মহাকালের চেনা পথ ধরে প্রতি বছর ২২ শে শ্রাবণ আসে। এই দিনটি বিশ্বব্যাপী বিশ্বকবির ভক্তদের কাছে একটি শূন্য দিন। স্বজন হারানোর বেদনার দিন। তাঁর কাব্য — সাহিত্যের বিশাল অংশে যে পরমার্থের সন্ধান করেছিলেন সেই পরমার্থের সঙ্গে তিনি লীন হয়েছিলেন এদিন। রবীন্দ্রনাথের কাব্যে মৃত্যু এসেছে বিভিন্নভাবে।জীবদ্দশায় মৃত্যুকে তিনি জয় করেছেন বারবার।
২২ শে শ্রাবণ, ১৩৪৮ সাল। কবির প্রিয় ঋতু বর্ষায় নিভেছিল জীবনদীপ। এ মৃত্যু কবির কাছে গীতসুধারসে আসেনি। জগতে মাধুরী ছড়িয়ে দিয়েও তাঁর অন্তরের মাধুরী যদিও কমেনি একরত্তি, কিন্তু শারীরিক কষ্ট পেয়েছেন। তবে যাবার আগেও ছড়িয়ে গেছেন রসের করুণধারা। মৃত্যুর সাতদিন আগে পযর্ন্ত বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টিশীল ছিলেন। তাই তিনি লিখেছেন — ‘তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছো আকীর্ণ করি।’ তবে আজ তাঁকে শুধু দুঃখ দিয়ে নয়, মনে করতে চাই একটু অন্যরকম করে।
প্রসঙ্গত, অসাধারণ সৃজনশীলতা, নিবিড় জীবনবোধ ও ভাষার অনন্য প্রকাশভঙ্গি দিয়ে সাহিত্যের সমসাময়িক বিশ্বে তিনি খ্যাতি লাভ করেন। বিশ্বের নানা ভাষায় তাঁর সাহিত্যকর্ম অনূদিত হয়েছে। এমনকী নানা দেশের পাঠ্যসূচীতে লেখা সংযোজিত হয়েছে। ‘গীতাঞ্জলি’ গ্রন্থের জন্য পেলেন নোবেল প্রাইজ। যেখানে প্রধান উপজীব্য ছিল জীবনানুভূতি। জাতিসত্তা, আশা-আকাঙ্খার ও নিরাশার আবেদন। যা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এটি এমন প্রবলভাবে ওঠে এসেছে যে তিনিই হয়ে উঠেছেন বাঙালির জাতিসত্তা ও বোধের এক অপার আধার।
উল্লেখ্য, ভানুসিংহের পদাবলীতে মৃত্যুকে বন্দনা করেছেন ‘মরণ রে, তুহুঁ মম শ্যাম সমান।’ অর্থাৎ কবি যে পরমার্থের সন্ধান করেছিলেন, এটা থেকেই স্পষ্ট। মৃত্যুকে তিনি একাধিকবার সামনে থেকে দেখেছেন। চোখের সামনে এক এক করে প্রিয়জনদের হারিয়েছেন।থেমে থাকেনি স্বজন হারানো বেদনা। এত কিছুর পরেও কবি আমাদের স্মরণে — মননে গেঁথে আছেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কর্মে আমাদের মধ্যে বর্তমান আছেন, থাকবেন চিরদিন। তাঁর ভাষায় ‘জীবনে মৃত্যু করিয়া বহন প্রাণ পাই যেন মরণে।’ তাঁরই গলায় শোনা যায় ‘মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে / মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।’ তাই আমাদের কাছে ২২ শে শ্রাবণ নতুন প্রাণের আবাহন তিথি। এই দিনটি আবার বৃক্ষরোপণ উৎসব হিসেবে পালন করা হয়। নিজের জীবনকালেই রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে বহুবার বৃক্ষরোপণ উৎসব পালন করেছেন। আজও এ দিনটি কবি গুরুর মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখতে প্রতি বছর শান্তনিকেতনে পালিত হয় বৃক্ষরোপণ উৎসব।
উল্লেখ করতেই হয় কবি এখনো বাঙালিদের আত্মার সঙ্গে মিশে আছেন। কলকাতার জোড়াসাঁকোতে জন্মেছিলেন। সময়টা ছিল ১৮৬১ সালের ৭ মে। বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মা সারদাদেবী। পুঁথিগত বিদ্যা একেবারেই পছন্দ ছিল না কবির। শান্তিনিকেতন গড়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন প্রকৃতির মাঠে পাঠই আসল শিক্ষা দেয়। এই নতুন ধারার শিক্ষায় তিনি বিশ্বাসী ছিলেন। খোলা আকাশের নিচে শিক্ষাকেই বেছে নিতে বলেছেন। তা আজকের গবেষকরা মনে করছেন এটাই সঠিক পথ। কারণ করোনা আবহওয়াকালে কোভিড আক্রান্ত দেশে তৃতীয় ঢেউয়ের আশংকায় প্রায় সকলেই ভীত। ঠিক তখনই রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠেন শুশ্রূষার প্রতীক। রবীন্দ্রনাথ তাঁর নানান লেখায় মৃত্যুকে কখনও ‘সন্ততি’, আবার কখনও ‘বন্ধু’ বলে সম্বোধন করেছেন। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুচেতনা বড় গভীর। আর সেই অগাধ গভীর সমুদ্রে এ হয়তো সামান্য নুড়ি — পাথর মাত্র। তবু এই কোভিডকালে ছন্দেও মঞ্চে ফিরতে একমাত্র তিনিই ভরসা।
৮১ তম প্রয়াণ দিবসে তাঁর সৃষ্টি দুটি জাতীয় সংগীতের মর্যাদা পেয়েছে। আমাদের দেশের ‘জনগণমন অধিনায়ক’ এবং বাংলাদেশের ‘আমার সোনার বাংলা’। যা আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে গাওয়া হয়। তাঁর প্রকাশির ৫২টি কবিতার বই, উপন্যাস ১৩টি, ছোটগল্প ৯৫টি, প্রবন্ধ ও গদ্য গ্রন্থ ৩৬টি, নাটকের বই ৩৮টি ও ২ হাজারের বেশি গান আজও সমাদৃত বিশ্ব জুড়ে।
যখন কবি শান্তিনিকেতনে শেষ বয়সে উপনীত, তখন লেখনীতে উঠে আসছে — “যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে, আমি বাইবো না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে।” ঠাকুরের পায়ের চিহ্ন না রইলেও তাঁর রচনায় ভর করে খেয়াতরী বাওয়া ছাড়েননি কবি। তাই মুত্যুর পরেও তিনি আমাদের কাছে চিরশাশ্বত। তিনিই বলতে পারেন, “মৃত্যুতেই জীবনের সর্বোচ্চ পরিপূর্ণতা।” আর এই সত্যই বারবার ওঠে এসেছে তাঁর সৃষ্টিশৈলী ও কাব্যধারার ছন্দে। ২২ শে শ্রাবণ মানে অঝোর বৃষ্টিস্নাত দিনটি মনে করায় বিচ্ছেদের কাহন। অঝোর বৃষ্টি আর একরাশ বিরহের অশ্রুধারা মিলেমিশে গিয়েছিল এই দিনে ৮১ বছর আগে। একদিকে পূব আকাশের রবি আলো দিয়ে পরিবেশকে সজীব ও প্রাণবন্ত করে তোলে। অপরদিকে প্রাণের রবি সমগ্র বিশ্বে জ্ঞানের আলো জ্বালিয়ে নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটায়। তিনি ছিলেন শৈশবের হাতে খড়ি, শিক্ষা জীবনের পথচলা শুরু, সহজপাঠ বুঝিয়ে ছিলে তুমি শিক্ষাগুরু। আমাদের সবার প্রাণের ঠাকুর। লহ তুমি প্রণাম।