বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়
দীর্ঘকালের পাল সাম্রাজ্যে, একের পর এক পাল রাজার উৎসাহে শতাব্দ পর শতাব্দ জুড়ে জনপদগুলোয় বহু বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠতে থাকে। এটাও উল্লেখ থাক পাল রাজারা শুধু বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন না তারা অন্যান্য ধর্মপালকও ছিলেন, যদিও সে বিষয়টা এই প্রবন্ধে আলোচ্য নয় (চুরাশি সিদ্ধর কাহিনীতে অলকা-দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় পাল রাজাদের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী বলছেন, কিন্তু পাল রাজারা কতটা বৌদ্ধ আর কতটা অন্যান্য ধর্মমতপালক ছিল সে বিষয়ে ঐতিহাসিকদেরর মধ্যে মতভেদ আছে। দেবীপ্রসাদ, অলকা চট্টোপাধ্যায়ের বইতে লিখছেন, প্রচলিত মতে রাজারা মহাযান ধর্মমতের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। অপরপক্ষে হিন্দু বাঙ্গালির কাব্য সমাজঃ আদি-মধ্যযুগ বইতে অর্জুনদেব সেনশর্মা প্রথম মহীপালের নারায়ণপুর মূর্তিলেখটি নিয়ে আলোচনায় ড দীনেশ্চন্দ্র সরকারের শিলালেখ-তাম্রশাসনাদি প্রসঙ্গ বইটির ৯৫ পাতা থেকে উদ্ধৃতি তুলে বলছেন, “এই অভিলেখ থেকে জানা যায় যে, মহারাজাধিরাজ মহীপাল দেবের চতুর্থ সংবৎসরে সমতটের অন্তর্গত বিলিকন্ধকবাসীবণিক জম্ভলমিত্রের পুত্র বুদ্ধ মিত্র বিনায়ক ভট্টারকের এই মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। …এই গ্রামটি কতিপয় বর্ধিষ্ণু বণিক পরিবারের আবাসস্থল ছিল। …নামদুটিতে বৌদ্ধ প্রভাব থাকলেও …বৌদ্ধগ্রন্থাদিতে বিনায়কের যে বর্ণনা দেখা যায় তা অনেকাংশে ভিন্নরূপ (লেখক স্পষ্টিকরণ করছেন – অর্থাৎ বৌদ্ধবণিক যে বিনায়ক মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন – তা বিশেষজ্ঞ বর্ণিত ‘বিষ্ণুধর্মোত্তর’ ধৃত হিন্দু বিনায়ক মূর্তির অনুরূপ) এই প্রসঙ্গে পট্টমহাদেবী চিত্রমতিকাকে ‘মহাভারত’ পাঠ করে শোনাবার দক্ষিণাস্বরূপ পরমসৌগত মদনপাল কর্তৃক জনৈক ব্রাহ্মণকে গ্রামদানের উল্লেখ করা যেতে পারে। …চন্দ্ররাজাদের অনেকেই ‘পরমসৌগত’ অর্থাৎ সুগত বা বুদ্ধের পরমভক্ত বলা হয়েছে। তাঁদের শাসনাদি ও দান ভগবান বুদ্ধভট্টারককে উদ্দেশ্য করে প্রদত্ত হত। কিন্তু… চন্দ্রবংশের লহড়চন্দ্র ও গোবিন্দচন্দ্র নামক শেষ নরপতিদ্বয় প্রকৃতপক্ষে বৌদ্ধধর্ম ত্যাগ করেছিলেন। …তাঁরা যথাক্রমে বিষ্ণুভট্টারক এবং শিবভট্টারককে উদ্দেশ্য করে শাসন দান করতেন, এ কথা তাদের ময়নামতী শাসন থেকে পাওয়া গিয়েছে)। রাজারা বেশ কিছু সংস্কৃতি কেন্দ্রও গড়ে তুলেছিলেন। এই সব কেন্দ্রগুলিতে সাধারণত বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা ভারতের প্রাচীন জ্ঞান বিজ্ঞান বিষয়ে আলাপ আলোচনা চালাতেন। পাল আমলের আগেই স্থাপিত নালন্দা, সরাসরি বৌদ্ধদের দখলে এল। রাজারা মঠাধ্যক্ষ নিয়োগ করতেন। অষ্টম শতে রাজা ধর্মপাল বিক্রমশীলা মহাবিদ্যালয় স্থাপন করেন। ওদন্তপুরী বিহার আরেকটু পুরোনো। জগদ্দল বিহার প্রতিষ্ঠা করেন রাজা রামপাল। অষ্টম থেকে দ্বাদশ শত পর্যন্ত পূর্ব ভারতের এই কেন্দ্রগুলো ছিল মূল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কেন্দ্র। এই সব কেন্দ্রগুলির বিদ্যাচর্চা পদ্মসম্ভব, শান্ত রক্ষিত, দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের মত শিক্ষাচার্য তৈরি করেছে। এই সব বিদ্যাকেন্দ্র থেকে পাঠ নেওয়া প্রখ্যাতরা তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করেছেন। বৌদ্ধ শিক্ষা বিহারগুলি বৌদ্ধ ভারতের সঙ্গে তিব্বতের মিলনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে। শিক্ষকেরা তিব্বতে বহু সংস্কৃত এবং তিব্বতি ভাষায় বই রচনা করেছেন, বহু বৌদ্ধ পুস্তক তিব্বতি ভাষায় অনুবাদও করেছেন। সেই সব অনুদিত পুস্তক আবার ভারতে এসে নালন্দা, বিক্রমশীলা এবং জগদ্দলে নতুন করে নানা ভাষায় প্রতিঅনুদিতও হয়েছে।

ওদন্তপুরী মহাবিহার
ভারতীয় পণ্ডিতদের চিন তিব্বত বা অন্যান্য দেশে যাওয়ার স্মৃতি প্রায় মুছে গিয়েছে। তাদের পথ ধরে ভারতীয় সভ্যতা সেই সব দেশে পোঁছিয়েছে। তারা বৌদ্ধপন্থের নিখিল মানবতাবাদ নিয়ে বহু কষ্ট সহ্য করে দেশে দেশে গিয়েছেন এবং তাদের মত প্রতিষ্ঠা করেছেন।
মনে রাখা দরকার তিব্বত ভারতের অন্যতম কাছের প্রতিবেশী হলেও বোদ্ধ ধর্ম ভোট দেশে (তিব্বতে) পৌঁছতে বহু সময় লেগেছে। বৌদ্ধপন্থ প্রতিবেশী তিব্বতে পৌঁছনোর বহু আগে পূর্ব এশিয়ার বহু দেশে প্রসারলাভ করেছে। প্রথম খ্রি শতে চিনে অন্যতম প্রধান ধর্ম রূপে বৌদ্ধধর্ম প্রচারিত হয়। চতুর্থ শতে কোরিয়ায় বৌদ্ধপন্থ প্রসার লাভ করে। ষষ্ঠ শতে কোরিয়া থেকে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা জাপানে বৌদ্ধধর্মের সূত্রপাত ঘটান। বৌদ্ধ ধর্ম ভারত থেকে গান্ধার, গান্ধার থেকে চিন, চিন থেকে কোরিয়া, কোরিয়া থেকে জাপান পৌঁছলেও তিব্বত যেহেতু পাহাড় দিয়ে ঘেরা রাজ্য, সেখানে ভগবান বুদ্ধের বাণী পোঁছতে বহু সময় লেগেছে (যদিও এটা কোনও যুক্তি নয়, কারন তিব্বত ছিল মধ্য এশিয়ায় ভারতীয় পণ্য যাওয়ার সহজ রাস্তা। এ রাস্তা ব্রিটিশপূর্ব সময় পর্যন্ত চালু ছিল)।

বিক্রমশীলা মহাবিহার
আরবে যখন মহম্মদ নব্য ধর্ম প্রচার করছেন, ভোট দেশে সে সময় নতুন এক ধর্মান্দোলনের সূচনা হচ্ছিল। স্রন-সান গাম্পোর রাজত্ব তিব্বতের ইতিহাসে নতুন প্রভাত। সে সময় তিব্বতে বন ধর্মের প্রচলন ছিল। রাজা বিবাহ সূত্রে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হন। রাজত্ব বিস্তারের সূত্রে তিব্বতী রাজা চিনের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। শান্তিচুক্তি অনুযায়ী চিনা সম্রাট চিতসাং লুনসান তার কন্যা ওয়েনচেংকে তিব্বতি রাজাকে বিবাহ দিতে বাধ্য হন। চিনা কন্যা তিব্বতি স্বামীকে বৌদ্ধ ধর্ম বিষয়ে আগ্রহী করে তোলেন। এরপরে রাজা গাম্পো নেপালের রাজা আমশু বর্মনের কন্যা ভ্রিকুতি দেবীকে বিবাহ করে। নেপালরাজকে তিনি আশ্বস্ত করে বলেন ‘অসভ্য বর্বর’ তব্বতীদের মধ্যে তিনি বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের উদ্যোগ নেবেন এবং রাজ্য জুড়ে পাঁচ হাজার বৌদ্ধ বিহারও তৈরি করবেন। এই দুই তিব্বতী রানী তিব্বতী রাজার ধর্মবিশ্বাস বদলের সূত্রপাত করলেন (সূত্রঃ ১৮৯৫এর এশিয়াটিক সোসাইটি জার্নাল — ড. এল অস্টিন ওয়াডেল-এর ডেস্ক্রিপশন অব লাসা ক্যাথিড্রাল প্রবন্ধ)।

জগদ্দল মহাবিহার
এরপর থেকে রাজা কায়মনোবাক্যে তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারে মন দিলেন। ভারত, চিন, নেপাল থেকে বৌদ্ধ ভিক্ষু আনতে তিনি দূত থোনমি শ্যাম-ভোটকে (সংস্কৃততে সৎ-ভোট) পাঠালেন। তাঁর মূল নাম থন-মি। পিতার নাম আনু। তার ভারত আগমনের সময় জানা না গেলেও অনেকে অনুমান করেন তিনি ৬৩২ খ্রি ভারতে এসে ৬৫০ খ্রি তিব্বতে ফিরে যান। এই সময়ে হিউএনসাংও ভারত ভ্রমণ করছিলেন। থন-মি ভারতে সংস্কৃত শেখেন ব্রাহ্মণ লিপিদত্ত এং দেব-বিদ সিংহর কাছে। ফিরে যাওয়ার সময় প্রচুর বৌদ্ধ পুঁথি নিয়ে যান। গুপ্ত অক্ষর বদলিয়ে তিনি তিব্বতি অক্ষর সৃষ্টি করেন। তার সঙ্গে ব্যাকরণও রচনা করেন। রাজার আমন্ত্রণে বহু শ্রমণ তিব্বতে যেতে শুরু করেন। ভারত থেকে যান কুসার (কুমার?), শঙ্কর ব্রহ্মণ, নেপাল থেকে যান শীল মঞ্জু, চিন এবং কাশ্মীরও ক্রমান্বয়ে বৌদ্ধপন্ডিত পাঠাতে থাকে।
তিব্বতি নরপতি দেশে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচলনে ভারত থেকে ভিক্ষু আনার পরিকল্পনা করলেন। ষষ্ঠ শতক থেকে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার বা সংস্কার করতে ভারত থেকে বহু বৌদ্ধ ভিক্ষু তিব্বত গিয়েছেন। রাজার পৃষ্ঠপোষণায় ভারতীয় ভিক্ষুরা সংস্কৃততে লেখা বহু বৌদ্ধ গ্রন্থ তিব্বতি ভাষায় অনুবাদ করেন। ভারতীয় বৌদ্ধ ভিক্ষুদের হাতে নতুন করে তিব্বতি সাহিত্য গড়ে ওঠে। তিব্বতি ভিক্ষুরা সংস্কৃত শিখতে শুরু করে নিজ হাতে ভারতীয় পুঁথিগুলি তিব্বতি ভাষায় অনুবাদ করার কাজ করলেন।

নালন্দা মহাবিহার
রাজা খ্রি-সন-লডে-বস্তন এবং রাজা রালপাচানের ডাকে বহু ভারতীয় পণ্ডিত তিব্বতে যান। খ্রি-র গুরু ছিলেন শান্তি রক্ষিত। গুরুর প্রস্তাবে রাজা পদ্মসম্ভবের মত পণ্ডিতকে আমন্ত্রণ করেন। কালপাচানের সময় জিন পণ্ডিত তিব্বতে যান (সূত্র শরৎ চন্দ্র দাস — এশিয়াটিক সোসাইটি জার্নাল, ১৮৮২তে প্রকাশিত প্রবন্ধ কনট্রিবিউশন অন টিবেট)।
এইসব প্রাতঃস্মরণীয় পণ্ডিতরা যেতেন বড় বাংলা মগধ এবং কাশ্মীররের বৌদ্ধ মঠগুলি থেকে। নালন্দা, জগদ্দল এবং ওদন্তপুরী বহু শত কাল ধরেই বহির্বিশ্বজুড়ে ভারতের সংস্কৃতি কেন্দ্র রূপে বিবেচিত হয়েছে। সেখান থেকে বহু সন্ন্যাসী তিব্বতে গিয়েছেন। তিব্বতে যাওয়ার জন্য উদ্দিষ্ট ভিক্ষুদের বিভিন্ন মঠে আলাদা করে তিব্বতি আর সংস্কৃত ভাষা শেখানো হত।
এরপর আমরা একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয় ধরে ধরে যে সব শিক্ষক ভিক্ষু তিব্বত গিয়েছেন সেই তালিকা এবং তাঁদের জীবন কর্ম বিষয়ে আলোচনা করব। বিদ্যালয় হিসেবে প্রথমে বিক্রমশীলা বিহার, তারপরে নালন্দা, জগদ্দল আর শেষে ওদন্তপুরী। (চলবে)