সাহিত্য, শিল্প, শিক্ষা, বাণিজ্য, বিজ্ঞান, খেলাধূলা, সমাজসেবা ও সরকারি ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য ভারত সরকার দেশের নাগরিকদেরই পদ্মশ্রী দিয়ে থাকেন। এই সম্মান দেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মাননা। রীতি মেনে সাধারণতন্ত্র দিবসের প্রাক্কালে পদ্ম পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে।
বাইশে দেশের সরকার পদ্ম সম্মান প্রাপকদের তালিকায় বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকেও রেখেছিল। সামাজিক ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য বর্ষীয়ান এই বাম নেতাকে পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষীত করতে চেয়েছিল। কিন্তু ভারত সরকারের সেই সম্মান তিনি গ্রহণ করছেন না। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী পদ্ম সম্মান বিষয়ক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, “পদ্মভূষণ পুরস্কার নিয়ে আমি কিছুই জানি না, আমাকে এই নিয়ে কেউ কিছু বলেনি। যদি আমাকে পদ্মভূষণ পুরস্কার দিয়ে থাকে তাহলে আমি তা প্রত্যাখ্যান করছি।”
প্রসঙ্গত এর আগেও ভারত সরকারের তরফে রাজ্যের আরও এক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রয়াত জ্যোতি বসুর নাম ঘোষণা করা হয়েছিল ভারতরত্ন সম্মানের জন্য। কিন্তু তিনিও সেই সম্মান প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। সেই সময় সিপিএমের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, কমিউনিস্টরা মানুষের মধ্যেই বেঁচে থাকে, তাদের আলাদা করে কোনও পুরস্কারের দরকার পড়ে না। বোঝা গেল বুদ্ধবাবুও এক্ষেত্রে তাঁর পূর্বসূরির রাস্তায় হাঁটলেন এবং পদ্ম সম্মান প্রত্যখ্যান করলেন।
কিন্তু বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যও কি একই কারণে পদ্মশ্রী প্রত্যাখ্যান করলেন? সিপিএমের ফেসবুক হ্যান্ডেলে জানানো হয়েছে, “পদ্মভূষণ সম্মানের জন্য মনোনীত পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও প্রাক্তন পলিটব্যুরো সদস্য কমরেড বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য পদ্ম সম্মান গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছেন। সিপিএম-এর নীতি রাষ্ট্র থেকে এই ধরনের পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করার ক্ষেত্রে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আমাদের কাজ জনগণের জন্য, পুরস্কারের জন্য নয়।”
অনেকেই আবার বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যেরই বেশ কয়েক বছর আগের একটি বক্তব্যকে সামনে তুলে এনেছেন। বুদ্ধবাবুর সেই বক্তব্যের সঙ্গে পদ্ম পুরস্কার বিষয়টি একত্রিত করলে দাঁড়ায়- এমন সাম্প্রদায়িক বিজেপি সরকারের থেকে পুরস্কার না নিয়ে বরং “দাঙ্গাবাজদের মাথা ভেঙে গুড়িয়ে দিতে হয়”।
উল্লেখ্য, কংগ্রেস সরকার এলামকুলাম মনক্কল শংকরন নাম্বুদিরিপাদকেও পদ্মভূষণ দিতে চেয়েছিল। নাম্বুদিরিপাদ কেরালায় কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম একজন। তিনি কেরালায় প্রদেশ কংগ্রেস পার্টির সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন। কংগ্রেস রাজনীতির পাশাপাশি তিনি মার্কসবাদের সচেতন চর্চায় ব্রতী হন। ১৯৩৬ সালে যে পাঁচজন কেরালায় কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন ই এম এস তাদেরও একজন।
তার মানে ‘সরকারি বামপন্থী’ দলকে ভারত সরকার এর আগেও পুরষ্কার প্রদানের চেষ্টা করেছিল। তবে নাম্বুদিরিপাদ ও জ্যোতি বসুর ভারত সরকারের পুরস্কার গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যক্তি হিসাবে ততটা সিদ্ধান্ত নিতে হয়নি যতটা তাঁদের পার্টি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ওঁরা দুজনেই তাঁদের পার্টির সিদ্ধান্তের প্রতি অনুগত ছিলেন। ফলে তাঁরা পার্টির সিদ্ধান্ত মেনেই কাজ করেছিলেন। তখন তাদের কাছে পার্টির ভাবমূর্তি রক্ষার বিষয়টিই ছিল প্রধান বিবেচ্য।
কিন্তু বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের প্রেক্ষিতটা আজ একটু ভিন্ন। ২০১১ সালে বাংলায় বাম জমানার অবসানের পর থেকে বুদ্ধবাবু আর সিপিএম কিম্বা বাম রাজনীতির সঙ্গে সেভাবে সংপৃক্ত নন। বামেদের কাজ কারবার নিয়েও তিনি আজ আর তেমন করে উৎসাহ বোধ করেন না। ফলে পদ্ম পুরস্কার গ্রহণ বর্জনের সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণভাবেই তাঁর ব্যক্তিগত। নিজস্ব মতামত গ্রহণের ক্ষেত্রে তিনি স্বাধীন অবস্থান নিয়েছেন। এখানে তাঁর পার্টির ভাবমূর্তি রক্ষার বিষয়টি যেমন তেমনই মত বা সিদ্ধান্ত ছিল একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক।
বরং ভাবতে অবাক লাগে যারা কৃষক আন্দোলনের ওপর একটানা আট মাস ধরে নির্যাতন চালালো, যারা গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সামিল হওয়ার জন্য মিথ্যা অভিযোগে একাধিক মানুষকে জেলে আটকে রেখেছে, যারা ছাত্র, যুব, শিক্ষক, অধ্যাপকদের গায়ে শুধুমাত্র মতবিরোধের কারণে দেশদ্রোহী তকমা সেঁটে দিয়েছে, তারা সমাজ সাহিত্য শিল্প বিজ্ঞান একটি সরকারি বামপন্থী দলের অন্যতম নেতাকে পুরস্কার দেওয়ার কথা ভাবলো কিভাবে! তাই বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য যদি না সেই সরকারের পুরস্কার অস্বীকার করতেন তা হত চরম লজ্জার।
অন্যদিকে সঙ্গীত শিল্পী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ও তবলা শিল্পী অনিন্দ্য চট্টোপাধায়কে পুরস্কার দিয়ে পুরস্কার আয়োজকরা নিজেদের মর্যাদা বাড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তা হতে দেন নি ওই দুই শিল্পী। এত কাল পরে পুরস্কার সঙ্গত কারণেই তাঁরা দুজনেই ভারত সরকারের এই নির্বোধ ও অপমানজনক প্রস্তাব প্রত্যাখান করেছেন সাধারণ মানুষের কাছে নিজেদের সম্মান আরও বাড়িয়েছেন।
প্রসঙ্গত, বেশ কিছু বছর আগে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় পুরস্কারদাতাদের মুখের ওপর পুরস্কার ফিরিয়ে তাদের উদ্ধত ক্ষমতাকে চূর্ণ করে দিয়েছিলেন, এরা দুজন প্রকৃত শিল্পী হিসাবে তারই যোগ্য পুনরাবৃত্তি করলেন।
বুদ্ধ বাবু সম্পর্কে যতটা লিখলেন সেই তুলনায় দুই শিল্পী কম গুরুত্ব পেল।
একদম ঠিক বলেছেন, কিন্তু কিছু ভক্ত এখন শিল্পীর সম্বন্ধে এত বাজে কথা বলছে যা ভাবা যায় না, আজ উনি অসুস্থ, হাসপাতালে ভর্তি।
বুদ্ধবাবু বামেদের ‘কাজ কারবার’ নিয়ে ইদানীং আর উৎসাহি নন,বলা টা বোধহয় ঠিক হলনা । খবরে প্রকাশ অনিচ্ছুক অশোক ভট্টাচার্য মহাশয়
কে পুরসভা ভোটে দাঁড়াতে বুদ্ধবাবু অনুরোধ করেছেন ।