নালন্দা (৪২৫ খ্রিঃপূঃ – ১২০৫ খ্রিঃ)
জগদ্দল বিশ্ববিদ্যালয়ের যে চার পণ্ডিতের কৃতি আমরা আলোচনা করব তাঁরা হলেন বিভূতিচন্দ্র, দানশীল, শুভকর এবং মোক্ষরগুপ্ত।
বিভূতিচন্দ্র
এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম শ্রুতকীর্তি অধ্যাপক-পণ্ডিতের নাম বিভূতিচন্দ্র। তিনি সে সময়ের প্রখ্যাত তিব্বতি পণ্ডিত এবং বহু সংস্কৃত ভাষায় লেখা বই তিব্বতি ভাষায় অনুবাদ করেন। যতদূরসম্ভব তিনি তিব্বতে গিয়েছিলেন। এটা ভাবার কারণ হল মহাপণ্ডিত অনুপমরক্ষিতের সাধঙ্গ-যোগ-নাম বইটি দিং-রি-তে অনুবাদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে দিং-রি কোথায়? এটা দক্ষিণ তিব্বতের একটি উপত্যকা। সত্যই তিনি যদি বইটি দিং-রিতে অনুবাদ করেন তাহলে ধরে নিতে হবে তিনি তিব্বতে গিয়েছিলেন। একই জায়গায় দ্প্ল দিং-রিতে তিনি শ্রী-কলা-চক্রোপদেশ-সূর্য-চন্দ্রসাধনা-নাম অনুবাদও করেন।
বিভূতিচন্দ্রের উপাধি ছিল মহাপণ্ডিত। তিনি যতদূরসম্ভব শ্রী শবরীশ্বরের অধীনে জ্ঞানার্জন করেন। তিনি গুরুর থেকে সাদঙ্গ-যোগ-নাম নামক বইটি অধ্যয়নের দিক নির্দেশ পান। বইটি বিভূতিচন্দ্র তিব্বতি ভাষায় অনুবাদ করেন।
বৌদ্ধপন্থের আরেকটি জনপ্রিয় বইএর নাম ছিল জ্ঞান-চাক্ষুষ-সাধন-নাম। বহুকালের এই বইটি বহু গুণী মানুষের হাত ঘুরে এসেপড়েছিল আলোচ্য পণ্ডিত বিভূতিচন্দ্রের হাতে। বইটির মূল লেখক আচার্য কালপাদ যিনি এটি মহাকরুণিক অর্থাৎ অবলোকিতেশ্বর এবং অন্যান্য বোধিসত্ত্বকে বিবৃত করেন। পরের দিকে এটি জ্ঞানডাক, সূর্য ধর্ম, রত্নশ্রীভদ্র, শাক্যশ্রীভদ্র এবং সর্বশেষে বিভূতিচন্দ্রের হাতে আসে।
এই বইসূত্রে আমরা বিভূতিচন্দ্রের নামের সঙ্গে যুক্ত থাকা আরেকটা নাম শাক্যশ্রীভদ্রের নাম পাচ্ছি। এই সূত্রটি থেকে আমরা আন্দাজ করতে পারি কোন সময়ে বিভূতিচন্দ্রের বউড্ডহীকোটাড় বিকাশ ঘটেছিল। ১২০৩-এ বখতিয়ার খলজি যখন বাংলায় আসছেন আক্রমণ করছে সে সময় এই বিক্রমশীলা বিহারের মঠধ্যক্ষ ছিলেন শাক্যশ্রীভদ্র। তাহলে এই সময়ের পূর্বেই বিভূতিভদ্রের আবির্ভাব ঘটেছিল। বিক্রমশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিনাশের পরে শাক্যশ্রী ভদ্রজগদ্দল বিহারে আসেন। আমরা জানি না সেখানেই তাঁর বিভূতিচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর দেখা হয় কী না; কিন্তু এই তথ্যটা পরিষ্কার যে তিনি শাক্যশ্রীভদ্রের সঙ্গে তিব্বতে রওনা হয়ে যান। কারণ এখানে বৌদ্ধপন্থ ক্রমশ ধ্বংস হচ্ছিল। ফলে বিভূতিচন্দ্র অবশ্যই বখতিয়ার বাংলায় আসার আগে মগধ এবং বাংলায় বিকশিত হয়েছেন।
আগেই বলেছি তিনি প্রখ্যাত তিব্বত ভাষা বিশেষজ্ঞ ছিলেন এবং বহু সংস্কৃত পুস্তক তিব্বতিতে অনুবাদ করেন। এই অনুবাদকর্মগুলি হল —
সাধঙ্গ-যোগ-নাম; সাধঙ্গ-যোগ-টিকা; শ্রী-কাল-চক্রপোদেশ-সূর্য-চন্দ্র-সাধনা-নাম; জ্জান-চাক্ষুষ-সাধনা-নাম; সাধঙ্গ-যোগ; গুণ-ভরণী-নাম-সাধনা-যোগ-টিপ্পনি; লুহি-পদভিসময়-বৃত্তি-সম্ভারোদ্যোয়-নাম; লুহি-পদভি-সময়-টিকা-বিশ্বাসদ্যোত-নাম; শ্রী-সম্ভার-মণ্ডল-বিধি; বজ্র-সত্ত্ব-সাধন-নিবন্ধ; পঞ্চ-কর্ম-মত-টিকা; মঞ্জু-বজ্র-পুজা-বিধি; রক্তারি-চতুহ-শক্তি-প্রাথক-সাধনা; আর্য-সিত-তাপত্রপরাজিত-সাধনা; গুরু-সাধনা; আর্য-মোঘ-পাশ-সাধনা; গুরু-সিদ্ধি।
বিভূতিচন্দ্র এই বইগুলি নিজেও রচনা করেন এবং নিজের হাতে বইগুলি তিব্বতিতে অনুবাদ করেন—
অন্তর-মঞ্জরী-নাম; স্বপ্নহানা; ত্রি-সম্বর-প্রবাহ-মালা-নাম; বজ্র-চক্রিকা-কর্ম-সাধনা; আর্য-মোঘ-পাশ-সাধনা; বোধিচার্যবতার-তাৎপর্য-পঞ্জিকা বিশেষ-দ্যোতনী-নাম।
দানশীল
জগদলের আরেক পণ্ডিতের নাম মহাপণ্ডিত দানশীল। তাঁর উপাধি শুধুই মহাপণ্ডিতই ছিল না আরও দুটি উপাধি তাঁর ছিল সেগুলি হল পণ্ডিত, আচার্য এবং উপাধ্যায়। তিনি সংস্কৃত থেকে বহু বই তিব্বতি ভাষায় অনুবাদ করেন। তিনি মধ্য তিব্ববতের ইয়ার-ক্লুংস-থানং-পো-চে বিহারে কাক-চরিত নামে একটি বই অনুবাদ করেন। এই তথ্য থেকে পরিষ্কার তিনি তিব্বতে গিয়েছিলেন। দানশীল যতদূরসম্ভব জ্ঞানমিত্রের সঙ্গে জুড়ে বেশ কিছু অনুবাদ এবং পণ্ডিতির কাজ করেছেন। তাঁরা যৌথভাবে এই দুটি বই অনুবাদ করেন করম-প্রজ্ঞাপ্তি; সার-সমুচ্চয়ে-নাম অভিধর্মবতার-টিকা।
দানশীল নিচের এই বইগুলি একক প্রচেষ্টায় অনুবাদ করেন —
মারিচ্য-সাধনা; শুক্ল-চন্দ-মহারোসন-সাধনা; আর্য-কলা-সাধনা; আর্য-মঞ্জু-শ্রী-সাধনা; মনোহর-কল্প-নাম-লোক-নাথ-স্তোত্র; রক্ত-যামরি-মন্ত্র-সংরহ-নাম; রক্ত-যামরি-কর্ম-বলি-সাধনা চিন্তা-মণি-নাম; রতি-প্রিয়-সাধনা-নাম; যক্ষ-নট-নটি-লক্ষ্মী-সাধনা; যক্ষ-নান্দিকার-সাধনা; যক্ষ-রাজা-কিলিকিলা-সাধনা; পীড়ন-মহা-যক্ষ-সেনাপতি-সাধনা; শ্রী-চন্দ্র-দেবীনাম-সাধনা; কুণ্ডল-ধ্রণী-হারিতি-সাধনা; রত্ন-মালা; নাগি-সাধনা; নাগি-বসু-পালা-মুকবি-নাম-সাধনা; নাগ্য-ফুনামোপায়া; মনোহরি-সাধনা; শুভয়া সাধনা; বিসাল-নেত্রী-সাধনা; রতি-রাগ-সাধনা; অপরাজিতা-নাম-সাধনা; অধিজয়জিত-সাধনা; পূর্ণ-ভদ্র-সাধনা; শ্রী-জয়-সুন্দরী-সাধনা; বিমলা-সুন্দরী-সাধনা; পসাচ-পিলুপাল-সাধনা; কৃষ্ণ-পিশাচ-সাধনা; পিশাচ-কৃষ্ণ-সার-সাধনা; পিশাচী-হানা-সাধনা; আলুকা-নাম-সাদ্গনা; অলগুপ্ত-নাম-সাধনা; খর-মুক্তি-সাধনা; আহুমবিনী-পিশাচী-সাধনা; উচ্চুস্মাননাম-সাধনা; ক্ষক্ষু-শ্রী-কুণ্ডলী-সাধনা; পিশাচী-কর্ণ-গৃহ-সাধনা; পিশাচী-ক্রিষ্ণ-মুখী-সাধনা; যামরী-চিন্তামণি-মালা-নাম-সাধনা; রক্ত-যামরী-সসাধনা; শুক্লৈক-জটা-সাধনা; এক-জটা-সাধনা; আর্য-বজ্র-তারা-সাধনা; অভিসময়-মঞ্জরী; যোগানুসারিনী-নাম-বজ্র-যোগিনী-টিকা; শ্রী-মঞ্জু-বজ্রাদি-ক্রমবিষম-সমুচ্চচয়ে-নিষ্পন্ন-যোগাবলী-নাম; হস্ত-বাল-প্রকরণ-কারিকা; কাক-চরিত।
তিনি যেহেতু কোনও সাহায্য ছাড়াই, শুধুমাত্র চারটি বই বাদে, ৫৪টা বই নিজেই অনুবাদ কররেছিলেন, স্বাভাবিকভাবে তিনি অনুবাদক হিসেবে বিশেষভাবে প্রখ্যাত হয়ে ওঠেন। বৌদ্ধপন্থ বিষয়ে তাঁর অবদান দীপঙ্কর অথবা অভয়ঙ্করগুপ্তের সমান্তরাল ধরা হয়। তিনি সংস্ক্রৃত ভাষায় একটি মাত্র বই রচনা কররেন ধ্যান-সদা-ধর্ম-ব্যবস্থান-বৃত্তি।
শুভকর
জগদ্দল বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যে তৃতীয় পণ্ডিতের নাম উল্লেখ করব, তিনি হলেন শুভকর। কোনও কোনও সময় তাকে শুভঙ্কর হিসেবেও আমরা পাচ্ছি। শুভকরের উপাধি পণ্ডিত। তিনি শাক্য শ্রীর পারমার্থিক গুরু। শাক্য শ্রী যদি কাশ্মীরে জন্মানো, বিক্রমশীলা বিহারের শাক্যশ্রীভদ্র(১২০৩খ্রীর পূর্বের) হন, তাহলে এই দেশে মঠগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পূর্বের তিনি বিকশিত হয়েছিলেন।
জগদল বিহারেই তিনি সংস্কৃতভাষায় লেখা বৌদ্ধপন্থী বই সিদ্ধাইকার-বৃত-তন্ত্র-টিকার রচনাকার। এই বইটি তিব্বতি ভাষায় রূপান্তর করেন আচার্য দানশীল।
মোক্ষরগুপ্ত
জগত্তল বা জগদ্দল বিহারের শেষতম যে পণ্ডিতের নাম নিয়ে আলোচনা করব তিনি হলেন মোক্ষকরগুপ্ত। বৌদ্ধাঙ্গিকের অসামান্য নৈয়ায়িক ছিলেন। তিনি তর্ক-ভাষা নামে একটি বৌদ্ধপন্থী ন্যয় পুস্তকের রচয়িতা। এই বইটি ভিক্ষু দ্পন-এ শ্রীমন্ত স্থিরমতি তিব্বতি ভাষায় অনুবাদ করেন।
মোক্ষকরগুপ্তর উপাধি ছিল মহাপণ্ডিত এবং ভিক্ষু। তিব্বতিতে তাঁর নাম হয় থর-হ্ব্যুন-গ্নাস-ক্যিসবাস-পা।
জগদ্দল বিহারের এই চারজন পণ্ডিত তাঁদের কৃত বিপুল পরিমান সংস্কৃত পুস্তক অনুবাদের মাধ্যমে তিব্বতি বৌদ্ধ সাহিত্য বিকাশের জন্যে অসামান্য অবদান পেশ কররেছিলেন। (চলবে)