জোড়াপাতা (এনেক্সার)
শরৎচন্দ্র দাসের ইন্ডিয়ান পণ্ডিতস ইন দ্য ল্যান্ড অব স্নো
তাশিলুনপো মহাবিদ্যালয়
তাশিলাম্পোয় উচ্চতর পাঠকে বলা হত লবরঙ্গ লোবতা। এটি ভিক্ষু এবং সাধারণের জন্যে উন্মুক্ত ছিল। এখানে অধার্মিক সাহিত্য, অঙ্ক এবং অন্যান্য পাঠ শেখানো হত। যুবা ভিক্ষু, যারা সরকারি আমলাতন্ত্রের পুরোহিত ইত্যাদি নানান পদে যোগদানের পরিকল্পনা করত, তাদের জন্যে এই বিদ্যালয়টা খলা হয়েছিল। তবে সব শিক্ষার্থীর প্রবেশাধিকার ছিল না। লিখন এবং পড়ায় যাদের কিছুটা অভিজ্ঞতা হয়েছে, তাদের জন্যে এই পাঠ্যক্রম উন্মুক্ত ছিল। এটাকে বিদ্যালয় না বলে মহাবিদ্যালয় বলতেও পারি। অন্যভাবে বললে এটা শুধুই দিনের পড়াশোনার জন্যে বিদ্যালয়। শুরু হত প্রাতঃভোজের পরে সকাল ৮টা থেকে চলত বিকেল ৪টে অবদি। দিনে দুবার সরকারি খরচে চা-সুপ এবং বার্লির আটা (রুটি) দেওয়া হত। এর কোনও বেতন কাঠামো ছিল না। শিক্ষক জেরগানদের (Gergans) রাষ্ট্র বেতন দিত। দুজন শিক্ষক ছিলেন – তাদের পদের নাম জেরগান চেংপো, বরিষ্ঠ শিক্ষক এবং জেরগান চুয়াং-ওয়া বা অধস্তন শিক্ষক। প্রধান লামার প্রধান মন্ত্রী কায়াব-ইয়িং চেন-পো এই বিদ্যালয়টা তার সচিব তুং-ইয়িং চেন-পোর পরিচালনায় দেখাশোনা করেন। তুং-ইয়িং, জারগান নিযুক্ত করেন তাঁর অধীনে কাজ করা সে-রুং বা দ্রুং খোরস নামক অধস্তনদের থেকে কিছু অতিরিক্ত ভাতার বিনিময়ে।

এই বিদ্যালয়ে উপযুক্ত হওয়ার জন্যে বয়সের বাধা ছিল না। অদক্ষ আমলাদের এখানে জেরগানদের অধীনে পড়তে পাঠানো হত। আশেপাশের অঞ্চলের ব্যবসায়ী আর মধ্যবিত্তদের ছানাপোনারা এখানে পড়তে আসত। মহিলাদের মঠে প্রবেশের অনুমতি ছিল না। যুবতীদের লোবতায় প্রবেশের অধিকার ছিল না। এখানে পাঠ্যক্রম শেষ করে যারা আমলা হতে চাইত, তারা কিছু দিনের জন্যে সরকারি চাকরিতে ঢুকত, সেখানে ব্যর্থ হলে তাদের বিপুল মাইনের বিনিময়ে জেরগানদের কাছে আবার পড়াতে পাঠানো হত। অর্থ ছাড়ের জন্যে সচিবের কাছে দরখাস্ত করতে হত। রবিবার আবশ্যিক ছুটি ছিল না। ছ’দিনের পড়াশোনার পর সপ্তম দিন ছুটি হিসেবে চিহ্নিত হত। ছদিনের পড়া শেষের পরে সপ্তম দিনে শিক্ষার্থীরা চায়ান-শিং বা লেখার খাতায় (স্লেট) একটি বাক্য লিখে দুপুরের খাবার খেতে যেত। এই স্লেটগুলি স্কুলের সঙ্গে যুক্ত নন এমন একজন শে-রুং পরীক্ষা করতেন। তিনি এই স্লেটগুলি মেধা আকারে সাজাতেন। জেরগান পরীক্ষকের মন্তব্য পড়তেন। এই পরীক্ষা অনুসারে তাদের শ্রেণী কক্ষের বসার অবস্থান ঠিক হত। জেরগান একটা ছুরির আকারের বাঁশের দণ্ড নিয়ে প্রথম হওয়া ছেলেটির গালে হাল্কা করে মেরে বলতেন, Though you are first in order yet your writing has not been very good. Further improvement is necessary। তিনি এই দণ্ডটি প্রত্যেক বালকের গালে ঠেকাতে বলতেন। সে এবারে দ্বিতীয়স্থানাধিকারীকে এটা দিয়ে প্রথম দুজন ছাড়া ছাড়া প্রত্যেক ছাত্রের গালে এটি ঠেকাতে বলত। এই প্রক্রিয়াটা তাদের হাতের লেখার মান উন্নত করার জন্যে সপ্তাহে একবার আয়োজন করা হত। এটা এক ধরণের শাস্তি প্রক্রিয়া। তবে সরকারি বিদ্যালয় বছরে চার মাস চলত। সেখানে মাসে একবার আয়োজন করা হত।
শিগা-সে শহরে থোম বা শহরের কাছে ছাগলো খাংসারে একটি বড় লোবতা ছিল। এখানে জেরগান এবং তাঁর সঙ্গের গাংডাং ত্রিশ-চল্লিশজন ছাত্র নিয়ে বিদ্যালয় চালাতেন। শরৎচন্দ্র যে সময়ের কথা বলছেন ১৮৮০-৯০-এর দশকের জেরগান ছিলেন শাহগ-শেরিং। তিনি ১৮৭৮ থেকে বিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং কঠোর নিয়মানুবর্তিতা মেনে চলতেন। এটি শহরের অলস ভবঘুরেদের সংস্কার কেন্দ্র ছিল। যে সব জেরগান তাদের বিদ্যালয়ে যে সব ছাত্রকে ঠ্যাঙ্গাতে পারতেন না, তাদেরকে তিনি সেই লোবতায় পাঠাতেন। সকাল সাতটা থেকে বিদ্যালয় খুলে বিকেল চারটেয় বন্ধ হত। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে দুই টঙ্কা নিতেন। সফল ছাত্ররা তাকে চা খাওয়াত। গুং-শ্যাংদিনে বন্ধুকে তিনি খাতা পরীক্ষা করাতেন। অকৃতকার্য ছাত্রদের বাঁশের দন্ড দিয়ে পিটিয়ে গালে দাগ করে দিতেন। এবং সে দাগ প্রকাশ্যে দেখা যেত, পাবলিক বুঝত শিক্ষার্থীটি শং-শেরিংএর লোবতার শিক্ষার্থী।

ব্যক্তিগতভাবে চালানো বেশ কিছু লোবতায় মেয়েরা পড়ত। তারা ১০ বছর হওয়ার পূর্বের ভর্তি হত। ধনীদের মেয়েরা চৌদ্দ বছর অবদি পড়ত।
বইএর তালিকা – যে বইগুলোর নাম প্রবন্ধে উল্লেখ করেছি, সেগুলোর নাম এখানে জুড়লাম না
এই শরৎ দাস কি সেই শরৎ চন্দ্র দাস, যিনি নিজে তিব্বতে গেছিলেন লামা জোরগেন গ্যাৎসোর সঙ্গে – তাশিলুম্ফো মঠে পাঞ্চেন লামার সাথে দেখা করতে?