নালন্দা (৪২৫ খ্রিঃপূঃ – ১২০৫ খ্রিঃ)
এই কিস্তিতে নালন্দার প্রধান গুরু-পণ্ডিতের সংক্ষিপ্ত পরিচয় শেষ হল। পরের কিস্তি থেকে অপ্রধান পণ্ডিতেরা।
পদ্মসম্ভব
গুরু শান্ত রক্ষিতের নির্দেশে রাজা খ্রি-স্রোন-দেউ-ৎসান পূর্ব ভারতে আরও একটি অভিযান পাঠান নালন্দার আরেক শ্রুতকীর্তি পণ্ডিত পদ্মসম্ভবকে তিব্বতে আমন্ত্রণ জানানোর জন্যে। পদ্মসম্ভব সম্বন্ধে আমরা বিশদ বিবরণ পাই নানান তিব্বতি গ্রন্থে। সেই গ্রন্থসূত্র আমাদের জানায় পদ্মসম্ভব ছিলেন উড্ডীয়ান (কাশ্মীর) রাজ ইন্দ্রভূতির পুত্র। ইন্দ্রভূতির একমাত্র পুত্র মারা যাওয়ায় শুধু ইন্দ্রভূতিই বা রাজপরিবারই নয় সমগ্র রাজ্য শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে। রাজ্যের অবস্থা দুর্দশায় ভরে যায়। প্রজারা সরাসরি বুদ্ধদেবের কাছে প্রত্যাদেশের আকাঙ্ক্ষা জানাতে থাকে।
একদিন রাজা স্বপ্নে দেখলেন তিনি এক হাতে বজ্র ধরে আছেন। পরের দিন রাজপুরোহিত রাজাকে জানালেন নির্দিষ্ট একটি হ্রদে একটি পদ্ম পাতার ওপরে একটি শিশুর জন্ম হয়েছে। সেই শিশুই রাজ্যকে উদ্ধার করবে। রাজা ত্রস্তপদে হ্রদের পাশে গিয়ে পদ্মের ওপরে শুয়ে থাকা শিশুটিকে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কে?’ শিশুটি উত্তর দিল, ‘আমি তোমার কাছে এসেছি স্বয়ং বুদ্ধদেবের নির্দেশে’। রাজা তাকে প্রাসাদে নিয়ে গিয়ে নিজের পুত্র সন্তানের মত করে গড়েপিটে তুলতে থাকেন। তার নাম দেওয়া হল সররুহ বজ্র। কিন্তু পদ্মপাতার ওপর শিশুটিকে পাওয়া যাওয়ার চমৎকার ঘটনায় জনগণ রাজপুত্রের নাম রাখল পদ্মসম্ভব। শিশুটি বড় হতে থাকে অন্যভাবে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে ঐহিক আনন্দ ফূর্তি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে থাকে। রাজপুত্র একদিন এক বুদ্ধবাদ বিরোধী প্রজাকে হত্যা করে। প্রজারা রাজপুত্রের বিরুদ্ধে রাজাকে অভিযোগ করতে আসে। রাজা, রাজপুত্রকে রাজ্য থেকে নির্বাসন দেন। উড্ডীয়ান, কাশ্মীর থেকে নির্বাসিত রাজপুত্র পদ্মসম্ভব এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণ করতে করতে বিপুল জ্ঞান সঞ্চয় করতে থাকে। লাহোরের এক বহুকালের অবিবাহিতা রাজকুমারী জ্ঞানী এই মানুষটাকে বিবাহ করতে আগ্রহ দেখায়। সে রাজকুমারী কুমারী দেবীকে বিবাহ করে।
এই ধরণের বহু সম্ভব অসম্ভব গল্প তিব্বতজুড়ে পণ্ডিত পদ্মসম্ভবের নামে ছড়িয়ে আছে। যখন তিব্বতি রাজা তাঁকে আমন্ত্রণ করে পাঠালেন, সে সময় তিনি তখন নালন্দায় অধ্যাপক হিসেবে প্রখ্যাতি লাভ করেছেন। তন্ত্রবিদ্যার যোগাচার্য আঙ্গিকের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা। ৭৪৭এ নালন্দা বিহার ত্যাগ করে তিনি তিব্বতে রওনা হন।
তিব্বতে রাজা এবং প্রজারা জ্ঞানী মানুষটিকে সাদরে অভ্যর্থনা জানায়। তিনি সাম-ইয়ের বৌদ্ধমঠ তৈরিতে শান্ত রক্ষিতের সাহায্য করতে থাকেন। তিব্বতি বৌদ্ধপন্থে পদ্মসম্ভব ক্রমশঃ তান্ত্রিকাচারের নানান রেণু যোগ করেন। তাঁর পর থেকে নালন্দা বিহার তিব্বতকে যত পণ্ডিত উপহার দিয়েছে সক্কলে তাঁর দেখানো পথে হেঁটে তন্ত্রবিদ্যার যোগাচার্য আঙ্গিকের বৌদ্ধপন্থ চর্চা করেছেন। তন্ত্রবিদ্যার যোগাচার্য আঙ্গিকের বৌদ্ধপন্থটি বন ধর্মের সঙ্গে মিলেমিশে গিয়ে তিব্বতে নতুন ধরণের বৌদ্ধপন্থের আবির্ভাব হল — নাম হল লামাবাদ। তিব্বতে বন ধর্মের শেকড় ছিল অনেক গভীরে। ধর্মের অনুগামীরা শুরু থেকেই তিব্বত থেকে বৌদ্ধ ধর্মকে উচ্ছেদ করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কয়েকশ বছরের রাজকীয় প্রচেষ্টায় তিব্বতি প্রজারা বৌদ্ধপন্থের জাদু, মন্ত্র এবং জনমনোহরণী বাণীতে আকর্ষিত হয়ে বৌদ্ধ অনুগামী পড়ে। ফলে বনপন্থী প্রজা এবং মন্ত্রীদের চলতে থাকা অন্তর্ঘাত সত্ত্বেও বৌদ্ধপন্থ ততদিনে তিব্বতি জনসাধারণের এক বড় অংশকে আকর্ষিত করতে পেরেছিল।
প্রথম খ্রিষ্টাব্দে বৌদ্ধপন্থ চিনে প্রবেশ করে। চিনা বৌদ্ধ ভিক্ষুরা ক্রমশ তিব্বতে অভিবাসিত হয়ে বৌদ্ধ ধর্মের বানি প্রচার করছিলেন। তিব্বতে ভারতীয় পণ্ডিতেরা বৌদ্ধপন্থ প্রচারে-প্রসারে যেতে শুরু করেলে এবং তাদের গ্রহণযোগ্যতা বেশি হওয়ায় চিনা বৌদ্ধপন্থীদের সঙ্গে ভারতীয় পণ্ডিতদের তাত্ত্বিক বিরোধ শুরু হয়। চৈনিক ভাবধারার অন্যতম প্রধান ভিক্ষু মহাযান হওয়া-শাং রাজগুরু শান্ত রক্ষিত এবং পদ্মসম্ভবের প্রচারিত বানিতে খুঁত ধরতে থাকেন। এই সময়য় পণ্ডিত কমলশীল তিব্বতে পৌঁছে প্রধান ভিক্ষু মহাযান হওয়া-শাংকে তর্কযুদ্ধে আহ্বান জানান। তিনি চিনা পণ্ডিতকে তর্কে হারিয়ে দেন এবং তাকে চিন থেকে বহিষ্কার করা হয়। চিনা বৌদ্ধপন্থের বিলয় সুনিশ্চিত হয়।
পণ্ডিত পদ্মসম্ভবকে তিব্বতে তান্ত্রিক পদ্ধতিতে পুজো করা হয়। তাঁর যতগুলি ছবি আছে সেগুলি কিন্তু উড্ডীয়ান দেশের রীতিতে বস্ত্রপরা অবস্থায় আঁকা। তাঁর ডান হাতে বজ্র এবং বিপরীত হাতে মড়ার খুলি। বগলের তলায় রাখা একটি ত্রিশূলে একটি মনুষ্যমুণ্ড বিদ্ধ রয়েছে। দুপাশে দুই স্ত্রী দণ্ডায়মান, যাদের একজন তাঁকে নৃমুণ্ডের মধ্যে মদ্য এবং রক্ত এগিয়ে দিচ্ছেন। এই ধরণের তান্ত্রিকাচারে নিবদ্ধ করে তিব্বত পদ্মসম্ভবকে আজও পুজা করে থাকে।
তিনি সময় পঞ্চাশিকার লেখক। এটি অনুবাদ করেন ভিক্ষু আনন্দপ্রজ্ঞা। তিনি তিব্বতে পদ্ম-হ্ব্যুন-গ্নস-শবস (আচার্য পদ্মসম্ভব-পদ) নামে পরিচিত।
কমলশীল
আমরা দেখেছি তিব্বতি রাজা খ্রি-স্রোন-দেউ-ৎসান শান্ত রক্ষিত এবং পদ্মসম্ভবকে তিব্বতে সাদরে আমন্ত্রণ করে নিয়ে যান। তিনিই আচার্য কমলশীলকে তার দরবারে যোগ দিয়ে ভোট দেশে বৌদ্ধপন্থ প্রচারের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
কমলশীল ছিলেন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রুতকীর্তি অধ্যাপক। তিনি শান্ত রক্ষিত এবং পদ্মসম্ভবের সময়ের পণ্ডিত-শিক্ষক। তার জ্ঞানচর্চাকাল কোনওভাবেই ৭২৮-৭৮৬ খ্রিঃ পরে হতে পারে না। নালন্দায় তিনি বিশেষ রূপে তন্ত্র পাঠ দিতেন।
তিব্বতি রাজার ডাকে তিনি তিব্বতে পৌঁছে দেখেন, আচার্য শান্তি রক্ষিত এবং মহাগুরু পদ্মসম্ভবের সঙ্গে তর্কযুদ্ধের মহড়া নেওয়ার পরিবেশ তৈরি করছেন চিনা ভিক্ষু। তিনি গুরুদের হয়ে চিনা মহাযানী ভিক্ষু নহাযান হওয়া-শ্যাং-কে তর্কযুদ্ধে আহ্বান জানান, গুরু তাঁকে সম্মতি দিলে তিনি কূট তর্কে চিনা ভিক্ষুকে অবলীলায় পরাজিত করে তিব্বত ছাড়া করান।
কমলশীল সূত্র (ম্ডো-হগ্রেল) বিষয়ে সংস্কৃত ভাষায় এই কয়টি বই রচনা করেন আর্য-সপ্ত-শতিকা-প্রজ্ঞা-পারমিতা-টিকা; আর্য-বজ্র-ছেদিকা-প্রজ্ঞা-পারমিতাটিকা; প্রজ্ঞা-পারমিতা-হৃদয়-নাম-টিকা; ন্যয়-বিন্দু-পূর্ব-পক্ষে-সংক্ষিপ্ত; তত্ত্ব-সংগ্রহ-পঞ্জিকা।
স্থিরমতি
হিউ-এন-সাং নালন্দা বিহারের জ্ঞানী পণ্ডিত স্থিরমতি এবং গুণমতী বিষয়ে লিখে গিয়েছেন, যারা সে সময়ের প্রখ্যাত পুষা (বোধিসত্ত্ব) ছিলেন। স্থিরমতির উপাধি ছিল একাধারে উপাধ্যায় এবং আচার্যও।
শ্রীমদ স্থিরমতি যতদূরসম্ভব ছিলেন গুরু বজ্রধ্বজ গোষ্ঠীর অনুগামী। তিনি দপন দেশের মানুষ। তিনি, তাঁর পরমার্থিক গুরুর সঙ্গে মিলে ভৃত্ত-মালা-স্তুতির অনুবাদ করেন, এই কাজটা তাঁর গুরুই শুরু করেছিলেন, পরে তিনি সেই অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে যোগ দেন।
স্থিরমতি তিব্বতিদের কাছে জনপ্রিয় ছিলেন প্রখ্যাত টিকাকার, ব্যাখাকার এবং অনুবাদক রূপে। তিনি বৈয়াকরণিক হুসেবেও প্রখ্যাতি অর্জন করেন এবং ব্যকরণ এবং ভাষা বিষয়ে বহু পুস্তক রচনা করেন। তিনি সংস্কৃত ব্যকরণের কল্প আঙ্গিক নিয়ে কাজ করেছেন। স্থিরমতি নির্দেশনায় এবং পরিকল্পনায় তাঁরই রচিত ধাতুসূত্র তিব্বতি ভাষায় অনুবাদ করেন বোধিশিখর নামক এক শিষ্য।
তিব্বতি গ্রন্থগুলি থেকে আমরা জানতে পারি যে স্থিরমতি মগধের নালন্দার তারাভট্টরিকা মন্দিরে বাস করতেন। এই মন্দির সে সময়ের বিজ্ঞান-প্রযুক্তি চর্চার কেন্দ্র ছিল। তিনি পুণ্ডরিকের লেখা আর্য-মঞ্জু-শ্রী-সঙ্গীতি-টিকা বিমলপ্রভা বইটি অনুবাদ করেন। (চলবে)