প্রজ্ঞাকরমতি (Prajñākaramati)
বিক্রমশীলা মহা বিহারের অন্যতম দ্বারপাল ছিলেন প্রজ্ঞাকরমতি। বিহারের মূল ছয়টি প্রবেশের জ্ঞান-দরজা ছিল। প্রত্যেক জ্ঞান-দরজায় জ্ঞানের পাহারায় থাকতেন একজন করে মহাপণ্ডিত বিদ্বান, যিনি পাঠের উদ্দেশ্যে আসা শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের স্তর পরীক্ষা করতেন। শিক্ষার্থীরা যদি পরীক্ষায় সফল না হত, তাহলে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার অধিকার দেওয়া হত না। দক্ষিণের দরজায় দ্বারপালের দায়িত্ব পালন করতেন আচার্য প্রজ্ঞাকরমতি। লামা তারানাথ বলছেন দক্ষিণের দরজায় মহাপণ্ডিত প্রজ্ঞাকরমতির পাহারা ছাড়া পূর্বের দরজার জ্ঞান-পাহারায় ছিলেন রত্নাকর শান্তি, পশ্চিমের দরজায় বাগীশ্বরকীর্তি, উত্তরের দরজায় নারোপা, প্রথম কেন্দ্রিয় দরজায় রত্নবজ্র, এবং দ্বিতীয় কেন্দ্রিয় দরজায় জ্ঞান শ্রী মিত্র।
প্রজ্ঞাকরমতি অসাধারণ বিদ্বান এবং প্রায় সব বৌদ্ধিক জ্ঞান তিনি আহরণ করেন। বলা হয় তিনি কোনও তীর্থজর (আলাপে আসা ব্যক্তি) সঙ্গে তর্কে বসার আগে মঞ্জুশ্রীর ছবি/মুর্তি (ইমেজ) তে বলি (স্যাক্রিফাইস) চড়াতেন এবং দেবীর প্রতি মন্ত্রে আত্মনিবেদন করতেন। এই উপাসনার ফলে তীর্থজ যে ধরণের প্রশ্ন করার কথা ভাবত সে সব প্রশ্ন তিনি আগেই জেনে যেতেন।
ইতিহাসে দুজন প্রজ্ঞাকর ছিলেন, দুজনেই প্রখ্যাত। একজন প্রজ্ঞাকরমতি, অন্যজন প্রজ্ঞাকরগুপ্ত। এরা দুজন আদৌ আলাদা আম্নুষ কী না সে বিষয়ে ইতিহাসচর্চকদের মধ্যে ধন্ধ রয়েছে। লামা তারানাথ জানাচ্ছেন এরা দুজন আলাদা আলাদা ব্যক্তিত্ব। প্রজ্ঞাকরমতি ছিলেন ভিক্ষাজীবি, কিন্তু প্রজ্ঞাকরগুপ্ত ছিলেন শুধুই উপাসক। তাদের আবির্ভাবের সময়ও আলাদা। প্রজ্ঞাকরগুপ্ত মহাপালের (মৃত্যু ৯৪০) সময়ে বর্তমান ছিলেন, কিন্তু প্রজ্ঞাকরমতি রাজা চনকের (৯৫৫-৯৮৩) সময়ের পণ্ডিত।
মনে হয় তিব্বতি বৌদ্ধতন্ত্রে প্রজ্ঞাকরমতির তাত্ত্বিক দার্শনিক ভাবনা এবং অবস্থান খুব বেশি প্রভাব ফেলেনি। তিব্বতি ত্রিপিটকে প্রজ্ঞাকরমতির মাত্র দুটো বইয়ের উলেখ পাওয়া যাচ্ছে – একটি সুত্র জাতীয় অভিসমঅলঙ্কার ভিত্তিপিণ্ডার্থ আর বোধিচার্যবর্ত পঞ্জিকা। দুটিই সে সময়ে বিখ্যাত পুস্তক এবং মহাপণ্ডিত সুমতি কীর্তি এই দুটি বই তিব্বতিতে অনুবাদ করেন।
তিব্বতে প্রজ্ঞাকরমতিকে ডাকা হয় ces-ral hbyun-gnas blogros হিসেবে। তাঁর উপাধি ছিল শ্রী মহাপণ্ডিত। তাঁর অপর নামটি হল অপরদভর্কপতাপ। এই সূত্র ধরে এম পি কর্ডিয়েরের মত পশ্চিমি বিশেষজ্ঞ বলছেন তিনি বিক্রমশীলা বিহারের পশ্চিম দরজার দ্বারপাল ছিলেন। কিন্তু লামা তারানাথ স্পষ্ট বলছেন তিনি দক্ষিণের দরজার দ্বারপাল ছিলেন। এই বিতর্কে আমরা লামা তারানাথের অনুগামী হব।
আচার্য রত্নাকর শান্তি (Ācārya ratnākara śānti)
বৌদ্ধ ধর্ম কাঠামোয় রত্নাকর শান্তি বিপুল প্রভাব ফেলেছেন। তাঁর বই অনুদিত হয়ে তিব্বতি বৌদ্ধদের কাছে পৌঁছয়। তিনি প্রজ্ঞাকরমতির সময়ের পণ্ডিত এবং বিহারের পূর্ব দ্বারপাল ছিলেন। রত্নাকর শান্তির তিব্বতে নাম আচার্য শান্তি বা শান্তি-পা। প্রথম দিকে তিনি ওদন্তপুরী বিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেখানকার সর্বস্তিবাদপন্থ (স্কুল) থেকে তিনি স্নাতক হন। পরের দিকে তিনি বিক্রমশীলা বিহারে যোগ দেন এবং রত্নাকরকীর্তি এবং আচার্য জেতারির কাছে তন্ত্র এবং সূত্র বিদ্যায় পারদর্শী হন।
কখন রত্নাকরশান্তির নাম সীমান্ত ছাড়িয়ে তিব্বতে ছড়িয়ে পড়ল? রাজা চনকের (৯৫৫-৯৮৩) সময় তিনি বিক্রমশীলার দ্বারপাল ছিলেন। জেতারি রাজা মহাপালের সমসাময়িক, যিনি ৯৪০ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেন। তিব্বতি সূত্রে পাচ্ছি মহাপালের পর সামু পাল (৯৪০-৯৫২), তাঁর পরে শ্রেষ্ঠ পাল বা পরিষ্ঠ পাল (৯৫২-৯৫৫) রাজত্ব করেন। এরপরে চনকের আবির্ভাব। আমরা জানি রত্নাকর শান্তি আচার্য জেতারির ছাত্র ছিলেন। আমরা ধরেই নিতে পারি ৯৪০ সালে তিনি সদ্য যুবক। ধরেই যদি নিই তাঁর বয়স তখন ২৫ বছর –তাঁর জন্ম হয় ৯১৫ নাগাদ। অঙ্কের হিসেবে তাঁর কর্মক্ষম থাকার সময় ধরা যেতে পারে ৯৮৩ পর্যন্ত।
রত্নাকর শান্তির উপাধি ছিল মহা পণ্ডিত। কখোনো তাঁকে বলা হত মহাচার্য বা শুধুই আচার্য। তিব্বতিরা পরম শ্রদ্ধায় তাঁর নাম দিয়েছে rin-chen hlyun-gnas shi-pa। তাঁকে শ্রীলঙ্কার রাজা ধর্ম প্রচারে আমন্ত্রণ জানান। তিনি সেখানে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারে গমন করেন। তিনি তিব্বতে গিয়েছেন কি না সে সংবাদ জানা যায় না কিন্তু তিব্বতি বৌদ্ধরা তাঁর লেখা আদর করে অনুবাদ করে নিজেদের দেশে নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর প্রমান আছে। তিনি সংস্কৃততে ১৩টি বই লেখেন স্বসম-নাম-টিকা, শ্রী-হেবজ্র পঞ্জিকা মুক্তিকাবলী নাম, ভ্রম-হর-নাম-সাধনা, পিণ্ডি-কর্তা-সাধনোপায়িকা বৃত্তি-রত্নাবলী-নাম, কুসুমাঞ্জলি-নাম গুহ্য-সমাজ-নিবন্ধ, আগের বইটার ক্রমলেখ, শ্রী-গুহ্য-সমাজ-মণ্ডল-বিধি-টিকা, শ্রী-কৃষ্ণ-যমরী-মহা-তন্ত্র রাজপঞ্জিকা রত্ন-প্রদীপ নাম, কৃষ্ণ-যমরী-সাধন-প্রফুল্ল-কুমুস-নাম।
জ্ঞান শ্রী মিত্র (Jñāna śrī mitra)
বিক্রমশীলার আরেক দ্বারপাল মহাপণ্ডিতের নাম জ্ঞান শ্রী মিত্র। লামা তারানাথ বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাসে তাঁকে নিয়ে লিখেছেন। দ্বিতীয় কেন্দ্রিয় দরজায় তিনি দ্বারপাল ছিলেন। তিনি গাণ্ডা থেকে আগত। শরৎ চন্দ্র বিদ্যাভূষণের দাবি জ্ঞান শ্রী আর জ্ঞান শ্রী মিত্র একই ব্যক্তি। তাঁর আরও ধারণা জ্ঞান শ্রী মিত্র আদতে জ্ঞানশ্রী ভদ্র, যিনি কাশ্মীরে বিখ্যাত হয়েছিলেন।
জ্ঞান শ্রী মিত্র বুদ্ধ ধর্মের শ্রাবক পন্থের অনুগামী ছিলেন, পরে তিনি পন্থ পরিবর্তন করে মহাযানী হন। তিনি রত্নবজ্র, রত্নাকর শান্তি এবং অন্যন্য দ্বারপালের সমসাময়িক ছিলেন। বৌদ্ধ সংস্কারক দীপঙ্কর অতীশের কম বয়সে তাকে বেড়ে উঠতে সাহায্য করেন। ফলে মনে হয় তিনি দশম শতের দ্বিতীয়ার্ধে বিখ্যাত হন।
তিব্বতে জ্ঞান শ্রী মিত্রের নাম yeces dpal bces-gnen। তিনি তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারে উৎসাহী ছিলেন বলে স্বউতসাহে তিব্বতী ভাষা শিখে নিজের লেখা প্রমান-বিনিশ্চয়-টিকা অনুবাদ করেন। এর থেকে বুঝতে পারি তিনি তিব্বতে বৌদ্ধ সাহিত্য অনুবাদ করে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পেশ করেছেন।
তিনি সংস্কৃত ভাষায় আরও কিছু বই লেখেন, তাঁর মধ্যে প্রধানগুলো হল প্রমান-বিনিশ্চয়-টিকা, কার্য-করণ-বাক-সিদ্ধি, তর্ক-ভাষা, ব্রত-মালা-স্তুতি অন্যতম। প্রথম তিনটে বই যুক্তিবিদ্যার ওপরে লিখিত। এছাড়াও আরও একটি বই সহজ-মন্ডল-ত্র্যলোক-সজ্ঞান-নাম মহাপণ্ডিত জ্ঞান শ্রীর নামে লিখিত পাওয়া যায়। ওপরের সব কটি বই নানান তিব্বতি পণ্ডিত দ্বারা অনুদিত হয়েছিল।
রত্ন বজ্র (Ratna bajra)
উপাধ্যায় রত্ন বজ্র বিক্রমশীলার আরেকজন প্রবাদপ্রতীম দ্বারপাল। তিনি প্রজ্ঞাকরমতি, রত্নাকর শান্তি অন্যান্যদের সমসাময়িক। লামা তারানাথ বলেছেন রত্ন বজ্র বিক্রমশীলা বিহারের মাঝের দরজার দ্বারপাল ছিলেন। তাঁর জন্ম কাশ্মীরের এক ব্রাহ্মণ পরিবারে। কাশ্মীরে মহেশ্বর নামে একজন ব্রাহ্মণ দৈববাণী করেন যে এই পরিবার বহু বিখ্যাত মানুষ জন্ম দেবে। সেই পরিবারের এক বিখ্যাত ব্যক্তির নাম ছিল হরিভদ্র। তিনি কাশ্মীরের বিখ্যাত পণ্ডিতরূপে পরিগণিত হতেন। তাঁর পুত্র রত্ন বজ্র ভিক্ষু হয়ে প্রখ্যাত হন। হরিভদ্র তাঁর পরিবারকে বৌদ্ধ ধর্মে পরিবর্তিত করেন। ফলে রত্ন বজ্র ছোটবেলা থেকেই বৌদ্ধ সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে বেড়ে উঠছিলেন। যৌবনেই তিনি উপাসক হন। ছত্রিশ বছর পর্যন্ত তিনি জন্মস্থান কাশ্মীরে কাটিয়ে শুধু যে বৌদ্ধ সূত্র বা সাহিত্য অধ্যয়ন করেন তাই নয়, তিনি সমস্ত বৌদ্ধ বিজ্ঞানও আত্মীকরণ করেন। এরপর তিনি মগধে আসেন এবং পুণ্য বজ্রাসনএ (বৌদ্ধ গয়া) গিয়ে প্রচুর বৌদ্ধ দেব দেবী সক্র-সম্ভার, বজ্রবর্তী ইত্যদি দর্শন করেন। তথাগতর কৃপায় অতি অল্প সময়ে তিনি বাকি বৌদ্ধ শাস্ত্রে সুপণ্ডিত হয়ে ওঠেন। আরও পাঠ নিতে তিনি বিক্রমশীলা বিহারে ছাত্র হিসেবে যোগ দেন। পাঠ শেষ হওয়ার পরে স্বয়ং রাজার হাত থেকে তিনি পণ্ডিতির স্নাতকপত্রটি গ্রহণ করেন। তারপরেই দ্রুত সময়ের মধ্যে চনকের রাজত্বে তিনি বিক্রমশীলা মঠের মাঝের দরজার দ্বারপাল নিযুক্ত হন।
রত্ন বজ্র বৌদ্ধ ধর্মের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রবক্তা। বেশ কিছুকাল সুনামের সঙ্গে দ্বারপালের কাজ নির্বাহ করার পরে স্বভূমি কাশ্মীরে ফিরে যান। কাশ্মীর থেকে তিনি উড্ডয়ন, তিব্বত দেশে যান, সেখান থেকে তিনি বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারে গিয়ে নিজের জীবন কাটিয়ে দেন। তিব্বতে তিনি তিব্বতি ভাষা শিখে বহু বৌদ্ধ গ্রন্থ অনুবাদ করেন। তাঁর বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি প্রগাঢ বিশ্বাস থেকে তিব্বতে তিনি পরিচিত হন আচার্য রত্ন বজ্র হিসেবে। তাঁর উপাধি ছিল মহাপণ্ডিত। তিব্বতিতে তাঁর নাম হয় কাশ্মীরের সিদ্ধাচার্য রিন-চেন রদ-রজে।
সংস্কৃততে ১৪টি বই পাওয়া গিয়েছে — শ্রী-হেরুক-সাধন-নাম, শ্রী-চক্র-সম্বর-মণ্ডল-মঙ্গল-গাথা, শ্রী-চক্র-সম্বর-স্তোত্র, বালি-কর্ম-নাম, শ্রী-হেবজ্র-স্তোত্র, মহা-মায়া-সাধনা, শ্রী-সর্ব-বুদ্ধ-সমযোগ-দাকিনী-জালা-সম্বর-মহা-তন্ত্র-রাজা-নাম-মণ্ডলোপায়িকা সর্ব-সত্ত্ব-সুখদয়া-নাম, শ্রী-অক্ষোভ্য-বজ্র-সাধনা, শ্রী-চক্র-সম্ভর-মণ্ডল-দেব-গণ-স্তোত্র-নাম, মন্ত্র-রাজা-সমায়া-সিদ্ধি-সাধনা-নাম, শ্রী-চক্র-সম্ভরদ্বয়-ভীর-সাধনা, আর্য-জম্ভল-স্তোত্র-নাম, মহা-সেনাপতি-চতুর্মুখ-স্তোত্র শ্লোক-বিমস্ক নাম, মেঘলোক-গণপতি-সাধনা নাম।
তিব্বতি অনুবাদক হিসেবে তিনি তিব্বতে উপাধ্যায় রত্ন বজ্র নামে খ্যাত ছিলেন। তিব্বতিতে তাঁর চারটি অনুবাদ বই পাওয়া গিয়েছে — গুহ্য-বজ্র-তন্ত্র-রাজা-বৃত্তি, গীতি-তত্ত্ব-নাম, অভসময়-কর্ম-মালা এবং শ্রী-আনন্দ-পুষ্প-মালা। (চলবে)