রেলের জন্য পৃথক বাজেট প্রধানমন্ত্রী মোদী আগেই তুলে দিয়েছেন। তাই ২০১৬ সাল থেকে কেন্দ্রীয় বাজেটের সঙ্গে রেল বাজেট পেশ প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষের কেন্দ্রীয় বাজেটে সরকার ভারতীয় রেলের জন্য ২.৪০ লক্ষ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের ভাষায় যা ‘অমৃতকালের প্রথম বাজেট’। আসলে তা দ্বিতীয় দফার মোদী সরকারের শেষ বাজেট অথবা ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে শেষ পূর্ণ বাজেট।
রেলের বর্ধিত বরাদ্দ ঘোষণা করেই কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা বলেছেন, ‘‘এর আগে কখনও ভারতীয় রেল এত বরাদ্দ পায়নি।’ ঢক্কানিনাদ শুরু হয়েছে— এই বরাদ্দ কেন্দ্রে মোদী জমানা শুরু হওয়ার আগে রেলের পাওয়া বরাদ্দের ৯ গুণ বলে। কেন্দ্রের বক্তব্য, ২০১৪ সাল পর্যন্ত, ভারতীয় রেলের মূলধনী ব্যয় ছিল বার্ষিক মাত্র ৪৫,৯৮০ কোটি টাকা আর এবার তা প্রায় ৯গুণ বাড়িয়ে বরাদ্দ হল ২ লক্ষ ৪০ হাজার কোটি টাকা।
প্রশ্ন, রেলের বরাদ্দ ব্যয় এতখানি বৃদ্ধি করা হল কেন? খুব স্পষ্ট ভাষায় দ্বিতীয় বারের মোদী সরকারের এটাই শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেট। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে তাঁর সরকার আর পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশের সুযোগ পাবে না। ‘শেষ’ বাজেটে তাই রেলের জন্য বিপুল বরাদ্দ ঘোষণা করেছন অর্থমন্ত্রী, তার সঙ্গে রেল সংক্রান্ত অন্যান্য পরিকল্পনাও প্রচুর। এর মধ্যে নতুন রেলপথ তৈরি, আরও রেলপথের বৈদ্যুতিকরণ, রেলস্টেশন এবং ট্রেনের পরিচ্ছন্নতা, রেলের পরিকাঠামোর উন্নতি, রেল সুরক্ষা ব্যবস্থা, নতুন আরও বন্দে ভারত ট্রেন, বুলেট ট্রেন এবং হাইড্রোজেন জ্বালানিতে ট্রেন চালানোর খাতে অর্থ খরচ করা হবেবলে জানা গিয়েছে।
প্রসঙ্গত, ইতিমধ্যে রেলের বিভিন্ন বিভাগ বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এবারও রেলওয়ে পরিকাঠামো খাতে আরও বেসরকারি বিনিয়োগ টানার প্রস্তাব রয়েছে। এর জন্য, নতুন প্রতিষ্ঠিত ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স সেক্রেটারিয়েট রেল, রাস্তা, শহুরে পরিকাঠামো এবং বিদ্যুৎ-সহ সমস্ত স্টেকহোল্ডারদের সহায়তা করবে, যা মূলত জনসম্পদের উপর নির্ভরশীল। এ বারের বাজেটে নতুন যে সব পরিকল্পনার কথা শোনানো হয় এবং পরবর্তীতে সাংবাদিক সম্মেলনে রেল মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণোই বলেছেন, ‘আগের বছরগুলিতে রেলে ঘাটতি ছিল। তাই এবারের বর্ধিত বরাদ্দ রেলকে সম্ভাবনা বাস্তবায়নে সাহায্য করবে।’
কেন্দ্রের রেল পরিকল্পনাগুলি সামনে রাখার সঙ্গে সঙ্গেই রেল মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণোই ফের বন্দে ভারতের মতো ‘উচ্চাভিলাষী’ প্রকল্পগুলির কথা বিস্তারিত বলতে শুরু করেন। তিনি স্পষ্টই জানান, এখন শুধু চেন্নাইয়ের ইন্টিগ্রাল কোচ ফ্যাক্টরিতে বন্দে ভারত ট্রেক তৈরি হচ্ছে। এরপর থেকে হরিয়ানার সোনেপত, মহারাষ্ট্রের লাটুর ও উত্তর প্রদেশের রায় বেরেলের কোচ ফ্যাক্টরিতেও বন্দে ভারতের মতো ট্রেনের কোচ তৈরি হবে। একই সঙ্গে এবারের বাজেট রাজধানী, দুরন্ত, হামসফর ও তেজাসের মতো প্রিমিয়ার ট্রেনে কোচ বাড়ানোর বিষয়ে জোর দিয়ে বলা হয়েছে। কিন্তু সাধারণ কামরা বা নিচের শ্রেণির কামরা নিয়ে বাজাটে কোনও কথা বলা হয়নি কিংবা সে বিষয়ে রেল মন্ত্রীর মুখেও কোনও কথা শোনা যায়নি।
অন্যদিকে বাংলার রেল-ভাগ্যেও নজিরবিহীন বরাদ্দ। যা রাজ্যের জন্য সর্বকালীন রেকর্ড। কারণ রেল খাতে বাংলা পেল ১১ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা। তবে বরাদ্দ অর্থের প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা অনুমোদিত হয়েছে কলকাতার মেট্রোরেল প্রকল্পগুলি সম্পূর্ণ করার কাজে। দক্ষিণ-পূর্ব রেল চার হাজার কোটি টাকার বেশি পেয়েছে বাংলার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়িত করার জন্য। বাকি টাকা পূর্ব রেল। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে রেল মন্ত্রীর একটি কথা থেকে- বরাদ্দ অর্থের বণ্টন কিন্তু নির্ভর করবে রাজ্য সরকারের সক্রিয়তার উপরে। প্রসঙ্গত, বাংলায় এখনও পূর্ব রেলেরই ৪৪টি প্রকল্পের কাজ আটকে আছে জমিজটে। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা থেকে মিড ডে মিলের মতো প্রকল্পগুলির রাজ্যের পারফরম্যান্স এখন কেন্দ্রের নিশানায়। বরাদ্দ টাকা আসছে না কিন্তু প্রতিনিধি দল বার বার বাংলা ঘুরে যাচ্ছেন। রেলের ক্ষেত্রেও কি এমনটাই ঘটবে?
বস্তুত মেট্রো রেল ও হাতে গোনা কিছু প্রকল্প বাদ দিলে বাংলার বেশিরভাগ প্রকল্পে নামমাত্র বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলার জন্য নতুন কোনও প্রকল্পও ঘোষণা হয়নি। রেলমন্ত্রীর নিজের কথতেই স্পষ্ট অতীতে ঘোষিত অধিকাংশ বড় মাপের প্রকল্প নামমাত্র অর্থ বরাদ্দ করে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। রেলমন্ত্রী এটাও জানান, ১১ হাজার ৯৭০ কোটি টাকার বরাদ্দ করা হয়েছে বাংলার রেল বাজেটে। কিন্তু বঞ্চনার তালিকা যে তার চেয়েও দীর্ঘ। কালিয়াগঞ্জ-বুনিয়াদপুর নতুন লাইন। এই প্রকল্পে এবার বরাদ্দ মাত্র এক হাজার টাকা। একলাখি-বালুরঘাট নতুন লাইন, সোনারপুর-ক্যানিং ডাবলিংয়েরও একই হাল। পাশাপাশি রেলের লিলুয়া এবং অণ্ডাল ওয়ার্কশপে গতবার যথাক্রমে ৫৭ লক্ষ ৪০ হাজার এবং তিন কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছিল। এবার তা কমে হয়েছে এক লক্ষ এবং এক কোটি টাকা। বর্ধমান-কাটোয়া গেজ পরিবর্তন প্রকল্পে বরাদ্দ ১০ কোটি থেকে কমে হয়েছে ৫ কোটি ১০ লক্ষ টাকা। চিনপাই-সাঁইথিয়া গেজ পরিবর্তনে অর্থই বরাদ্দই হয়নি। যদিও তারকেশ্বর-বিষ্ণুপুর নতুন লাইনের জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে। এবার দেওয়া হয়েছে ১০১ কোটি ৮৫ লক্ষ টাকা।