বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী মাঘ মাসকে দশম মাস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যেটি ২০ জানুয়ারি শুরু হয়ে ১৮ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়। মাঘ নামটি এসেছে মঘা নক্ষত্রে সূর্যের অবস্থান থেকে। মাঘ মাসে ভগবান বিষ্ণু, সূর্য দেবতা ও গঙ্গা নদীকে পূজা করা হয়, মনে করা হয় এতে পাপনাশ হয়। মাঘ মাসে ব্রত, পূজার্চনা, দান-পুণ্যের বিশেষ মাহাত্ম্য রয়েছে। ১১ মাঘ ব্রাহ্ম সমাজের মাঘোৎসব পালন করা হয়।
এবছর ২৬ শে জানুয়ারি শুক্রবার থেকে শুরু হচ্ছে শুভ দিন।
প্রবাদ আছে “মাঘের শীতে বাঘ পালায়”। এ মাসে আমের মুকুল আসে। মাঘ মাসের শেষভাগে কখনো কখনো বৃষ্টি হয়ে থাকে। খনার বচনে রয়েছে, “যদি বর্ষে মাঘের শেষ, ধন্যি রাজার পূণ্যি দেশ”। অতীতে সেচ ব্যবস্থা না থাকায় বছরে একবার বর্ষায় চাষ হতো। ফলে মাঘের শেষের দিকে ভালো বৃষ্টি হলে অল্প সেচে চাষ হয় — ডাল, গম, ভুট্টা, সরিষা ইত্যাদির ফলন ভালো হয়। এর ফলে কৃষকদের আর্থিক সমৃদ্ধি হয়। জমিদারেরা বাড়তি কিছু খাজনা আদায় করত। মাঠে মাঠে বোরো ধান রোপন শুরু করা হয়েছে এই বৃষ্টি তাই অনেকটাই কাজ দেয়। মাঘ মাস কৃষকদের কাছে সমৃদ্ধির মাস। প্রতিবছর মাঘ মাসে সাধু সন্ন্যাসীদের মত কিছু গৃহী এক মাসের জন্য আরাধ্য দেব দেবীর উপাসনা এবং নিত্য ত্রিবেণী সঙ্গমে স্নান করে নিজে নিজে ব্রত উদযাপন করেন। ব্রত পালনে দেহ ও মনের এক অপূর্ব স্বস্তি পাওয়া যায়, পারমার্থিক কল্যাণও ঘটে। এই স্নানকে পুণ্যতরা মাকরী স্নান বলে।

মাকরী স্নান
সময় : মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের সপ্তমী তিথিতে মাকরী সপ্তমী ব্রত করতে হয়। এবছর ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১৭ মাঘ ১৪৩০।
দেবতা : সূর্যদেব।
উপকরণ : কুলগাছের সাতটি পাতা, আকন্দ গাছের সাতটি পাতা, তামার পাত্র, ফুল ফল, মিষ্টান্ন।
নিয়ম : সূর্যোদয়ের আগে কুলগাছের সাতটি পাতা এবং আকন্দ গাছের সাতটি পাতা মাথায় নিয়ে ডুব দিয়ে স্নান করতে হবে (সম্ভব না হলে স্নান করে মাথায় ঠেকিয়ে নেবেন)। এই পুজো মুক্ত প্রাঙ্গনে (উঠনে ছাদে বা বারান্দায়) করলে ভালো হয়। তামার পাত্রে কুলগাছের সাতটি পাতা, আকন্দ গাছের সাতটি পাতা সাজিয়ে সূর্যার্ঘ্য দিতে হবে। এতে ব্রতকথা পাঠ বা ডোর বাঁধার বিধি নেই। এই ব্রত পালনকারীর সংসার জীবনে সার্বিক দুঃখমোচন হয়, দেহ ও মনের স্বস্তি আসে। কর্মশক্তির কামনাই এই ব্রতের মূল উদ্দেশ্য বলা যায়।

মকর স্নান ব্রত : কৈশোরকাল থেকেই এই ব্রতের শুরু। মাঘমাস ব্যাপী প্রতিদিন সকালে স্নান করতে হয়। স্নানের শেষে ছড়া বলে কামনা করা হয়—
মাঘ মাসেতে কালাপানি
স্নান করে গো এয়ো রানী।
এয়ো রানী হব
সিঁথের সিঁদুর দেব।
সাত ভাইয়ের ভগ্নি হব
টানা পাখায় বাতাস খাব।
পতির কোলে পুত্র দিয়ে
ফুল ভাসাবো নদীর কূলে।।
অবৈধব্য বা সারা জীবন এয়ো থাকা, সুখ ও সমৃদ্ধির কামনাই এই ব্রতের লক্ষ্য।

সন্তান দ্বাদশী ব্রত : মাঘ মাসের শুক্লাদ্বাদশী তিথিতে এই সূচনা এবং সমাপ্তি এক বছরে। প্রতি মাসে শুক্লাদ্বাদশী তিথিতে একবার করে ব্রতটি পালন করতে হয়। অর্থাৎ বারো মাসে ১২টি ব্রত পালন করতে হবে সন্তানের দীর্ঘজীবন কামনাই এই ব্রতের লক্ষ্য।
এই মাসে অনেকের গৃহে রটন্তী কালীপুজো হয়ে থাকে। এই পূজো কার্তিক মাসে দীপান্নিতা কালীপুজোর ফলের মত গৃহীদের সাংসারিক ও পারমার্থিক কল্যাণ কামনার্থে করা হয়। অন্যান্য কালীপূজা অমাবস্যা বা পঞ্চদশী তিথিতে হলেও একমাত্র এই কালীপূজায় চতুর্দশী তিথিতে হয়ে থাকে। এই তিথিতে নিষ্ঠা ভরে মায়ের আরাধনা করলে, মা ভক্তের ডাকে সাড়া দেন। এ বছর ৮ই ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার রটন্তী কালীপুজোর দিন পড়েছে।
বিশ্বাস করা হয়, দাম্পত্য কলহ বা প্রেম বা অবাঞ্চিত কারণে দাম্পত্য সুখ যাদের খন্ডিত হয়েছে রটন্তী কালী আরাধনার মাধ্যমে নিশ্চিত ভাবে সুফল পাওয়া যায়।

কথিত আছে রামকৃষ্ণদেব রটন্তী কালী পূজার দিন বলেছিলেন, ‘ভোরে দেখলাম দক্ষিণেশ্বরের গঙ্গায় স্বর্গের দেবতার নেমে এসেছেন স্নান করতে।’ সেই কারণে আজও শুধু দক্ষিণেশ্বরে গঙ্গার তীরে নয় ঐদিন বিভিন্ন গঙ্গার তীরে পূণ্যস্নান করেন ভক্তজন। দক্ষিণেশ্বর সহ বিভিন্ন কালীমন্দির সেজে ওঠে এক বিশেষ সাজে।
এই মাসের শ্রেষ্ঠ উৎসব হল শুক্ল পঞ্চমীতে দেবী সরস্বতীর আরাধনা। আর তারপরের দিন বাংলার অধিকাংশ ঘরে মায়েরা স্বামী ও সন্তানের মঙ্গল কামনায় শ্রীশ্রীশীতল ষষ্ঠী ও গোটা সেদ্ধ ব্রত পালন করে থাকেন। বাড়ির সব বউ মেয়েরা কনিষ্ঠ সন্তানকে কোলে নিয়ে ব্রত কথা শোনেন এবং ব্রতের পর হলুদ আর দইয়ের ফোঁটা সকলের কপালে পড়ানো হয়। দুপুরে শীতল ষষ্ঠীর ভোগ গোটা সেদ্ধ আর কুলের টক গোটা সেদ্ধ গোটা মুখ রাঙালো খুলিবেগুন গোটা কড়াইশুঁটি শীতলা পালং শাক লঙ্কা ও সৈন্ধব লবণ দিয়ে সেদ্ধ করতে হয়। অনেকেই এর সঙ্গে মসলা দেন , অনেকে দেননা।
ত্রিভুবন চতুর্থী : মাঘ মাসের সরস্বতী পূজার আগের দিন এই ব্রত পালন করা হয়। ব্রতটি চার বছর পালনীয়। কোন কোন অঞ্চলে এই ব্রতকে ‘বরদা চতুর্থী’ ব্রতও বলে। এই ব্রত পালন রীতিটি অন্য পালনের মত নয়। কাঁঠালের পাতার ওপর ছড়া লিখে এই ব্রত পালন করতে হয়।

ছড়াটি হল :
আগুনের চাউল, পৌষের ঘড়াটোপা, মাঘের পানি
অমুকে যে বর্ত করে ত্রিভুবনে জানি।।
তারাব্রত : মাঘ মাসের সংক্রান্তির দিন থেকে শুরু হয়ে এই ব্রত, শেষ হয় ফাল্গুন সংক্রান্তির দিন। প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা উঠোনের মাঝখানে একটু ছোট্ট চৌকো ঘর এঁকে আর সংক্রান্তির দিন বড় করে ঘর কেটে তার মধ্যে তারা আঁকা হয়।
ব্রতের প্রথম বছরে চারটি ছোট ঘট ও ঘটটি ঢাকার জন্য চারটি সরা, দ্বিতীয় বছরে আটটি ঘট আটটি সরা তৃতীয় বছরে বারটি ঘট বারোটি সরা এবং চতুর্থ বছরের ১৬টি ঘট ও ১৬টি সরার প্রয়োজন হয়। ঘটগুলি পূর্ণ করা হয় খই ও নারকেল নাড়ু দিয়ে। ব্রত প্রতিষ্ঠার দিন ব্রতী উপবাসী থেকে তারা অঙ্কিত ঘরে ফুল ও দূর্বা দিয়ে ১১৬ বার ব্রতের ছড়া বলে :
ষোলো ষোলো তারা মুকুটের ঝরা,
তোমরা হল সাক্ষী,
ঘৃত দিয়ে করি আমরা পঞ্চগ্রাসী
………ইত্যাদি।

ব্রত কথা শেষ হলে ব্রতী খই ও নাড়ু ভর্তি ঘটগুলি অন্যান্য ব্রতী ও অন্যান্যদের মধ্যে বিলিয়ে দেয়। এই ব্রতের মধ্যে দিয়ে স্বামী সন্তান ধন-সম্পদ ও চিরকাল এয়োস্ত্রী থাকার কামনা প্রকাশ পায়।
সেই কবে থেকেই পিতৃকুল শ্বশুরকূল ও পতিকূল অর্থাৎ নিজের সংসারের সুখ-সমৃদ্ধি মঙ্গল কামনায় বাংলার মেয়েরা ব্রত পালন করে আসছে। তাই আজও সারা মাঘ মাস জুড়ে প্রতিদিন মায়েরা ব্রত পালন করে আসছে।
তথ্য কৃতজ্ঞতা : অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্রতকথা ও ডক্টর শিলা বসাক এবং অন্যান্য।।