| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

তিব্বতে পূর্বাঞ্চলের বৌদ্ধ শিক্ষকেরা (৫ম পর্ব) : বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ৫৯৯ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ২৬ মার্চ, ২০২২

বিক্রমশীলা মহাবিহারের তিব্বতরত্নরা

আমরা আগেই উল্লেখ করেছি বিক্রমশীলা মহাবিহার স্থাপন এবং পাঠ্যক্রম রচনা করা হয়েছিল মূলত তিব্বতে বৌদ্ধপন্থ প্রচারে যে সব মঠ তৈরি হচ্ছে, সেগুলি পরিচালন, প্রচার পণ্ডিত এবং প্রশাসনিক আমলা তৈরির উদ্দেশ্যে। ফলে মহাবিহারগুলোর মধ্যে তিব্বতে বিক্রমশীলা মহাবিহারের সব থেকে বেশি সংখ্যক ভিক্ষু গিয়েছেন বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যন্য প্রখ্যাত ভিক্ষু ছাড়াও জগৎ বিখ্যাত পণ্ডিতদের মধ্যে ছিলেন দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান, অভয়ঙ্কর গুপ্ত, বিরোচন রক্ষিত প্রমুখ।

আচার্য বুদ্ধ জ্ঞানপাদ

বিক্রমশীলার অন্যতম প্রবীণ অধ্যক্ষ ছিলেন আচার্য বুদ্ধ জ্ঞানপাদ। বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাসে লামা তারানাথ জ্ঞানপাদের বিষয়ে লিখেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় শুরুর দিকের সময়েই রাজা উদ্যোগী হয়ে আচার্য বুদ্ধ জ্ঞানপাদকে মঠ প্রধান হিসেবে যুক্ত করান। ধর্মপালের সময়ে যে অঞ্চলে বিক্রমশীলা বিহার স্থাপিত ছিল, তার বিশদ বিবরণ তারানাথ দিয়েছেন, সে বর্ণনা আলোচনা আমরা আগেই করেছি। তিনি বিহারেরও বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন। তারানাথ সূত্রে জানতে পারি বিক্রমশীলা বিহারকে আদর্শ বিহার হিসেবে তৈরি করতে বিহার স্থপয়িতা তার স্থাপত্যবিদ্যার সমস্ত জ্ঞান উজাড় করে দিয়েছেন।

তারানাথের ইতিহাস সূত্রে আমরা যে সব ভিক্ষুর কথা এই পর্বে আলোচনা করব তাঁরা রাজা ধর্মপাল এবং তিব্বতি রাজা খ্রি স্রোন ইদে বতসনের সময় জীবিত ছিলেন। এই সময়ে যে সব পণ্ডিত ক্রিয়াশীল ছিলেন তাদেরও নাম পাচ্ছি যেমন কালিজ্ঞ গুপ্ত, সীমাভদ্র, কোবাভুজ, সাগর মেঘ, প্রভাকর, পূর্ণবর্ধন, বুদ্ধ জ্ঞানপাদ, বুদ্ধ গুহ্য, বুদ্ধ শান্তি, কাশ্মীরের আচার্য পদ্মকরঘোষ, ধর্মকর দত্ত এবং সিংহমুখ।

বোঝা যাচ্ছে আমরা বিহারের যে সব প্রখ্যাত আচার্য ভিক্ষুর কথা পাচ্ছি,  সেখানে আমাদের আলোচ্য আচার্যও রয়েছেন। অর্থাৎ আচার্য পদ গ্রহণের আগে তিনি সেই সময়ের অন্যতম প্রধান জ্ঞানী রূপে প্রখ্যাত হয়ে গিয়েছেন। তিনি আচার্য সিংহভদ্রর সাক্ষাৎ শিষ্য। গুরুর মৃত্যুর পর আচার্য বুদ্ধ জ্ঞানপাদ, যতদূর সম্ভব রাজার রাজগুরুর পদ অলঙ্কৃত করেন। তিনি বিহারের পুরোহিতদের অভিষেকের মন্ত্র পড়ার দায়িত্ব পান। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়েরই বজ্রাচার্যযানে অংশীদার হন। শুরুর সময় থেকেই বিহার মন্ত্র-বজ্রযানের অংশ হয় এবং বজ্রযানের অন্যতম বাক রূপে তিনি পরিগণিত হন।

আটের শতকে আচার্যের প্রতিভার পূর্ণ বিকশিত হয়। তিনি মূলত তান্ত্রিক ছিলেন। বহু তন্ত্র পুস্তক লেখেন। তিব্বতী ত্রিপিটকের পঞ্জিকায় (ক্যাটালগ) আমরা দেখতে পাচ্ছি তিনি ন’টা বই লিখেছেন (সেগুলি বহু জ্ঞানীর উৎসাহে অনুদিত হয়) — মুখাগম, সামন্তি-সাদ্র-নাম-সাধনা, শ্রী হেরুক সাধনা, আত্মসাধনাব্রত নাম, ভট্টরাকার্য-জম্ভল-জলেন্দ্র-সাধনা, গুহ্য-জম্ভল-সাধনা, বিস্তার-জম্ভল-সাধনা, গতি-ব্যুহ, এবং সামন্ত-ভদ্রার্থ-সংগ্রহ। আরও তিনটে বই বুদ্ধ শ্রী জ্ঞানপাদের নামে লিখত হয়েছে – দ্বিকর্ম-তত্ত্ব-ভাবনা নাম অমুখধ্যায় পান, চতুরঙ্গ-সাধানপাকিয়া-সামন্তভদ্র নাম, এবং মুক্তি তিলক নাম – দৃঢ ধারণা সেগুলি বুদ্ধ জ্ঞানপাদেরই রচনা।

দুঃখের এগুলির সংস্কৃত সংস্করণ হারিয়ে গিয়েছে শুধু রয়ে গিয়েছে তব্বতি সংস্করনটি। আমরা জানি না যে তিনি তিব্বতে গিয়েছিলেন কি না।

এখানে আমরা তাঁর জীবনী আলোচনা করলাম কারণ তিনি বিক্রমশীলা বিহারে আগামী দিনে তৈরি হতে চলা আচার্যদের ভিত্তিপ্রস্তর তৈরি করে গিয়েছেন।

বিরোচন রক্ষিত

বিরোচন রক্ষিত বিক্রমশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান শিক্ষক ভিক্ষু ছিলেন। তিনি বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারে তিব্বতে যান। তাঁর জীবন তথ্য সম্বন্ধে আমরা কিছুই প্রায় জানতে পারি না। তিব্বতি বৌদ্ধ সাহিত্যে তার নাম উল্লিখিত হয়েছে দপল-রনম-পর স্যান-মসদ-স্রুন-বা (শ্রী বিরোচন রক্ষিত)। তাঁর দুটি উপাধি ছিল মহাপণ্ডিত এবং মহাচার্য। তিনি তিব্বতি ভাষায় সুপণ্ডিত ছিলেন এবং নিজের সংস্কৃতে লেখা কাজগুলি তিনি তিব্বতি ভাষায় অনুবাদ করেন। তিনি শ্রী-বজ্র-ভৈরব-সাধনা-বজ্র-প্রকাশ নাম আর শ্রী-বজ্র-ভৈরব-মণ্ডল-বিধি-প্রকাশ-নাম নামক দুটি সংস্কৃত ভাষায় লেখা বইও তিব্বতিতে অনুবাদ করেন।

তাঁর লিখে যাওয়া জীবন তথ্যের মধ্যে একবার উঁকি দিয়ে দেখা আমরা কোন মণিমুক্তো উদ্ধার করতে পারি। একবার মাত্র বিরোচন রক্ষিত নিজের পিতার নাম উল্লেখ করেছেন পা গোরের হি-হাদোদ — যার কোন ভারতীয় প্রতিশব্দ পাওয়া যায় নি। তিনি কোন অঞ্চলের মানুষ তাও আজও কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে। এই সূত্রটি আমাদের জানাচ্ছে যে তিনি গুরু পদ্মসম্ভবের সাক্ষাৎ শিষ্য এবং তিব্বতি রাজা খ্রি স্রোন ইদে বস্তানের সময়কালের মানুষ।

কে এই তিব্বতি রাজা খ্রি স্রোন ইদে বস্তান? রাজা খ্রি স্রোন ইদে বস্তান তিব্বতের প্রখ্যাত রাজা। তিব্বতি ইতিহাস সূত্রে জানতে পারি ৭২৮ খ্রিতে তার জন্ম এবং ৮৬৪ সালে তার জীবনাবসান। ৭৪৯ সালের কাছাকাছি সময়ে তিনি তার রাজসভায় পদ্মসম্ভব এবং শান্ত রক্ষিতের মত প্রখ্যাত পণ্ডিতকে নিয়ে যান। তিনি বৌদ্ধ ধর্মের উতসাহী পালক ছিলেন। তাঁর সময়ে (৭৪৯ খ্রি) মগধের ওদন্তপুর বিহারের অনুসরণে সাম-য়ি নামক তিব্বতি মঠটি তৈরি হয়। পদ্মসম্ভব তিব্বত গমনের আগে নিশ্চই গুরু পদ্মসম্ভবের থেকে যথাযগ্য নির্দেশমালা আহরণ করেছিলেন। যে সময়ে তাঁর গুরু তিব্বতে রওনা হচ্ছেন, তখন বিরোচন রক্ষিতের বয়স কুড়ির আশেপাশে। ফলে আমাদের বুঝতে সুবিধে হয় তার সময় কাল — তিনি যতদূর সম্ভব অষ্টম শতকের দ্বিতীয় পাদেই তার কাজগুলি রচনা করেন।

গুরু পদ্মসম্ভবের তত্ত্বাবধানে শিক্ষা পূর্ণ করার পর তিনি বিক্রমশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদেন। সেখানে তিনি সংস্কৃততে নিজের তাত্ত্বিক রচনাগুলি সন্নিবদ্ধ করেন এবং তার অনেকগুলিও তিব্বতি ভাষায় অনুবাদ করেন।

গুরুর পদাঙ্ক অনুসরণ করে বিরোচন রক্ষিত তিব্বতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দুটি তাত্ত্বিক পুস্তক মন্ত্র-বিবৃত-প্রজ্ঞা-হৃদয়-বৃত্তি এবং রত্ন-বাদ-চক্র রচনা করেন রাজা খ্রি স্রোন ইদে বস্তানকে তার মতবাদ এবং বৌদ্ধ মতবাদ বিস্তার জানানোর জন্য। প্রথম বইটির মূল ভাবটি প্রজ্ঞা-পারমিতা-হৃদয়-সূত্র থেকে সঙ্কলিত। ভোট দেশের রাজাকে বৌদ্ধ ধর্মের তাত্ত্বিক অক্ষদণ্ড বোঝাবার জন্য বইটি রচনা করেন। ফলে এটা পরিষ্কার তিনি রাজা খ্রিএর সময়কালেই তিব্বতে যান।

মহাপণ্ডিত বিরোচন রক্ষিত সংস্কৃত ভাষায় আটটি বই রচনা করেন, যেগুলি বিভিন্ন তিব্বতি পণ্ডিতের হাতে তিব্বতি ভাষায় রূপান্তরিত হয় – রক্ত-যমারি-সাধনা, বোধিসত্ত্ব-চর্যাবতর-পঞ্জিকা, শিক্ষা-কুসুম-মঞ্জরী-নাম, শিষ্য-লিখা-টিপ্পনা, মৌল তন্ত্র বিষয়ে ভাষ্য, মতবাদের মৌলতত্ত্ব, মন্ত্র-বিব্রত-প্রজ্ঞা-হৃদয়-বৃত্তি এবং রত্ন-বাদ-চক্র।

বিরোচন পণ্ডিত নিজে তিব্বতি সংস্কৃতিতে গভীর জ্ঞানী ছিলেন; তাই তিনি বেশ কিছু তান্ত্রিক এবং অন্যন্য পুস্তক নিজের হাতে তিব্বতি ভাষায় অনুবাদ করেন। সেই পুস্তকগুলি হল মহা-গণপতি-ধাতু-ত্রিকর-রক্ত-ভাসি-কর-সাধনা, গণপতি-সময়-গুহ্য-সাধনা-নাম, হেরুক-পঞ্চ-সাধনা-নাম, ফল-জ্ঞানিকা-ভূমি-ধর্ম-ধাতু, পারমিতা-সমস্যা-নাম, বিনয়-সংরহ, শুক্ল-ভদ্র-যোগিনী-সাধনা, কল্প-সপ্তক-সাধনা, মহেশনানস্য-সাধনা, প্রজ্ঞা-পারমিতা-হৃদয়-সাধনা। এই সব পুস্তকের মূল সংস্করণটি আর পাওয়া যায় না, বরং এগুলি আমরা পেয়েছি তিব্বতি সূত্রে।

আমাদের আলোচ্য বিরোচন রক্ষিত আর ন্যায়লোক-সিদ্ধির অনুবাদকার বিরোচন বা কোশোলের বিরোচন বজ্র, যিনি দোহাকোষ তিব্বতিতে অনুবাদ করেন – এরা এক ব্যক্তি নন। প্রত্যেকে আলাদা আলাদা ব্যক্তিত্ব। এদের গুলিয়ে ফেললে ভুল হবে।

জেতারি

বিক্রমশীলা বিহারের স্নাতক ছিলেন আচার্য জেতারি। তাঁর সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পাণ্ডিত। তার পাণ্ডিত্য তিব্বতি বৌদ্ধ ধর্মকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করে। তন্ত্র এবং সূত্র বিষয়ক সমস্ত পুস্তক তিব্বতি ভাষায় অনুদিত হয়। লামা তারানাথের বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাসে তাঁর সম্বন্ধে মোটামুটি বিশদে বলা আছে। আচার্য জেতারি বরেন্দ্র (উত্তরবঙ্গ) ভূমণ্ডলে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম গর্ভপাদ। তিনি পাল রাজত্বের করদ রাজা সনাতনের রাজসভায় ছিলেন। সনাতনের রাজত্বে গভীর পাণ্ডিত্যের জন্যে পাল রাজত্বে ব্রাহ্মণ গর্ভপাদ বিপুল ক্ষমতা এবং সম্পদ অর্জন করেন। সাত বছর বয়সে জেতারিকে বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান (সায়েন্সেস — যদিও প্রাচীন ভারতে বিজ্ঞান মানে ছিল বিশেষ জ্ঞান, শুধুই পশ্চিমি অর্থে প্রকৃতির মৌলসূত্রগুলো বোঝা নামক সায়েন্স নয়) পড়াবার জন্য পাঠান। পাঠশালাতেই জেতারি বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষ করে অভিধর্ম বিষয়ে জ্ঞানী হয়ে ওঠেন। পাঠশালায় পাঠ সাঙ্গ হওয়ার পরে তিনি বৌদ্ধ উপাসক হন এবং পিতার থেকে গুহ্যসমস্যা, সম্বর এবং হেবশ্চর্য শিক্ষা করেন। মহাপাল (৮৯৯-৯৪০) বাংলা উদ্ধার করার যুগে তাঁর পিতার দেহাবসান ঘটে। তিব্বতি ইতিহাস সূত্র অনুযায়ী রাজা মহাপালের রাজত্বের সময় আচার্য জেতারি বিক্রমশীলা বিহারের ছাত্র থেকে স্নাতক হয়ে রাজার হাত থেকে পণ্ডিত উপাধি গ্রহন করেন।

জেতারি দীর্ঘকাল বিক্রমশীলা মহাবিদ্যালয়ে আচার্যের ভূমিকা পালন করেছেন। তার অধীনেই রত্নাকর শান্তি বিক্রমশীলা বিহারে সূত্র ও তন্ত্রের পাঠ অর্জন করেন। ৯৮৩ সনে এই বিহারের দ্বারপাল হিসেবে নিয়োজিত হলেন প্রবাদপ্রতীম রত্নাকর শান্তি। সেই দশকে অর্থাৎ ৯৮০র দশকের কোনও এক সময়ে দীপঙ্কর বা অতীশের জন্ম। প্রথমত তিনি জেতারির ছাত্র। জেতারির অধীনে পাঁচটি বিশেষ জ্ঞান অর্জন করেন। এই সূত্রগুলি ধরে মোটামুটি স্পষ্টভাবে বলা যায়, জেতারি দশম শতের শুরুর দিকে বৌদ্ধিকভাবে বিকশিত হন।

আজ তাঁর নানান পুস্তক তিব্বতি ভাষায় উদ্ধার করা গিয়েছে। সেই সব পুস্তকের মাধ্যমে তিনি তিব্বতি বৌদ্ধ ধর্মকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছেন। এখন আমরা তাঁর ২২টা বই মাত্র উদ্ধার করতে পেরেছি বৌদ্ধ জ্ঞানচর্চার সূত্র ধরে। অথচ তারানাথ ইতিহাস পুস্তকে জানাচ্ছেন জেতারি তন্ত্র এবং সূত্র বিষয়ে একশর বেশি বই রচনা করেছেন। নিজে তিব্বতি ভাষায় বিদ্বান নন বলে হয়ত তাঁর নিজের অনুবাদ করা তিব্বতি পুস্তক খুঁজে পাই নি। তাঁর বইগুলি বৌদ্ধদের এতই প্রভাবিত করেছিল যে, সেগুলি লেখা হওয়া মাত্রই অধিকাংশ তিব্বতি বিদ্বান তিব্বতি ভাষায় অনুবাদ করে ফেলতেন।

তাঁর তন্ত্র বিষয়ে নটা বই পাওয়া গিয়েছে — হেবজ্রস্য-সেকনিশ্চয়-নাম, শ্রী-দশ-ক্রোধ-বিদ্যা-বিধি-নাম, শ্রী-চতুয়া-পিট-তত্ত্ব-চতুষ্ক, নাথকসভ্য-সাধনা, আর্য-লোকেশ্বর-চিন্তামনি-চক্রবর্তী-সাধনা, সীতা-বতী-সাধনা, মহাপ্রাতী-ষোড়শকার-লেখন-বিধি, মায়া-জাল-কর্মভালিকেতশ্বর-সাধনা, চতুর-মুদ্রা-সধনা-নাম।

মনে হয় তন্ত্র বিষয়ক এইসব বইও তাঁর রচনা — প্রতিসর-সাধনা, আর্য-মহা-ময়ূরী-সাধনা, মহা-সহস্র-প্রমর্দানি-সাধনা, আর্য-মহা-মন্ত্রনুদ্ধারিনী-সাধনা, পঞ্চ-রক্ষারচন-বিধি।

সূত্র বিষয়ে তাঁর নামে আটটি বই পাওয়া গিয়েছে — বোধি-চিত্তপদ-সমদান-বিধি, সুতমত-বিভঙ্গ-কারিকা, বোদ্ধপত্তিদেশনা-বৃত্তি-বোধি-সত্ত্ব-শিক্ষা-কর্ম-নাম, হেতু-তত্ত্বপদেশ, ধর্ম-ধার্মী-বিনিশ্চয়, বাল্বতন্ত্র-মাতা-বিভঙ্গ-কারিকা, সুগত-মাতা-বিভঙ্গ-ভাষ্য। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev