্তরাধিকার, যেখানে ‘ভারতীয়’ বলতে একটি কাল্পনিক, সমরূপ ও ব্রাহ্মণ্য-হিন্দু ঐতিহ্যকে বোঝানো হয়। এটি ভারতের বহুত্ববাদী, বহুভাষিক ও বহু-কালচেতনার ইতিহাসকে মুছে দিয়ে একটি একক ‘হিন্দু সময়’ চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র মাত্র। দ্বিতীয়ত, এই ‘মহাকাল’-এর ধারণা যে রাজনৈতিক প্রকল্পের সন্তান, তা স্পষ্ট। এটি এমন এক কাল্পনিক ঐতিহ্য নির্মাণ করছে যেখানে ভারতের সময়চেতনার কেন্দ্রে শুধু হিন্দু পৌরাণিক চরিত্র ও তীর্থস্থানগুলোই স্থান পাবে। অথচ প্রকৃত ‘স্বদেশী সময়’ যদি কিছু থেকে থাকে, তবে তা পুণ্যাহ ও হালখাতার মতো অনুষ্ঠানের মধ্যে নিহিত, যা কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। বাংলার কৃষক সমাজের এই সময়চেতনা ছিল আন্তধর্মীয়, প্রকৃতি-নির্ভর এবং বিকেন্দ্রীভূত। সরকারি ফরমান জারি করে জিএমটির পরিবর্তে ‘মহাকাল’ ঘোষণা করলে তা হবে সময়ের ওপর রাষ্ট্রীয় আধিপত্যের আরেকটি নির্মম প্রয়োগ, যা প্রকৃত স্বাধীনতার বিপরীত। তৃতীয়ত, মার্ক রিফকিন যেমন বলেছেন, সময়ের সার্বভৌমত্বের অর্থ হলো নিজস্ব গোষ্ঠীগত ইতিহাস, ভূখণ্ডের প্রতি সম্পর্ক এবং প্রাত্যহিক জীবনের ছন্দের ভিত্তিতে সময়কে অনুভব করা (রিফকিন, ২০১৭, পৃ. ৩০)। ‘মহাকাল’ চাপিয়ে দেওয়া মানে জনগণের ওপর রাষ্ট্র কর্তৃক অনুমোদিত একটি ‘কাল্পনিক অতীত’ ও ‘কাল্পনিক সময়’ লাদা। এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন এক কৃত্রিম আধিপত্যবাদী প্রকল্প, ঠিক যেমনটি একসময় ব্রিটিশরা জিএমটি চাপিয়েছিল। আল-আজমেহ ইসলামি পুনর্জাগরণবাদী আন্দোলনের সমালোচনায় যেমনটি বলেছেন, এই ধরনের ‘প্রামাণিকতার রাজনীতি’ (পলিটিক্স অব অথেন্টিসিটি) প্রকৃত ইতিহাসের জটিলতাকে অস্বীকার করে এক কাল্পনিক ‘সুবর্ণ অতীতে’ ফিরে যাওয়ার বিপজ্জনক স্বপ্ন দেখায়, যা চূড়ান্তভাবে কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির হাতিয়ার হয় (আল-আজমেহ, ২০০৭, পৃ. ১৭)।

গ্রিনিচ মান সময় যে একটি ঔপনিবেশিক আরোপ, তা মানতে কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু তার প্রতিকার হিসেবে ‘মহাকাল’-এর মতো আরেকটি একরৈখিক, পৌরাণিক সর্বগ্রাসী সময় চাপিয়ে দেওয়া কোনো সমাধান নয়; বরং তা ঔপনিবেশিক মানসিকতারই পুনরুৎপাদন। প্রকৃত উপনিবেশবাদ-বিরোধিতা হলো রিফকিনের ভাষায় “সময়ের বহুত্বের” (প্লুরালিটি অফ টাইম) স্বীকৃতি দেওয়া (রিফকিন, ২০১৭, পৃ. ৯)। তা হলো পুণ্যাহ ও হালখাতার লোকায়ত প্রজ্ঞাকে পুনরাবিষ্কার করা, যেখানে সময় কোনো যান্ত্রিক কাঁটা নয়, বরং ফসলের মর্মর, ঋতুর আবর্তন আর সামাজিক বন্ধনের ছন্দ। ‘মহাকাল’ প্রকল্প তাই উপনিবেশবাদ থেকে মুক্তির কোনো পথ দেখায় না; বরং এটি আমাদের শেখায় কীভাবে ব্রাহ্মণ্যবাদী ফ্যাসিবাদ উপনিবেশিকতার ভাষাকেই হাতিয়ার করে ক্ষমতা দখল করে। পুণ্যাহের বিলুপ্তির ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, রাষ্ট্র ও ধর্ম যখন সময়ের ওপর নিজেদের একচেটিয়া কর্তৃত্ব কায়েম করতে চায়, তখন সাধারণ মানুষের জীবনপ্রবাহই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কাজেই, ‘মহাকাল’-এর এই রাজনৈতিক মায়াজাল প্রত্যাখ্যান করাই হোক সময়ের প্রকৃত স্বাধীনতার প্রথম শর্ত। পুণ্যাহ হারিয়ে গেছে জমিদারি প্রথার সঙ্গে, কিন্তু হালখাতা আজও টিকে আছে। এ টিকে থাকা নিছক পুরনো আমলের স্মৃতিচারণ নয়; বরং এটা ঔপনিবেশিক আধুনিকতার বিরুদ্ধে আমাদের অবচেতন মনের এক গোপন প্রতিবাদ। এই অনুষ্ঠান আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ঘড়ির কাঁটা আবিষ্কারের আগেও বাঙালির জীবন ছিল ফসলের মর্মরধ্বনির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা এক অর্থবহ সময়যাপন। ডিসকলোনিয়াল ভাবনার লক্ষ্যই হলো পুণ্যাহের সেই হারিয়ে যাওয়া জাঁকজমক বা হালখাতার সেই পানের সাজিতে লুকিয়ে থাকা ‘বাংলা সময়’কে পুনরাবিষ্কার করা, এবং একইসঙ্গে ‘মহাকাল’-এর মতো নতুন ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে সজাগ থাকা।

গ্রন্থপঞ্জি (বিবলিওগ্রাফি)

আল-আজমেহ, এ. (২০০৭)। দ্য টাইমস অফ হিস্ট্রি: ইউনিভার্সাল টপিকস ইন ইসলামিক হিস্টোরিওগ্রাফি। বুদাপেস্ট: সেন্ট্রাল ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি প্রেস।

কোহন, বি. এস. (১৯৯৬)। কলোনিয়ালিজম অ্যান্ড ইটস ফর্মস অফ নলেজ: দ্য ব্রিটিশ ইন ইন্ডিয়া। প্রিন্সটন: প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস।

রিফকিন, এম. (২০১৭)। বিয়ন্ড সেটলার টাইম: টেম্পোরাল সভরেন্টি অ্যান্ড ইন্ডিজেনাস সেলফ-ডিটারমিনেশন। ডারহাম: ডিউক ইউনিভার্সিটি প্রেস।

রুজেন, ইয়. (সম্পা.) (২০০৭)। টাইম অ্যান্ড হিস্ট্রি: দ্য ভ্যারাইটি অফ কালচার্স। নিউ ইয়র্ক : বের্গান বুকস।

 

অত্রি ভট্টাচার্য

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev