জোড়াপাতা (এনেক্সার)
শরৎচন্দ্র দাসের ইন্ডিয়ান পণ্ডিতস ইন দ্য ল্যান্ড অব স্নো
তাশিলুনপো মহাবিদ্যালয়
প্রাচীন ভারতের নালন্দার মহাবিদ্যালয়ের মত তাশিলুনপো বিদ্যালয় ছিল তিব্বতের প্রখ্যাততম শিক্ষাকেন্দ্র। বিশেষ করে মঙ্গোলিয়া, সাইবেরিয়া এবং উত্তর চিন যাকে আজ আমরা উত্তরের বৌদ্ধ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত কররি, সেই সব অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্যে তাশিলুনপো ছিল চাঁদের হাট। উচ্চতর এশিয় (হায়ার এশিয়) অঞ্চল জুড়ে বৌদ্ধ ধর্মকেন্দ্রগুলিতে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিপুল চাহিদা ছিল। সেরা, দুপঙ্গ, উপ্রদেশের গাহাদান, আমদোর তাসি গোমাং, খানের রেভত-সে এবং মঙ্গোলিয়ার তাহ খুরেশের বৌদ্ধ বিদ্যালয়গুলি তাশিলুনপো বিদ্যালয়ের মানের তুলনীয় ছিল না। তাশিলুনপো মহাবিদ্যালয়ের ভর্তির প্রক্রিয়া খুবই কড়া ছিল।
ভর্তির প্রক্রিয়া
প্রখ্যাত পরিবারের ছয় থেকে বারো বছরের শিক্ষার্থীদের ভর্তির জন্যে নেওয়া হত। যে শিক্ষিক এদের ভর্তি করাতেন এবং দেখাশোনা করতেন তাকে বলা হত জারগান (মহান উচ্চতর)। তিনি সেই মহাবিহারে থাকতেন। তার নির্দেশে ছাত্রটি বই পড়তে শিখত। খাওয়াদাওয়া শোয়া ঘুমোনো ইত্যাদি সব কিছু নিত্যনৈমিত্তিক কাজেই জারগান ছাত্রদের সঙ্গেই থাকতেন। প্রত্যেক মাসের শেষে গুরুজনেরা শিক্ষার্থীদের দেখতে আসতেন। দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে শিক্ষার্থীটি বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থগুলির বইগুলির ১২৫টি পাতা পড়া মোটামুটি শেষ হলে ধরে নেওয়া হত প্রাথমিক পড়া শেষ হয়েছে। পড়াশোনা অগ্রগতি হয়েছে ধরে নিলে, জারগান তার নাম গেকোই চেনপোকে (মঠ নির্দেশেক) পাঠিয়ে দিতেন উচ্চতর পাঠ্যক্রমে নাম অন্তর্ভূক্তি করারনোর জন্যে। প্রত্যেক জারগানের পাঠানো নাম যদি একই পাঠ্য বছরে আসত, তাহলে তাদের ফেব্রুয়ারির সম্বতসরিক উপাসনা পর্বের পরে চতুর্থ দিনে একইসঙ্গে মোনলাম চেনপো নামক মঠের উপাসনা গৃহে জড়ো করানো হত। প্রধান লামা এবং প্রধানমন্ত্রীর সহকারী নোয়োনের প্রতিনধি হিসেবে, গেকোই চেনপো, জারগানদের অধীনে থাকা ভর্তি হতে ইচ্ছুক ছাত্রদের উপস্থিত হতে নির্দেশ দেয়। জারগানদের সক্কলে এই প্রশ্নটা করে, – এই বালকটা চুরি করেছিল, না কি বিষবত ওষুধ মঠের পুকুরে ফেলেছিল? সে কি পাহাড়ের ওপর থেকে পাথর গড়িয়ে ফেলে পশুহত্যা করে ছিল? সে কী তার বাবা বা মাকে হত্যা করে নি? তার পরিবারের সম্বন্ধে বল। সে কী নিচু জাতির, কামার না কী কসাই পরিবার থেকে আসা? সে কি শিগা-সে (তাশি-লুনপো মহাবিদ্যালয় সরাসরি তাশিলামার অধীনে ছিল, যারত নাম পান-ছেন রিন পোচে (পান পণ্ডিত, প্রধান-চেন, পিনপোচে, মহারত্ন)। এই মহাবিদ্যালয়ের দরজাটা একমাত্র সম্মানিত ব্যক্তিদের জন্যে খোলা থাকত, ব্যতিক্রম ছিল শিগা-সে এবং আশেপাশের কিছু গ্রাম, কারন সেগুলির অধিবাসীরা বৌদ্ধধর্ম এবং মঠ শাসনের বিরোধী ছিল) বা দেং-লেগ, তাশি জ্ঞান-সে, নামরাল ইত্যাদি থেকে এসেছে? এর উত্তরে যদি জারগানেরা যদি না বলত, বা বলত এরকম কিছুই হয় নি, তাহলে পঞ্জীকারক তাকে একটি কাগজে স্বাক্ষর করতে বলত। এরমধ্যে বাচ্চারা অধীত ১২৫টি পাতা থেকে তাদের শিক্ষা মুখস্থ উচ্চারণ করে যেত। পড়ুয়ারা যদি পঞ্জীকারককে খুশি করতে পারত, তাহলে তাদের নাম পরবর্তী শ্রেণীর জন্যে বিবেচিত হত। তার মাথা পুরোপুরি কামিয়ে ফেলা হত, শুধু থাকত একটি ছোট্ট শিখা/টিকি। সে যদি ব্যর্থ হত, তাহলে তাকে মঠ থেকে দূর করে দেওয়া হত এবং শিক্ষককে ১০ ঘা চাবুকা মারা হত এবং তিন দিনের মধ্যে মঠকে ৪০ পাউন্ডের ঘি/মাখন দেওয়ার জন্যে বাধ্য থাকত। জারগান যদি সম্মানিত বা খান-পো হতেন, তাহলে তিনি তার অধীনে থাকা কোনও সাধারণ ভিক্ষুকে বাচ্চাটির সঙ্গে পাঠাতেন তার প্রতিনিধি হিসেবে এই ধরণের দণ্ড ভোগার জন্যে।

ভর্তির দিন থেকে এই শিশুটিকে থাপা (tapa) বা শিক্ষানবিশ ভিক্ষু হিসেবে গণ্য করা হত এবং তাদের নির্দিষ্ট বরাদ্দ দেওয়া হত। যতক্ষণনা তারা গে-তসুল শপথ না নিচ্ছে, ততক্ষণ তাকে অন্যান্য ভিক্ষুদের কেন্দ্রিয় সম্মেলন গৃহে অনুষ্ঠিত কোনও রকম সম্মেলক অনুষ্ঠানেই যোগ দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হত না। সে সময় তার সঙ্গে এই শ্রেণীতে যোগ দেওয়া অন্যান্য শিক্ষানবিশ বন্ধুরা শের-চান লা-কাং গৃহে একযোগে মাত্র বসতে পারত। প্রধান লামার মনতুষ্টি ঘটলে তিনি শিক্ষানবিশদের ডেকে প্রথম ভাষণ দেবেন এবং কেশকর্তন করাবেন। তাছাড়া তাদের মঠের নির্দিষ্ট বসন পরতে হত। তাতে থাকত দেহের ওপরের এবং নিচের অংশের বসন, মঠে ব্যবহৃত ধরণের একটি অন্তর্বাস আর একটি চাদর। এই বসন পরে নতুন ভিক্ষুরা প্রধান লামার সামনে উপস্থিত হত। প্রধান লামার হাতে থাকত একটি মস্তক মুণ্ডনের যন্ত্র (কাঁচি বলা হয়েছে)। তিনি প্রত্যেক বালককে পারিবারিক নাম ধরে ডেকে ‘তুমি কি আনন্দ সহকারে মস্তক মুণ্ডন করতে চাও?’ জিজ্ঞাসা করতেন, আবশ্যিক উত্তর আসত ‘অবশ্যই মহামহিম, আমি অসম্ভব খুশি হয়েই কাজটা করব’। প্রধান লামা তখন মাথায় থাকা টিকিটা কটে দেবেন এবং প্রত্যেককে নতুন নাম দেবেন, যে নামে এরপর থেকে বালকটিকে ডাকা হবে… এই অনুষ্ঠানেই যে সব বালক উচ্চশ্রেণী থেকে এসত, তাদের প্রধান লামা আভিজাত্যিক উপাধিতে ভূষিত করতেন। যারা প্রাচীন অভিজাত পরিবার, এবং যারা প্রাচীন তিব্বতি তান্ত্রিক লামাবাদী নগাগ-শাং (Ngag-tshang) পরিবার থেকে আসত তাদের দেওয়া হত শাব-ডুং (Shab-dung) উপাধি। জমিদার, উচ্চপদের আমলাপুত্রদের জে-ডুং (Je-dung), এবং যারা ভদ্রস্থ এবং শাং-গো (Sha-ngo) বাড়ি থেকে আসত তাদের চৈ-জে (Choi-je) উপাধি দেওয়া হত। উপাধি দেওয়া হয়েগেলে এই শিক্ষার্থীদের তিন দিনের চাল, চা, বিস্কুট, পিঠা এবং বার্লি আটা দেওয়া হত। একটা গোটা দিন ধরে তাদের দীক্ষাদানের জন্যে ধার্মিক উপাসনা আয়োজন করা হত। এই উপাসনার উদ্দেশ্য জীবন রক্ষাকারী আত্মা এবং শিক্ষাদানকারী দেবতাকে পুজো করা। এবারে মিত-সেন-এরা প্রত্যেককে দুআনার ওপরের মূল্যমানের রূপোর মুদ্রা দিত। প্রত্যেক রাত খাবারের সময় প্রত্যেক নতুন শিক্ষার্থী বেশ কিছু পরিশ্রমের কাজ যেমন জল আনা, মেঝে পরিষ্কার করা ইত্যাদি কাজ করতেন। দীক্ষাদানের সময়, যারা গেন-নেন বা উপাসক এবং গে-শুল (Ge-tshul) শিক্ষানবিশ ভিক্ষু উপাধি পেতেন, তাদের এক প্রকার শিরস্ত্রাণওয়ালা লামা আলখাল্লা চাম-সে দাগাম (Cham-tse Dagam) পরিধান করতে দেওয়া হত। তাদের প্রধান লামার সামনে বসে থাকা শিক্ষার্থীদের জমায়েতের এক্কেবারে সামনের সারিতে নিজেদের জীবক আসনের ওপর বসতে হত। প্রধান লামা, অন্তত চারজন দীক্ষা নেওয়া ভিক্ষুর সাহায্যে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে ভিক্ষুর পাত্রে কিছু ঔষধি ফল দিয়ে যেতেন। যারা দীক্ষা নিতেন তাদের প্রত্যেকে প্রত্যেকের হাত পা এবং হাঁটু ছুঁয়ে বসে থাকতে হত। তিনি তখন ভক্তিপূর্বক বলতেন বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি, ধর্মং শরণং গচ্ছামি, সঙ্ঘং শরণম গচ্ছামি। এটি দুবার উচ্চারণ করার পরে প্রধান লামা তাদের দুষ্কর্ম না করতে এবং পঞ্চশীল অনুসরণ করতে নির্দেশ দিতেন। অনুষ্ঠানটা শেষ হলে প্রত্যেকে প্রধান লামার কাছে অগ্রসর হত মঠে যোগদানের অনুমতি নিতে। শরণ নেওয়ার ত্রিশরণমন্ত্র তার সামনে তিনবার উচ্চারণ করলেই তিনি বললেন, এই পবিত্র মঠে যোগদান করার জন্যে তুমি কী তোমার পরিবারের অনুমতি নিয়েছে? তুমি কী পিতামাতাকে হত্যা করেছ ইত্যাদি? উত্তর না হলে তিনি তাকে দুষ্কর্ম না করার নির্দেশ দিতেন এবং তাঁকে জীবিত বুদ্ধ হিসেবে স্বীকার করে নেওয়ার কথা বলতেন এবং আগামী দিনের মহান কর্ম সমাধান করার উদ্দেশ্যে তার নব বাসস্থানকে ব্যবহার করতে বলতেন। এবারে শ্রমনদের (শিক্ষার্থী ভিক্ষু) দীক্ষা পড়ানো হত। এই অনুষ্ঠানের শেষে প্রত্যেক ভিক্ষু প্রধান লামাকে রেশমের ওড়না এবং দশ তিব্বতি মুদ্রা থাঙ্কা দিতেন।

এই অনুষ্ঠানের পর থেকে প্রত্যেককে প্রত্যেক প্রার্থনা অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার অনুমনি দেওয়া হল এবং তিন বছর এদেরকে রিগ-চুং (Rig-chung) বা প্রথামক স্তরের ভিক্ষু হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হল। এর পরের স্তর রিগ-ডিং (Rig- ding) বা মাধ্যমিক পর্ব। পাঁচ বছর কাটানোর পরের ভিক্ষুদের বলা হত গিগ-চেন (Rig-chen), উচ্চস্তরের ভিক্ষু। ফল-চেনপা স্তরে পৌয়ঁছনোর জন্যে তাদের নতুন করে পরীক্ষা দিতে হত। ফল-চেনপাদের মধ্যে যারা মেধাবী তারা কাহ-চান (লাসায় বলত রব-চম্পা) (শরতচন্দ্র একে ডিডি প্রতীম ডিগ্রি বলছেন, মানে কী?)। যারা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হত, তাদের জ্ঞান-সে(Gyan-tse) বৌদ্ধ কলেজে পাঠানো হত। তারা সেখানে ১৮টা শ্রেণীর তাশাংস (Ta-tshangs) পাঠ্য নিয়ে টুং-রাম্পা (Tung-Rampa) বা ধর্মশাস্ত্র স্নাতক উপাধি পেত। কিছু ফল-চেনপা স্নাতক উত্তর তিব্বতের নামরিং মহাবিদ্যালয়ে একই ধরণের উপাধি অর্জনের জন্যে যেত। তবে টুং-রাম্পা উপাধিকে নিকৃষ্ট উপাধি বলে মনে করত তাশিলাম্পো মহাবিদ্যালয়। কিন্তু জ্ঞান-সে থেকে পাওয়া কাহ-চান এবং টুং-রাম্পা উপাধিপ্রাপ্তরা তাশি-লাম্পোর নগাগপা (Ngag-pa) মহাবিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিয়ে লামা হওয়ার সুযোগ পেত। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের মোহান্ত পদ আর খান-পোদের(উত্তম) বিভিন্ন শাখা মঠের প্রধান হওয়ার সুযোগ ঘটত। তাশিলাম্পোর ৫০০টা শাখা মঠ ছিল। এগুলির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণগুলি চ্ছিল উত্তর চিনের ইয়াহোলে (জেহোর), পিকিং-এর হোয়াং-শি এবং ইয়ুং-হো-কুং, তিব্বতের ফুন্টশিলিং, জ্ঞান-শি, নারথাং, ডং-শে ইত্যাদি। (চলবে)